চিলেকোঠার প্রেম পর্বঃ- ৬ (ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস)

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস

ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ছোট ছেলে রাসেল রোদে বসে আছে।আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কি যেন বিড়বিড় করছে?মনে হচ্ছে,অনেকদিন পর বাইরের নীল আকাশ দেখে কথা বলছে আকাশের সঙ্গে।প্রকৃতির বাতাসের সুবাস গ্রহন করছে।আজ সকালে রাসেলকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।রুম থেকে বের হওয়ার পর তেমন হইচই করেনি।চুপচাপ এসে বাইরে বসে কি যেন দেখছে।মুখ দিয়ে একটি কথা বের হয়নি।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ চেয়ার নিয়ে বসে আছে একটু দূরে।তিনি রাসেলের দিকে গভীর পর্যবেক্ষণ করছেন।ছেলেটা সত্যিই সুস্থ হয়েছে তো?যদি আগের মতই থাকে,তবে অন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে।চশমার ফাঁকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছেন তিনি।ইয়াজউদ্দিন আহমেদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তুলি।তুলির হাতে ক্যামেরা।রাসেলের আচরন ক্যামেরায় বন্দী করছে খুব সাবধানে।রাসেল দেখলে হয়তো রেগে হুলস্তুল কান্ড বাঁধাতে পারে।তুলি মাথাটা নিঁচু করে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের কানে কানে বলল,বাবা,কিছু বুঝতে পারলে তুমি?

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ মাথা নেড়ে বললেন,এখনও কিছুই বুঝতে পারছি না।ছেলেটা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।সূর্যের প্রচন্ড তাপ,অথচ তাকিয়ে থাকতে ওর কষ্ট হচ্ছে না।

তুলি বলল,হুম সত্যিই তাই।অস্ট্রেলিয়ায় আমার এক পরিচিত ডাক্তার আছে।নাম ডাঃ ব্রেড জনসন।আমি জনসনকে সব খুলে বলেছি।জনসন বলেছে,রাসেলের আচরনের দিকে লক্ষ্য রেখে তাকে জানাতে।আজ রাতে স্কাইপে জনসনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

-সেই ভালো হবে।আমরা কি আর ডাক্তার নাকি,আচরন দেখে বলে দিতে পারবো সবকিছু?আচ্ছা তুবা কি করে?এত করে ডাকলাম,বের হলো না মেয়েটা,বলল ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

-রুমে জাহিদের সঙ্গে কথা বলছে।দুজনের মধ্যে কিছু নিয়ে ঝামেলা চলছে।তাই হুট করে বাংলাদেশে চলে এসেছে,বলল তুলি।

-তাই তো বলি,হঠাৎ বাংলাদেশে কেন?আমার এক সন্তান এক রকমের হয়েছে।কেউ আমার স্বভাব পায়নি।সন্তানের মধ্যে কেউ তো একজন বাবার স্বভাব পেয়ে থাকে।কিন্তু আমার কেউ পায়নি,কেউ না,আফসোস করে বললেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

আরিশা পুতুল নিয়ে নিচে চলে এসেছে।তুলি আর ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে দেখে সে কিছুক্ষন তাকিয়ে রয়েছে,যেন মজার কোনো দৃশ্য দেখছে।দুজনের সামনে একটি ছেলে বসে আছে।ছেলেটির বয়স তার থেকে অনেক বেশি হবে।কিন্তু ছেলেটি আকাশের দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?আকাশে কি কোনো ভূতের মুভির দৃশ্য চলছে?Is there a picture of ghost in the sky?আরিশা হেঁটে রাসেলের সামনে এসে দাঁড়ালো।বলল,এই ছেলে,তোমার নাম কি?আকাশের দিকে তাকিয়ে কি দেখো?নতুন এসেছো এই বাড়িতে?জানো,এটা আমার নানুর বাড়ি।This home is my Grandfather's house.

রাসেল মাথায় হাত দিয়ে আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল,আকাশে মেলা বসেছে।অতি সুন্দর মেলা।আমি মেলা দেখি।

আরিশা চোখগুলো সংকুচিত করে রাসেলের দিকে তাকিয়ে বেশ বিরক্ত মনে হলো।কেউ পাল্টা প্রশ্ন না করলে খুব রাগ হয় ওর।আরিশা বলল,এই পুতুলটার নাম কি জানো?ওর নাম অ্যারাইবা।

রাসেল চুপ করে রইল।ওর কথা বলার ইচ্ছে নেই কারো সাথে।আরিশাকে দেখে মনে হচ্ছে,ছোট মেয়েটা বেশ রেগে গেছে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,এই পঁচা লোকটা কে?আমার সাথে কথা বলছে না কেন?

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বলল,নানুভাই,ওনি তোমার মামা হয়।এতদিন দেশের বাইরে ছিল।আজ বাসায় এসেছে,আরিশার সঙ্গে মিথ্যে বলে ইয়াজউদ্দিন সাহেব মাথা নিঁচু করে ফেলল।মানসিক সমস্যার মতো কঠিন শব্দটি আরিশার ক্ষুদ্র মাথায় ঢুকবে না।

তুলি ব্যাপারটা বুঝতে পারল।বাম হাত ইয়াজউদ্দিন আহমেদের কাঁধে রেখে ভরসা দিল।আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল,মামনি,তুমিও মামার সাথে বসে আকাশ দেখো।দেখবে,সে তোমার সাথে কথা বলছে।

আরিশা বোধহয় কথাটি শুনে বেশ খুশি হয়েছে।পুতুলটি তুলির হাতে দিয়ে দৌঁড়ে রাসেলের পাশে বসে পড়ল।আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,কোথায় বসেছে মেলা?

রাসেল,মামা কথাটি শুনে আরিশার দিকে একবার তাকালো।তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,ওইযে দেখো,নীল রঙের ছোট ছোট দোকান এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তার মাঝে সাদা রঙ হাঁটছে।এই সাদা রঙগুলো হলো মানুষ।মানুষগুলো দোকান ঘুরে ঘুরে দেখছে।আরিশা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে কথা শুনছে রাসেলের।

তুলি রাসেলের কথা শুনে আকাশের দিকে তাকালো।নীল রঙের আকাশে সাদা মেঘগুলো নড়ছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়।মুগ্ধ হয়ে দেখছে তুলি।সত্যিই তো সুন্দর মেলা বসেছে উপরে।আজ কি আকাশে পহেলা বৈশাখের মেলা বসেছে?আজ বাংলা মাসের কত তারিখ?তুলির মনে পড়ে,সে যখন খুব ছোট তখন বাবার কাঁধে চড়ে বৈশাখের মেলা দেখতে রাস্তায় বের হতো।এখন সে সুযোগ হয়না দেশে আসার।বাবাকে জিজ্ঞেস করে দেখি তো কি বলে।বাবা,আজ বাংলা মাসের কত তারিখ?জিজ্ঞেস করল তুলি।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বেশ বিরক্ত।তিনি একটা বিশেষ কাজ করছে চেয়ারে বসে।অথচ তার মেয়ে এই সময়ে কি বাড়তি কথা জিজ্ঞেস করছে!বাংলা মাসের কত তারিখ জেনে কি করবে সে?জমিতে ফসল লাগাবে নাকি?বিদেশে থেকে থেকে তুলির মাথাও রাসেলের মতো খারাপ হয়ে যাচ্ছে।এটাকেও বাসায় আটকে রেখে চিকিৎসা করতে হবে।তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন,জৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি হবে।কত তারিখ বলতে পারবো না।

তুলি বলল,আকাশে বোধহয় জৈষ্ঠ মাসের মেলা বসেছে।আচ্ছা বৈশাখ তো চলে গেছে।আকাশেরও কি বৈশাখের মেলা বসে?সেখানেও মেলায় হাতি-ঘোড়া উঠে?

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তুলির কথা শুনে বিড়বিড় করে বললেন,সত্যিই মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।রুমে আটকে রেখে চিকিৎসা করা অতি জরুরি।

নয়.

সাজ্জাদ জহির গম্ভীর মুখে সোফায় বসে আছে।ওনার মতে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজগুলোর একটি,বাসায় স্ত্রীর সামনে দাঁত বের করে বসে থাকা।এই মহিলাটিকে এখন অসহ্য মনে হয় তার কাছে।দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়।কিন্তু পুষ্পের আবদারে না বসেও উপায় নেই।শত হলেও একমাত্র মেয়ে বলে কথা।সাজ্জাদ জহির ভাবছেন,ইশশ,এখন যদি ম্যানেজার শফিক সাহেবকে ডেকে পাঠাতেন ভালোই হতো।অফিসের কলিং-বেল হাতের কাছে থাকলেই চাপ দিতেন।শফিক সাহেব,ভেতরে ঢুকে হাসিমুখে বলতেন,আসসালামুআলাইকুম স্যার।আপনার শরীর ভালো তো?মুহূর্তে মন ভালো হয়ে যেতো।যাই হোক,কল্পনা কল্পনাই থাকুক।তিনি পুষ্পের দিকে তাকিয়ে বললেন,এখানে বসে থাকতে বেশ বিরক্ত লাগছে,মা।অফিসেও যেতে পারিনি।

পুষ্প সাজ্জাদ জহিরের পাশে বসে আছে।বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,আজ আমার খুব কাছের বন্ধু আসবে।ছেলেটি নাম কাব্য।বেশ ভদ্র ছেলে।কাব্যকে বলেছি,তোমাদের দুজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো।তবে অন্তত আজকের জন্য আমার বন্ধুর সামনে আমাকে ছোট করো না,প্লিজ।আমার তোমাদের দু'জনের প্রতি অনুরোধ রইল।

সেলিনা হোসেন সামনের সোফায় বসে আছেন।তিনি পুষ্পের দিকে তাকিয়ে বললেন,আহা!বুঝতে পারছো না?অফিসে না গেলে তো সুন্দরী মেয়েদের দেখতে পারবে না তোমার বাবা।যাই হোক,আমার বসে থাকতে কোনো সমস্যা নেই।

সাজ্জাদ জহির বেশ রেগে বললেন,এই বাজে কথা বলবে না।আমি কখনোই অন্য মেয়েদের দিকে তাকাই না।সবাইকে নিজের মতো চিন্তা করবে না,সেলিনা।

পুষ্প বলল,এই এতক্ষন কি বললাম তোমাদের?আবার শুরু করে,কথা শেষ করার আগেই দরজায় টোঁকা পড়ল।পুষ্প দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,কাব্য,ভেতরে চলে এসো।
সাজ্জাদ জহির এবং সেলিনা হোসেন নিজেদের স্বাভাবিক করে বসে রইলেন সোফায়।

কাব্য ভেতরে এসে প্রবেশ করতেই সাজ্জাদ জহির দেখতে পেলেন,ছেলেটি নীল পান্জাবি পড়ে এসেছে ।মাথায় সাদা টুপি।তিনি একটু চমকে উঠলেন।পুষ্পের বন্ধু এভাবে আসবে তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি।পুষ্পের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি কি যেন ইশারা দিলেন।পুষ্প সেদিকে খেয়াল করেনি।ওনার স্ত্রী সেলিন হোসেনের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখ পড়তেই তিনি চোখ নামিয়ে ফেললেন।তবে বুঝতে পারলেন,সেলিনা বেশ অবাক হয়েছে।সাজ্জাদ জহির নিজেকে স্বাভাবিক করে বললেন,আরে তুমিই তো কাব্য?পুষ্পের মুখে তোমার কথা কত শুনেছি।দাঁড়িয়ে কেন,বসে পড়ো,সোফার দিকে ইশারা করে বসতে বললেন তিনি।

কাব্য সালাম দিয়ে বসে পড়ল সোফায়।পুষ্পের দিকে তাকিয়ে বলল,আমি বোধহয় একটু দেরি করে ফেললাম।আসলে জানাযার নামাজ পড়ে আসতে দেরি হয়ে গেছে।রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম ছিল।

কথাটি শুনার জন্য সাজ্জাদ জহির বোধহয় প্রস্তুত ছিলেন না।মানুষ বাসায় এসে জিজ্ঞেস করে,কেমন আছে,কি খবর।আর এই ছেলে এসেই বলছে,জানাযার নামাজ পড়ে এসেছে।তিনি কাব্যের দিকে তাকিয় বললেন,কার জানাযার নামাজ পড়ে এসেছো?

-আমার এক কাছের বন্ধুর।গতকাল রাতে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে।ছেলের লাশ ধরে বাবা-মায়ের কান্না দেখে চোখে পানি চলে এসেছে।ওর সাথে কত হেঁটেছি রাস্তায়,হতাশা ব্যক্ত করে বলল কাব্য।

-নিশ্চয়ই প্রেমঘটিত বিষয়ে বিষ খেয়েছে।এখনকার ছেলে-মেয়েগুলোকে নিয়ে আর পারা যায় না।কিছু হলে আত্মহত্যা করে বসে,বলল সেলিনা হোসেন।

-আন্টি,প্রেমঘটিত বিষয় নয়।প্রেমের চেয়েও দুনিয়াতে আরও কঠিন কষ্ট রয়েছে,বলল কাব্য।

-বলো কি,প্রেমের চেয়েও আছে?একটু খুলে বলো তো,বাবা,বলল সাজ্জাদ জহির।

-ছেলেটির নাম হাসান।হাসানের সঙ্গে পরিচয় সেই ছোটবেলা থেকে।খুবই হাসি-খুশি,প্রাণবন্ত একটা ছেলে।ওর মুখ কখনও মলিন দেখিনি আমি।আমার মন খারাপ হলে মুহূর্তে মন ভালো করার এক জাদুর কাঠি ছিল হাসান।এই হাসান হঠাৎ পাল্টে যায় ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হওয়ার মাঝামাঝি সময়ে।সারাদিন মুখ গোমড়া করে বসে থাকতো।আমার সঙ্গে কথা কম বলতো।সবকিছু নিয়ে খুবই বাজে অবস্থা।ছেলেটার হাসি কোথায় যেন হারিয়ে গেল।পরে জানতে পারলাম,হাসানের বাবা-মায়ের মধ্যে প্রচন্ড ঝামেলা চলছে।হাসানের বাবা ওর মায়ের গায়ে হাত তুলে প্রতি রাতে।এই নিয়ে হাসানের মধ্যে হতাশার জন্ম নেয়।একসময় মানসিক রোগী হয়ে যায় সে।ঢাকায় ভর্তি করিয়ে দেয় ওর দাদা।মাঝেমাঝে গিয়ে দেখা করি।কিন্তু আমাকে চিনতে পারেনা।সারাক্ষন কি যেন বলে সিলিং-ফ্যানের দিকে তাকিয়ে।দুইবার ফাঁস দেয়ার চেষ্টা করেছিল,কিন্তু পারেনি।গতকাল রাতে হসপিটালের সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে,তখনই এই দুর্ঘটনা ঘটে।শেষ রক্ষা আর হয়নি।ছেলের লাশকে ঘিরে বাবা-মায়ের আহাজারিতে হাসপাতালের বাতাস ভারি হয়ে গেছে।এখন কান্না করে কি হবে?ঝগড়া করার সময়ে ছেলেটার কথা চিন্তা করলে হয়তো এমন করুন পরিণতি ওর ভাগ্যে লেখা থাকতো না,হতাশা ব্যক্ত করে বলল কাব্য।
ভালোবাসার গল্প
সাজ্জাদ জহির এবং সেলিনা হোসেন মাথা নিঁচু করে চুপ করে বসে আছেন।যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে দু'জনে।পুষ্প দুজনের চেহারা দেখে বুঝতে পারলো,কাব্যের কথাগুলো বেশ কাজে দিয়েছে।এখন দেখা যাক,কি হয়!

কাব্য নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,যাই হোক,আংকেল-আন্টি,প্রথম দেখা করতে এসে এসব  কথা বলা উচিত হয়নি।পরিবেশটা কেমব ঘুমট করে দিয়েছি।আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

সাজ্জাদ জহির বললেন,না,ঠিক আছে।তবে ছেলেটার জন্য খারাপ লাগছে।আচ্ছা,ওর বাবা-মায়ের কি অবস্থা?

কাব্য বলল,এখন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে দুজনে আফসোস করছে।কিন্তু কি লাভ,সবই তো শেষ হয়ে গেল।

সেলিনা হোসেনের মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বের হলো।তিনি পুষ্পের দিকে তাকিয়ে বললেন,আমি একটু ভেতর থেকে আসছি।তোমরা দুজনে কথা বলো,এই বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন।
সাজ্জাদ জহির সঙ্গে সঙ্গে সোফা থেকে উঠে বললেন,আমিও একটু আসছি।

কাব্য পুষ্পের চোখের দিকে তাকিয়ে কাব্যের উপর ভরসা রাখার জন্য বললো।সব ঠিক হয়ে যাবে।

মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ।মাঝেমাঝে মেঘের গুড়ুমগুড়ুম শব্দ হচ্ছে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ টেবিলে খেতে বসেছেন।ফুলি খিচুড়ি দিচ্ছে সবাইকে।সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা এবং বেগুন ভাজা।বৃষ্টির সময়ে খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশ ভাজা বেশ জমে।সবাই বেশ তৃপ্তি নিয়ে ভোজন করছে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদের খাবারের দিকে মনোযোগ নেই।আজ টেবিলে একজন সদস্য বেড়েছে।সে হচ্ছে রাসেল।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ রাসেলের দিকে তাকিয়ে আছেন।তিনি এখনও রাসেলের ব্যাপারে আশস্ত হতে পারছেন না।ছেলেটা সত্যিই সুস্থ তো?রাসেলের সঙ্গে আরিশা খেতে বসেছে।একদিনেই বেশ ভাব হয়েছে দুজনের।আরিশা আজ পুতুল সঙ্গে আনেনি।ব্যাপারটা দেখে তুলিও বেশ অবাক।রাসেল আরিশাকে খাইয়ে দিচ্ছে।

-ব্যাপার কি বল তো,মা?আরিশার সঙ্গে রাসেলের এত ভাব জমে গেল কিভাবে?ছেলেটা কোনো জাদু জানে নাকি?পাশে বসে খেতে বসা তুলিকে জিজ্ঞেস করলেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

তুলি খাওয়া বন্ধ করে বলল,বাবা,রাসেলের আলাদা একটা জগৎ আছে।কল্পনার জগৎ বলতে পারো।ওর কল্পনায় আমরা প্রবেশ করতে চাইলে বেশ বিরক্ত হয়,রেগে অনেক কিছু করতে পারে।আজ সকালে খেয়াল করে দেখো,আমরা উপরে তাকিয়ে দেখতে পাই বিশাল নীল আকাশ।কিন্তু রাসেলের চোখে,সেখানে মেলা বসেছে,আকাশের মেলা।এই মেলায় মেঘগুলো হলো মানুষ।আমাদের কাছে বৃষ্টি হয়তো স্বাভাবিক।কিন্তু রাসেলের চোখে বৃষ্টির ব্যাখ্যা আরও মুগ্ধকর।হতে পারে,রাসেলের কল্পনায় আরিশা নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।তাই রাসেল,আরিশাকে আপন করে নিজের বন্ধু বানিয়েছে।আমি নিশ্চিত বলতে পারি,তুমি এখন আরিশাকে বকা দাও,দেখবে রাসেল তোমার উপর ক্ষেপে যাবে।

ইয়াজউদ্দিন সাহেব মনোযোগ দিয়ে তুলির কথাগুলো শুনছিলেন।কথা শেষ হতেই তিনি পরীক্ষা করার জন্য আরিশার দিকে তাকিয়ে বললেন,এই নানুভাই,তুমি দুষ্টামি করলে কিন্তু খুব বকা খাবে।তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।
ইয়াজউদ্দিন সাহেবকে অবাক করে দিয়ে সত্যিই সত্যিই রাসেল কেমন চোখে যেন তাকালো।সে চোখের চাউনি খুবই ভয়ংকর।
তিনি তুলির দিকে তাকিয়ে বললেন,কি অদ্ভুদ!তুই এতকিছু কিভাবে জানতে পারলি?

বাবা,এসবই মনোবিজ্ঞানের বিষয়।আমি কিছুদিন এই নিয়ে রিসার্চ করেছিলাম।কিন্তু মাথা পাগল করার মতো অবস্থা।সে যাই হোক,তুমি রাসেলকে আরও আগে ছেড়ে দিলে এতদিনে সুস্থ হয়ে যেতো।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,আমারও কি ইচ্ছে হয় না রে,মা?কিন্তু চার বছর আগের কথাগুলো মনে পড়লে ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে।

-আচ্ছা বাবা,পুরাতন ইতিহাস টেনে লাভ নেই।রাসেল এখন মোটামুটি সুস্থ।শুধু কয়েকদিন একটু খেয়াল রাখতে হবে।আমার মনে হয়,সে সব ভুলে গেছে,বলল তুলি।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বলল,হুম,হতে পারে।আচ্ছা,তুবার ঝামেলা মিটেছে?খেতে আসতে বললাম,আসেনি।জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে।ওর হাবভাব তো বোঝা বড় কঠিন।
ভালোবাসার গল্প
-বাবা,তুমি এত চিন্তা করার দরকার নেই।ওদের দুইজনের সমস্যা ওদেরকে দেখতে দাও।আজ খিচুড়িটা কিন্তু দারুন হয়েছে।বৃষ্টির মধ্যে এর তুলনা হয়না।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ মুচকি হেসে বললেন,হুম।তবে সবসময় তোদের কাছে ফেলে আরও ভালো লাগতো।

তুলি কিছু বলল না।কথাটা যেন শুনতে পায়নি সে।মাথা নিচু করে চুপচাপ খেতে লাগল।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস

দশ.

পুষ্প বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে।শুয়ে শুয়ে বই পড়া পুষ্পের পুরানো অভ্যাস।তবে আজ পুষ্পের বই পড়তে ইচ্ছে করছে না।কাব্য যাওয়ার পর থেকেই ছেলেটার প্রতি তীব্র আকষর্ন কাজ করছে পুষ্পের মধ্যে।কত গুছিয়ে কথা বলতে পারে ছেলেটা।আর কত সহজে কথা বলে বাবা-মায়ের মধ্যে একটা পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।দুজনে যদি ঠিক নাও হয় তবুও পুষ্পের বিশ্বাস,ঝগড়া একটু হলেও কমবে।পুষ্প ভাবছে,এই আকষর্নই কি তবে ভালোবাসা?যেই ছেলেটা একটা পরিবারকে এত সুন্দরভাবে গুছিয়ে দিতে পারে,তাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।চোখ বন্ধ করে যেকোনো পথে তার সঙ্গে পা বাড়ানো যায়।দরজায় ঠকঠক আওয়াজে পুষ্পের ভাবনায় ছেদ পড়লো।বাবার কন্ঠ কানে আসল,ভেতরে আসবো,পুষ্প?

পুষ্প বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো।বই হাত থেকে রেখে বলল,হুম বাবা,ভেতরে আসো।

সাজ্জাদ জহির ভেতরে প্রবেশ করলেন।মুখে এক চিলতে হাসি।পুষ্পকে অবাক করে দিয়ে পেছন পেছন প্রবেশ করলেন সেলিনা হোসেন।তিনি মুচকি হেসে বললে,বই পড়ছিলে,মামনি?

পুষ্প যেন স্বপ্ন দেখছে।সত্যিই কি এমন ঘটছে?নিজের হাতে চিমটি দিয়ে দেখলো,সে ব্যাথা পেয়েছে।আনন্দে পুষ্পের মুখ দিয়ে যেন কথা বের হচ্ছে না।

সাজ্জাদ জহির ব্যাপারটা বুঝতে পেরে পুষ্পের পাশে এসে বসলেন।হেসে বললেন,এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকলে মশাও ঢুকে যেতে পারে।তখন তো রাতের খাবার খেতে পারবে না।পেট ভরে যাবে।

পুষ্প তার বাবার কথা শুনে হেসে ফেলল।বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,বাবা,আমি যেন স্বপ্ন দেখছি।তোমরা দুইজন একসঙ্গে আমার রুমে!

সেলিনা হোসেন বললেন,শুধু বাবাকে জড়িয়ে ধরবে?নাকি মায়ের বুকেও আসবে,আম্মু?পুষ্পকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি।

-সত্যিই আজ আমি খুব খুশি।আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন।আবার যেন আমাদের বাড়িতে আনন্দ ফিরে আসে,বলল পুষ্প।

-আচ্ছা শোনো,আজ আমরা বাইরে খেতে যাবো।জলদি তৈরি হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসো।এই দিনটি সেলিব্রেট না করলে জীবনটাই জলে যাবে,বলল সাজ্জাদ জহির।এই তুমিও আমার সঙ্গে চলো,রুম থেকে দুজনে বের হয়ে গেলেন।

পুষ্পের চোখে-মুখে খুশির আবেশ ছড়িয়ে পড়েছে।কাব্য সত্যিই জাদু জানে।কাব্যের কথা ভাবতেই লজ্জায় দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল পুষ্প।
ভালোবাসার গল্প
কাব্য বিছানায় শুয়ে আছে।পুরো রুম অন্ধকার।দক্ষিনের জানালা খুলে দিয়েছে সে।বৃষ্টি হওয়ার পর আকাশ বেশ পরিষ্কার।মেঘ কেটে গেছে।চাঁদের আলো বিছানায় এসে পড়ছে।কাব্য মুগ্ধ হয়ে দেখছে প্রকৃতির সৌন্দর্যের রূপ।মাঝেমাঝে নিচতলা থেকে হাসির শব্দ আসছে।শুনেছে,রাসেলকে নাকি ছেড়ে দিয়েছে।সে দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে।কাব্য ভেবেছিল,একবার গিয়ে দেখে আসবে।কিন্তু ইয়াজউদ্দিন সাহেবের দুই মেয়ে আসার পর নিচতলায় যেতে অশস্তি লাগে কাব্যের।হঠাৎ কারো কন্ঠে চমকে উঠল কাব্য।পেছন ফিরে দেখে বিন্তী বিছানায় বসে আছে।ধড়মড় করে শোয়া থেকে উঠে পড়ল কাব্য।

বিন্তী কাব্যের অবস্থা দেখে বেশ জোরে হেসে উঠল।হাসতে হাসতে বলল,ভয় পেয়েছেন নাকি?

কাব্যের চোখ থেকে চশমা একটু সরে গেছে। চশমা ঠিক করে বলল,না,ভয় পাবো কেন?কিন্তু আপনি ভেতরে আসলেন কিভাবে?দরজা খোলা ছিল নাকি?

বিন্তী মুচকি হেসে বলল,জানালা দিয়ে চলে এসেছি।দরজা তো বন্ধ ছিল।

কাব্য বলল,আমি ভীতু নই।আপনি যতই ভয় দেখানোর চেষ্টা করুন,আমি ভয় পাবো না।হয়তো ভুলে দরজা খোলা রেখে শুয়ে পড়েছি।

-আজ ছাদে যাবেন না?আকাশ বেশ পরিষ্কার।কি সুন্দর চাঁদ উঠেছে,বলল বিন্তী।

-না,আজ যেতে ভালো লাগছে না।ছাদ ভেজা রয়েছে।তাছাড়া প্রতিদিন যেতে দেখলে বাড়িওয়ালা চাচা সন্দেহ করতে পারে।ওনি এমনিতেই রাতে ছাদে আসতে বারণ করেছে।
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস

-কাব্য ভাইয়া,আপনে ভেতরে কার সাথে কথা বলেন?নতুন বিয়ে করছেন নাকি?দাওয়াত দিলেন না যে?ফুলির গলা ভেসে আসল বাইরে থেকে।

কাব্য বেশ ভয় পেল।নিজেকে সামলে বলল,না,ফুলি,একা একা ভালো লাগছে না।তাই নাটকের সংলাপ মুখস্থ করছি।কলেজে অনুষ্ঠান কিছুদিন পর।
ভালোবাসার গল্প
-আমি কি সাহায্যে করবো?আমি ভালো অভিনয় করতে পারি কিন্তু,বলল ফুলি।

কাব্য বেশ রেগে বলল,এই মেয়ে,একটা ছেলের বাসায় আসতে লজ্জা করে না।যাও নিচে,নাহলে চাচাকে বলে দিবো।

ফুলির গলা শোনা গেল না।বোধহয় নিচে চলে গেছে।

কাব্য সস্থির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,যাক একটুর জন্য রক্ষা।কিছু সন্দেহ করেনি।

বিন্তী মুচকি হেসে বলল,আপনার উপস্থিত বুদ্ধি খুবই ভালো।কলেজের অনুষ্ঠানের কথা বলে চালিয়ে দিলেন।

কাব্য বেশ লজ্জা পেল।বিন্তীর কথার উত্তর না দিয়ে জানালার পাশে গিয়ে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে।অস্ফুট স্বরে বলল,সুন্দর এই রজনী সত্যিই খুব সুন্দর।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস


..........চলবে.........

written by Habib Khan Hridoy

Post a Comment

أحدث أقدم