গোয়েন্দা সিরিজঃ- আত্নহত্যা অথবা খুন পর্ব ০৭ শেষ পর্ব (গল্প শেয়ার)



ঘুম ভেঙে গেল ফারহানের।এখন কয়টা বাজে?এই সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা নয়।পাশে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠল ফারহান।মিলি পাশে নেই।কোথায় গেছে মিলি?ফারহান উঠে লাইট জ্বালিয়ে মিলি বলে ডাক দিল।কিন্তু সাড়াশব্দ নেই।বাথরুমের দিকে গিয়ে দেখে,দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।তার মানে বাথরুমে যায়নি।তাহলে কোথায় গেছে?হঠাৎ চোখ পড়ল গেইটের দিকে।গেইট খোলা।তাহলে মিলি বাইরে গেছে?রাত তো অনেক।এত রাতে বাইরে কি করবে?


ফারহান আর দাঁড়িয়ে না থেকে শার্ট পড়ে বেরিয়ে পড়ল বাইরে।কিন্তু যাবে কোনদিকে?রাস্তা চলে গেছে দু'দিকে।অবশ্য প্রথম রাস্তার শেষে আর কোনো পথ নেই।একটু পরেই সেখানে গিয়ে উল্টো ফিরতে হবে।আর বাকি আছে একটি রাস্তা।ফারহান সে রাস্তা ধরে দ্রুত হাঁটছে।পুরো রাস্তা ফাঁকা।কুকুরগুলো শুনশান রাস্তা ধরে হাঁটছে।ফারহানকে এতরাতে হাঁটতে দেখে পিছু নিয়েছে।মাঝেমাঝে ঘেউঘেউ শব্দে ডাকছে।ফারহানের সেদিকে খেয়াল নেই।সে আশপাশে তাকিয়ে মিলিকে খুঁজছে।এতরাতে কখনো তো বের হয়না।আর বের হয়ে যাবে কোথায়?ফারহানের শরীর ঘামে ভিজতে শুরু করেছে।সে যেন এখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়বে।কি জবাব দিবে নিজেকে?একটা মাত্র বোন।কোথায় হারিয়ে গেল মিলি।ফারহানের ভীষণ কান্না আসছে।তাহলে কি মিলির কিছু হয়েছে?


ফারহান দৌঁড়াতে শুরু করেছে।ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ফারহানের ভেজা চোখদুটো চিকচিক করছে।হঠাৎ একটা জায়গায় এসে থেমে গেল ফারহান।খোলা চুলে একটি মেয়ের অবয়ব চোখে পড়ছে।দেখতে মিলির মতোই।ফারহান ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে আস্তে বলল,এই মিলি?


মেয়েটি পিছনে ফিরে তাকালো।সত্যিই মিলি!মিলি বলল,ভাইয়া,তুই এখানে?


ফারহান মিলিকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল।বলল,তুই এতরাতে বাসা থেকে বের হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?


মিলি সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,ভাইয়া,রাকিব।


-কোথায় রাকিব?বিস্ময়ে বলল ফারহান।


-এদিকেই চলে গেছে।এখন চোখে পড়ছে না।এখানে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি।এই ভাইয়া,রাকিব না বলেছিল,রাত হলে মিশনে বের হয়।এটাই কি সেই মিশন?


-কি জানি।আচ্ছা,এখন বাসায় চল।ঘুম থেকে উঠে এভাবে একা রাতে বের হওয়া ঠিক না।রাকিব হয়তো অনেক দূর চলে গেছে।আর খুঁজে পাওয়া যাবে না,বলল ফারহান।


-ঠিক আছে,চলো।


-আচ্ছা মিলি,তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?বলল ফারহান।


মিলি মাথা নেড়ে বলল,কি কথা ভাইয়া?


-একা থাকতে ভয় লাগবে তোর?তুই তো অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস?এইযে এখন একা একা হাঁটতে পারিস।আমি ছাড়া একা থাকতে পারবি না?


ফারহানের মুখে এমন অদ্ভুদ প্রশ্ন শুনে মিলি তাকিয়ে রইল ফারহানের দিকে।বলল,কোথায় যাবে তুমি?এই কথা বলছো যে?


-না,কিছু না।এখন বাসায় চল।আমার ভীষণ ঘুম আসছে।


ফারহানের মুখে এমন কথা কখনো শুনেনি মিলি।ছোট্ট মনে বাকি পথটুকু এই জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফারহানের মুখে তাকিয়ে হাঁটছে মিলি।


দশ.


হাসনাত করিম মিশনারি স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।বিট্রিশ আমলের তৈরি স্কুল।তৎকালীন সময়ে এদেশের খুব কম মানুষই মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যেতে পারতো।তবে উঁচু শ্রেণীর মানুষেরা শিক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে বিদেশেও গমন করতো।লন্ডন ছিল তাদের চোখে স্বপ্নের মতো।এমনই সময়ে ইংল্যান্ড থেকে আগত এক ধনী খ্রিষ্টান যাজক সব শ্রেণীর কথা বিবেচনা করে এই স্কুলটি তৈরি করেন।অবশ্য এখন স্কুলের পাশাপাশি অনেক কিছুই হয়েছে।হাসনাত করিম ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলেন,ছেলে-মেয়েরা বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত।এখানে নিয়ম করে সবার কাজ আলাদা করে ভাগ করে দেয়া হয়।কাজের সুন্দরের উপর বিচার করে ক্লাস পরীক্ষায় আলাদা নম্বর দেয়া হয়।মাঠের একপাশে বেশ বড় সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে-"পরিবেশ সুন্দর,তো শিক্ষার আঙিনায় মন বসবে।"হাসনাত করিম একপলক মাঠের দিকে তাকিয়ে স্কুল ভবনে প্রবেশ করলেন।ক্লাসের ব্যাগ রেখে সবাই বাইরে চলে গেছে।মনে হয় যেন,হঠাৎ সবাই কোথায় হারিয়ে গেছে।হাসনাত করিম খুঁজছেন অন্যকিছু।নিচতলা পুরোটা হেঁটে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন।একটি ছেলে হেঁটে যাচ্ছে।সম্ভবত কোনো কাজে পাঠিয়েছে।হাসনাত করিম বললেন,এইযে শুনছো?


ছেলেটি পেছনে ফিরে তাকালো।বলল,কিছু বলছেন,স্যার?


-এই চার্জ স্কুলের প্রধান ফাদারের অফিস রুম কোথায়?অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছি,খুঁজে পাচ্ছি না,বললেন হাসনাত করিম।


ছেলেটি বলল,পেছন দিকে একটু সামনে হাঁটলে লাইব্রেরী।লাইব্রেরীর পাশেই উনার অফিস রুম।ফাদার তো এখন অফিসে নেই।নিচে সবার কাজের উপর নজর রাখছেন।একটু পরেই ফাদার আসবেন।আপনি বসে অপেক্ষা করুন।


হাসনাত করিম পেছনে ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন লাইব্রেরী ধরে।বিশাল বড় লাইব্রেরী।অনেক বই সাজানো রয়েছে।হাজার পাঁচেক হবে আন্দাজ করলেন তিনি।একটু সামনে যেতেই থমকে দাঁড়ালেন।তিনি যা খুঁজছিলেন পেয়ে গেছেন।শুরু থেকে বর্তমান ফাদারের তালিকা দেয়ালে ঝুলছে।তবে একটি জায়গায় এসে আশা হারিয়ে ফেললেন তিনি।চার বছর আগে যিনি ফাদার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি গতবছর মারা গেছেন।এখন নতুন ফাদার এসেছে।উনার নাম ফাদার অ্যালেন আর্চার।হাসনাত করিম দাঁড়িয়ে রইলেন বাইরে।একটু পরেই একটু স্বাস্থ্য করে একজন এদিকেই আসছেন।উনার গলায় ক্রস ঝুলসে।


-আপনি কি ফাদার অ্যালেন আর্চার?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।


-হ্যাঁ,আমি ফাদার অ্যালেন আর্চার।কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।


-আপনি আমাকে চিনবেন না।একটা কথা জানতে আপনাকে খুঁজছি।একটু কথা বলা যাবে,ফাদার?


ফাদার অ্যালেন বললেন,হুম বলুন,কি জানতে চান?


-চার বছর আগে এখানে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল যা স্বাভাবিক ছিল না?মানে ঝামেলা হয়েছিল এমন কিছু?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।


ফাদার একটু থমমত খেয়ে বললেন,কই এমন কিছু তো হয়নি।চারবছর আগে ফাদার ছিলেন দ্বিতীয় রিচার্ড।উনার সাথে সহকারী হিসেবে ছিলাম পনেরো বছর।পনেরো বছরে এমন কিছু তো চোখে পড়েনি।


-সত্যিই এমন কিছুই হয়নি?আপনি ঠিক বলছেন তো ফাদার?


ফাদার অ্যালেন বললেন,অবশ্যই ঠিক বলছি।কোনো সন্দেহ নেই।


-কিন্তু আমার মনে হচ্ছে,আপনি কিছু আড়াল করছেন।আপনার চোখ-মুখ এমন কিছুই বলছে।সত্যিটা আমি জানতে চাই।


ফাদার ভ্রুঁ কুচকে বললেন,আপনি কি পুলিশের লোক?আপনার কাজের কাগজটা আমাকে একটু দিন তো।


-জ্বি না,আমি পুলিশের লোক নই।তবে আমার শ্যালক এসআই আনিসুর রহমান পুলিশ,বললেন হাসনাত করিম।


ফাদার অ্যালেন এবার বেশ হুংকার ছেড়ে বললেন,বাইরের লোক হয়ে ক্লাসের সময়ে এসে বিরক্ত করছেন?আপনি যাবেন নাকি আমি অন্য ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো?


হাসনাত করিম দমে গেলেন।বললেন,ঠিক আছে আমি যাচ্ছি।তবে সঠিক সময়ে কাঠি উল্টোদিকেও ঘুরতে পারে।সিড়ি বেয়ে নিচে নামলেন।বেশ ক্লান্ত লাগছে।মুখে একটু পানির ঝাপটা দিলে ভালো লাগবে ভেবে তিনি স্কুলের পেছনের দিকে বড় পুকুর ধরে হাঁটছেন।পুরানো অনেক বিল্ডিং-ই বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কালের সাক্ষী হয়ে হয়তো স্মৃতি হিসেবে রাখা হয়েছে।হঠাৎ হাসনাত করিম সূর্যের আলোতে দেখতে পেলেন,একটি ছায়া পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।পেছনে ফিরে তাকাতেই কেউ যেন মুখ চেপে ধরলো।


মুনিরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।মুনিরার হাতে পানির বোতল।বারান্দায় ঝুলানো গাছে পানি দিচ্ছে সে।কেয়ারটেকার চাচাকে দিয়ে বেশ কিছু গাছ আনিয়েছে।ভাবছে,যাওয়ার সময় সঙ্গে কিছু গাছও নিয়ে যাবে।দাদাজান দেখলে বেশ খুশি হবেন।দেখা যাবে,সালেহ মোর্শেদকে বলবে,দেখো তো,গাছগুলোর রেখা উজ্জ্বল কিনা?সালেহ মোর্শেদ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে বলবে,নাহ,মন্দ না।উমুক জায়গা থেকে কিছু সার নিয়ে গাছে দিতে পারলে তো কমপক্ষে দশবছর চল যাবে।মুনিরা কথাগুলো ভেবে মুচকি হেসে গাছে পানি দেয়া শেষ হলে চেয়ার পেতে বারান্দায় বসে পড়ল।এদিকের রাস্তাগুলো কেমন যেন শুনশান।অবশ্য আবাসিক এরিয়া হওয়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া কেউ বের হয়না।নাহলে তরকারি কিংবা মাছওয়ালাদের ডাকাডাকিতে ব্যস্ত দেখা যেত সবসময়।তবুও মাঝেমাঝে রিকশার টুংটাং আওয়াজ শোনা যায়।এতকিছুর ভিড়ে মুনিরার চোখ এক জায়গায় এসে আটকে গেল।বিশাল বড় একটি গাছের নিচে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে মুনিরার দিকে তাকিয়ে আছে।শরীরে ছেঁড়া শার্ট,পরনে হাফ প্যান্ট।ছেলেটির চোখের দৃষ্টি কেমন যেন শূন্য।মুনিরার হঠাৎ ইরার কথা মনে পড়ে গেল।দু'দিন আগে ফোনে কথা বলছিল দুজনে।তারপর একটি ছেলেকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল।একটু পরেই শুনতে পেল গোঙানির আওয়াজ।আর পরদিনই প্রিয় বান্ধবীর মৃত্যু।কথাগুলো ভাবতেই শিউরে উঠল মুনিরা।এই ছেলেটিও কি মৃত্যুর দূত হিসেবে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে?আজ রাতে সে নিজেও তাহলে মারা যাবে?মুনিরা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।দৌঁড়ে নিচে নেমে আসতেই কেয়ারটেকার বলল,কি হয়েছে আপামনি?এভাবে কোথায় যাচ্ছেন?


-রাস্তার ওইপাশে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।ছেলেটাকে এক্ষনি আমার সামনে নিয়ে আসুন,হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মুনিরা।


কেয়ারটেকার লোকটা আর দাঁড়িয়ে না থেকে গেইট খুলে চলে গেল ছেলেটিকে ধরে আনতে।একটু পরেই লোকটার ধমক শোনা গেল,আয়,নাহলে তোকে চোর বলে পিটাবো।মুনিরার সামনে এনে কেয়ারটেকার লোকটি বলল,এইযে নেন,কোনো বেয়াদবি করলে বলেন।এখনি চামড়া তুলে লবণ দিবো।


মুনিরা লোকটাকে ধমক দিয়ে বলল,আপনাকে মারতে বলিনি আমি।আপনি ভেতরে যান।আমি ওর সাথে কথা বলবো।


কেয়ারটেকার লোকটি রাগে ফুঁসলেও বাধ্য হয়ে ভেতরে চলে গেল বিড়বিড় করতে করতে।মুনিরা ছেলেটির দিকে তাকালো।মুখের একপাশে পুঁড়ে গেছে।বারান্দায় বসে দূর থেকে সেটা ভালো করে দেখা যায়নি।কাছে থেকে দেখলে শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে যায়।মুনিরা বলল,তোমার নাম কি বাবু?


ছেলেটি বলল,রাকিব।আমারে ধইরা আনছেন ক্যান?আমি তো এখনও কিছু করি নাই।


-তোমার সাথে কথা বলবো।আমার কথা বলার কেউ নেই।ইরা ছিল,কিন্তু সে বেঁচে নেই।তুমি আমার সাথে গল্প করতে পারবে না?


মুনিরার কথার উত্তর না দিয়ে রাকিব বলল,মৃত্যুর কথা সবাই বলতে পারে না।কিন্তু আমি পারি।


রাকিবের কথা শুনে কিছুটা ভয় পেল মুনিরা।এই কি সেই ছেলে,মৃত্যুর আগে সবার সামনে এসে দাঁড়ায়?মুনিরা বলল,তুমি আগে থেকেই বলতে পারো কে মারা যাবে?


রাকিব মাথা নেড়ে বলল,হ পারি।তয় সবার না।


মুনিরা চুপ করে আছে।কথা বলতেই এখন ভয় লাগছে তার।কিন্তু ভয় লাগার মত কিছুই ঘটেনি।মুনিরা ভাবছে,তার মৃত্যুর কথা একবার জিজ্ঞেস করবে কিনা ছেলেটিকে?পরমুহূর্তে কথাটা ভাবতেই নিজেকে পাগল ছাড়া কিছুই মনে হলো না মুনিরার।মুনিরা বলল,আজ আর গল্প করবো না।তুমি তাহলে যাও।কিছু খাবে তুমি?


রাকিব মাথা নেড়ে না বলে গেইটের দিকে পা বাড়ালো।গেইট থেকে বেরিয়ে মুনিরার দিকে মুচকি হেসে বলল,আর দেখা হইবো না।


সে হাসির প্রতিচ্ছবিতে মুনিরা যেন অন্যকিছুর ইঙ্গিত পেল।হয়তো একটু বেশি ভাবছে।


এসআই আনিসুর রহমান থানায় বসে আছে।মাথায় ব্যান্ডেজ করা।ডাক্তার বলেছে,ক্ষতটা শুকাতে বেশ কিছুদিন লাগবে।এসআই আনিসুর রহমানকে ছুটি নিতে বলা হয়েছিল থানা থেকে।কিন্তু সে নেয়নি।টেবিলের সামনে এক গাদা ফাইল নিয়ে বসে আছে।ফাইলে চোখ বুলিয়ে আবার চেয়ারে বসে থাকে।কনস্টেবল হামিদ নিজ জায়গা ছেড়ে উঠে এসে এসআই আনিসুর রহমানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,স্যার,ছুটি নিলেই পারতেন।শুধু শুধু অসুস্থ শরীরকে ব্যস্ত রাখার কি দরকার ছিল?বাসায় আরামে বসে খেতেন আর ঘুমাতেন।এমন সুযোগ তো সবার আসেনা।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,আমার তো গত এক বছর ধরে ছুটি নেই।আপনি তো পেয়েও বারন করে দিলেন।


-হামিদ সাহেব,ছুটি না নেয়ার কারন আছে।ছুটি নিলে দুলাভাইকে সাহায্য করা সম্ভব হতো না।এখন তো আমার কথা বলে উনি অনেক জায়গায় গিয়ে তথ্য নিতে পারছেন।আমি ছুটিতে গেলে তা আর সম্ভব হবেনা।তাছাড়া আমি প্রতিজ্ঞা করেছি,আমার মাথায় যে আঘাত করেছে,তার চেহারা না দেখে কোনো ছুটি নিবো না।এমনকি বিশ্রামও নয়।


কনস্টেবল হামিদ বলল,মাফ করবেন,স্যার।আপনার চিন্তাটা ঠিক হয়নি।চারটা খুন হয়ে গেল।অথচ খুনের প্রমান নেই।আত্মহত্যা বলে কেইস ফাইল বন্ধ।সেখানে আপনি চেহারা না দেখে ছুটি নিবেন না,ব্যাপারটা যুক্তিগত মনে হচ্ছে না।


-বাদ দাও তো।তবে সবকিছু হঠাৎ চুপ হয়ে গেল কেন বুঝতে পারছি না।কোনো খবরও তো নেই।আবার কে আত্মহত্যার নামে খুন হবে কে জানে?


-স্যার,আপনার দুলাভাই তো দেখছি,অনেক দৌঁড়ঝাপ করছেন।হয়তো কিছু হবে আমার বিশ্বাস,বলল কনস্টেবল হামিদ।


এসআই আনিসুর রহমান বলল,আমারও তাই ধারনা।হামিদ সাহেব,আপনার ছুটির ব্যাপারে আমি স্যারকে বলবো।দেখি,উনি কি বলেন।


কনস্টেবল হামিদের মুখে হাসি ফুটেছে।কৃতজ্ঞতায় কিছু বলতে যাবে এমন সময়ে টেলিফোন বেজে উঠল।বিরক্ত হয়ে পাশের টেবিলে বাজতে থাকা টেলিফোন তুলতেই কি যেন শুনে কনস্টেবল হামিদের বিরক্তি মুখের ভাবটা মুহূর্তে হেসে উঠল।টেলিফোন রেখে বলল,স্যার,আমার কথা মনে হয় আল্লাহপাক শুনেছে।খুনি ধরা পড়েছে।হাসনাত করিম সাহেব আপনাকে এক্ষনি গাড়ি নিয়ে বের হতে বলেছেন।


এসআই আনিসুর রহমান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।কনস্টেবল হামিদকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল গন্তব্যে।কিছুদূর যেতেই ফোন বেজে উঠল তার।ওপাশ থেকে হাসনাত করিমের কন্ঠ শুনতে পেলেন,আনিস,তুই বেরিয়েছিস তো?


-হ্যাঁ,আমি গাড়িতে,দুলাভাই।তুমি কোথায় এখন?জিজ্ঞেস করল এসআই আনিসুর রহমান।


-আমি এখনও স্কুলে।এখানে এসে একটা তথ্য পেয়েছি।পুরো ধারনা পাল্টে গেছে।সঠিক সময়ে জানতে পারবি।আমি আসতে ঘন্টা দুয়েক লাগবে।একটা ঠিকানা দিয়েছি,এক্ষনি গিয়ে ধরে নিয়ে আসবি।তবে খবরদার,শরীরে হাত তুলবি না।আমি আসার পর সব বলবো।এখন ফোন রাখছি।


এগারো.


সন্ধ্যায় হাসনাত করিম থানায় এসে পৌঁছালেন।ঢুকে দেখতে পেলেন,শ্যালক আনিসুর রহমান তার জন্যই অপেক্ষায় থানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।এগিয়ে গিয়ে বললেন,ছেলেটি কোথায়,আনিস?


এসআই আনিসুর রহমান বলল,ইনভেস্টিগেশন রুমে বসিয়ে রেখেছি।সাথে একজন নারী পুলিশ দেয়া হয়েছে।দুলাভাই,এই ছেলেটাই চারটা মেয়েকে খুন করেছে?


হাসনাত করিম বললেন,সে কথা পরে হবে।আগে আমাকে ইনভেস্টিগেশন রুমে নিয়ে চল।


দুজনে ইনভেস্টিগেশন রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো।হাসনাত করিম বাইরে থেকে কাঁচের দেয়ালের ভেতরে বসা ছেলেটিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করছেন।শ্যালক আনিসের দিকে তাকিয়ে বললেন,আনিস,চারটা খুনের ফাইলগুলো আমাকে দে তো।আমি আরেকটু চোখ বুলাতে চাই।


হাসনাত করিমের হাতে ফাইলগুলো দিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে রইল এসআই আনিসুর রহমান।হাসনাত করিম একবার ইনভেস্টিগেশন রুমের ছেলেটির দিকে তাকাচ্ছে।আবার ফাইলগুলোর পৃষ্টায় চোখ বুলাচ্ছে।হঠাৎ তিনি বললেন,হিসাব অনেকটা মিলে গেছে,আনিস।এখন শুধু অপেক্ষার পালা।


শ্যালক আনিস কিছু বলতে যাবে এমন সময়ে তার ফোনটা বেজে উঠল।রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ শুনে বিচলিত মনে হচ্ছে তাকে।ফোন রেখে বলল,দুলাভাই,মুনিরা নামের মেয়েটিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।একটু আগে কেয়ারটেকার কল করেছিল।সে খুব কান্না করছে।


হাসনাত করিম বললেন,এখনি গাড়ি নিয়ে একটা জায়গায় চল।গাড়িতে বসেই তোকে সব বলছি।তবে খুনী কে আমি এখনও শিউর নই।আন্দাজে মনে হচ্ছে,মুনিরা,সেখানেই রয়েছে।


গাড়ি বেশ দ্রত চলছে।এসআই আনিসুর রহমান ড্রাইভারকে আরও জোরে গাড়ি চালাতে তাগাদা দিচ্ছে।দুলাভাই,অন্তত একটা জীবনকে যেন বাঁচাতে পারি।


হাসনাত করিম বললেন,তাই যেন হয়।


-দুলাভাই,এই ছেলেটা কে?আর সে এখানে হলে মুনিরা নিঁখোজ হওয়ার পেছনে কার হাত রয়েছে?তাহলে আমরা ছেলেটাকে ধরেছি কেন?


-আনিস,ছেলেটাকে আটকে রেখেছি একটা হিসাব মেলাতে।ফারহানের কথা মনে আছে তোর।এই ছেলেটার নাম রাকিব।মুখের এক অংশ ছোটবেলায় পুঁড়ে গিয়েছিল।ফারহানের সাথে মাঝেমাঝে দেখা যায় রাকিবকে।ইরা মৃত্যুর আগে নিচে একটি ছোট্ট ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল।তারপরই মুনিরা গোঙানোর আওয়াজ শুনতে পায় ফোনে।


শ্যালক আনিস বলল,হ্যাঁ,তাই তো।কিন্তু কিসের হিসাব মিলবে আমি বুঝতে পারছি না।


হাসনাত করিম বললেন,ডাঃ রফিক ইরার পোস্টমর্টেম এর সময়ে বলেছিল,ইরার পোশাক থেকে একধরনের পাউডার জাতীয় ঔষধ পাওয়া গিয়েছে যা শরীরের পোঁড়া অংশে ব্যবহৃত হয়।গতকাল মুনিরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাস্তায় ফারহানের সাথে দেখা।তখনই রাকিবের সাথে পরিচয়।রাকিবের মুখের পোঁড়া অংশে ঔষধটা  দেখে আমি কৌতহূলী হয়ে ওদের নিয়ে একটা হোটেলে বসি এবং কথায় কথায় রাকিবের মুখের থেকে ঔষধের কিছু অংশ নিজের হাতে নিয়ে ফেলি।তারপরই তা ডাক্তার রফিকের কাছে এক কিনা পরীক্ষা করতে বলি।আজ সকালেই পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ আসে।


এসআই আনিসুর রহমান উত্তেজিত হয়ে বলল,তাহলে তো রাকিবই খুনী।কিন্তু এর মাঝে মুনিরা নিঁখোজ হয়েছে কেন?


হাসনাত করিম মুচকি হেসে বললেন,আসল ব্যাপারটা তো সেখানেই।মিশনারি স্কুলে যাওয়ার পর ফাদার কিছু বলেনি।সন্দেহজনকভাবে এড়িয়ে যান।তারপর মুখে পানির ঝাপটা দিতে পুকুরের দিকে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ কেউ যেন আমার মুখ চেপে ধরলো।একটু আড়ালে অন্ধকার ঘরে ঢুকে দেখতে পাই,সামনে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে।লোকটার কাছে যা শুনতে পাই,ঠিক চার বছর আগে স্কুলে একটা বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।সেখানে ফাস্ট হওয়ার কথা ছিল একটি এতিম ছেলের।কিন্তু প্রভাব খাঁটিয়ে ছেলেটিকে বাদ দেয়া হয়।সেদিন রাতেই ছেলেটি আত্মহত্যা করে।ছেলেটির মৃত্যুর পর পাঁচ বছরের একটি ছেলেকে কয়েকদিন স্কুলের বারান্দায় কাঁদতে দেখা যায়।একসময় ছেলেটিও কোথাও হারিয়ে যায়।মনে হচ্ছে,এতিম ছেলেটির আত্মহত্যাকে কেউ একজন মেনে নিতে পারেনি।তাই প্রতিশোধ নিচ্ছে।রাকিবের বয়স যদি আমরা হিসাব করি তাহলে নয়-দশের কাছাকাছি বয়স হবে।এমনটা আন্দাজ করেই তোকে ধরতে বলেছিলাম।কিন্তু পথেই আমার একটা হিসাব পুরো ব্যাপারটা ৩৬০ ডিগ্রি মোড় নেয়।


এসআই আনিসুর রহমান বলল,কি সেটা?


-রাকিবের উচ্চতা যদি আন্দাজ করি তাহলে তুলি,আনিকা,ইরা,সাবিহা এই চারজনের থেকে খুব কম।এই চারজনের দুজনকে ফ্যানে ঝুলানো অবস্থায় পাওয়া যায়।আর রাকিবের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।তাহলে রাকিবকে সাহায্য করছে কে?এখন প্রশ্ন তো তাই!


-আসলেই তো!আবার আরেকটা প্রশ্ন,ওই প্রতিযোগিতায় সাবিহা,তুলি আর মুনিরা পুরুষ্কার পেয়েছিল।কিন্তু তুলি আর আনিকাকে খুন করা হলো কেন?বলল এসআই আনিসুর রহমান।


হাসনাত করিম বললেন,আমার অনুমান যদি সঠিক হয় তবে এই দুটি প্রশ্নের উত্তর আসল খুনীই দিতে পারবে।তবে মুনিরাকে আমাদের বাঁচাতেই হবে।কি যে হচ্ছে মেয়েটার সাথে?


মুনিরার জ্ঞান ফিরতেই দেখতে পেল,সে একটি অন্ধকার ঘরে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে।শরীর ভীষণ দুর্বল লাগছে।এখানে কিভাবে আসলো সে?মুনিরার মনে পড়ল,বিকেলবেলা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।হঠাৎ পেছন থেকে কেউ মুখে একটা কাপড় ধরতেই আর কিছু মনে নেই।মুনিরা চিৎকার করতে গিয়ে আটকে গেল।আবছা অন্ধকারে কেউ যেন বসে মৃদু সুরে ভায়োলিন বাজাচ্ছে।মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না।মুনিরা বলল,কে তুমি?আমাকে এখানে নিয়ে আসার মানে কি?অপহরন করে মুক্তিপণ চাওয়ার ইচ্ছে থাকলে তাড়াতাড়ি বাসায় ফোন করো।টাকা চলে আসবে।


ভায়োলিনের আওয়াজ থেমে গেল।অন্ধকারে বিকট জোরে হাসির শব্দ শোনা গেল।হাসি থামিয়ে বলল,আগের দুই বান্ধবীর মৃত্যুর খবর মনে নেই,মুনিরা?তাদের তো টাকার জন্য খুন করিনি।খুন করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিয়েছি।তোমার পরিনতিও তাই হবে।তারপর আমিও চলে যাবো শহর ছেড়ে।কেউ জানবে না।অবশ্য একজন আমার কাছেই চলে এসেছে।কিন্তু সে আসার পর তোমার ঝুলানো দেহ ছাড়া আর কিছুই পাবেনা।ভেবেছিলাম,তোমাকেও রুমে মারবো।কিন্তু আমি জানি,আমার হাতে আর বেশি সময় নেই।


মুনিরা ভয়ে কান্না করতে শুরু করল।বলল,কিন্তু আমি কি করেছি তোমার?সাবিহা আর ইরা কি করেছে তোমার সাথে?


অন্ধকারে শোনা গেল,আমার সাথে কিছুই করেনি।কিন্তু একজনের তো পুরো জীবন শেষ করে দিয়েছে।তার কি হবে?


মুনিরা বলল,কে সে?আমরা তো তাকে জানিনা।


আবার হাসির শব্দ শোনা গেল।এবার কিছু বলার আগেই হঠাৎ রুমের লাইট জ্বলে উঠল।হাসনাত করিম,এসআই আনিসুর রহমান,ডাঃ রফিক দাঁড়িয়ে আছে।ডাঃ রফিক বলল,ফারহান তুমি এখানে?তাহলে এতকিছু তুমিই করছিলে?আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।


এসআই আনিসুর রহমান একবার হাসনাত করিমের দিকে তাকাচ্ছে,আবার ফারহানের দিকে।কিছুই বুঝতে পারছে না সে।বলল,দুলাভাই,এটা কিভাবে সম্ভব?


-ফারহান,তোমাকে আমি আন্দাজের উপরেই খুনী হিসেবে এখানে এসেছি।তবে তার জন্য নিজের ভাগ্যকে কিছুটা ধন্যবাদ দিতেই হয়।সেদিন মুনিরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর পথে তোমার সাথে দেখা।কথার ফাঁকে রাকিবের মুখের থেকে কিছু ঔষধ নিজের হাতে নিয়ে ফেলি।সকালে রিপোর্ট পজিটিভ আসার পর রাকিবকে খুনী হিসেবে মনে হলেও ছেলেটার উচ্চতা আমাকে দ্বিধায় ফেলে দেয়।মিশনারি স্কুলে যাওয়ার পর জানতে পারি,যেই ছেলেটি আত্মহত্যা করে তার একটি ছোট্ট ভাই ছিল এবং পরে জানতে পারি সেই ছেলেটিই এখন রাকিব।আর রাকিবের সাথে সখ্যতা বেশি তোমার।সঙ্গে খুনের ধরন দেখে মনে হচ্ছিল,খুনী বেশ মেধাবী।ডাঃ রফিকের কাছেই জানতে পারি,তোমার এসব ব্যাপারে খুব আগ্রহ।তখনই আমার ধারনা হয়,এর পেছনে তোমার হাত থাকতে পারে।কি ফারহান ঠিক বললাম তো?কিন্তু আমার একটি জায়গায় এসে প্রশ্ন,ডাঃ রফিক সাহেব বলেছিল,খুনীর চেহারা বেশ ভয়ঙ্কর।আনিসও ভয় পেয়েছিল।কিন্তু তোমার মাঝে তো এমন কিছু চোখে পড়েনি।তাহলে কি সবকিছু রাকিব ছিল?আর খুন করছিলে তুমি?


ফারহান এবার অন্ধকার জায়গা ছেড়ে লাইটের সামনে এসে দাঁড়ালো।মুখের একপাশ হাত দিয়ে টেনে দেখাতেই সবাই আঁতকে উঠল।রাকিবের চেয়েও ভয়ঙ্কর অবস্থা।অন্ধকারে যে কেউ দেখলে ভয়েই মারা যাবে।


হাসনাত করিম বললেন,এই জন্যই হোটেলে গতকাল মুখে পানি দাওনি।আসল অংশটা যদি বেরিয়ে আসে।ভালোই ঢেকে রেখেছিলে ফ্রেম দিয়ে।বোঝার উপায় নেই।এবার বলো,আত্মহত্যা করা ছেলেটি তোমার কে হয়?আর সাবিহা আর ইরার উপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তুলি আর আনিকাকে খুন করলে কেন?


ফারহানের চোখে হঠাৎ পানি দেখতে পেল সবাই।টপটপ করে পানি পড়ছে।সাদিক আমার বন্ধু ছিল।বন্ধু বললে ভুল হবে।রক্তের সম্পর্কের চেয়ে যদি বেশি কিছু থাকে তবে সাদিক তাই।সাদিক এতিমখানায় বড় হয়েছিল।রাকিব ছিল ওর আপন ছোটভাই।বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমার বোন মিলিকে নিয়ে বেশ কষ্টে পড়েছিলাম।সেই মুহূর্তে সাদিক পাশে এসে দাঁড়ায়।সাদিকের মাথা ছিল দারুন।নিত্য নতুন জিনিস তৈরি করা ছিল তার নেশা।মিশনারি স্কুলে একবার বিদেশ থেকে একটি দল আসে।সবার তৈরি করা উদ্ভাবনীর মধ্যে থেকে যে সেরা হবে তাকে স্কলারশিপে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হবে।আমি জানতে পেরে,সাদিককে দিতে বলি।সাদিকের কাজ দেখে সবাই খুশি হয়েছিল।সাদিকই প্রথম হবে সবাই জানতো।কিন্তু মুনিরার বাবা তা সহ্য করতে পারেনি।এতিমখানার ছেলে কিনা বিদেশ যাবে?সঙ্গে মুনিরা তার বাবাকে বলেছিল,তারা তিন বান্ধবী যেন সেরা হয়।মুনিরার বাবা তার ক্ষমতা ব্যবহার করে সাদিককে সরিয়ে জায়গা করে দেয় সাবিহা,ইরা আর মুনিরাকে।এই অপমান সহ্য করতে পারেনি সাদিক।সাদিকের স্বপ্ন ছিল,এবার হয়তো সে ঘুরে দাঁড়াবে।ছোট ভাইটাকে ঠিকমতো পড়াবে।কিন্তু পারেনি।সেদিন রাতে আমার কাছে এসে খুব কেঁদেছিল।যাওয়ার আগে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,রাকিবের দিকে খেয়াল রাখিস।


সাদিকের এই কথার মানে তখনও বুঝিনি।সকালে শুনতে পাই,সাদিক আত্মহত্যা করেছে।পাঁচ বছরের রাকিব সাদিকের লাশের দিকে তাকিয়ে শুধু "ভাইয়া ভাইয়া" বলে চিৎকার করছিল।আমি হারিয়েছিলাম আমার বন্ধুকে।সেদিনই শপথ নিয়েছিলাম,মুনিরার বাবাকে খুন করবো।কিন্তু তার আগেই গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায়।তখন সব রাগ এসে জমা হয় তিনজনের উপর।সাদিকের থেকে শেখা জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আত্মহত্যার নামে খুন করি সাবিহা আর ইরাকে।পোস্টমর্টেম রিপোর্টে কিছুই ধরা পড়েনি।আপনি যখন খুন বলে তদন্ত শুরু করলেন,তখনই দ্বিধায় ফেলতে আমার চেহারাকে কাজে লাগাতে শুরু করি।রাতে আনিস স্যারকে ইচ্ছে করে আসল চেহারা দেখাই,যেন মুনিরাকে খুন করতে সময় পেতে পারি।রাকিবকে ধরতে ব্যস্ত থাকবে সবাই,এদিকে আমার কাজ যেন শেষ করতে পারি।কিন্তু রাকিবের এই খুনে কোনো ধরনের হাত নেই।


হাসনাত করিম বললেন,সবই তো বুঝতে পারলাম।কিন্তু তুলি আর আনিকার তো দোষ ছিল না।মাঝে এই দুইটা মেয়েকে খুন করলে কেন?আর দুজনের খুনের ধরন আলাদা কেন?


ফারহান হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল।আমার চেহারা এতটাই খারাপ,কেউ ভালো করে তাকায় না।তখনই চেহারায় আলাদা প্রলেপ লাগানো শুরু করি।তুলির সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায় আমার।একসময় ভালোবেসে ফেলি দুজন দুজনকে।কিন্তু একদিন তুলিকে মিলির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য বাসায় আসতে বলি।নির্ধারিত সময়ের ত্রিশ মিনিট আগে চলে আসাতে তুলি আমাকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়।আমি তাকে আমার মিথ্যা চেহারায় প্রতারণা করেছি,ব্যাপারটা সে সহ্য করতে পারেনি।আমি ভয় পেয়ে যাই।সবাইকে যদি বলে দেয়,তাহলে জানাজানি হবে।সাবিহা খুন হওয়ার কথা বের হয়ে যেতে পারে ভেবে আমি তুলির বইয়ের ফাঁকে একধরনের ঔষধ ব্যবহার করি যার অস্তিত্ব রিপোর্টে আসেনা।পৃষ্টা ধরার সময়ে মুখে দিতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে।তারপর মৃত্যুর যন্ত্রনা কম হবে এই ভেবে ভালোবাসার মানুষটাকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দেই।আর আনিকা তুলির সবকিছুই জানে।ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে আনিকাকেও একইভাবে খুন করি।তবে দুজনকে খুন করার কোনো ইচ্ছে ছিল না।শুধুমাত্র আমার মিশন শেষ করার জন্যই এমনটা করি।


হাসনাত করিম বললেন,তোমার ভেতরে কতটা হিংস্র পশু বাস করে সেটা কি তুমি জানো,ফারহান?হয়তো,মুনিরার বাবা একটা অন্যায় করেছে।বাবা হিসেবে মেয়ের আবদার পূরন করতেই তিনি সাদিককে বাদ দিয়েছিলেন।কিন্তু এই তিনজন তো তার জন্য দায়ী নয়।এতগুলো খুন করার পর কখনো ভেবেছিলে,তোমার বাসায়ও একটা বোন আছে।তার সামনে দাঁড়াতে বিবেক কিছু বলেনি?


ফারহান বলল,স্যার,আমি ভুল করেছি।আমি জানি,আমি আমার বোনের সামনে কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো না।আমি তার জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।আপনার কাছে একটা অনুরোধ,ওই টেবিলে একটা কাগজ রাখা আছে।মিলির কাছে কাগজটা পৌঁছে দিবেন।বলবেন,তার আদরের ভাইটাকে যেন সে ক্ষমা করে দেয়।


সবাই কিছু বুঝে উঠার আগেই ফারহান খোলা বিল্ডিং-এর পেছনে যেতে শুরু করল।বলতে লাগল,তুলি আমি তোমার কাছেই আসছি।তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।দু'পা পেছনে ফেলার আগেই ফারহানকে আর দেখা গেল না ।সকলে দৌঁড়ে এসে নিচে দেখতে পেল,ফারহান উপুড় হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।রক্তের স্রোত মাটিতে মিশে রক্তিম সূর্যের মতো দেখা যাচ্ছে।


কাগজটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন হাসনাত করিম।


প্রিয় আদরের বোন,


তুই যখন এই লেখাগুলো পড়বি,আমি তখন অনেক দূরে।কত দূরে জানতে চাইবি না।শুধু এতটুকু বলতে পারি,আমি আর কখনো ফিরবো না তোর কাছে।কাল রাতে যখন তোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,একা চলতে পারবি কিনা?তোর চোখ দেখে আমি বুঝে নিয়েছিলাম,তুই পারবি।রাকিব তোর সমবয়সী।ওর সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করিস না।তোর সাদিক ভাইয়ার কথা ভেবে ওকে দেখে রাখবি।হয়তো তোর সাথে একটু মজা করে,কিন্তু মনটা খুব ভালো।আমি জানি,তোরা দুজনে সবসময় একে অপরের পাশে থাকবি।এখন রাখছি।আমার ওই পৃথিবীর ট্রেনের সময় হয়ে গেছে।বিদায় বোন আমার।


হাসনাত করিমের চোখদুটো ভিজে উঠল।বললেন,আমি জানি না,আমার চোখে অশ্রু কেন?যদি আমাকে বিচারকের চেয়ারে বসিয়ে দেয়া হয়,তবে কে দোষী তাও বলতে পারবো না।পরিস্থিতি একজন মানুষের ভেতর থেকে হিংস্র পশুটাকে বের করে আনে।সাদিকের কিছু না হলে হয়তো এতগুলো নিষ্পাপ জীবন চলে যেতো না।


ভালোবাসার মানুষটিকে খুন করার ব্যাপারটা হয়তো ফারহান মেনে নিতে পারেনি।তুলির কথা শুনতেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিল সে।তবে মুনিরাকে বাঁচাতে পেরেছি হয়তো তাই আমাদের সফলতা।আত্মহত্যা অথবা খুন রহস্যের সমাধান আত্মহত্যা আবার খুনও।ফারহান নিজের জীবন দিয়ে সেটাই বুঝিয়ে দিয়ে গেল।


........সমাপ্ত.........


written by Habib Khan Hridoy


শব্দসংখ্যা:১৮৩০৪


[গল্পটির সঙ্গে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।নতুন কোনো গল্প নিয়ে আবার ফিরবো সবার মাঝে।]

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন