ভালবাসার গল্পঃ অপেক্ষার প্রহর (গল্প শেয়ার)

আসসালামু আলাইকুম

Golpo Share - গল্প শেয়ার এর পক্ষ থেকে সবাইকে স্বাগতম।

গল্পের নামঃ অপেক্ষার পহর
লিখেছেনঃ আদনান হাবিব
কলেজের লাইব্রেরি রুমটা অনেকাংশেই ছোট। বেশ
কয়েকটা বড় বড় আলমারিতে ঠাসা। আলমারি ভর্তি
নানান ধরনের বই! একটা ইয়া লম্বা টেবিল তার দু পাশে
বেশ কিছু চেয়ার। লাইব্রেরিতে আসবাব বলতে এই।
লাইব্রেরিতে মানুষ বলতে একজনকেই দেখা যাচ্ছে,
টেবিলে অনেক বইয়ের মাঝে মুখ গুঁজে পরে আছে! তার
চারপাশটা বইয়ে ছেঁয়ে আছে। আলমারিতে রাশিয়ান
পরী বইটা খুঁজতে খুঁজতে মেয়েটাকে আড় চোখে দেখছে
অনিক কিন্তু সে বইটা খুঁজে পাচ্ছে না হঠাত্ করেই বইটা
সে পেলো মেয়েটার সামনের অনেক বইয়ের মাঝে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মেয়েটার থেকে সে বইটা চাইবে কি
করে। মোটা ফ্রেমের চশমায় মেয়েটাকে বেশ
মানিয়েছে। চেহারায় জ্ঞানী ভাব থাকায় অনিকের
চাইতে অস্বস্তি লাগছে।
অবন্তি অনেকক্ষণ থেকেই ছেলেটাকে লক্ষ্য করছে। বই
পড়ার ভান করলেও মনযোগটা ছেলেটার দিকে। তার
কেন জানি মনেহচ্ছে ছেলেটা কিছু বলতে চাইছে কিন্তু
বলতে পারছে না। মেয়েরা তাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সঠিক
ব্যবহার জানে বলেই অবন্তি বুঝতে পারছে। এমন
মিনমিনে স্বভাবের ছেলেদের অবন্তি দু চোখে দেখতে
পারে না! এতক্ষণে সে ছেলেটাকে ভালভাবে দেখার
মত সুযোগ পেল, ছিমছিমে গড়নের শরীর, পাতলা ঠোঁট
সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সে এমন কি গলার
তিলটাও তার চোখ এড়ালো না।
অনিক স্বভাবতই মেয়েদের এড়িয়ে চলে। স্কুল জীবনে ওর
কোন মেয়ে ফ্রেন্ড না থাকায় ও তেমন জানেও না
একটা মেয়ের কাছ থেকে কি করে কোন কিছু চাইতে হয়!
তবুও অনেক কষ্টে অনিক অবন্তিকে বলল, “বইটা কি
নিতে পারি?”
অবন্তি অনিকের দিকে এমন ভাবে তাকালো যে
বেচারা অনিক একেবারে চুপসে গেল। কি বলবে বুঝতে
না পেরে অনিক লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এল। নিজের
অজান্তেই মেয়েটার উপর রাগ হল অনিকের। সে তো শুধু
একটা বই চেয়েছে, কিন্তু এমন ভাবে তাকালো যেন
তাকে প্রেম নিবেদন করা হয়েছে! এজন্যই সে মেয়েদের
পছন্দ করে না। সব কিছু অন্য ভাবে নেয়াই এদের ধর্ম।
অনিকের আজ সকাল সকাল মেজাজটা খারাপ হয়ে
গিয়েছে। ক্লাসে ঢুকবে এমন সময় পেছন থেকে কে যেন
তাকে ডাকল, "এই যে মিস্টার!" অনিক ঘুরে তাকিয়ে
লাইব্রেরির সেই মেয়েকে দেখল বলল, "আমাকে
ডাকছেন?"
-"জ্বি। আপনি ছাড়া তো আর কাউকে দেখছি না
এখানে।"
-"জ্বি বলুন, কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?"
-"এই যে আপনার বই। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে
চলে এলেন কেন?"
-"না মানে............. :|"
-"আমি তো আপনাকে দিবনা সেটা বলিনি, যাইহোক
নেক্সট টাইম থেকে এসব আর করবেন না ।"
এভাবেই অনিকের সাথে পরিচয় অবন্তির। বন্ধুত্বটাও
হয়ে যায় যখন তারা তাদের একই ক্লাসে আবিষ্কার
করে। দুজনেই তখন অবাক হয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে
ছিল। এরপর থেকেই থেকে তাদের বন্ধুত্বটা গভীর হতে
থাকে। সময় যতই যাচ্ছে দুজন দুজনের প্রতি নির্ভরশীলতা
বাড়ছে সেই সাথে বাড়ছে দায়বদ্ধতাও। ওর প্রতি
অবন্তির যে কেয়ারিং সেই বিষয়টা অনিককে সবসময়ই
অবাক করে! এত সহজে একটা মানুষ কি করে অপরিচিত
একজনকে এতটা আপন করে নেয় বিষয়টা আজও অনিককে
ভাবিয়ে তোলে। সৃষ্টিকর্তা এমন ক্ষমতা সবাইকে দেন
না, যাদের দেন তারা নিসন্দেহে স্রেষ্টত্বের
দাবিদার। ধীরে ধীরে অনিক নিজেও তাকে আপন
ভাবতে শুরু করে। অন্যরা ওদের একসাথে দেখতে দেখতে
অভ্যস্থ হয়ে গেছে। যদিও তাদের ধারণা অনিক ও
অবন্তির মাঝে হয়ত কোন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু
অবন্তির প্রতি অনিকের তেমন কোন ফিলিংস কাজ করে
না। সময় তার নিজ গতিতেই চলতে থাকে আর সেই সাথে
বাড়তে থাকে মায়া। মায়া এমন এক অনুভূতি যা
অজান্তেই সৃষ্টি হয়।
কয়েকটাদিন অবন্তির কোন খোঁজ পায় না অনিক।
অনেকবার ফোন করেও পায়না তাকে। অনিক বুঝতে শুরু
করে ওর অস্তিত্বের কতটা দখল করে নিয়েছে সে।
অনিককের ভয় হয় যদি ও হারিয়ে যায়!
কয়েকদিন পর অবন্তি অনিকের মেসেজগুলো পড়ে যথেষ্ট
অবাক হয় ।কেননা অনিক কখনও এমন করে তাকে মেসেজ
দেয়নি । অবন্তিরও অনিকের জন্য ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা
লাগে। ওকে ছাড়া অবন্তির থাকা প্রায় অসম্ভব! অনিক
তো সেই কবেই তাকে হরণ করেছে তবুও এটা তাকে বুঝতে
দেয়নি অবন্তি। অবন্তি কখনও ওকে চোখের আড়াল
করেনি যদি হারিয়ে যায়!
অনিক রাতে অবন্তির একটা মেসেজ পায় যেখানে
লেখা,"কাল সকাল দশটার কলেজে এসো অনেক কথা
আছে।" সারারাত জেগেই কাটিয়ে দেয় অনিক। সবকিছু
অবন্তিকে বলে দিবে ঠিক করে নয়ত স্বাভাবিক হতে
পারছে না। পরেরদিন সকাল দশটার অনেক আগেই কলেজ
চলে যায় অনিক।আজ ওর অনেক আনন্দের দিন আর
অবন্তিকে সবকিছু বলবে সে। ওর ভাল লাগার কথা,
ভালবাসার কথা। তবে একটা বিষয় যেন ভাবনা থেকে
সরাতেই পারছে না, "অবন্তি ওকে ফিরিয়ে দিবে না
তো ?" ওকে দেখেই অবন্তি কান ধরে বলল,"সরি বাবু আর
কখনও এমন হবে না" অবন্তি আদর করে মাঝে মাঝে ওকে
বাবু বলে ডাকে। ডাকটা অবন্তির মুখে শুনতে অনেক ভাল
লাগে অনিকের।
অনিক বলে,"অবন্তি আমার হাতটা সারাজীবনের জন্য
ধরতে পারবে?" অবন্তির অনিকেল কথার অর্থ বুঝতে
দেরি হল না,"জ্বি মশাই ধরব এবং কখনই ছেড়ে যাব না ।
গন্ডার একটা, এই ছোট্ট কথাটা বলতে এতদিন লাগে? আই
লাভ ইউ "
এর পরবর্তি সময়গুলো যেন স্বপ্নের মত। সারাক্ষণ কথা
বলা একসাথে থাকা সব কিছুর পরিমাণটা যেন হঠাত্ই
বেড়ে গেল। এমন কোন বিষয় নাই যেটা একে অপরেরটা
জানত না। একটা মুহূর্ত কথা না বললে মনে হত ও বুঝি
অনেক দুরে চলে গেছে।
ওর সাথে সম্পর্কটা অনেক গভীর হয়েছে অনিকের। ভালই
চলছে সবকিছু। জীবনটা আসলে খারাপ না ! রাতে
অবন্তির ফোন পেয়ে অনিকের মনে হল ওর তো এখন ফোন
দেবার কথা নয়। ফোন রিসিভ করতেই,"জানো বাবু কি
হয়েছে? আমি আমার এক পুরোন বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছি।
এজন্য খুশির খবরটা তোমাকেই প্রথম দিলাম"
-"হুম। তো কে সে যার জন্য আপনি এত খুশি?"
-"শোন সব বলব পরে, এখন রাখি। রাতে খেয়ে নিয়ো।
লাভ ইউ"
অনিক কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই কেটে গেল। এর
কিছুদিন পর থেকেই অনিক অবন্তির পরিবর্তন গুলো
লক্ষ্য করতে শুরু করল। অনিকের খোঁজ করে না, ফোন
করলে সেটাও রিসিভ করে না। অবন্তির এমন আমূল
পরিবর্তন অনিককে ভেতরে ভেতরে কষ্ট দিতে থাকে।
আসলে খুব কাছের মানুষই পারে মানুষের পরিবর্তন গুলো
কেউ ধরতে পারে না তাই অনিক পারছিল। চির চেনা
অবন্তিকে হঠাত্ করেই কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছে
অনিকের। এক অর্থে অবন্তি অনিকে এড়িয়ে চলছে।
কেননা অবন্তিকে বেশ কিছুদিন তার সেই ফ্রেন্ডের
সাথে ফাস্টফুডের দোকান থেকে বের হতে দেখেছে।
অবন্তিকে ফোন করেও পায় না সে পেলেও কিছু বলা
যায় না তাকে অল্পতেই রেগে যায় তখন যা ইচ্ছা বলে
দেয় এতটুকু মুখে বাঁধে না তার। অনিক ভালভাবেই বুঝে
গেছে ছেলেটির সাথে অবন্তির সম্পর্কটা এখন আর
বন্ধুত্বর মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার
জন্য একদিন দুপুরে অবন্তিকে ছেলেটির সাথে
ফাস্টফুডের দোকান থেকে বেরুতে দেখে ফোন দেয়
অনিক,"হ্যালো, কোথায় তুমি এখন? সকাল থেকে কতবার
ফোন দিয়েছি ধরলে না যে?"
অবন্তি,"বাসাতে আমি। বাসায় থাকলে ফোন ধরব কি
করে আম্মু আব্বু বাসায়"
অনিক আর কোন কথা বলেনি সেদিন শুধু দূর থেকে
দাড়িয়ে তাদের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে ছিল
কিছুক্ষণ। অবন্তির মত মেয়েদের কাছে ভালবাসা মানে
ফাস্টফুডের দোকানে মুখোমুখি বসে একটুকরো
স্যান্ডউইচ চিবোন। কিন্তু অনিক কখনও ভালবাসাকে
একটুকরো স্যান্ডউইচের সাথে তুলনা করেনি, কখনও
করবেও না। অনিকের কাছে ভালবাসা হৃদয় দিয়ে
উপলব্ধির জিনিস খেলার বস্তু নয়। তার কাছে ভালবাসা
মানে একই আত্মা বিশিষ্ট দুটি দেহ।
অনিক তার রুমের ডানদিকের দেয়ালে টানানো
থোরিয়ামের প্রলেপ দেয়া ঘড়ির কাঁটাগুলোর দিকে
তাকালো। ৪.৩০ বেজে গেছে! পুরোন স্মৃতি ভাবতে
ভাবতে এমন কতটা রাত যে পার করেছে সেটা তার
নিজেরও অজানা। এই ছয়টা বছরে প্রতিটা রাতেই
ভেবেছে এই বুঝি আজ অবন্তি ফোন করবে। কিন্তু না
অবন্তি একটিবারের জন্যও তাকে ফোন করেনি।
অনিকের কেন জানি মনেহয় মেয়েদের ভাল লাগা বা
ভালবাসাটা সাময়িক । সময়ের সাথে সাথে তা
পরিবর্তিত হয় তখন তাদের নতুন কাউকে প্রয়োজন হয়।
অনিক আরও অধীর আগ্রহে তার জন্য অপেক্ষা করে ঠিক
যেমনটি প্রথমদিন করেছিল। অনিকের অনেকদিনের
ইচ্ছা এখনও তার মনে বারবার উকি দিয়ে যায়। মনেহয়,
অবন্তিকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলবে,"ভালবাসি
তোমাকে অবন্তি"। কিন্তু কিছু মানুষের ইচ্ছাগুলো
ইচ্ছাই রয়ে যায় সারাজীবন। কেননা সৃষ্টিকর্তা সবার
সব ইচ্ছা পূরণে বাধ্য নন।
উৎসর্গ তাদের যারা ভালবাসা নামক অনুভুতিকে মূল্য
দিতে শিখেছে। (সমাপ্ত)
আপনার লেখা গল্প, কবিতা, উপন্যাস ইত্যাদি ইত্যাদি শেয়ার করতে ইমেইল করেন GolpoShare@gmail.com এ।
সুত্রঃ-ফেসবুক

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন