ব্লাসফেমি উপন্যাস রিভিউ - গল্পশেয়ার

ব্লাসফেমি উপন্যাস রিভিউ - গল্পশেয়ার

ব্লাসফেমি উপন্যাসটি পাকিস্তানের নারীবাদী লেখিকা তেহমিনা দুররানির রচনা। তিনি দাবি করেছেন বইটি একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত। 


বইটি একটি মর্মান্তিক এবং চরম আশ্চর্যজনক কাহিনী তুলে এনেছে। ক্ষমতা অর্জনের জন্য ধর্মকে কীভাবে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং ধর্মের নামে কীভাবে প্রতারণা করা হয়, সেটা হির-এর জীবনকাহিনীর সাথে সুন্দরভাবে উঠে এসেছে।

বইটি দক্ষিণ পাকিস্তানের পটভূমিতে লেখা। লেখায় উঠে এসেছে পিতৃতন্ত্র ও পুরুষ আধিপত্যের চরম রুপ, নারী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের  দূরাবস্থা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের চূড়ান্ত আধিপত্য। 

ভণ্ডামির মাধ্যমে তথাকথিত ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা ইসলাম ধর্মের বিকৃতিগুলোও সহজভাবে সামনে এসেছে। হির-এর বিবরণে উঠে আসা এসব ভণ্ডামিগুলো পড়লে আতঙ্কে আঁতকে উঠতে হয়। ভণ্ডামির জন্য ধর্মের চাইতে নিরাপদ ছদ্মবেশ যে আর কিছুতেই নেই, সেটাও ভয়ানকভাবে বোধগম্য হয়।


গল্পের নায়িকা হির তার বয়সের অন্যান্য কিশোরীদের মতোই স্বপ্নালু চোখে পৃথিবীকে দেখত। যদিও তার বাবার মৃত্যুর পরে সে তার বিধবা মায়ের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। 


পনের বছর বয়সে তার মা তাকে পীর সায়নের কাছে নিয়ে যান, দোয়া নেয়ার জন্য। পীর সায়নকে সবাই "আল্লাহওয়ালা মানুষ" বলে জানত।


পীর সায়ন সেখানে হিরকে দেখে পছন্দ করে ফেলেন এবং পরবর্তীতে নিকাহ করে নেন। হির চলে যায় পীর সায়নের অন্তঃপুরে।


এই অন্তঃপুরে প্রবেশ করেই হির বুঝতে পারে যে ব্যক্তি আল্লাহওয়ালা মানুষ হওয়ার ভান করছে সে প্রকৃতপক্ষে একটা মুখোশধারী শয়তান। পীর সায়ন হিরকে প্রতিটি সম্ভাব্য উপায়ে নির্যাতন করেছিল। তার বিয়ে ছিল শারীরিক এবং মানসিক উভয়ভাবেই নির্যাতনমূলক। তাকে মারধর করা হয়, অপমান করা হয়, অপব্যবহার করা হয়, ধর্ষণ করা হয়; তারপরও তাকে পীর সায়নের অন্তঃপুরেই বন্দী হয়ে থাকতে হয়। তার স্বামীর তৈরি পৃথিবীতেই সে বাঁচতে থাকে।

হির এমন একটি পৃথিবীতে ছিল যেখানে কোনও ভুলত্রুটি করার অনুমতি নেই, সামান্যতম ভুলও ক্ষমা করা হয় না, কোনও যুক্তি প্রয়োগ করা হয় না এবং কোনও ব্যাখ্যাও দেওয়া হয় না - এমন একটি পৃথিবী যেখানে তাকে তার স্বামীর অনুমতি ব্যতীত চৌকাঠ পেরোতে দেওয়া হয় না। 


এমনকি তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় ছয় বছর বয়সের এক 'পুরুষ' এর সামনে আসার জন্য। তার মা এবং ভাইবোনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করাও তার জন্য দুর্দশা নিয়ে আসে, তার সাথে তার বেদনা ভাগ করে নেওয়ার বা হৃদয়ের কথা বলার মতোও কেউ নেই, নিজের মেয়েকেও রক্ষা করতে হয় লম্পট বাবার হাত থেকে!


পীর সায়ন আল্লাহ ও ইসলামের নামে দুর্বল ও অজ্ঞ লোকদের শোষণ করতেন। কেউ যদি এই  সিস্টেমের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সাহস করতো, তাহলে তাকে এমনভাবে চূর্ণ করা হত যেন ভবিষ্যতে আর কেউ পীরের পৈতৃক মাজারের কর্তৃত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সাহস না পায়। 


কালী, গুপ্পি, তোতি, তারা, ছোট সায়ন, সখি বাবা, ইয়াথিম্রি, চিল - সকলেই এই ব্যবস্থার শিকার হয়েছিল। কেবলমাত্র যারা পীরের ইচ্ছার কাছে বিনীতভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল তাদেরকেই বলা হত অনুগত মুসলমান। অজ্ঞতা ছিল এই  সিস্টেমের মূল ভিত্তি।  

পীর সায়নের সাথে এই যাত্রায় হির কীভাবে সমস্ত কিছু হারিয়েছিল তার একটা সুস্পষ্ট চিত্র দুররানি দিয়েছেন।


হীরের ভাষায়,


“আমার কাছে আমার স্বামী আমার ছেলের খুনি ছিলেন। তিনি আমার মেয়ের শ্লীলতাহানিকারকও ছিলেন। পবিত্র গ্রন্থের উপর পরজীবী একজন লুসিফার ছিলেন, তিনি আমার গলায় ধরতেন এবং প্রতি রাতে আমাকে পাপ করতে আদেশ করতেন। তিনি অনাথের ধর্ষণকারী ছিলেন। 


তবে সর্বোপরি, তিনি আল্লাহর নিকটতম ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন, যিনি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারেন এবং আমাদের বাঁচাতে পারেন।"


ধর্মের পর্দার নীচে তিনি নিজের কিশোরী কন্যা এবং একই বয়সের অন্যান্য মেয়েদের  শ্লীলতাহানি করতেন। বোরকার সুযোগ নিয়ে হিরকে নিজের বন্ধুদের কাছে "বেশ্যা" হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। অন্য পুরুষদের সাথে নিজের স্ত্রীকে বিছানায় পাঠিয়ে সেই দৃশ্য নিজে ক্যামেরাবন্দী করতেন।


তেহমিনা দুররানীর লেখা শক্তিশালী এবং রাখ-ঢাকহীন। কিছু কিছু অনুচ্ছেদ মেরুদণ্ডে আতঙ্কের শীতল স্রোত বইয়ে দেয়।

"ব্লাসফেমি" এই ইস্যুগুলোতে আলোকপাত করে - 


১. ধর্মকে কীভাবে শোষণ করতে ব্যবহার করা হয়।

২. জনগণকে পঙ্গু করতে শক্তিশালীরা কীভাবে অস্ত্র হিসাবে এটি ব্যবহার করে। 

৩. সাধারণ মানুষ যারা ধর্মকে পুরোপুরি বুঝতে পারে না, তাদেরকে হাতিয়ার বানিয়ে ধর্মব্যবসায়ীরা কীভাবে ক্ষমতাবান হয়ে উঠে।


ব্লাসফেমি আমার পড়া সবচাইতে কষ্টকর উপন্যাস। ধর্ম এবং ক্ষমতার অন্ধকার আর ভয়াবহ দিকটাই এখানে উঠে এসেছে। শেষদিকে আছে সুন্দর একটা মেসেজ...


বি.দ্র: দূর্বল হৃদয়ের মানুষদের জন্য এই বইটা না পড়াই ভালো।


বই: ব্লাসফেমি

লেখিকা: তেহমিনা দুররানি

Post a Comment

أحدث أقدم