বিয়ের পরে কি মনে করে জানি, একদিন রওশন আরা স্বামীর অফিসের একটা কাগজ খুলে পড়তে বসলো । খুব সম্ভবত, কাগজটি দরকারি ছিলো । অসাবধানতায় পড়েছিলো খাটের নীচে কিংবা টেবিলের পায়ার কাছের মেঝেতে । আরও সম্ভবত কাগজটিতে রওশন আরার নিজের নাম দেখতে পেয়েছিলো ।
সামরিক বাহিনীর কাগজ । পেনশন, নমিনি এইসব জিনিসপত্র লেখা । প্রথমেই লেখা সার্জেন্ট জসীম উদ্দিন আনসারী । সনাক্তকরণ চিহ্ন-- ডান হাটুর উপর কাটা দাগ আছে ।
সেদিন রওশন আরা স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, এত কিছু থাকতে তোমার সনাক্তকরণ চিহ্ন এই হাটুর কাটা দাগ কেন দিলো বলতো? জসীম হাসে । হেসে বলে এইটা আমার জন্মদাগ । রওশনের তবুও জিনিসটা পছন্দ হয় না । তাই বলে সবাই জানবে তোমার হাটুর উপরে কোথায় কি দাগ আছে? ধুর!
জসীম আবার হাসে । বিয়ের পর থেকেই খেয়াল করেছে, রওশন খুব সেন্সেটিভ । সামান্য একটা বিষয় নিয়ে অনেক ভাবে । ভাবতে ভাবতে এত গভীরে চলে যায় যে, সেখান থেকে তাকে বের করে আনতে বিরাট বেগ পেতে হয় । আপাতত এই হাটুর উপর কাটা দাগ নিয়ে বেশ কিছুদিন পাগলামি চলবে । সুতরাং আনসারী হাসে । হাসতে হাসতে রওশনের এই পাগল পাগল যন্ত্রণা সামাল দেবার জন্য প্রস্তুত হয় ।
বড় ছেলে আওলাদ হবার সময় রওশন কিছুতেই সিজার করবে না ।পরে নাকি আবার তার সনাক্তকরণ চিহ্ন হবে পেটে সিজারের দাগ--এইরকম দূরবর্তী সচেতন দুশ্চিন্তার কারণে জসীমকে বারবার সামালে নেওয়া হাসি হাসতে হয় ।
...
বাইরে বৃষ্টি থেমে এসেছে । ব্যাংকে বিরাট পেনশনের লাইন । চিল্লাচিল্লি । গরমে দম বন্ধ হয়ে আসছে । রওশন আরা এই প্রথম পেনশনের জন্য ব্যাংকে এসেছে । কিভাবে কী করতে হবে খুব একটা ধারণা নাই । এর আগেও কয়েকবার নানা ঝামেলায় টাকাটা তুলতে পারে নাই সে । হিসাব ঠিক আছে কী না, টাকা জমা আছে কী না, সই স্বাক্ষর কোথায় কীভাবে করবে, করলেও মিলবে কী না-- নানা দুশ্চিন্তায় রওশনের বুকটা দুরু দুরু কাঁপতে থাকে । একটু পরপর লাইনের অন্য মানুষদের জিজ্ঞাসা করে করে সে সবাইকে বিরক্ত করে ফেলেছে ।
রওশন আরা! ব্যাংক কাউন্টার থেকে ডাক আসতেই রওশনের বুকটা কেঁপে ওঠে ।
রওশন আরার হাতে পেনশনের বই । লেখা জসীম উদ্দিন আনসারী । সনাক্তকরণ চিহ্ন-- ডান হাটুর উপর কাটা দাগ । হঠাতই সনাক্তকরণ লেখা কাগজটায় হাত দিয়ে রওশন কেঁদে ফেলে। ওর মনে হতে থাকে যেন মৃত জসীমকেই স্পর্শ করছে সে।
জসীম উপর থেকে সব দেখে। দেখে দেখে হাসে। মনে মনে সামলে নেয়--তারাদের আবার রাত দিন!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন