ভালোবাসার গল্পঃ- স্রোতের প্রতিকুলে ( গল্প শেয়ার)



-স্যার,একজন আপামনি আসছে।ভেতরে পাঠিয়ে দিবো,ভেতরে প্রবেশ করলেন মকবুল চাচা।


ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রায় চারটা বাজতে চলেছে।বিরক্ত হয়ে বললাম,চাচা,আপনার বউমা আমার উপর রেগে আছে।সকালবেলা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বারবার বলে দিয়েছে,ঠিক দুটো বাজলে যেন দেরি না করে খাবার খেয়ে নিই।অথচ কাজের চাপে সময় গড়িয়ে ঘড়িতে এখন বাজে প্রায় চারটা।আমাকে তখন থেকে কল দিয়েই যাচ্ছে মেয়েটা।অনেক বুঝিয়ে বললাম,চারটায় ঠিক খেয়ে নিবো।কিন্তু আপনি এখন আবার একজনকে নিয়ে আসলেন।আজ আমার খবর আছে।আমার সংসারটা বোধহয় আর রইল না,হেসে বললাম আমি।


-আমার কি দোষ বলেন,স্যার।আপামনির নাকি আজ কাগজ জমা দেয়ার শেষ তারিখ।আমি অনেকবার বললাম,আজকে আর হবে না।অফিস বন্ধ হয়ে গেছে।স্যার,বাসায় চলে যাবে একটু পরে।কিন্তু সে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,আজ কাগজ জমা দিতে না পারলে আর কখনো হবে না।এমন অবস্থা যে আমার পায়ে না ধরে বসে,বললেন মকবুল চাচা।


-ঠিক আছে,এই শেষ কিন্তু।আর একজনও না।দেরি করলে বিন্তি আমার খবর করে ছাড়বে।তখন কিন্তু কিছু হলে আপনি সামলাবেন বলে দিলাম।


মকবুল চাচা হেসে চলে গেলেন বাইরে।


অগত্যা আবার ড্রয়ার থেকে জরুরি কাগজগুলো বের করে টেবিলে রাখলাম।এদের নিয়ে আর পারা যায় না।কাগজ জমা দেয়ার তারিখ দিলে খবর থাকবে না।বাসায় বসে থাকবে।আর যখনই শেষ দিন আসবে তখনই কাগজ নিয়ে ছুটাছুটি।ভুল কিছু করলে এবার দোষ আমাদের।মোবাইলটা আবার বেজে উঠল।দেখতে পেলাম,বিন্তী আবার ফোন করেছে।আজ আর রক্ষা নেই।মেসেজ দিয়ে বললাম,আমি এইতো ডাইনিং-এ যাচ্ছি।প্লিজ রাগ করো না।


-আসসালামুআলাইকুম স্যার,ভেতরে আসবো?


বিন্তীর মেসেজের অপেক্ষায় মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বললাম,আচ্ছা,আপনাদের কি দায়িত্ব বলতে কিছু নেই।আজকে কাগজ জমা দেয়ার শেষ দিন।তারপরও সকালে না এসে এখন অফিস শেষ হওয়ার পর এসেছেন।এবার তাড়াহুড়ায় কিছু ভুল হলে এর দায় কে নিবে?মাথা তুলে তাকাতেই সামনে দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখে চমকে উঠলাম।আরে,এটা তো শারমিন।স্মৃতির কোণে ভেসে উঠলো আজ থেকে ঠিক চার বছর আগের কথা।


শরতের এক গোধূলী বিকেলবেলা।নদীর পাড়ে বসে আছি।গায়ে কুঁচকানো ফুলহাতা শার্ট।দক্ষিনা বাতাসে নদীর স্রোতের বয়ে চলা দেখে মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছি। অপেক্ষা একটি মেয়ের।মেয়েটিকে আমি ভালোবাসি।আমাদের আজ প্রায় চার বছরের সম্পর্ক।তবে কম বেতনের চাকরি বলে সম্পর্কটা কত দিন থাকবে সেটা নিয়ে বেশ চিন্তিত।গত চারদিন আগে শারমিনের বাবার কাছে গিয়েছিলাম,আমাদের বিয়ের কথা বলতে।ওনি আমার গায়ের পান্জাবি দেখে বলল,সস্তা দামে কেনা পান্জাবি যেই ছেলে পড়ে সে সারাজীবন আমার মেয়েকে সুখী রাখবে কিভাবে?ওনার কথা শুনে,আর একটি কথাও মুখ দিয়ে বলিনি।জানি,বলে কিছু হবে না।রাস্তায় বেরিয়ে ভাবছিলাম,সংসার করতে খুব কি বেশি টাকার প্রয়োজন?তিনবেলা পেট ভরে ভাত আর দুজন দুজনের প্রতি সম্মান থাকলেই কি যথেষ্ট নয়?"যৌতুক নিয়ে সবাই তো অনেক কিছুই বলে।কত গল্পই লেখা হয় পাতা জুড়ে।কিন্তু মেয়ের পরিবারের উচ্চ বেতনের চাহিদা শুনে কত ছেলের বিয়ে হয়না তা কি এই শহরের মানুষগুলো খবর রাখে?"


-এই এখানে কখন আসছো?সরি,আজ একটু দেরি হয়ে গেছে আমার।


পরিচিত কন্ঠ শুনে মুচকি হেসে পেছনে তাকালাম।শারমিন হাতে অনেকগুলো ব্যাগে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বললাম,পাশে বসে পড়ো।দেখো,আজ কি সুন্দর বাতাস বইছে!সাদা কাশফুলের এই ভুবনে তোমার আমার শরতের ভালোবাসা।তা মার্কেটে গিয়েছিলে বুঝি?


শারমিন আমার পাশে বসে বলল,হ্যাঁ আজ অনেক মার্কেট করে আসলাম।জিজ্ঞেস করবে না কিসের মার্কেট?


ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,কিসের?তোমার বিয়ের?


-হ্যাঁ আমার বিয়ের।বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।আগামী সপ্তাহে আমার বিয়ে,বলল শারমিন।


মেয়েটা মাঝেমাঝেই এমন মজা করে।এই নিয়ে কতবার বলল হিসেব নেই।আমিও বললাম,ভালোই তো।তোমার বিয়ের দাওয়াত খেয়ে আসবো।তবে আমি কিন্তু কোনো গিফট দিতে পারবো না।মাসের শেষদিকে।পকেট একেবারে ফাঁকা।


-দেখো,হাবিব,আমি কিন্তু মজা করছি না।আমি তোমাকে অনেক সময় দিয়েছি।কিন্তু এই চাকরি নিয়েই তো বসে রয়েছো।বাবা সাফ জানিয়ে দিয়েছে,কোনোভাবেই আমাদের মেনে নিবে না।আর দেখা করতে সস্তায় কেনা পাঞ্জাবি পড়ে কেউ যায়?


-সম্পর্কের শুরুতে তো তোমাকে সবই বলেছিলাম,শারমিন।তুমি তো আমার সবকিছু জেনেই সম্পর্কে জড়িয়েছিলে।তবে আজ কেনো এই প্রশ্ন করছো আমাকে?


-ভুলে যাও সবকিছু।আজই আমাদের শেষ দেখা।আর কখনো তোমার সাথে কথা হবে না,বলল শারমিন।


-তাহলে এই চারবছর দুজনে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম,একটা চিলেকোঠায় বাসা নিবো।চড়ুইভাতির সংসারে টোনাটুনি একসঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করবো।এসবের তাহলে কি হবে,শারমিন?


-সেগুলো ভোরের দেখা দুঃস্বপ্ন ছিল।আর এসব স্বপ্ন বেশিদিন মনে থাকে না।আমি এখন উঠছি।সে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য,শারমিন উঠে হাঁটতে শুরু করল।একসময় মিশে গেল সাদা কাশফুলের আড়ালে।


-পুরানো কথা ভাবছিলে বুঝি?


শারমিনের কথায় বাস্তবে ফিরে আসলাম।বললাম,অনেকদিনের জমানো আবেগ তো।চোখের সামনে ভেসে উঠবে তাই তো স্বাভাবিক।


-তুমি তো দেখছি,আজ অনেক বড় অফিসার।টিভির চ্যানেল খুললেই তোমার ছবি।বেশ ভালো লাগছে দেখা হয়ে গেল,বলল শারমিন।


-এইতো আছি আল্লাহর কৃপায়।আচ্ছা কেন্টিনের দিকে পা বাড়াই।সারাদিন এখানে বসেছিলাম।আর ভালো লাগছে না,দুজনে রুম থেকে বেরিয়ে কেন্টিনে চলে আসলাম।ফাঁকা দেখে বসে পড়লাম টেবিলে।সঙ্গে দুটো কফির অর্ডার।বললাম,তুমি হঠাৎ চাকরির জন্য আবেদন করছো?সত্যিই আমি প্রথম দেখে বিশ্বাস করিনি।এত ভালো পরিবারে বিয়ে হয়েছে।নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা হয়েছে বুঝি?


শারমিন আমার কথা শুনে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।ওর চোখের কোণে পানি জমেছে কিছুটা।হাত দিয়ে মুছে বলল,সত্যিই আমার ভাগ্যটা খুব খারাপ।তোমার সাথে সম্পর্ক ভাঙার পর জাহিদের সাথে বিয়ে হয়।নামকরা ইঞ্জিনিয়ার।বিয়ের প্রথম দুইবছর বেশ ভালোই কেটেছিল দুজনের।কিন্তু হঠাৎ একদিন প্রজেক্টের কাজে ছাদ থেকে পরে প্যারালাইজড হয়ে যায় পুরো শরীর।দেশ-বিদেশে অনেক ডাক্তার দেখিয়ে লাভ হয়নি।সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকে।আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ হয়ে গেছে।এখন বাধ্য হয়ে চাকরি করতে বের হয়েছি।


শারমিনের কথা শুনে খুব খারাপ লাগছে।শত হলেও একসময় আমার প্রিয় ছিল।স্বাভাবিক হওয়ার জন্য বললাম,কফিটা খেয়ে নাও।আশা করি,তোমার ভালো সময় খুব শীঘ্রই আসছে।


শারমিন কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,একটা কথা বলবো?


বিন্তীর মেসেজে আবার ফোনটা কেঁপে উঠল।স্কিনের দিকে তাকিয়ে বললাম,হ্যাঁ বলতে পারো।


-এখনও আমাকে ভালোবাসো?চিলেকোঠায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার স্বপ্ন দেখো?


শারমিনের কথা শুনে মুচকি হাসলাম।চেয়ার ছেড়ে উঠে বললাম,আমার স্ত্রী বিন্তী আমার জন্য বাসায় অপেক্ষা করছে।দুপুর থেকে খাওয়া হয়নি।বাসার গিয়ে দুজনে একসঙ্গে খাবো।আর তোমার কাগজগুলো মকবুল চাচার হাতে দিয়ে বলবে,আমার ড্রয়ারে রেখে দিতে।আশা করি,তোমার জন্য কিছু করতে পারবো।আজ আমি উঠি তবে।


হাঁটতে শুরু করলাম।হঠাৎ মনে হলো,শারমিনের শেষ প্রশ্নের উত্তরটা দেয়া দরকার।পেছনে ফিরে বললাম,হয়তো দুঃস্বপ্ন ছিল।আর দুঃস্বপ্ন খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে হয়।তুমি চলে যাওয়ার পর ঠিক তোমার মতই একটি মেয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।আর সে আমার পাশে ছিল বলেই আমি আজ এখানে আসতে পেরেছি।সেই মেয়েটি হলো আমার স্ত্রী বিন্তী।"যারা দুঃসময়ে পাশে থাকে না,তাদের কখনো মনে রাখতে নেই।কখনো কখনো কিছু স্বপ্নকে মাটি চাপা দিতে হয়,যাতে সে স্বপ্নের চেয়ে নিজেকে অনেক উঁচুতে নিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়,সত্যিই আমার জায়গায় আমি ঠিক ছিলাম।


আর পিছুটান নয়।চোখের কোণে পানি জমেছে।কিন্তু এই অশ্রু কিসের আমার জানা নেই।হয়তো আমার ভেতরের মেঘলা আকাশ কাঁদছে।কিন্তু আমি আমার নীল আকাশেই সুখী।


............সমাপ্ত.......... 


written by Habib Khan Hridoy

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন