আমি যখন ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট ছিলাম, আমার ননদের এগারো বছরের ছেলে হঠাৎ একদিন পেটে ঘুসি মেরে বেবিয়ে যেতেই আমি বিছানায় পরে গেলাম।
পলাশ রুমে এসে আমাকে এই অবস্তায় দেখে খুব চিল্লাচিল্লি করেছিলো।
আমাকে নিয়ে দ্রুত ডাক্তারের কাছে ছুটলো।
সেদিন ও সবাই মুখ বেকিয়ে বলেছিলো,
- এত কি? আমাদের কি বাচ্চা হয় নি?
সেদিনের পর থেকে সবাই কেমন যেন পর হয়ে গেলো।
আমি লুকিয়ে কান্না করতাম এইসব শুনে। মা বাবার আদরের মেয়ে আমি। বিয়ে যখন হলো তখন মাত্র অর্নাসে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সংসার কি বুঝার আগেই বিয়ের দুইমাসেই প্রেগন্যান্ট হলাম।
আমি শরীরের হিমোগ্লোবিন প্রথম থেকেই কম ছিলো৷ তাই আমাকে খুব বেশি প্রোটিন যুক্ত খাবার আর বেড রেস্টে দিলো ডাক্তার। পলাশ কে প্রথম থেকে ঢাল হিসেবে পেয়েছি আমি।
![]() |
| Photo Cradit CTV news |
আমি জানি না, সবার কি হয় প্রেগ্ন্যাসির টাইমে। কিন্তু আমার কিছুই ভালো লাগতো না। সারাক্ষনেই ভয়ে থাকতাম। এই বুঝি কেউ কিছু বলে দিলো।
নিজে আর বাচ্চার চেয়ে ভয়ে থাকতাম, এই বুঝি বলল, আমার কারণে বাচ্চার ক্ষতি হবে।
কোন নতুন হবু মায়ের কাছে ব্যাপারটা যে কি ডমিনেটিং তা কি কেউ একবার ও চিন্তা করে?
হঠাৎ করে মাছ কে পানি থেকে তুলে এক বোতলে রাখলে যেমন সে হাপিয়ে উঠবে আমি যেন এত নিয়ম বাধা সব কিছুতে সেরকম নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না।
মা হওয়া ব্যাপারটা সৌভাগ্যের না হয়ে আমার কাছে সব টা আস্ত মোটা কালো শেকল মনে হচ্ছিলো।
আমিও যেন ডুবে যাচ্ছিলাম সে চোরা বালিতে।
লাল শাড়ি পড়তে পারবে না, নজর লাগবে।
প্রাইভেট এ যেতে পারবে না।
কোন অনুষ্টানে যেতে পারবে না।
সারারাত না ঘুমালেও দিনের বেলা শোয়া যাবে না।
এই পাশ হয়ে ঘুমাবে না।
এই টা খাবে না, ওটা খাবে না।
এইটা দেখবে না।
ডাক্তাররা তো কোন কিছুতে বাধা দেয় নি। এমন বললে। উত্তর আসতো,
- ডাক্তাররা ওমন বলে, কিছু একটা হলে তো ওদের লাভ।
এইসবের ভয়ে আমি নিজেই মানতে শুরু করলাম সব। সজ্ঞানে একটু একটু বড় হওয়া ছোট প্রাণ টার সাথে গান্ডেপিন্ডে গিলছিলাম এইসব নিয়ম।
পলাশ খুব সাহায্য করতো। নিজের কাপড় চোপড় নিজেই কেচে নিতো। কারণ ও আগে থেকেই করতো এইসব। পারলে আমার কাপড় ও ধুয়ে দিতো। আমার যে নিচু হওয়া মানা।
ওর মা গলা চড়িয়ে বলতো,
- এই জন্যেই কি ছেলের বউ এনেছি আমি?
আমি পর্দা কাছে দাঁড়িয়ে শুনতাম সব।
প্রেগ্ন্যাসির টাইমে মুড সুইং এর ব্যাপার টা আমাদের সাধারণ ঘরের মানুষদের এত গুরুত্ব সহকারে জানার তো প্রয়োজন নেই কারো৷
তাই হঠাৎ আমার রেগে যাওয়া। কিংবা বারান্দায় বসে একমনে কান্না করাটাকে অতি যত্নের আধিখ্যেতা বলেই ধরে নিতো ওরা।
পলাশের কাকার মেয়ের বিয়ে। সাপ্তাহ খানিক আগে থেকেই আমি খুশি ছিলাম যে,
-যাক, অনেক দিন পর সবার সাথে দেখা হবে। আড্ডা হবে৷ হবে একটু সাজগোজ।
সকাল থেকে সবাই রেডি হচ্ছে। আমি যখন দেখাতে গেলাম এই শাড়িটা পরি?
সবাই ভুতের দেখার মতো চমকে উঠে বলে।
- এমা, তুমি কোথায় যাচ্ছো? ওখানে এত মানুষ?
আমি আহত চোখে বললাম, তাতে কি?
ডাক্তারের কাছে যখন যাই, তখন কি আর মানুষে দেখে না?
আর দেখলে বা কি? এইটা তো খারাপ কিছু না। স্বাভাবিক ব্যাপার।
না, কোন লাভ হয় নি সেসব কথার। উল্টো আমায় ভয় লাগালো। আমিও কুকড়ে গেলাম প্রতিবারের মতো।
ওদের গাড়িতে যখন পলাশ তুলে দিয়ে বলল,
- তোমরা যাও, নীলা তো বাসায় একা। আর আজ একদিন ছুটির দিন আমি ওর সাথেই থাকি।
আমার মন খারাপে সামান্য ভালো লাগলো। কিন্তু, তা হবে কেন? অন্য কারো কি বাচ্চা হয় নি?
তারা তো কোন ছুটির দিনে দায়িত্ব পালন না করে ঘরে বউ পাহাড়া দেয় নি।
পলাশ না গেলে কেমন দেখায়, তাই ওকে নিয়ে যেতেই হলো৷
আমি বড় করে টিভি ছেড়ে দিয়ে বারান্দায় বসে এক মনে কেঁদেছি।
আমি জানি না, শুধু কি আমার এমন হয়? নাকি সবার হয়? সবার এমন ইচ্ছে হয়?
সবার হয়ে থাকলে, মেয়েরাই কেন ভুলে যায় তাদের সে সময় গুলো? মন খারাপ গুলো? কেন বার বার অন্যকে ভয় দেখিয়ে বলে, আমাদের ও তো বাচ্চা হয়েছে? কেন বুঝে না সবার শরীর তো এক না।
পছন্দের জামাটা বারবার হাত বুলিয়ে আবার রেখে দিই। সে মালাটা পড়ে কিছুক্ষন আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আবার ছিটকে আসা কান্না টা গিলে চুপ করে বসি। বেড়ে যাওয়া পেটে হাত বুলাতেই থেমে যায়। ভালো থাকার চেষ্টা করি, ইচ্ছে করে একটু আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দুচোখ ভরে শ্বাস নি।
সারা দুনিয়া থেকে আমাকে আলাদা করে একটা বক্সে ঢুকিয়ে রাখা হলো। কেউ নেই কথা বলার, কেউ নেই কথা শোনার।
আমি শূন্য দৃষ্টিতে শুধু অপেক্ষা করি আমার সন্তানের।
কেন যেন মনে হতে থাকে ও কি আমায় শেষ করতে আসছে? ও কি আমায় বেঁধে ফেলতে আসছে? সবাই বলে মা হওয়া এত সহজ না, কিন্তু মা হওয়া মানে কি নিজের সব টা শেষ করা। ও তো আমার অংশ মাত্র। ওকে আমার সাথে নিয়ে চলতে হবে। নিজেকে ওর মাঝে হারিয়ে ফেললে কি বেশি যত্ন হবে ওর?
এই চিন্তাটা দিন দিন আমায় কুড়ে খাচ্ছিলো।
সব পছন্দ কেন বাদ দিতে হবে আমায়? কেন পছন্দের লাল শাড়ি টা আমি পড়তে পারবো না?
সারারাত দশ মিনিট পর পর ওয়াশরুমে কাটিয়ে কেন দিনের বেলা আমি একটু ঘুমাতে পারবো না?
হাটতে অসুবিধা, বসতে অসুবিধা, শুতে অসুবিধা, কোন অসুখ লাগলে ওষুধ খেতে মানা। এত কিছুর পর কেন আমাকে তাদের একটু সময় দিতে কষ্ট তাদের? বুঝতে সময় নেই তাদের?
শুধু আমার বেলা নয় আমাদের দেশে এখনো শিক্ষিত মানুষেরা কেন এইসব আকঁড়ে ধরে আছে? হবু মায়ের যত্ন বলতে শুধু তিন বেলা খাওয়া তো না।
কিছু দিন পর খেয়াল করলাম পলাশ আমায় দোষ দিতে শুরু করলো, আমার জন্য ওর বোন আসে না।
আমি শুধু একবার বলেছিলাম, দিদির ছেলের সাথে তো আমার কোন শত্রুতা নেই। ও হয়ত ভুল করেছে। কিন্তু তাতে আমার তো দোষ নেই।
এইসবের মধ্যে আমি মাঝেমধ্যেই দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করি। কি যে সেসব অভিজ্ঞতা!
বিভিন্ন গ্রুপে যখন কেউ সমস্যা গুলো শেয়ার করতো মনে হতো, এই বুঝি নিজের কথা। বুঝতাম শুধু আমি একা নয়, অনেকে যাচ্ছে এইসবের মধ্যে দিয়ে।
কিন্তু এই মানুষ গুলোই কি নিজের প্রেগ্ন্যাসির টাইম টা কেন ভুলে যায় যখন অন্যের ব্যাপার আশে। পাশে কেন দাঁড়ায় না?
সব কিছু কাটিয়ে উঠা আমার হয় নি, তাও শুরু করেছি নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা। তার মধ্যে এসে গেলো আমার সন্তান। রেগুলার হাটাহাটি করার পর ও, বেবি উপরের দিকে থাকার কারণে সিজারেই করতে হয়।
এরপর শুনতে হয়েছে,
- এর তো করতে হয় নি, ওর তো করতে হয় নি, এই রকম শুয়ে বসে থাকলে এমন তো হবেই।
আমার চুপ থাকাটা নাকি শান্তি বজায় রাখবে তাই ছিলাম।
কিন্তু এত কিছুর পরও মেয়েকে বুকে নিয়ে একটু নিশ্বাস ফেলতাম।
সবাই বাচ্চাকে নিয়ে এত বিজি। আমার যত্ন বলতে সে তিন বেলা খাবারেই রয়ে গেল।
আমি জানি এইটা শুধু আমার নয়, আমাদের দেশে হাজারো মেয়ের প্রেগ্ন্যাসির জার্নি।
লিখা: দোলনা বড়ুয়া তৃষা
Source: Facebook

إرسال تعليق