অধ্যায় ৪
ওভারসীজ অপারেশন্স পরিদপ্তর, সেনা সদর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পূর্ব পাকিস্তানে একটি নতুন কম্যান্ড গঠন করা হয় এবং এই কমান্ডের প্রথম জিওসি জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের তত্বাবধানে ঢাকায় অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে সেনা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্প্রসারণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেনা সদর দপ্তরের কলেবরও বাড়তে থাকে। বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের মূল সড়ক শহীদ সরণীর পূর্ব পাশে অবস্থিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক সদর দপ্তর হিসেবে স্বীকৃত। এই সদর দপ্তরের পুরোভাগে নবনির্মিত হেলমেট সদৃশ ডিজাইন গুরুত্বপূর্ন এই স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে যোগ করেছে অনন্য এক মাত্রা।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
স্বাধীনতার পর থেকে সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন সমুহ সেনা সদরের মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহনের কলেবর বেড়ে যাবার পর মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরের উপর কাজের চাপ কমাতে ২০০৬ সালে ওভারসিজ অপারেশন্স ডাইরক্টরেট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতিসংঘ মিশনসহ সেনাবাহিনীর সকল প্রকার আন্তর্জাতিক অপারেশন সমুহ এই ডাইরেক্টরের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছে।
নিজের ডেস্কে বসে হাতের মোবাইলটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেজর ইশরাক। ওভারসীজ অপারেশন্সের পার্সোন্যাল সেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে এই কাজটি তারই করবার কথা। কিন্তু প্রত্যেকবারই এই জাতীয় কাজ করবার আগে নিদারুন মর্মপীড়ায় ভোগে সে আর ভাবে, তার হয়ে কাজটি অন্যকেউ যদি করে দিত!
উত্তেজনা প্রশমন করতে আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে ফেলল ইশরাক, তারপর সামনের তালিকাটায় আরেকবার চোখ বুলালো; প্রথমে ছয়টি নাম, পরে আরো দুটো; প্রত্যেকটি নামের পাশে একজন নিকটাত্মীয়ের নাম আর তার মোবাইল নম্বর টাইপ করা। আধ খাওয়া সিগারেটটা এশট্রেতে গুঁজে দিয়ে প্রথম নম্বরটি মোবাইলে টাইপ করতে শুরু করল ইশরাক। টাইপ করতে করতেই ভাবল, মৃত্যু মানুষের নিশ্চিত এক ভবিতব্য, তবু নিকটজনের মৃত্যুর সংবাদ একেক জন একেক ভাবে নেয়।
গত দুই বছরের অভিজ্ঞতায় সে শিখেছে, মৃতের পিতামাতা, স্ত্রী কিংবা সন্তানকে মৃত্যুর সংবাদটি সরাসরি দিতে নেই; তাতে কখনও কখনও প্রতিক্রিয়া আর ফলাফল হয় ভয়াবহ! বরং শুরুতেই মৃতের মামা-চাচা গোছের কাউকে ডেকে নিয়ে সময় নিয়ে সংবাদটি দিতে হয়, যেন সেই আত্মীয়টি উপযুক্তভবে এই চরম দুঃসংবাদটি তার পরিবারের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় আহতদের পরিবারকে বোঝাতে। যথেষ্ট সময় নিয়ে বুঝিয়ে বলার পরও তারা ধরেই নেয় যে তাদের পরিবারের কর্তাটি আর বেঁচে নেই এবং অফিস থেকে ব্যাপারটি ইচ্ছে করেই আপাতত গোপন করা হচ্ছে। এরপর বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে ফোনের পর ফোন আসতে শুরু করে; সবাই নিশ্চিত হতে চায় যে আহত ব্যক্তিটি সত্যি বেঁচে আছে কিনা।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
ইতোমধ্যে ইশরাকের মোবাইল থেকে করা কলটি বাজতে শুরু করেছে। মোবাইলটি কানের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে সে অপেক্ষায় আছে। সম্ভাব্য কল রিসিভকারীর নাম মিসেস মেহনাজ অফরিন, সে মালিস্থ ব্যানব্যাট কন্টিনজেন্টের দোভাষী ক্যাপ্টেন রাশেদের স্ত্রী!
***
সকাল সকাল খবরের চ্যানেলটি খুলে বসা রাহেলা বেগমের পুরনো অভ্যাস। অনেক রাত অবধি রাশেদের সাথে ইন্টারনেটে কথা বলে বৌ মা একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠে। তাই বাধ্য হয়েই রাহেলা বেগম টিভির সাউন্ড যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখেন।
‘…আফ্রিকার মালিতে আই ই ডি বিস্ফোরণে ছয় শান্তিরক্ষী নিহত, আহত দুই। নিহতরা হলেন…’ টিভি স্ক্রলে নিজের ছেলের নাম দেখে রাহেলা বেগম প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না; তারপর নিজের অজান্তেই ‘বৌ মা…’ বলে আর্ত চিৎকার করে জ্ঞান হারালেন। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা হতচকিত মেহনাজ চিৎকার শুনে আলুথালু বেশে ড্রয়িং রুমে পৌছে নিজের শাশুড়িকে সংজ্ঞাহীন পরে থাকতে দেখে দ্রুত তার দিকে ছুটে গেল।টিভি স্ক্রলটি অনবরত ডান থেকে বায়ে ধেয়ে চলেছে। সধবা মেহনাজের সদ্য বৈধব্যের সংবাদটি যখন ইথারে ছড়িয়ে পরছে সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে, তখন কিংকর্তব্যবিমুঢ় মেহনাজ উন্মুখ হয়ে রাহেলা বেগমের জ্ঞান ফেরাতে ব্যস্ত! ঠিক তখনই বেড রুমে রাখা তার মোবাইল ফোনটিও সুরেলা রিং টোনে বাজতে শুরু করল এবং বাজতেই থাকল। মোবাইল স্ক্রিনে কলার আইডিতে লেখা ‘ওভারসীজ ওপারেশন্স বাংলাদেশ আর্মি’; মিশনে যাবার আগে রাশেদ যত্ন করে এই নাম্বারটি মেহনাজের মোবাইলে সেভ করে গিয়েছিল।
অধ্যায় ৫
ব্যানব্যাট বেইজ ক্যাম্প, গাও, মালি
নাইজার নদীর তীরে অবস্থিত গাও এলাকাটি মালির দশটি রিজিয়নের একটি। নবম শতক থেকেই গুরুত্বপূর্ন ও স্বাধীন ট্রান্স-সাহারান বানিজ্যকেন্দ্র ও মরু শহর হিসেবে গাও পরিচিত ছিল। তেরো শতকের শেষ ভাগে গাও মালি সাম্রাজ্যের অধীন হয়ে যায়। কিন্তু পনের শতকের শেষ দিকে সোংঘাই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুন্নি আলী গাও দখল করে একে রাজধানীর স্বীকৃতি দেন। পরে ১৫৯১ সালে মরোক্কানদের হাতে সোংঘাই সাম্রাজ্যের পতন হলে গাও দ্রুত এর গুরুত্ব হারাতে শুরু করে এবং উনিশ শতকের মাঝামাঝি এটি মাত্র তিনশ কুঁড়েঘরের একটি গ্রাম হিসেবে টিকে থাকে।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
২০১২ সালের ৩১ মার্চ আজওয়াদ নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী দ্য ন্যাশনাল মুভমেন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ আজওয়াদ (এমএনএলএ) এবং আনসার দাইন গেরিলারা সম্মিলিত আক্রমণে মালিয়ান সেনাবাহিনীকে হঠিয়ে দিয়ে গাও দখল করে নেয় এবং গাওকে স্বাধীন আজওয়াদের রাজধানী ঘোষণা করে। কিন্তু মাত্র একমাসের মাথায় মুভমেন্ট ফর ওয়াননেস এন্ড জিহাদ ইন ওয়েস্ট আফ্রিকা (মোজউয়া) নামের আরেক সশস্ত্র দলের সাথে গাও এর যুদ্ধে হেরে গিয়ে নিয়ন্ত্রন হারায়। পরে মালি সরকারের আবেদনে সারা দিয়ে তাদের প্রাক্তন উপনিবেশিক প্রভু ফ্রান্স নিজ সেনাদল পাঠিয়ে অপারেশন সের্ভাল পরিচালনা করে এবং ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি গাও পুনর্দখল করে নেয়। কিন্তু আজওয়াদের স্বপ্নে বিভোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলাদের চোরাগুপ্তা হামলা চলতেই থাকে।
তাই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য একই বছর জুলাই মাসের ১ তারিখে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা মালিতে পদার্পন করে এবং তাদেরই একাংশ গাওতে সুপারক্যাম্প স্থাপন করে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু করে; যেখানে নিরাপত্তার খাতিরে বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষী কন্টিনজেন্টগুলো একসাথে একই ক্যাম্পে নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগাভাগি করে থাকে। বর্তমানে মালিতে প্রায় ষোল হাজারের বেশি শান্তিরক্ষী মোতায়েন আছে যার মধ্যে চোদ্দশো এর বেশি বাংলাদেশী। ইতোমধ্যে ১৯১ জন শান্তিরক্ষী হারাবার প্রেক্ষিতে মালিতে চলমান শান্তিরক্ষা মিশনকে বিশ্বের সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ন শান্তিরক্ষা মিশন হিসবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
***
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
একরাশ ধুলোর মেঘ উড়িয়ে গাও সুপারক্যাম্পের ব্যানব্যাট কম্পাউন্ডে এসে থামা সাদা এপিসিগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস লুকালো মেস ওয়েটার হানিফ। মেস ওয়েটার হিসেবে তার কাজ অফিসারদের খাবার পরিবেশন করা এবং গত সাতাশ বছর ধরে নিষ্ঠার সাথে সে তার কাজ করে যাচ্ছে। তার অফিসারদের কার কখন কী খাওয়া উচিত আর কার কখন কী খেতে ইচ্ছে করতে পারে, তা সম্ভবত সে তার অফিসারদের চাইতেও ভাল বোঝে আর জানে।
মেজর সাইরাস পেট্রোল থেকে ফিরেই প্রথমে ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কোল্ড টাওয়ালটা পাক্কা দুই মিনিট মুখে চেপে ধরে রেখে তারপর টানা দুই গ্লাস লেবু লবন পানি পান করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি ক্যাম্পে থাকা অবস্থা থেকে তার এই অভ্যাস; তার ইউনিটের মেস ওয়েটার হিসেবে হানিফ তা খুব ভালো করেই জানে। আরো জানে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্যাম্পে বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ পাওয়া যেতো না; তাই শরবতেও কখনো বরফ কুচি দেয়া যেতো না, আর তাই এখনও মেজর সাইরাস বরফ ছাড়াই শরবত পান করতে পছন্দ করেন।
ধুলোর মেঘ সম্পুর্ন সরে যাবার আগেই এপিসি পাঁচটির হ্যাচ প্রায় একসাথেই খুলে গেল আর সবার আগে মেজর সাইরাস বেরিয়ে এলেন, তারপর পিলপিল করে বাকীরা। প্রত্যেকের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট; প্রত্যেকের মুখ অস্বাভাবিক রকম বিমর্ষ। কম্পাউন্ডের পাশের গোলঘরে মেস ওয়েটার হানিফের সামনেই ব্যানব্যাটের এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন শাহেদ, সুবেদার মেজর (এসএম) অনারারি লেফটেন্যান্ট নজরুল আর মেজর সাইরাসের রানার সৈনিক আতাউর তাদের অপেক্ষায়ই ছিল। মেজর সাইরাসকে দেখতে পেয়ে তারা একযোগে তার দিকে ছুটে গেল। হাতের ট্রে এর দিকে তাকিয়ে হানিফ আরেকটু অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। এডজুট্যান্ট আর এসএম সাহেবের সাথে মেজর সাইরাসের কুশলাদি বিনিময় শেষ হবার পর যাওয়াই শ্রেয় ভাবল সে।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
যথারীতি এসএম সাহেবই সবার আগে মেজর সাইরাসের পাশে পৌছে গেলেন। অফিসারসহ কন্টিনজেন্টের প্রত্যেক সেনা সদস্যের কল্যান নিশ্চিত করতে তিনি সারাক্ষণ উন্মুখ হয়ে থাকেন; কন্টিনজেন্টের জৈষ্ঠ্যতম সৈনিক হিসেবে এটাই তার দায়বদ্ধতা। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি পূর্ন ওয়াকিবহাল। সারা কন্টিনজেন্ট জুড়ে ছড়িয়ে পরা শোকের চাদর তাকেও ছুঁয়েছে; হয়ত আর সবার চাইতে বেশিই ছুঁয়ে গেছে। তবু তার দীর্ঘ সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি শিখে গেছেন কিভাবে নিজের আবেগকে বশ করতে হয় আর কিভাবে শোকের চাদর ভাঁজ করে উঠিয়ে রেখে আবার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হয়।
প্রথমে নিজের হেলমেট খুলে আতাউরের হাতে তুলে দিয়ে ধীরেসুস্থে নিজের গলায় ঝোলানো অস্ত্রটিও তুলে দিল সাইরাস। তারপর হাতের গ্লাভস খুলে নিয়ে এসএম সাহেবের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ভরাট গলায় বলল, ‘এসএম সাহেব, কেমন আছেন? সব ঠিক তো?’
‘জ্বী, স্যার।’
‘আচ্ছা।’ বলে এবার এডজুট্যান্টের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিস্পৃহ কন্ঠে জানতে চাইল, ‘সার্জেন্ট কুতুব আর কর্পোরাল হারেসের কী অবস্থা?’ এদের দুজনকেই কাল অকুলস্থল থেকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করে আনা হয়েছিল।
ইতোমধ্যে ট্রে হাতে মেস ওয়েটার হানিফ ওদের পাশে এসে দাড়িয়েছে। এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন শাহেদ বেশ কসরত করে নিজের কন্ঠ শান্ত রেখে বলল, ‘সার্জেন্ট কুতুবের অবস্থা বেশ খারাপ, স্যার। অলরেডি ইউ এন ফ্লাইটে ঘানার লেভেল ফোর হসপিটালে ট্রান্সফার করা হয়েছে। কর্পোরাল হারেস সেই তুলনায় বেটার, পাঁজরের কিছু হাড় ভেঙ্গেছে। এখন এখানেই লেভেল টু হস্পিটালে ভর্তি আছে।’
মেস ওয়েটার হানিফ কোল্ড টাওয়াল আর লেবুর শরবতসহ ট্রেটি সামনে এগিয়ে ধরল। মেজর সাইরাস তার হাতের গ্লাভসগুলো খুলে ট্রেতে রেখে হাত নেড়ে ট্রে সরিয়ে নিতে ইশারা করল। সাইরাসের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে হানিফ তার সামনে থেকে দ্রুত সরে আসতেই এডজুট্যান্ট বলল, ‘সিসি (কন্টিনজেন্ট কমান্ডার) আর টু আইসি অফিসেই আছেন, স্যার। বলেছেন আপনি ফ্রেশ হয়ে তারপর গেলেও চলবে।’
‘নাহ, এখুনি যাব। তুমি পেট্রোলের ওকে রিপোর্ট নিয়ে ব্রেক করে দিও। কন্টিনজেন্টের বাকিদের বলে দিও, এখন যেন ওদের কেউ ডিস্টার্ব না করে; সবাইকে ফ্রেস হয়ে রেস্ট নিতে দাও, এন্ড আনটিল মাই ফার্দার অর্ডার ডোন্ট গিভ দেম এনি ডিউটি।’
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
‘রজার, স্যার।’
পেছনে ইতোমধ্যে পেট্রোলের সবাই ফল ইন করে দাঁড়িয়ে গেছে; সবার সামনে ক্যাপ্টেন আমিন। ওদের দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে একবার দেখে নিয়ে এডজুট্যান্টের কাঁধ চাপরে দিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল মেজর সাইরাস। ওর মনে ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে থাকা আশংকাটির কথা যতদ্রুত সম্ভব সিসিকে জানানো চাই তার! কিন্তু তার আগে কর্পোরাল হারেসকে দেখতে হাসপাতালে যেতে হবে।
***
প্রায় সারা গায়ে ব্যান্ডেজ মুড়ানো দেহটি দেখে কর্পোরাল হারেসকে আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই। ডাক্তার আর মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্টকে পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে তার মাথার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো মেজর সাইরাস। কড়া ঘুমের ঔষধের প্রভাবে হারেস গভীর ঘুমে ডুবে আছে, শুধু তার ব্যান্ডেজ বাঁধা বুকের উঠা নামা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সে এখনও জীবিত।
ইতোমধ্যে ডাক্তারদের সাথে কথা বলে হারেসের অবস্থা সম্পর্কে জেনে নিয়েছে মেজর সাইরাস। বিস্ফোরণের ধাক্কায় তার ডান পাশের চেয়াল, হাত, পা আর পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু তারচেয়েও বড় সমস্যা হলো বিস্ফোরণের ফলে এপিসিতে আগুন ধরে গিয়েছিল, আর সে আগুন নিভিয়ে ওদের দুজনকে বের করে আনবার আগে ওদের গায়ে আগুন ধরে গিয়েছিল। মেজর সাইরাস নিজে এক্সটিংগুইশার দিয়ে এপিসির আগুন নিভিয়েছিল আর মিনিট পাঁচেকের ভেতর ওদের বের করে এনেছিল। কিন্তু ঐ পাঁচ মিনিটেই ওদের গায়ের ইউনিফর্ম পুড়ে চামড়ার সাথে লেপ্টে গিয়েছিল।
বার্ন ইঞ্জুরির ক্ষেত্রে বরাবরই বাইরের ত্বক পোড়ার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতিকর ভেতরের আঘাত। কারন গরম ধোঁয়া শ্বাসের সাথে ভেতরে গিয়ে ভিক্টিমের শ্বাসনালী আর ফুসফুসের যে ক্ষতি করে তাতেই বেশিরভাগ রোগী প্রাণ হারায়। মাথার পাশ থেকে সরে হারেসের বিছানার পাশের টুলে এসে বসল মেজর সাইরাস। তারপর আলতো করে হারেসের বাম হাতের তালুর উল্টা পিঠে স্পর্শ করল; চামড়ার পুরু গ্লাভস পরে থাকার সুবাদে এই অংশটুকু অক্ষত আছে। হঠাৎ হাতটা থির থির করে কেঁপে উঠল। চট করে মেজর সাইরাস হাতটা নিজের হাতে তুলে নিতেই কর্পোরাল হারেস শিশুদের মত দুর্বলভাবে মেজর সাইরাসের হাতটা মুঠি করে আঁকড়ে ধরতে চাইলো।
মুহুর্তেই একরাশ স্মৃতি সাইরাসকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। প্রথমেই নিজের শিশু কন্যার মুখটা ভেসে উঠল তার মানসপটে; ঠিক এভাবেই সে বাবার আঙ্গুল আঁকড়ে ধরে বারবার। তারপর পরই হারেসের হাস্যোজ্জল মুখটা ভেসে উঠল। মনে পরল পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল ধরে একসাথে হেঁটে যাবার কথা; মনে পরল বাস্কেটবল কম্পিটিশনে শেষ মুহুর্তে হারেসের তিন পয়েন্টের সুবাদে চ্যাম্পিয়ন হবার পর ঘাম ভেজা শরীরে ওকে জড়িয়ে ধরবার কথা; মনে পরল মিষ্টির প্যাকেট হাতে হাসিমুখে দেখা করতে আসা সদ্য বিবাহিত হারেসের লাজুক মুখ; মনে পরল বাবা হবার সংবাদ দিতে আসা হারেসের গর্বিত মুখও!
হারেসের আহত হাতে হালকা চাপ দিয়ে ওকে আনমনে সাহস দেবার চেষ্টা করল মেজর সাইরাস। তার কোম্পানীর বাছাই করা সৈনিকদের একজন কর্পোরাল হারেস। মালির পরিবেশ আর পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। মরুভূমি, উচ্চ তাপমাত্রা, শুষ্কতা, রুক্ষতা আর টেররিস্টদের হুমকি মিলিয়ে শান্তিরক্ষীদের জন্য মালি বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজনক মিশন। তাই মালিতে মোতায়েনের আগে দিনের পর দিন হাতেকলমে নিজের কোম্পানীর প্রত্যেক শান্তিরক্ষীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে সে। সেই প্রশিক্ষণের সময় আর মালিতে মোতায়েনের পর কর্পোরাল হারেস ছিল তার আস্থাভাজন সৈনিকদের একজন। উটের মতই কষ্টসহিষ্ণু আর কমান্ডারের আদেশে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে এক পায়ে খাড়া এক শান্তিরক্ষী। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এই প্রতিকূল পরিবেশেও একজন নন-কমিশন্ড অফিসার (এনসিও) হিসেবে সে তার সেকশনটাকে এমনভাবে মাতিয়ে রাখত যে, ওর কথায় ওর সেকশনের প্রত্যেকে সোজা নরকেও যেতে রাজি।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
হারেসের ঠোঁট নড়তে দেখে মেজর সাইরাস চট করে তার মুখের কাছে কান নামিয়ে আনল। ফিসফিস করে সে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু বুকের ঘরঘর শব্দ আর অস্ফুট যন্ত্রণায় কিছুই বোঝা গেল না। হারেসের হাতের তালুতে আলতো করে চাপ বাড়িয়ে আশ্বস্ত করার স্বরে সাইরাস বলল, ‘চিন্তা নেই, হারেস। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘বাড়িতে এখনই কিছু জানায়েন না, স্যার…’ ফিসফিস করে অস্পষ্ট গলায় বলল হারেস।
‘ওকে, তুমি এখন আর কথা বলো না; ঘুমাবার চেষ্টা কর।’ দ্রুত জবাব দিল মেজর সাইরাস। প্রায় সাথে সাথেই তার হাতের মুঠায় হারেসের হাতটা শিথিল হয়ে এলো। এই অসামান্য আস্থার কোনো ব্যাখ্যা নেই, ভাবল সাইরাস। সুখে দুঃখে দিনের পর দিন রোদ, জল, বৃষ্টিতে একসাথে থাকতে থাকতে গড়ে উঠে এই পারস্পরিক আস্থা। হঠাৎ করেই সাইরাস বিচলিত বোধ করল; এই আস্থার প্রতিদান দেয়ার সামর্থ্য কী সত্যি তার আছে?
মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট আরেক দফা সিডেটিভ পুশ করতেই হারেস আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। সাবধানে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চাদর টেনে হারেসের হাতটি ঢেকে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সাইরাস। সিসির সাথে দেখা করতে যাবার সময় হয়েছে। তাই ক্লান্তি উপেক্ষা করে সে ডাক্তার আর মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্টের সাথে হ্যান্ডশেক করে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সিসির অফিসের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। পরবর্তী করণীয় ঠিক করার আগেই তার আশংকার কথাটি সিসির জানা উচিত।
কপিরাইট Del H Khan
অধ্যায় ৪
ওভারসীজ অপারেশন্স পরিদপ্তর, সেনা সদর, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পূর্ব পাকিস্তানে একটি নতুন কম্যান্ড গঠন করা হয় এবং এই কমান্ডের প্রথম জিওসি জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খানের তত্বাবধানে ঢাকায় অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে সেনা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্প্রসারণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেনা সদর দপ্তরের কলেবরও বাড়তে থাকে। বর্তমানে ঢাকা সেনানিবাসের মূল সড়ক শহীদ সরণীর পূর্ব পাশে অবস্থিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক সদর দপ্তর হিসেবে স্বীকৃত। এই সদর দপ্তরের পুরোভাগে নবনির্মিত হেলমেট সদৃশ ডিজাইন গুরুত্বপূর্ন এই স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে যোগ করেছে অনন্য এক মাত্রা।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
স্বাধীনতার পর থেকে সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন সমুহ সেনা সদরের মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহনের কলেবর বেড়ে যাবার পর মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরের উপর কাজের চাপ কমাতে ২০০৬ সালে ওভারসিজ অপারেশন্স ডাইরক্টরেট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতিসংঘ মিশনসহ সেনাবাহিনীর সকল প্রকার আন্তর্জাতিক অপারেশন সমুহ এই ডাইরেক্টরের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছে।
নিজের ডেস্কে বসে হাতের মোবাইলটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেজর ইশরাক। ওভারসীজ অপারেশন্সের পার্সোন্যাল সেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে এই কাজটি তারই করবার কথা। কিন্তু প্রত্যেকবারই এই জাতীয় কাজ করবার আগে নিদারুন মর্মপীড়ায় ভোগে সে আর ভাবে, তার হয়ে কাজটি অন্যকেউ যদি করে দিত!
উত্তেজনা প্রশমন করতে আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে ফেলল ইশরাক, তারপর সামনের তালিকাটায় আরেকবার চোখ বুলালো; প্রথমে ছয়টি নাম, পরে আরো দুটো; প্রত্যেকটি নামের পাশে একজন নিকটাত্মীয়ের নাম আর তার মোবাইল নম্বর টাইপ করা। আধ খাওয়া সিগারেটটা এশট্রেতে গুঁজে দিয়ে প্রথম নম্বরটি মোবাইলে টাইপ করতে শুরু করল ইশরাক। টাইপ করতে করতেই ভাবল, মৃত্যু মানুষের নিশ্চিত এক ভবিতব্য, তবু নিকটজনের মৃত্যুর সংবাদ একেক জন একেক ভাবে নেয়।
গত দুই বছরের অভিজ্ঞতায় সে শিখেছে, মৃতের পিতামাতা, স্ত্রী কিংবা সন্তানকে মৃত্যুর সংবাদটি সরাসরি দিতে নেই; তাতে কখনও কখনও প্রতিক্রিয়া আর ফলাফল হয় ভয়াবহ! বরং শুরুতেই মৃতের মামা-চাচা গোছের কাউকে ডেকে নিয়ে সময় নিয়ে সংবাদটি দিতে হয়, যেন সেই আত্মীয়টি উপযুক্তভবে এই চরম দুঃসংবাদটি তার পরিবারের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় আহতদের পরিবারকে বোঝাতে। যথেষ্ট সময় নিয়ে বুঝিয়ে বলার পরও তারা ধরেই নেয় যে তাদের পরিবারের কর্তাটি আর বেঁচে নেই এবং অফিস থেকে ব্যাপারটি ইচ্ছে করেই আপাতত গোপন করা হচ্ছে। এরপর বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে ফোনের পর ফোন আসতে শুরু করে; সবাই নিশ্চিত হতে চায় যে আহত ব্যক্তিটি সত্যি বেঁচে আছে কিনা।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
ইতোমধ্যে ইশরাকের মোবাইল থেকে করা কলটি বাজতে শুরু করেছে। মোবাইলটি কানের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে সে অপেক্ষায় আছে। সম্ভাব্য কল রিসিভকারীর নাম মিসেস মেহনাজ অফরিন, সে মালিস্থ ব্যানব্যাট কন্টিনজেন্টের দোভাষী ক্যাপ্টেন রাশেদের স্ত্রী!
***
সকাল সকাল খবরের চ্যানেলটি খুলে বসা রাহেলা বেগমের পুরনো অভ্যাস। অনেক রাত অবধি রাশেদের সাথে ইন্টারনেটে কথা বলে বৌ মা একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠে। তাই বাধ্য হয়েই রাহেলা বেগম টিভির সাউন্ড যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখেন।
‘…আফ্রিকার মালিতে আই ই ডি বিস্ফোরণে ছয় শান্তিরক্ষী নিহত, আহত দুই। নিহতরা হলেন…’ টিভি স্ক্রলে নিজের ছেলের নাম দেখে রাহেলা বেগম প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না; তারপর নিজের অজান্তেই ‘বৌ মা…’ বলে আর্ত চিৎকার করে জ্ঞান হারালেন। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা হতচকিত মেহনাজ চিৎকার শুনে আলুথালু বেশে ড্রয়িং রুমে পৌছে নিজের শাশুড়িকে সংজ্ঞাহীন পরে থাকতে দেখে দ্রুত তার দিকে ছুটে গেল।টিভি স্ক্রলটি অনবরত ডান থেকে বায়ে ধেয়ে চলেছে। সধবা মেহনাজের সদ্য বৈধব্যের সংবাদটি যখন ইথারে ছড়িয়ে পরছে সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে, তখন কিংকর্তব্যবিমুঢ় মেহনাজ উন্মুখ হয়ে রাহেলা বেগমের জ্ঞান ফেরাতে ব্যস্ত! ঠিক তখনই বেড রুমে রাখা তার মোবাইল ফোনটিও সুরেলা রিং টোনে বাজতে শুরু করল এবং বাজতেই থাকল। মোবাইল স্ক্রিনে কলার আইডিতে লেখা ‘ওভারসীজ ওপারেশন্স বাংলাদেশ আর্মি’; মিশনে যাবার আগে রাশেদ যত্ন করে এই নাম্বারটি মেহনাজের মোবাইলে সেভ করে গিয়েছিল।
অধ্যায় ৫
ব্যানব্যাট বেইজ ক্যাম্প, গাও, মালি
নাইজার নদীর তীরে অবস্থিত গাও এলাকাটি মালির দশটি রিজিয়নের একটি। নবম শতক থেকেই গুরুত্বপূর্ন ও স্বাধীন ট্রান্স-সাহারান বানিজ্যকেন্দ্র ও মরু শহর হিসেবে গাও পরিচিত ছিল। তেরো শতকের শেষ ভাগে গাও মালি সাম্রাজ্যের অধীন হয়ে যায়। কিন্তু পনের শতকের শেষ দিকে সোংঘাই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সুন্নি আলী গাও দখল করে একে রাজধানীর স্বীকৃতি দেন। পরে ১৫৯১ সালে মরোক্কানদের হাতে সোংঘাই সাম্রাজ্যের পতন হলে গাও দ্রুত এর গুরুত্ব হারাতে শুরু করে এবং উনিশ শতকের মাঝামাঝি এটি মাত্র তিনশ কুঁড়েঘরের একটি গ্রাম হিসেবে টিকে থাকে।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
২০১২ সালের ৩১ মার্চ আজওয়াদ নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর বিদ্রোহী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী দ্য ন্যাশনাল মুভমেন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ আজওয়াদ (এমএনএলএ) এবং আনসার দাইন গেরিলারা সম্মিলিত আক্রমণে মালিয়ান সেনাবাহিনীকে হঠিয়ে দিয়ে গাও দখল করে নেয় এবং গাওকে স্বাধীন আজওয়াদের রাজধানী ঘোষণা করে। কিন্তু মাত্র একমাসের মাথায় মুভমেন্ট ফর ওয়াননেস এন্ড জিহাদ ইন ওয়েস্ট আফ্রিকা (মোজউয়া) নামের আরেক সশস্ত্র দলের সাথে গাও এর যুদ্ধে হেরে গিয়ে নিয়ন্ত্রন হারায়। পরে মালি সরকারের আবেদনে সারা দিয়ে তাদের প্রাক্তন উপনিবেশিক প্রভু ফ্রান্স নিজ সেনাদল পাঠিয়ে অপারেশন সের্ভাল পরিচালনা করে এবং ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি গাও পুনর্দখল করে নেয়। কিন্তু আজওয়াদের স্বপ্নে বিভোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলাদের চোরাগুপ্তা হামলা চলতেই থাকে।
তাই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য একই বছর জুলাই মাসের ১ তারিখে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা মালিতে পদার্পন করে এবং তাদেরই একাংশ গাওতে সুপারক্যাম্প স্থাপন করে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু করে; যেখানে নিরাপত্তার খাতিরে বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষী কন্টিনজেন্টগুলো একসাথে একই ক্যাম্পে নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগাভাগি করে থাকে। বর্তমানে মালিতে প্রায় ষোল হাজারের বেশি শান্তিরক্ষী মোতায়েন আছে যার মধ্যে চোদ্দশো এর বেশি বাংলাদেশী। ইতোমধ্যে ১৯১ জন শান্তিরক্ষী হারাবার প্রেক্ষিতে মালিতে চলমান শান্তিরক্ষা মিশনকে বিশ্বের সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ন শান্তিরক্ষা মিশন হিসবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
***
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
একরাশ ধুলোর মেঘ উড়িয়ে গাও সুপারক্যাম্পের ব্যানব্যাট কম্পাউন্ডে এসে থামা সাদা এপিসিগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস লুকালো মেস ওয়েটার হানিফ। মেস ওয়েটার হিসেবে তার কাজ অফিসারদের খাবার পরিবেশন করা এবং গত সাতাশ বছর ধরে নিষ্ঠার সাথে সে তার কাজ করে যাচ্ছে। তার অফিসারদের কার কখন কী খাওয়া উচিত আর কার কখন কী খেতে ইচ্ছে করতে পারে, তা সম্ভবত সে তার অফিসারদের চাইতেও ভাল বোঝে আর জানে।
মেজর সাইরাস পেট্রোল থেকে ফিরেই প্রথমে ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কোল্ড টাওয়ালটা পাক্কা দুই মিনিট মুখে চেপে ধরে রেখে তারপর টানা দুই গ্লাস লেবু লবন পানি পান করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি ক্যাম্পে থাকা অবস্থা থেকে তার এই অভ্যাস; তার ইউনিটের মেস ওয়েটার হিসেবে হানিফ তা খুব ভালো করেই জানে। আরো জানে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্যাম্পে বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ পাওয়া যেতো না; তাই শরবতেও কখনো বরফ কুচি দেয়া যেতো না, আর তাই এখনও মেজর সাইরাস বরফ ছাড়াই শরবত পান করতে পছন্দ করেন।
ধুলোর মেঘ সম্পুর্ন সরে যাবার আগেই এপিসি পাঁচটির হ্যাচ প্রায় একসাথেই খুলে গেল আর সবার আগে মেজর সাইরাস বেরিয়ে এলেন, তারপর পিলপিল করে বাকীরা। প্রত্যেকের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট; প্রত্যেকের মুখ অস্বাভাবিক রকম বিমর্ষ। কম্পাউন্ডের পাশের গোলঘরে মেস ওয়েটার হানিফের সামনেই ব্যানব্যাটের এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন শাহেদ, সুবেদার মেজর (এসএম) অনারারি লেফটেন্যান্ট নজরুল আর মেজর সাইরাসের রানার সৈনিক আতাউর তাদের অপেক্ষায়ই ছিল। মেজর সাইরাসকে দেখতে পেয়ে তারা একযোগে তার দিকে ছুটে গেল। হাতের ট্রে এর দিকে তাকিয়ে হানিফ আরেকটু অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। এডজুট্যান্ট আর এসএম সাহেবের সাথে মেজর সাইরাসের কুশলাদি বিনিময় শেষ হবার পর যাওয়াই শ্রেয় ভাবল সে।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
যথারীতি এসএম সাহেবই সবার আগে মেজর সাইরাসের পাশে পৌছে গেলেন। অফিসারসহ কন্টিনজেন্টের প্রত্যেক সেনা সদস্যের কল্যান নিশ্চিত করতে তিনি সারাক্ষণ উন্মুখ হয়ে থাকেন; কন্টিনজেন্টের জৈষ্ঠ্যতম সৈনিক হিসেবে এটাই তার দায়বদ্ধতা। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি পূর্ন ওয়াকিবহাল। সারা কন্টিনজেন্ট জুড়ে ছড়িয়ে পরা শোকের চাদর তাকেও ছুঁয়েছে; হয়ত আর সবার চাইতে বেশিই ছুঁয়ে গেছে। তবু তার দীর্ঘ সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি শিখে গেছেন কিভাবে নিজের আবেগকে বশ করতে হয় আর কিভাবে শোকের চাদর ভাঁজ করে উঠিয়ে রেখে আবার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হয়।
প্রথমে নিজের হেলমেট খুলে আতাউরের হাতে তুলে দিয়ে ধীরেসুস্থে নিজের গলায় ঝোলানো অস্ত্রটিও তুলে দিল সাইরাস। তারপর হাতের গ্লাভস খুলে নিয়ে এসএম সাহেবের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ভরাট গলায় বলল, ‘এসএম সাহেব, কেমন আছেন? সব ঠিক তো?’
‘জ্বী, স্যার।’
‘আচ্ছা।’ বলে এবার এডজুট্যান্টের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিস্পৃহ কন্ঠে জানতে চাইল, ‘সার্জেন্ট কুতুব আর কর্পোরাল হারেসের কী অবস্থা?’ এদের দুজনকেই কাল অকুলস্থল থেকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করে আনা হয়েছিল।
ইতোমধ্যে ট্রে হাতে মেস ওয়েটার হানিফ ওদের পাশে এসে দাড়িয়েছে। এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন শাহেদ বেশ কসরত করে নিজের কন্ঠ শান্ত রেখে বলল, ‘সার্জেন্ট কুতুবের অবস্থা বেশ খারাপ, স্যার। অলরেডি ইউ এন ফ্লাইটে ঘানার লেভেল ফোর হসপিটালে ট্রান্সফার করা হয়েছে। কর্পোরাল হারেস সেই তুলনায় বেটার, পাঁজরের কিছু হাড় ভেঙ্গেছে। এখন এখানেই লেভেল টু হস্পিটালে ভর্তি আছে।’
মেস ওয়েটার হানিফ কোল্ড টাওয়াল আর লেবুর শরবতসহ ট্রেটি সামনে এগিয়ে ধরল। মেজর সাইরাস তার হাতের গ্লাভসগুলো খুলে ট্রেতে রেখে হাত নেড়ে ট্রে সরিয়ে নিতে ইশারা করল। সাইরাসের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে হানিফ তার সামনে থেকে দ্রুত সরে আসতেই এডজুট্যান্ট বলল, ‘সিসি (কন্টিনজেন্ট কমান্ডার) আর টু আইসি অফিসেই আছেন, স্যার। বলেছেন আপনি ফ্রেশ হয়ে তারপর গেলেও চলবে।’
‘নাহ, এখুনি যাব। তুমি পেট্রোলের ওকে রিপোর্ট নিয়ে ব্রেক করে দিও। কন্টিনজেন্টের বাকিদের বলে দিও, এখন যেন ওদের কেউ ডিস্টার্ব না করে; সবাইকে ফ্রেস হয়ে রেস্ট নিতে দাও, এন্ড আনটিল মাই ফার্দার অর্ডার ডোন্ট গিভ দেম এনি ডিউটি।’
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
‘রজার, স্যার।’
পেছনে ইতোমধ্যে পেট্রোলের সবাই ফল ইন করে দাঁড়িয়ে গেছে; সবার সামনে ক্যাপ্টেন আমিন। ওদের দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে একবার দেখে নিয়ে এডজুট্যান্টের কাঁধ চাপরে দিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল মেজর সাইরাস। ওর মনে ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে থাকা আশংকাটির কথা যতদ্রুত সম্ভব সিসিকে জানানো চাই তার! কিন্তু তার আগে কর্পোরাল হারেসকে দেখতে হাসপাতালে যেতে হবে।
***
প্রায় সারা গায়ে ব্যান্ডেজ মুড়ানো দেহটি দেখে কর্পোরাল হারেসকে আলাদা করে চেনার কোনো উপায় নেই। ডাক্তার আর মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্টকে পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে তার মাথার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো মেজর সাইরাস। কড়া ঘুমের ঔষধের প্রভাবে হারেস গভীর ঘুমে ডুবে আছে, শুধু তার ব্যান্ডেজ বাঁধা বুকের উঠা নামা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সে এখনও জীবিত।
ইতোমধ্যে ডাক্তারদের সাথে কথা বলে হারেসের অবস্থা সম্পর্কে জেনে নিয়েছে মেজর সাইরাস। বিস্ফোরণের ধাক্কায় তার ডান পাশের চেয়াল, হাত, পা আর পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু তারচেয়েও বড় সমস্যা হলো বিস্ফোরণের ফলে এপিসিতে আগুন ধরে গিয়েছিল, আর সে আগুন নিভিয়ে ওদের দুজনকে বের করে আনবার আগে ওদের গায়ে আগুন ধরে গিয়েছিল। মেজর সাইরাস নিজে এক্সটিংগুইশার দিয়ে এপিসির আগুন নিভিয়েছিল আর মিনিট পাঁচেকের ভেতর ওদের বের করে এনেছিল। কিন্তু ঐ পাঁচ মিনিটেই ওদের গায়ের ইউনিফর্ম পুড়ে চামড়ার সাথে লেপ্টে গিয়েছিল।
বার্ন ইঞ্জুরির ক্ষেত্রে বরাবরই বাইরের ত্বক পোড়ার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতিকর ভেতরের আঘাত। কারন গরম ধোঁয়া শ্বাসের সাথে ভেতরে গিয়ে ভিক্টিমের শ্বাসনালী আর ফুসফুসের যে ক্ষতি করে তাতেই বেশিরভাগ রোগী প্রাণ হারায়। মাথার পাশ থেকে সরে হারেসের বিছানার পাশের টুলে এসে বসল মেজর সাইরাস। তারপর আলতো করে হারেসের বাম হাতের তালুর উল্টা পিঠে স্পর্শ করল; চামড়ার পুরু গ্লাভস পরে থাকার সুবাদে এই অংশটুকু অক্ষত আছে। হঠাৎ হাতটা থির থির করে কেঁপে উঠল। চট করে মেজর সাইরাস হাতটা নিজের হাতে তুলে নিতেই কর্পোরাল হারেস শিশুদের মত দুর্বলভাবে মেজর সাইরাসের হাতটা মুঠি করে আঁকড়ে ধরতে চাইলো।
মুহুর্তেই একরাশ স্মৃতি সাইরাসকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। প্রথমেই নিজের শিশু কন্যার মুখটা ভেসে উঠল তার মানসপটে; ঠিক এভাবেই সে বাবার আঙ্গুল আঁকড়ে ধরে বারবার। তারপর পরই হারেসের হাস্যোজ্জল মুখটা ভেসে উঠল। মনে পরল পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল ধরে একসাথে হেঁটে যাবার কথা; মনে পরল বাস্কেটবল কম্পিটিশনে শেষ মুহুর্তে হারেসের তিন পয়েন্টের সুবাদে চ্যাম্পিয়ন হবার পর ঘাম ভেজা শরীরে ওকে জড়িয়ে ধরবার কথা; মনে পরল মিষ্টির প্যাকেট হাতে হাসিমুখে দেখা করতে আসা সদ্য বিবাহিত হারেসের লাজুক মুখ; মনে পরল বাবা হবার সংবাদ দিতে আসা হারেসের গর্বিত মুখও!
হারেসের আহত হাতে হালকা চাপ দিয়ে ওকে আনমনে সাহস দেবার চেষ্টা করল মেজর সাইরাস। তার কোম্পানীর বাছাই করা সৈনিকদের একজন কর্পোরাল হারেস। মালির পরিবেশ আর পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। মরুভূমি, উচ্চ তাপমাত্রা, শুষ্কতা, রুক্ষতা আর টেররিস্টদের হুমকি মিলিয়ে শান্তিরক্ষীদের জন্য মালি বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজনক মিশন। তাই মালিতে মোতায়েনের আগে দিনের পর দিন হাতেকলমে নিজের কোম্পানীর প্রত্যেক শান্তিরক্ষীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে সে। সেই প্রশিক্ষণের সময় আর মালিতে মোতায়েনের পর কর্পোরাল হারেস ছিল তার আস্থাভাজন সৈনিকদের একজন। উটের মতই কষ্টসহিষ্ণু আর কমান্ডারের আদেশে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে এক পায়ে খাড়া এক শান্তিরক্ষী। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এই প্রতিকূল পরিবেশেও একজন নন-কমিশন্ড অফিসার (এনসিও) হিসেবে সে তার সেকশনটাকে এমনভাবে মাতিয়ে রাখত যে, ওর কথায় ওর সেকশনের প্রত্যেকে সোজা নরকেও যেতে রাজি।
ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প
হারেসের ঠোঁট নড়তে দেখে মেজর সাইরাস চট করে তার মুখের কাছে কান নামিয়ে আনল। ফিসফিস করে সে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু বুকের ঘরঘর শব্দ আর অস্ফুট যন্ত্রণায় কিছুই বোঝা গেল না। হারেসের হাতের তালুতে আলতো করে চাপ বাড়িয়ে আশ্বস্ত করার স্বরে সাইরাস বলল, ‘চিন্তা নেই, হারেস। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘বাড়িতে এখনই কিছু জানায়েন না, স্যার…’ ফিসফিস করে অস্পষ্ট গলায় বলল হারেস।
‘ওকে, তুমি এখন আর কথা বলো না; ঘুমাবার চেষ্টা কর।’ দ্রুত জবাব দিল মেজর সাইরাস। প্রায় সাথে সাথেই তার হাতের মুঠায় হারেসের হাতটা শিথিল হয়ে এলো। এই অসামান্য আস্থার কোনো ব্যাখ্যা নেই, ভাবল সাইরাস। সুখে দুঃখে দিনের পর দিন রোদ, জল, বৃষ্টিতে একসাথে থাকতে থাকতে গড়ে উঠে এই পারস্পরিক আস্থা। হঠাৎ করেই সাইরাস বিচলিত বোধ করল; এই আস্থার প্রতিদান দেয়ার সামর্থ্য কী সত্যি তার আছে?
মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট আরেক দফা সিডেটিভ পুশ করতেই হারেস আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। সাবধানে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চাদর টেনে হারেসের হাতটি ঢেকে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সাইরাস। সিসির সাথে দেখা করতে যাবার সময় হয়েছে। তাই ক্লান্তি উপেক্ষা করে সে ডাক্তার আর মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্টের সাথে হ্যান্ডশেক করে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সিসির অফিসের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। পরবর্তী করণীয় ঠিক করার আগেই তার আশংকার কথাটি সিসির জানা উচিত।
কপিরাইট Del H Khan

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন