পর্ব:০৩
হাসনাত করিম সকালের আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়লেন বাসা থেকে।আনিকাদের বিল্ডিং-এর সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তখন মানুষের ভীড় জমে গেছে।গেইটের সামনে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে।কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।দারোয়ান এক কোণায় বসে আছে।দারোয়ানের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে,সকাল থেকে কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়ে গেছে তাকে।মুখটা চুপসে বেলুনের মতো হয়েছে।হাসনাত করিম মানুষের ভীড় ঠেলে গেইটের সামনে পৌঁছাতেই দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ তাকে বাঁধা দিল।বলল,কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।বের হতেও দেয়া হচ্ছে না।লাশ বের হলে তবেই ঢুকতে পারবেন।
-মিঃ জামিল আমার পূর্ব পরিচিত।একটু পরেই আমার শ্যালক এসআই আনিস আসবে,বললেন হাসনাত করিম।
একজন পুলিশ বলল,আনিস স্যার আপনার শ্যালক।উনি একটু আগেই চলে এসেছেন।আচ্ছা,ভেতরে আসুন।
হাসনাত করিমকে গেইট খুলে ভেতরে ঢুকতে দিল পুলিশ।তিনি আর দাঁড়িয়ে না থেকে সিড়ি পেরিয়ে উপরে উঠতে শুরু করলেন।বাড়ির থমথমে পরিবেশ দেখে মনে পড়লো,ঠিক দুইদিন আগেও এই অবস্থা তার বাড়িতেও হয়েছিল।একদিকে কান্নার শব্দ,অন্যদিকে পুলিশের তদন্ত।হাসনাত করিম আনিকাদের দরজার সামনে আসতেই দেখতে পেলেন,এসআই আনিস দাঁড়িয়ে আছে।তিনি হাত দিয়ে ইশারা দিলেন এসআই আনিসুর রহমানকে।সম্ভবত দেখতে পেয়েছে সে।
-দুলাভাই,ভেতরে চলে আসো,বলল এসআই আনিসুর রহমান।
হাসনাত করিমকে জায়গা করে দিলেন সকলে।এগিয়ে গিয়ে বললেন,তুই কখন আসলি?এত তাড়াতাড়ি আসবি ভাবিনি।
-থানায় ঝামেলা ছিল না।তোমার ফোন পেয়েই ছুটে আসলাম।কিন্তু এসে তো দেখি,তুলির বান্ধবীও একই অবস্থা।
হাসনাত করিম জিজ্ঞেস করলেন,তদন্ত করছে কে?অফিসার তোকে চিনবে তো?
-অফিসার আমার পরিচিত নয়।তবে সাহায্য বললে পাওয়া যাবে।তুমি আমার সঙ্গে চলো।আনিকার রুমটাও ভালো করে দেখা দরকার আমাদের।
দুজনে তুলির বান্ধবী আনিকার রুমে ঢুকলেন।দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল আনিকার বাবা।হাসনাত করিমকে দেখতে পেয়ে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না তিনি।হাসনাত করিম বললেন,কিভাবে হলো ভাই?
-মাঝরাতে উঠে আনিকার রুমে একবার উঁকি না দিলে আমার সহজে ঘুম আসে না।মেয়েটার শরীরে কাঁথা দিয়ে তবেই আমি ঘুমাতে যেতাম।আর গতকালই তো আপনি এসে দেখে গেলেন,কি অবস্থা ছিল মেয়েটার?সে জন্যই আরও বেশি খেয়াল রাখা শুরু করলাম।রাত বারোটায় একবার গিয়ে দেখি,শুয়ে আছে।আমি আর কিছু না বলে চলে আসি।রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর এবার যেতেই আমার আনিকা আর নেই।চলে গেল না ফেরার দেশে।
-নিজেকে শান্ত করেন,ভাই।এখনই ভেঙে পড়লে কিভাবে হবে?হাসনাত করিম তদন্তে থাকা পুলিশ অফিসারের কাছে গিয়ে বললেন,আমি সিনিয়র ব্যাংক অফিসার।এসআই আনিস আমার শ্যালক।আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি এই বিষয়ে?
পুলিশ অফিসার বললেন,জ্বি অবশ্যই।বলুন,আপনাকে কিভাবে সাহায্যে করতে পারি?
-আনিকা আমার মেয়ের বান্ধবী।ঠিক দুইদিন আগেও আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।কিন্তু আমি ধারনা করছি,আমার মেয়েকে খুন করা হয়েছে।অথচ শক্ত কোনো প্রমান হাতে নেই।আচ্ছা আনিকার ব্যাপারে আপনার কি মনে হচ্ছে,অফিসার?
-প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে।মেয়েটির পাশে এক পাতা ঘুমের ঔষধ পাওয়া গেছে।সেখান থেকে পাঁচটি ঔষধ খেয়েছে সে।বাকি সাতটি প্যাকেটেই রয়েছে।আর সন্দেহজনক তেমন কিছু পাইনি,বললেন পুলিশ অফিসার।
-আচ্ছা একটা প্রশ্ন থাকছে না যে,কোনো ঝামেলা নেই।কিন্তু হঠাৎ আত্মহত্যা!ব্যাপারটা অদ্ভুদ নয়?অবশ্য আনিকা আমার মেয়ের মৃত্যুর পর থেকেই কেমন যেন হয়ে যায়।আর কাল রাতেই তো সব শেষ হয়ে গেল।
পুলিশ অফিসার বললেন,এখন প্রমান ছাড়া তো খুন বলে চালিয়ে দেয়া যায় না।পোস্টমর্টেম রিপোর্টে সন্দেহজনক কিছু পেলে তখনই বলা যাবে,আত্মহত্যা করেছে কিনা?
-আচ্ছা আমি একটু বারান্দায় যেতে পারি,জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।
-হ্যাঁ,অবশ্যই।সেদিকটা দেখা হয়ে গেছে আমাদের।প্রয়োজন হলে যেতে পারেন।
হাসনাত করিম পকেট থেকে একটা লেজার রশ্মি বের করলেন।গতকাল রাতেই কিনেছেন।এসআই আনিসুর রহমানকে ইশারায় পেছন পেছন আসতে বললেন।বারান্দার দরজা কিছুটা খুলে রাখা হয়েছে।হাসনাত করিম প্রথমে রুমের জানালাতে লেজারের রশ্মি ফেললেন।এসআই আনিস হাত দিয়ে অনেকবার জানালা ধাক্কা দিল।কিন্তু এক ইঞ্চি নড়ে উঠল না।হাসনাত করিমের মুখে হতাশার ছাপ।এবার বারান্দায় পা ফেললেন।নিচ থেকে মানুষের আওয়াজে কানে তালা পড়ার উপক্রম।দুজনে বারান্দার প্রতিটা জায়গা ভালো করে দেখলে লাগলেন।পিঁপড়ার দু'একটা ছিদ্র ছাড়া তেমন কিছুই চোখে পড়ল না।হাসনাত করিম আর সময় নষ্ট না করে বারান্দা থেকে বেরিয়ে আসলেন।পুলিশ অফিসারকে বললেন,তেমন কিছু পাইনি।আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।আসি তাহলে।
হাসনাত করিম চলে যেতেই পুলিশ অফিসার আস্তে বলল,আজকাল ব্যাংক অফিসারও গোয়েন্দায় নাম লিখিয়েছে।কিছুদিন পর তো আমাদের অবসরে বসে থাকা ছাড়া গতি নেই দেখছি।
আনিকাদের বাসা ছেড়ে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় আসতেই হাসনাত করিম বললেন,আনিস,আমরা কি অযথা সময় নষ্ট করছি?মানে সত্যিই দুজনে আত্মহত্যা করেছে?
-আমিও বুঝতে পারছি না,দুলাভাই।তুলির রুমে জানালা ফাঁকা ছাড়া সন্দেহজনক কিছু নেই।কিন্তু আনিকার রুমে-বারান্দায় কিছুই তো চোখে পড়ল না,বলল এসআই আনিসুর রহমান।
-কিন্তু আমার প্রশ্ন এক জায়গায়,আত্মহত্যা করার কোনো না কোনো কারন অবশ্যই থাকে।কেউ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করে।অবশ্য,ছোটবেলায় আমিও এমন পাগলামি করেছিলাম।কিন্তু এখন মনে পড়লে হাসি আসে।তুই আবার গিয়ে আমার বাসায় আগুনে ঘি ঢালিস না,আনিস।
-কি যে বলেন,দুলাভাই।আমি আবার এসব বলতে যাবো কেন?তাছাড়া সবার এমন বয়সে একটু-আধটু পাগলামি থাকেই।
-যাই হোক।বলছিলাম,কেউ আবার জীবনে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করে।কিন্তু এই দুটোর একটিও তুলি কিংবা আনিকার নেই।তাহলে হঠাৎ আত্মহত্যা কেন?এই প্রশ্নটার উত্তর তো পাচ্ছি না।
-দুলাভাই,একবার কলেজে যাবেন নাকি?ধরুন,আন্দাজে যদি কিছু পেয়ে যাই।
-কাল তো একবার গিয়ে কথা বললাম।আবার যাবো বলছিস?
-হুম চলেন।আমার হাতেও আজ কাজ নেই।দুজনে কথা বলতে পারবো।
-ঠিক আছে,চল তাহলে।
চার.
সিটি কলেজে পৌঁছাতেই গেইট দিয়ে ঢুকতেই দাঁড়িয়ে গেল এসআই আনিসুর রহমান।কিছুর দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন।
-কি ব্যাপার,আনিস,দাঁড়িয়ে রইলি যে?ভেতরে যাবি না তুই?
-দুলাইভাই,এই ছেলেটা আমার পরিচিত মনে হচ্ছে।ওইযে,একা বসে আছে যে।চলো তো একটু আমার সাথে।একটু দূরে একটি ছেলে বসে আছে।ছেলেটির হাতে বই।আশপাশে এইদিকটায় তেমন মানুষও নেই।বেশ শুনশান।এমন সময়ে আনিসুর রহমান এগিয়ে গিয়ে বললেন,তোমাকে আমি কোথায় যেন দেখেছি তাই না?পরিচিত মনে হচ্ছে।
-আপনার সাথে আমার মেডিকেলের মর্গে দেখা হয়েছিল ডাঃ রফিক স্যারের সাথে।আমার নাম ফারহান।
-ও হ্যাঁ,মনে পড়েছে।দুলাইভাই,এই হচ্ছে ফারহান।তুলির রিপোর্টের সময় সে সঙ্গে ছিল।আমার বন্ধু ডাঃ রফিকই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।তা তুমি কি এই কলেজে পড়ো নাকি?
-হ্যাঁ,ওইদিন তো আপনাকে বলেছিল,আমি সিটি কলেজে সাইন্সে পড়ছি।
-আসলে তখন এতকিছু খেয়াল করিনি।যাক ভালোই হয়েছে।আচ্ছা ফারহান,তুমি আমাদের কিছু তথ্য দিতে পারবে?
-জ্বি বলুন না,কি জানতে চান,বলল ফারহান।
হাসনাত করিম হঠাৎ এসআই আনিসুর রহমানকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন,এই ছেলেটার সাথে এসব নিয়ে কথা বলা কি ঠিক হবে?
-দুলাভাই,ছেলেটাকে ভালো মনে হচ্ছে।তাছাড়া ছোটছোট তথ্যও এখন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
-ঠিক আছে,যা ভালো মনে করো।
-আচ্ছা ফারহান,এই কলেজে তোমাদের কাছে কখনও অদ্ভুদ কোনো ঘটনা চোখে পড়েছে?মানে দেখতে সাধারন মনে হলেও কিছু ব্যাপারে ধোঁয়াশা রয়েছো এমন কিছু?জিজ্ঞেস করল এসআই আনিসুর রহমান।
-ফারহান বলল,না তো তেমন কিছু তো মনে পড়ছে না।সবই তো স্বাভাবিক চলছে।
হাসনাত করিম হতাশা ব্যক্ত করে বললেন,ঠিক আছে।আনিস,আর সময় নষ্ট না করে উপরে চল।অধ্যক্ষ স্যারের সাথে কথা বলে আসি।
দুজনে কিছুদূর পা বাড়াতেই হঠাৎ ফারহান দৌঁড়ে এসে বলল,মনে পড়েছে,স্যার।
হাসনাত করিম বললেন,কি আবার মনে পড়েছে?আমরা তো জানতে চেয়েছি,কিছু দেখেছো কিনা?
ফারহান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,স্যার,দুইমাস আগে একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল।কিন্তু কোনো অজানা কারনে ঘটনা বেশিদূর যায়নি।আমাদের ক্লাসের সবাইকে বলা হয়েছিল,যেন এটা নিয়ে তেমন আলোচনা না করতে।আমরাও তেমন আর সাড়াশব্দ করিনি।এটাই বলার ছিল।জানি না,আপনাদের কাজে লাগবে কিনা।
এসআই আনিসুর রহমান ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে বললেন,কাজে লাগতে পারে।এখন আমি আসি।
অধ্যক্ষ আজিজুল হক চেয়ারে বসে কি যেন লিখছিলেন।পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল পিয়ন রহমত।হঠাৎ পুলিশ রুমে ঢুকতে দেখে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।বললেন,আপনারা এখানে?আবার কি হয়েছে?
আনিসুর রহমান বলল,কিছু হওয়ার কথা ছিল নাকি,স্যার?
অধ্যক্ষ আজিজুল হক কিছুটা থতমত খেয়ে বললেন,মানে?আপনি আমাকে জেরা করছেন নাকি?
-স্যার,বসুন।পুলিশের সব কাজে এত তাড়াতাড়ি হলে চলে না।এইযে বললেন,জেরা করছি কিনা?পুলিশ নিজের চোখ দুটো ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করে না।সন্দেহের তালিকায় যে কেউ পড়তে পারে।
অধ্যক্ষ আজিজুল হক বললেন,কি ব্যাপারে আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন?আমার অপরাধ কি?
-দুই মাস আগে আপনার কলেজে একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।গোপন সংবাদে জানতে পেরেছি,আপনি ঘটনা ধামাচাপা দিতে বেশ তোড়জোড় করেছিলেন।এমনকি ছাত্রদের শাসিয়ে বলেছিলেন,যে এসব নিয়ে কথা বলবে তাকে কলেজ থেকে বের করে দিবেন।কারনটা কি জানতে পারি?আর গত দুই দিনের ব্যবধানে আরও দুটি মেয়ের আত্মহত্যা।আপনার কলেজ কি এসবের আঁতুড় ঘর নাকি?আমার তো মনে হচ্ছে,আপনি কোনোভাবে জড়িত রয়েছেন।কথাটা কি সত্যিই?
অধ্যক্ষ আজিজুল হক যেন কান্না করে দিবেন এমন অবস্থা।বললেন,প্রথম মেয়েটার পরিবারই তো বলেছিল,কথাটা যেন না ছড়ায়।এমনকি আপনাদের পুলিশ থেকেও তাই বলা হয়েছিল।মেয়েটির পরিবার অনেক বড়লোক।সম্মানের ভয়ে আমাকে অনেক আকুতি-মিনতি করলে আমি কি করতে পারি?আর তুলি আর আনিকা কেন আত্মহত্যা করেছে,বিশ্বাস করুন আমি কিছুই জানি না।আমি নিরীহ মানুষ।
এসআই আনিসুর রহমান মুচকি হেসে বলল,স্যার,কি সত্যিই ভয় পেয়েছেন?আপনার সাথে একটু মজা করেছি।গোপন সংবাদের কথাটা মিথ্যা বলেছি।আপনার চোখ বলছে,আপনি সত্যি বলছেন।আজ তাহলে আসি।দরকার পড়লে আবার আসতে পারি।এত সহজে ভয় পেলে কিন্তু ফেঁসে যাবেন।
এসআই আনিসুর রহমান চলে যেতেই আজিজুল হক বললেন,কি সাংঘাতিক পুলিশ অফিসার।একটু হলেই হাই চাপে মারা পড়তাম।উফফ,এভাবে কেউ মজা করে!এই রহমত,মাথায় পানি ঢাল।আমার পুরো শরীর ভয়ে কাঁপছে।
সিড়ি দিয়ে নামার সময়ে এসআই আনিসুল হক বলল,দুলাইভাই,মেয়েটির বাসা বাড্ডায়।বাড্ডা থানা থেকে পুলিশ গিয়েছিল বাসায়।তবে ওই অফিসার আজ ছুটিতে।কাল সকাল ছাড়া আসবে না।কিছু বলতে পারলে ওই অফিসারই পারবে।আজ আর বাড্ডায় গিয়ে লাভ নেই।
-কোন মেয়ের কথা বলছিস,তুই?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।
-দুই মাস আগে যে আত্মহত্যা করেছিল।
-এরই মাঝে এত খবর কিভাবে জানলি?আমি তো তোর সাথেই ছিলাম।
এসআই আনিসুর রহমান হাতের মোবাইল দেখিয়ে বলল,এই গোয়েন্দা রয়েছে কি জন্য?
-তবে তুই কিন্তু অধ্যক্ষ সাহেবকে পুরো ভয়ে জমিয়ে দিয়ে আসলি।ব্যাচারার মুখটা দেখার মতো ছিল।মনে হচ্ছিল,এই বুঝি কেঁদে ফেলবেন।এমনটা না করলেও হতো।
-দুলাভাই,এসব হলো কথা বের করার কৌশল।মাঝে মাঝে কিছু মিথ্যা বলতে হয়।অনেক সময় ধমকে কেঁচো বের হতে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসে।এসব তুমি বুঝবে না।
-আমার বুঝে কাজ নেই।আর কাল ছাড়া তো কোনো উপায়ও দেখছি না।দেখি এই রহস্যের নতুন কোনো মোড় নেয় কিনা?
পাঁচ.
হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে হাঁটছে ফারহান।শরীরের তুলনায় ব্যাগের ওজন বেশি হয়ে গেছে।হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে ফারহানের।একটু থেমে আশপাশে তাকিয়ে রিকশা খুঁজতে লাগলো।কিন্তু এদিকটায় রিকশা খুব কমই আসে।অনেকটা বস্তি এলাকার মতো।ময়লা রাস্তা পেরিয়ে কিছুদূর হাঁটলে কিছুটা ফাঁকা জায়গা।তার পাশেই টিনশেড পাঁকা বাড়ি।ফাঁকা জায়গা পেরিয়ে গেইটে আওয়াজ দিয়ে বলল,মিলি,দরজা খোল।আমি এসে গেছি।
একটু পরে লাঠিতে ভর করে একটি বারো-তের বছরের মেয়ে বেরিয়ে আসল।লাল রঙের ফ্রক পড়া।চুল বেণি করা মেয়েটির।গেইট খুলে হেসে বলল,ভাইয়া,এত দেরি হলো যে?আমি কখন থেকে বসে আছি।তোমার ব্যাগে এতকিছু কি?
এই সপ্তাহের বাজারটা করে ফেললাম।সঙ্গে অনেক কিছু কিনেছি।তোর রান্না শেষ হয়েছে,মিলি?
-হ্যাঁ,একটু আগেই হয়েছে,বলল মিলি।
-আচ্ছা গেইট বন্ধ করে আয়।আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসছি।একসঙ্গে ভাত খাবো।
দুজনে খাবার নিয়ে একসঙ্গে খেতে বসলো।ফারহান নিজ হাতে মিলিকে খাইয়ে দিচ্ছে।খেতে খেতে মিলি বলল,আজ বিকালে রাকিব এসেছিল।তোমাকে না পেয়ে চলে গেছে।জানো ভাইয়া,রাকিব আমাকে কি বলেছে?
ফারহান বলল,কি বলেছে?নিশ্চয়ই তোর সঙ্গে মজার কিছু বলেছে?
মিলি বলল,রাকিব বলেছে,রাকিব নাকি গভীর রাতে একটা মিশনে বের হয়।মিশন শেষ হলে আমাকে বলবে বলেছে।কি মিশন হতে পারে,ভাইয়া?
-আরে বাদ দে তো পাগলটার কথা।নিজে কি বলে নিজেই জানে না।আচ্ছা রাকিবের মুখের কি অবস্থা?মুখের পোঁড়া অংশ শুকিয়েছে?কালকে ঔষধ কিনে দিয়েছিলাম ছেলেটাকে।
-মনে হয়,কিছুটা শুকিয়েছে।আমাকে ওর মুখটা সামনে নিয়ে এসে ভয় দেখায়।লাঠি দেখালে পালিয়ে যায়।
-কখনো মারবি না বলে দিলাম।খুব ভালো ছেলে।একটু মজা করে তোর সাথে।এখন খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি।আমাকে একটু পড়তে বসতে হবে।
মিলি বলল,আজকে গল্প শুনাবে না,ভাইয়া?
-না রে,আজকে অনেক পড়া।সামনে পরীক্ষা আমার।
মিলি মুখ কালো করে বসে রইল।
ফারহান হেসে বলল,আচ্ছা শুনাবো।কিন্তু একটার বেশি নয় বলে দিলাম।
মিলি খুশিতে হাত তালি দিয়ে ভাত খেতে লাগল।
ভোর রাতে ঘুম ভেঙে গেল হাসনাত করিমের।পাশ ফিরে দেখলেন,ফিরোজা ঘুমাচ্ছে।আজ চারদিন পর ফিরোজার ঘুম হচ্ছে।এই কদিনে চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে।বিছানা ছেড়ে উঠে ওযূ করে নামাজে দাঁড়ালেন।দু'হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার কাছে বললেন,"হে আমার রব,তুমি আমাকে শক্তি দাও।আমি যেন আমার মেয়ের সত্য উদঘাটনে সফল হতে পারি।"
নামাজ শেষ করে তুলির রুমে ঢুকলেন।চেয়ারে বসে বইপত্র দেখছেন কি মনে করে।বইয়ে আঁকা তুলির ছবিগুলো দেখে আনমনে হেসে উঠলেন,পাগলিটা পারেও বটে।হঠাৎ পায়ের সাথে লেগে টেবিলের নিচে ময়লার ঝুড়ি পড়ে গেল।ঝুড়িতে কয়েকটা কাগজ,পেন্সিলের ময়লা ছাড়া তেমন কিছু নেই।তিনি সেগুলো হাত দিয়ে কুড়িয়ে ঝুড়িতে উঠালেন।চোখ পড়ল একটি কাগজের উপর।কাগজটা খুলতেই দেখতে পেলেন,১৯ তারিখের কিছু লেখা রয়েছে।ক্লাসের পড়া হবে হয়তো।অপর পৃষ্টা উল্টাতেই দেখলেন,কলম দিয়ে কিছু আঁকার চেষ্টা করেছিল।কিন্তু শেষে সেখানে ইচ্ছেমতো কলমের কালি দিয়ে ক্রস দেয়া হয়েছে।যেন এই অবয়বের উপর তুলির খুব রাগ।তুলি আত্মহত্যা করেছে ১৯ তারিখ রাতে।তবে কি এই সেই ব্যক্তির অবয়ব?যার জন্য এত রহস্য?
ফোন বেজে উঠল হাসনাত করিমের।চমকে উঠলেন তিনি।পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করতেই শুনতে পেলেন আনিসের উত্তেজিত কন্ঠ,দুলাভাই,তাড়াতাড়ি বাড্ডা থানায় চলে আসেন।এইবারের ব্যাপার আরও সাংঘাতিক।এটা কোনো সাধারন মানুষের কাজ নয়!
..........চলবে..........
written by Habib khan Hridoy

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন