আমার আর শুভর সম্পর্ক প্রায় আট বছর গড়িয়েছে। তারপর বিবাহিত জীবনের তিন বছর চলছে। এর মধ্যে আমি তার মাঝে কোনো খুঁত খুঁজে পাইনি।
একটা ছেলে কি করে এতো নিখুঁত হয় আমার জানা নেই।
আশ্চর্য!!
আমি ছাড়া আমার চারপাশের মানুষরা তার মাঝে কিছু খুঁত খুঁজে পায়।
আমি যখন বাপের বাড়িতে যাই তখন কিছু কথা আমার কানে আসে। এই যেমন ধরুন, তরু এমন লম্বা আর জামাইটা এমন খাটো ক্যান?
আহারে! বেচারি মেয়েটা। চাইলেও হাই-হিল পরতে পারবেনা। রোমান্টিক ছোট গল্প
অথচ বিধাতার আশ্চর্য খেলায় আমি হাই-হিল পছন্দ করিনা।
আবার কখনো বলে, তরু দেখতে এমন সুন্দরী আর দ্যাখ জামাইটা কেমন? মেয়েটার কপালই খারাপ। কি জুটলো তার কপালে!
অথচ শুভর দিকে তাকালে মনে হয় পৃথিবীর একমাত্র সুদর্শন পুরুষ হচ্ছে "শুভ"।
আমাদের বয়সের ব্যবধান মাত্র দুই বছর। তার উপর আমি গ্রামের মেয়ে। সেই হিসেবে তার জন্য অপেক্ষা করাটা টাফ ছিল আমার জন্য। তবুও অপেক্ষা করেছি।
সেও তার দিক থেকে চেষ্টা করেছে। আর যার ফলস্বরূপ আমরা এখন স্বামী স্ত্রী। ওর সাথে যখন আমার বিয়ে হয় তখন সে ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট। তার উপর কোনো জব ছিল না।
আমাদের দুইজনকেই দুইজনের ফ্যামিলিকে মানাতে প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছিল।
বিয়ের পর যেহেতু তার ভালো চাকুরী হয়নি। স্যালারি খুবই অল্প। তবুও এই স্যালারি দিয়ে খুব ভালোভাবেই দিন কাটে।
এইটা নিয়েও চারপাশের লোকজনের কানাঘুষা। বাপের বাড়িতে গেলে চারপাশ থেকে বাতাসে ভেসে আসে তাদের কথা,,,
--- এতো ভালো ভালো প্রস্তাব এসেছে সরকারি চাকুরী আর শেষ পর্যন্ত এই ছেলে।
অথচ সৃষ্টি কর্তার অশেষ রহমতে আমার জন্ম থেকেই চাহিদা কম। মেকআপ, ড্রেস, অর্নামেন্টস এগুলোর প্রতি আমার জন্ম থেকে অনীহা।
আমি আর শুভ সম্পূর্ণ দুই মেরুর। সে ডানে বললে আমি বামে যাই। প্রচুর ঝগড়া হয় আমাদের মাঝে। প্রচুর ঠোকাঠুকি লেগে থাকে। যখন ঠোকাঠুকি লাগে ঠিক তক্ষুনি " যাবোগা" বলতে আমার ভুল হয় না।
সম্পর্কের শুরুতে থেকেই আমি এমনই ছিলাম 🤣 বিয়ের আগে যেমন ব্রেক আপ বলতাম তেমনি বিয়ের পরও ব্রেক আপই বলতাম।
তবে এর মাঝে কথা হচ্ছে ঠোকাঠুকি লাগলেই ওকে দুর্বল করার জন্য আমি কেঁদে ফেলি। আর শুভর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমার চোখের পানি।
ঝগড়া লাগলেই কেঁদে দিতাম আর অমনি শুভ আমাকে জড়িয়ে ধরতো।
সারাদিন যাই হয়ে যাক কেনো দিন শেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জন্য শুভর বুকটা ঠিকি কাছে পেতাম।
হাজারটা ক্লান্তি শেষে মাথা রাখার জন্য তার কাঁধটা কাছে পেতাম।
অন্য আট দশটা প্রেমিকের মতো শুভ আমার জন্য কবিতা লিখেনি, কিংবা রাগ ভাঙ্গানোর জন্য বাসার সামনে আইসক্রিম নিয়ে দাঁড়িয়েও থাকেনি, আমার দিকে তাকিয়ে নিয়ম করে কখনো বলেনি তুমি আমার দেখা সেরা সুন্দরী, অথবা আমার চুলের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায়নি৷ রোমান্টিক ছোটগল্প
কথিত প্রেমিক সমাজের কাতারে সে ছিল না।
আমি নিয়ম করে রোজ এগুলো নিয়ে ঝগড়া করলেও মনে মনে খুশী ছিলাম এই ভেবে যে সে আমাকে অন্তত মিথ্যে সান্ত্বনা দিতো না। আমার শুভ অন্য রকম।
শুভ ভীষণ রকম ধৈর্যশীল। এমন ম্যান্দামার্কা স্বভাবের ছেলে যে কি করে হয় আমার জানা নেই 🙄🙄
বিবাহিত সম্পর্কের পর স্বামী হিসেবে সে আরো বেশী ধৈর্যশীল হয়ে যায় যতটা সে ছিল প্রেমিক হিসেবে।
আমার মতো একটা অগোছালো, উদ্ভব মেয়েকে সহ্য করা কোনো সাধারণ ছেলের কাজ নয়।
আমাকে ভালো রাখার দায়িত্বটা সে সম্পূর্ণ পালন করছে ইভেন তারচেয়ে বেশী যতটা সে আমার আম্মুকে কথা দিয়েছিল।
মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, আমি বোধহয় শুভকে একটু বেশী চাপে ফেলে দিই। তাই নিজেকে হালকা করতে শুভ রোজ রাতে রুটিন করে ঘুমোবার আগে জিজ্ঞেস করি,,,
---- আচ্ছা শুভ, আমাকে নিয়ে তোমার অনুভূতি কি?
শুভ রোজ একই উত্তর দেয়। আর তা হলো সে নাক মুখ কুঁচকে বলবে,,,
---- তুমি থাকলে শুধু আমার ঘুম পায়।
আমি ওর দিকে বড় বড় চোখ করে তাকালে, সে আমার নাক টেনে দিয়ে বলে,,,
--- আর চলে গেলে ঘুম কেড়ে নিয়ে চলে যাও।
ওর দিকে তাকিয়ে আমি মনে মনে ভাবি, আমি খুব ভালো আছি। পৃথিবীর একমাত্র সুখী মানুষ আমি।
শুভর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয় শুভও বলছে,,
আমি নয় আমরা একমাত্র সুখী মানুষ।
লিখা--- নিতিকা সুলতানা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন