-এই মিলি,দরজাটা বন্ধ কর।আমি বের হচ্ছি।গেইট থেকে বেরিয়ে গলির রাস্তা ধরে হাঁটছে ফারহান।গতকাল রাত থেকে ফারহানের মাথায় মিলির কথাগুলো যেন একনাগাড়ে বেজে চলছে।রাত হলে কি একটা মিশনে রাকিব বাসা থেকে বের হয়।কি সেই মিশন?অথচ এই ছেলেটা ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না।এর রাতে বের হওয়ার সাহস হয় কিভাবে?নাহ,একবার নজর রাখতে হবে ছেলেটার উপর।কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বড় রাস্তায় আসতেই হঠাৎ ইরার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ফারহানের।ইরা আর ফারহান একই সঙ্গে পড়ে।তবে দুজনের কলেজ আলাদা।বামদিকে একটু হাঁটলে একটা সরু গলি পেরিয়ে গেলে ইরাদের বাড়ি।কলেজ থেকে মাত্র দশ মিনিটের পথ।সে প্রায় সময় হেঁটেই আসে।হেঁটে আসার কারনে একটু-আধটু কথা হয় মাঝেমাঝে দুজনের।ফারহানকে দেখতে পেয়ে হাতের ইশারায় থামতে বলল ইরা।
-আজ এতো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লে যে?তোমাকে তো কলেজের ছুটি হওয়া ছাড়া দেখা পাওয়া যায় না,বলল ইরা।
দুজনে আবার হাঁটতে শুরু করেছে।ফারহান বলল,আজ ভালো লাগছিল না।ভাবলাম,কলেজে চলে যাই।সবার সাথে কথা বললে ঠিক হয়ে যাবে।
ইরা হেসে উঠল।তুমি কবে থেকে সবার সাথে কথা বলতে শুরু করেছো?সবসময়ই তো দেখি,দু'একজন ছাড়া তেমন কথা বলো না।
-নাহ,সবার সাথে বলি না তা ঠিক।কারন সবাইকে যে ভালো লাগবে তাও কিন্তু নয়।মানে বলছি যে,সবার সাথে তো আর কথা বলতে ভালো লাগবে না তাই না?
-হুম,বুঝতে পারলাম।তা আমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে তো?নাকি সেটাও জোর করে বলো,মুচকি হেসে বলল ইরা।
ফারহান মাথা চুলকে বলল,ভালো লাগবে না কেন?তোমার সাথে কথা বলতে আমার ভালো লাগে।ভালো না লাগলে কি আর কথা বলি?
ইরা বলল,ভালো লাগলেই ভালো।
ইরার কলেজ গেইটের সামনে আসতেই রাস্তার অপর পাশে চোখ পড়ল ফারহানের।রাকিব এদিকেই শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।"ইরা তুমি একটু দাঁড়াও,আমি আসছি"ফারহান রাস্তা পেরিয়ে অপর পাশে যেয়ে রাকিবকে বলল,তুই এখানে কেন?
-এমনি ভাই।দেখতে আসছি,বলল রাকিব।
-কি দেখতে আসছিস?এটা মেয়েদের কলেজ,চিড়িয়াখানা নয়।এক্ষনি চলে যা।নাহলে দারোয়ান এসে মাইর শুরু করবে।
-ভাই,আপনার সাথে ওই মাইয়াটা কে?খুব সুন্দর দেখতে।
-এই বয়সে সুন্দরও শিখে ফেলছস?আমার সাথেই পড়ে।কিন্তু দুজনের কলেজ আলাদা।তা সকাল থেকে কিছু খাওয়া হইছে তোর?জিজ্ঞেস করল ফারহান।
-কলা আর পাউরুটি খাইছি।রাকিব পেটে হাত বুলিয়ে বলল,ক্ষিধা লাগে নাই,ভাই।ক্ষিধা লাগলে চোখের সামনে কত কিছুই আছে।
ফারহান পকেট থেকে দশ টাকার নোট বের করে রাকিবের হাতে দিয়ে বলল,এই নে।এখান থেকে বাসায় যা।আমি এখন আসছি।ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।
ফারহান গেইটের সামনে আসতেই ইরা বলল,ওই ছেলেটা কে?দেখতে কেমন নোংরা।তুমি ওদের সাথে কথা বলো কেন?
-সকাল থেকে কিছু খায়নি।রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।ভাবলাম,কিছু দিয়ে আসি,বলল ফারহান।
ইরা বলল,ওরা খুব নোংরা।শরীর থেকে গন্ধ আসে।আর যাবে না ঠিক আছে?আমার কলেজে চলে এসেছি।তুমি তাহলে এবার সামনে হাঁটতে শুরু করো।আসি তাহলে,ইরা গেইটের ভেতরে চলে যেতেই ফারহান গেইট পেরিয়ে সামনে হাঁটতে শুরু করল।কিছুদূর যাওয়ার পর পেছনে ফিরে দেখতে পেল,রাকিব এখনও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।ওর শূন্য দৃষ্টির কোঠরে ভাসছে ইরার মায়াবী চেহারা।
বাড্ডা থানার সামনে আসতেই এসআই আনিসুর রহমানকে দেখতে পেলেন হাসনাত করিম।গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে একমনে।আনিসের ধূমপান করার অভ্যাস কখনো চোখে পড়েনি উনার।হঠাৎ এই জিনিস কবে থেকে ধরেছে কি জানি!হাসনাত করিম এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললেন,এই ব্যাটা,ধরেছি।
চমকে উঠলো এসআই আনিসুর রহমান।সিগারেট হাত থেকে ফেলে ধোঁয়া সরিয়ে বলল,দুলাভাই তুমি কখন আসলে?
-এসেছি তো মাত্র।তা আনিস,এই জিনিস কবে থেকে?আগে তো কখনো হাতে দেখিনি।
-এইতো দুলাভাই,মাস তিনেক হবে।আসলে এত চাপে থাকি যে না টেনেও উপায় নেই।এসব কথা বাদ দাও।এবার আসল কথায় আসা যাক।
-হ্যাঁ,গতকাল রাতে কি যে বলছিলি সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে।কি হয়েছে বল তো?
-দুই মাস আগে আত্মহত্যা করা মেয়েটার নাম সাবিহা।কিন্তু সাবিহার রিপোর্ট দেখে তুলি আর আনিকার মৃত্যুর ঘটনা পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।মানে সবকিছুই উলটপালট।আমরা যে কোনদিকে যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছি না,বলল এসআই আনিসুর রহমান।
হাসনাত করিম ভ্রু কুচকে বললেন,তার মানে?
-তদন্ত কর্মকর্তার সাথে কথা বললে বুঝতে পারবে।আমার সাথে একবার ভেতরে এসো।
প্লাস্টিকের চেয়ারে বেশ স্বাস্থ্যসুলভ দেখতে একজন বসে আছেন।ওনার টেবিলের উপরে রাখা প্লেট যেন পুরো একটা সবজির দোকান।অনেক রকমের সবুজ সবজির মিশ্রনে কি যেন বানানো হয়েছে।খাতায় কয়েক লাইন লিখছে,কিছুক্ষণ পরপর এক চামচ মুখে তুলে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে।ব্যাপারটা বেশ মজাই লাগছে হাসনাত করিমের।তিনি সালাম দিয়ে চেয়ারে বসলেন।
এসআই আনিসুর রহমান পরিচয় করিয়ে দিলেন,ওনার কথাই বলেছিলাম।আমার দুলাভাই সিনিয়র ব্যাংক কর্মকর্তা।কয়দিন ধরে রহস্যের পেছনে ঘুরছেন।দুলাভাই,উনার নাম এসআই তালুকদার।
-আহা,আনিস,এত বাড়িয়ে বলার দরকার নেই।তিনি এবার পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন,আপনার ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে।একটু বলা যাবে কি?
লোকটি বেশ জোরে হেসে উঠলেন।আর বলবেন না,বসে থাকতে থাকতে শরীরে পানি জমে গেছে।ডাক্তার বললেন,শুধু সবজি খেতে।আমি আবার খুব ভোজন রসিক মানুষ।হঠাৎ করে তো আর বললেই ছাড়া যায় না।সবজির সাথে কিছুটা মধু দিয়ে হজম করছি।দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো যাকে বলে।
হাসনাত করিম মুচকি হাসলেন।বললেন,আচ্ছা,ওই মেয়েটার তদন্ত তো আপনি করেছিলেন।কোনো সমাধান পেয়েছিলেন কি?
লোকটি এবার কিছুটা গম্ভীর গলায় বললেন,মেয়েটার নাম সাবিহা ছিল।বেশ সম্রান্ত পরিবারের।আমার যতদূর মনে পড়ে,ঘটনার দিন সকালে আমার কাছে একটা ফোন এসেছিল।একটি মেয়ে রহস্যজনকভাবে সুইসাইড করেছে।আমি তাড়াতাড়ি সেখানে পৌঁছে লাশ নেয়ার ব্যবস্থা করে ফেললাম।দেখি,সিলিং ফ্যানে ঝুলে আছে ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে।কলেজ পড়ুয়া।কিন্তু লাশ যখন নামানোর জন্য ধরি,আমার স্পষ্ট মনে আছে,যেন কিছুই নেই।
এসআই তালুকদারকে মাঝপথে থামিয়ে হাসনাত করিম জিজ্ঞেস করলেন,কিছু নেই মানে?
-মানে মনে হচ্ছিল যেন,মেয়েটির শরীরে শুধু চামড়া ছাড়া কিছুই নেই।শরীরের ভেতরের মাংসগুলো যেন ঝরঝরে বালির মতো লেগে ছিল।রহস্যজনক আত্মহত্যা তো এই চাকরির জীবনে কম দেখা হয়নি।কিন্তু এমন অদ্ভুদ কান্ড আর দেখিনি।অনেকে বলছে,অশরীরি কিছুর কাজ হতে পারে।
-তা মেডিকেলের রিপোর্টে কি এসেছিল?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।
-অদ্ভুদ ব্যাপার হলো,কারো হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি।তবে চোখদুটো ছিল বিস্ফোরিত।মেডিকেল রিপোর্টে আত্মহত্যার ব্যাপারই উঠে এসেছে।মানে পুরো ব্যাপারটা একসাথে করলে এমন হয় যে,আত্মহত্যার আগে মেয়েটা কিছু দেখে ভয়ে চোখগুলো এমন বিস্ফোরিত হয়।কিন্তু আত্মহত্যার কারনটা আজও এক রহস্য,বললেন এসআই তালুকদার।
-খুবই অদ্ভুদ।যতই গভীরে যাচ্ছি,ততই যেন নতুন করে আরও তলিয়ে যাচ্ছি।বেরিয়ে আসছে নতুন রহস্য,বিড়বিড় করে বললেন হাসনাত করিম।আচ্ছা মেডিকেল রিপোর্টের একটা কপি কি আমাদের দেয়া যাবে?
-হ্যাঁ,আমি আগেই রেখে দিয়েছি।আনিস সাহেবই রাখতে বলেছিলেন।তবে আমার চাকরি জীবনে,এমন অদ্ভুদ ঘটনা আগে কখনো দেখিনি।
হাসনাত করিম এসআই আনিসুর রহমানের দিকে তাকিয়ে বললেন,এবার তাহলে আসা যাক।মেয়েটার বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।আসি তাহলে,তালুকদার সাহেব।অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
-দুলাভাই কি ভাবছেন তখন থেকে?কিছু বলছেন না যে,জিজ্ঞেস করল এসআই আনিসুর রহমান।
দুজনে থানার পাশে ছোট্ট একটি ব্রিজের উপর গিয়ে বসল।পাশেই প্লাস্টিকের পলিথিন দিয়ে ঘেরা চায়ের দোকান।দোকানের ভেতরে তেমন ভিড় নেই।দোকানি অলসভাবে বসে তাকিয়ে আছে একটা গাছের উপরে।দুটি কাক খাবার নিয়ে দুজনের মাঝে ঝগড়া লেগেছে।ঝগড়ার এক পর্যায়ে মুখ থেকে খাবারটা নিচে পড়ে গেল।এই নিয়ে আবার তুমুল মারামারি।
-আনিস,ভাবছি অনেক কিছুই।কিন্তু কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছি না।তোকে তো বলতে মনে নেই,গতকাল রাতে তুলির রুম থেকে একটা কাগজ পেয়েছি।দেখ তো কিছু চোখে পড়ে কিনা?পকেট থেকে কাগজ বের করে বাড়িয়ে দিলেন হাসনাত করিম।
কাগজখানা উল্টেপাল্টে দেখছে এসআই আনিসুর রহমান।কিছু পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।বলল,না দুলাভাই,সম্ভবত কিছু আঁকতে চেয়েছিল।কিন্তু পরে আবার নষ্ট করে ফেলেছে।
-কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করে দেখ,যেই অবয়বটা আঁকার চেষ্টা করেছে তার উপর অনেক কাঁটাছেড়া হয়েছে।মানে এমন কেউ যার উপর তুলির রাগ ছিল।আর অবয়বের মুখের একপাশ আঁকেনি কেন?তাহলে কি একটা পাশ নেই?
-আরে দূর কি বলো?মুখের একপাশ না থাকলে মানুষ হয় কিভাবে?পুরো মুখ দিয়েই তো চেহারার গঠন হয়।হতে পারে তুলি আঁকেনি।মানে যদি ধরি,রাগ কমানোর ইচ্ছা ছিল।তো কোনোমতে একটা কিছু এঁকে তার উপর কাঁটাছেড়া করলেই তো হয়ে গেল।ব্যাপারটা এমন নয়?এই কাগজ দিয়ে কিছুই হবে না।
-দুইমাসে তিন আত্মহত্যা।সবাই কলেজ পড়ুয়া।শরীরে কোনো ছাপ নেই।অথচ সবারই এমনভাবে মৃত্যু হয়েছে,যাদের কোনো কারনই ছিল না।এর মধ্যে বাড্ডার মেয়ে সাবিহার তো আরও সাংঘাতিক অবস্থা।তুলি আর আনিকার সাথে মিলই নেই।পরিচিতও নয়।আচ্ছা আনিস,তাহলে কি বাড্ডার মেয়েটার সাথে আমাদের রহস্যের কোনো সম্পর্ক নেই?আমরা এখানে সময় নষ্ট করছি?
এসআই আনিসুর রহমান বলল,হতে পারে।আবার নাও হতে পারে।এই মেয়েটার সাথে মিল নেই।শুধু আত্মহত্যা শব্দটার মিল রয়েছে।কিন্তু বাকি অংশ তো বলার মতো অবস্থা নয়।
-একবার ওর বাড়িতে গিয়ে কথা বলে আসবি?মিল না হলেও যেতে তো সমস্যা নেই।হতে পারে কোনো কাজে লাগতে পারে আমাদের।কথায় তো বলে-"যেখানে যা দেখবে তা নিয়ে নাও,হতে পারে অমূল্য কিছু রয়েছে সেখানে।"
-দুলাভাই,এখন পর্যন্ত শক্ত কোনো প্রমান নেই।আত্মহত্যা নাকি খুন এখনও জোর দিয়ে বলতে পারছি না।সবই আন্দাজে আর ক্ষুদ্র আলামতের উপরে দাঁড়িয়ে হাঁটছি।তবুও চলো,ক্ষীণ আলোতেও সূর্যের দেখা পাওয়া যায়।
ছয়.
"কুকুর হইতে সাবধান" লেখার সাইনবোর্ড বাড়ির গেইটে ঝুলে আছে।বাইরে থেকে কোনো দারোয়ান চোখে পড়ছে না।হুট করে এমন বাড়িতে ঢুকে পড়া ঠিক নয়।অনেকে শখের বসে হিংস্র কুকুর রাখে।অপরিচিত কাউকে দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ে এরা।শরীর থেকে মাংস খুবলে নিতে দেরি করে না।বাড়ির দারোয়ানের কাছে সচরাচর থাকে।হাসনাত করিম গেইটের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলেন।ভেতরটা শুনশান।ভেতরে মনে হয় কেউ নেই।গেইটে হাত দিয়ে কয়েকবার আওয়াজ করতেই বাঁজখাই গলায় কে যেন বলল,কারে চান?
এসআই আনিসুর রহমান বলল,আমরা পুলিশের লোক।গেইট খোলো।
লুঙ্গি পরিহিত একজন গেইট খুলে সালাম দিয়ে বলল,স্যার তো বাসায় নাই।দেশের বাইরে গেছে।
-কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।
-হাবলু ভাই আছে উপরে।মনে হয় ছাদে পানি দেয়।আপনারা ভেতরে গিয়া বসেন।আমি আনতাছি হাবলু ভাইরে।
-তা কুকুর-টুকুর নাই তো?জিজ্ঞেস করলেন এসআই আনিসুর রহমান।
লুঙ্গি পড়া লোকটি হেসে বলল,না স্যার,ব্রডম্যান নাই।ওরে সঙ্গে নিয়া গেছে।থাকলে এখন দেখতেন কি করতো।হারামজাদা,মহা পাজি।মানুষ দেখলেই লাফালাফি শুরু করে।
-আচ্ছা যাও,তাড়াতাড়ি আসতে বলবা।
গেইট পেরিয়ে মাঝে কিছু অংশ সবুজের আবরণে মোড়া।দু'পাশে সারিসারি ফুল গাছ।দু'একটা গাছে ফুল ফুটেছে।দেখে মনে হচ্ছে,বেশ যত্ম করা হয়।ভেতরে ঢুকে সোফায় বসলো দু'জনে।চারদিকে ফুলের গাছ দিয়ে ঘেরা।অবশ্য সবগুলোই সাজানোর জন্য।নিরবতা ভেঙে হাসনাত করিম বললেন,ভদ্রলোকের রুচি আছে বলতে হবে।শুধু গাছ আর গাছ।যেন জঙ্গলে চলে এসেছি।দেখতে বেশ ভালো তাই না,আনিস।
-হুম।খুব সুন্দর।লোকটা আসতে এতো দেরি করছে কেন বলো তো?চারপাশ ঘুরে দেখবে নাকি?
-না,এটা খারাপ দেখায়।এমনিতে লোকজন নেই।আর আমাদের তো অফিসিয়ালি অনুমতি নেই।হুট করে কোথাও ঢুকলে সমস্যা আছে।
একটু পরে একজন বয়স্ক দেখে লোক ট্রে হাতে নিয়ে প্রবেশ করল।দু'কাপ চা,সঙ্গে বিস্কুট দিয়েছে।বলল,আপনারা এমন সময়ে এসেছেন বাসায় উনারা নেই।আমি আর দারোয়ান আছি।
-আপনিই কি হাবলু ভাই?প্রশ্ন করলেন হাসনাত করিম।
লোকটি বলল,জ্বি।
-কাউকে দরকার হবে না।আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করবো।একদম ঠিক উত্তর দিবেন।ভুল হলে সমস্যায় পড়তে পারেন,বলল এসআই আনিসুর রহমান।
লোকটি বলল,জ্বি স্যার,সব বলবো।
-আপনার মেডামের মেয়ে দুইমাস আগে ফ্যানে ঝুঁলে আত্মহত্যা করে ঠিক তো?
-সাবিহা আপামনির কথা বলতেছেন?হ্যাঁ,দুইমাস তো হবেই।
-ওইদিন কি হয়েছিল ঠিক বলুন তো?প্রশ্ন করলেন হাসনাত করিম।
-উনারা তার সপ্তাহখানেক আগে কক্সবাজার থেকে আসছিলেন।সাবিহা আপামনি তেমন কোথাও যেতেন না।সারাদিন রুমে বই পড়তেন,টিভি দেখতেন এসবই।ঘটনার দিন রাতে আমি উনার রুমে গিয়ে দেখি,বারান্দায় বসে আছে।আমি দুধের গ্লাস রেখে চলে আসি।পরদিন সকালে আসমানি রুম ঝাড়ু দিতে গিয়ে দেখে,আপামনির লাশ ঝুলে আছে।তারপর তো পুলিশ আসে।অনেক জিজ্ঞাসা করা হলো।কিন্তু কিছুই বের করতে পারল না।
-তা শুনলাম,ঘটনা যেন বেশিদূর না যায় তাই কলেজে গিয়ে সবাইকে বারন করেছিল।এটা কি সত্যি?
-স্যার,উনারা বড়লোক মানুষ।সবার আগে নিজের সম্মানের কথা ভাবে।হয়তো তাই এমন করছেন।
-আচ্ছা ঘটনার সময় ওই কুকুর মানে ব্রডম্যান কি ছিল?জিজ্ঞেস করল আনিসুর রহমান।
-হ্যাঁ স্যার,ছিল তো।কিন্তু আপামনি এসব পছন্দ করত না।তাই কুকুরটাকে নিচেই দারোয়ানের কাছে রাখতে হতো।
-দুলাভাই,কুকুরের ঘ্রাণশক্তি প্রখর।রাতেরবেলা কাউকে আসতে দেখলে তো চিৎকার করার কথা।
হাসনাত করিম বললেন,হয়তো দেখেনি।আর সাবিহার শরীর তো কেমন যেন হয়েছিল।আত্মহত্যা করলে এমন হওয়ার কথা নয়।এটা নিশ্চিত কারো কাজ হবে।কিন্তু কিছুই তো রেখেও যায়নি।
-আপনার আপামনির রুমটা একটু দেখা যাবে,বললেন এসআই আনিসুর রহমান।
লোকটা হাতের ইশারায় আসতে বললেন।সিড়ি পেরিয়ে উপরে উঠলেন দুজনে।দরজায় তালা।হয়তো সাবিহার মৃত্যুর পর কেউ আসেনি।লোকটি তালা খুলে ভেতরে ঢুকে বলল,আপামনির রুমে কেউ আসে না।সবকিছু আগের মতই রয়ে গেছে।শুধু উনিই নেই।
দুজনে দেখতে পেলেন,বিছানার চাদর নেই।খোলা বারান্দা।দেয়ালে সাবিহার ছবি ঝুলছে।হাসনাত করিম বললেন,সাবিহার আর ছবি নেই?মাত্র একটা ছবি?
-আরও আছে।ম্যাডামের কাছে একটা ছবির ডায়েরীতে অনেক ছবি আছে,বলল লোকটি।
-আপনি এই বাড়িতে কতদিন পর্যন্ত আছেন?মনে তো হয়,অনেকদিন রয়েছেন,বললেন হাসনাত করিম।
লোকটি বলল,আমার বয়স যখন বিশ বছর তখন স্যারের গ্রামের বাড়ি ফিরোজপুর থেকে নিয়ে আসছিল।তারপর থেকেই এখানে।বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আর গ্রামে যাইনি।
-ঠিক আছে,আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ।আর কিছুই জানার নেই।
সাবিহাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাসনাত করিম বললেন,আনিস,আমরা কিছু ধরেও যেন ধরছি না।কোথাও তো একটা সূত্র অবশ্যই আছে।তিনজনই একই কলেজে পড়ে।কিন্তু সাবিহার সঙ্গে মিলছে না।ব্যাপারটা কেমন যেন!
এসআই আনিসুর রহমান বললেন,এখন কি করা যায়?সবার বাড়িতেই তো জিজ্ঞাসাবাদ করে ফেললাম।এর মাঝে খুন হয়ে গেল আনিকা।আবার কে শিকার হতে চলেছে কে জানে?আসলেই অশরীরি কিনা এখন আমারও সন্দেহ হচ্ছে।
বিছানায় শুয়ে আছে ইরা।ভাবছে,তার বান্ধবী মুনিরাকে ফোন করবে কিনা?সন্ধ্যা থেকে পড়তে পড়তে এখন একঘেয়েমি লাগছে ইরার।বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো সে।মুনিরা লন্ডনে থাকে।প্রায় দু'বছর ধরে সেখানেই পড়াশোনা করছে।ফোনে মাঝেমাঝে দুজনের কথা হয়।মুনিরা তার লন্ডনের গল্প বলে।এই নিয়ে কেটে যায় তাদের দিন।ওপাশ থেকে মুনিরার কন্ঠ শুনতে পেয়ে ইরার মুখে হাসি ফুটেছে।বলল,কেমন আছিস?অনেকদিন পর তোর সাথে কথা হচ্ছে।
-হবেই তো।তুই ব্যস্ত থাকলে কথা হবে কিভাবে?সারাদিন শুধু পড়া আর পড়া।
-একদম আমার দোষ দিবি না।আমি ফোন করলে তুই থাকিস কলেজে।তুই বাসায় থাকলে আমি তখন ঘুমে।দোষটা কার শুনি?
-হুম,হয়েছে।দোষ আমাদের দুই দেশের সময়ের,মুনিরার হাসির শব্দ শোনা গেল।
-এই মুনিরা,দাঁড়া তো।ইরা দেখতে পেল,একটি ছেলে নিচে দাঁড়িয়ে আছে।ছেলেটির মুখের একপাশ কেমন যেন।হঠাৎ মনে হলো,সকালে কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার মতো দেখতে অনেকটা।অন্ধকারে ছেলেটিকে দেখে বেশ ভয় লাগছে।ইরা বলল,দারোয়ান চাচা,আপনি কোথায়?এখানে এসে দেখেন তো নিচে কে দাঁড়িয়ে আছে?
একটু পর একজন দৌঁড়ে এসে বলল,কি হয়েছে,আপামনি?
-দেখেন তো নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কিনা?
লোকটি হাতে থাকা টর্চ নিয়ে আশপাশে কিছুক্ষণ হেঁটে এসে বলল,কেউ নাই তো।
ইরা বলল,ঠিক আছে আপনি যান।এই মুনিরা শুনছিস?
ফোনের ও'পাশ থেকে মুনিরা বলল,হ্যাঁ শুনছি।কি হয়েছে রে ইরা?
ইরা বলল,মনে হলো কেউ যেন নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
-আচ্ছা বাদ দে।আজ কি হয়েছিল জানিস তো,আমাদের কলেজ থেকে বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।কেউ কিন্তু প্রথমে দাঁড়ায়নি।তারপর আমি যখন দাঁড়ালাম তখনই এক এক করে সবাই নাম দিতে শুরু করল।শেষে দেখা গেল,বেশি নাম জমা হয়ে যাওয়াতে অনেকেই বাদ পড়ে গেল।কি মজার ব্যাপার তাই না?ইরা শুনছিস?হ্যালো?হ্যালো?হঠাৎ ওপাশ থেকে গোঙানির আওয়াজ শুনতে পেল মুনিরা।কারো যেন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।ফোনের লাইন কেটে গেল তারপর।তবে কি আবার কেউ আত্মহত্যা করেছে নাকি খুন হয়েছে?
..........চলবে...........
written by Habib Khan Hridoy

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন