একজন কমলালেবু - বই রিভিউ

একজন কমলালেবু - বই রিভিউ

"আদিবা হয়ত বুঝতে পেরেছিল, জীবনান্দের জীবন আমার আমার জানা নেই। তাই বইটি আমাকে দিয়েছিল সে। অথচ বইয়ের ভেতরের চিরকুটটি উড়ে গেল কোথায় যেন। আর খুঁজে পাইনি সেই চিরকুট। আর কখনও পাবোনা। আদিবার মনের কথা অজানাই থেকে যাক।"

পত্রিকায় ছাপানো জীবনের প্রথম কবিতায় জীবনানন্দ দাশের নাম লেখা হয়েছিল "জীবানন্দ দাশ"। জীবনানন্দের কবিতার ছাপার ব্যাপারটি একদমই হেলাফেলা ছিল হয়ত সম্পাদকের কাছে। জীবনানন্দ পত্রিকায় লেখা ছাপানোর জন্য কখনোই খুব বেশি আগ্রহ দেখান নি। যা'ও ছাপা হয়েছিল সেসব লেখা নিয়ে তখনকার অধিকাংশ কবি লেখক বিরূপ মন্তব্য করতেন। তখনকার ডাকশাইটে এবং সভা সমিতিতে মুখর কবিরা জীবনান্দের কবিতা নিয়ে বাজেভাবে সমালোচনা করতেন। জীবনানন্দের আত্মবিশ্বাস ছিল, তিনি জানতেন তিনি কী লিখছেনে। তাই তিনি এসবে ভ্রূক্ষেপ করতেন না। তবে মাঝে মাঝেই হতাশায় সময় কাটাতেন। তার সময়কার এক কবি 'সজনিকান্ত' তো তাকে নিয়মিত ধোলাই না করলে তার ভাত হজম হত না।


সারা জীবনে জীবনানন্দ একটি মাত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। "নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার"। যেখানে ছিল একটি ক্রেস্ট আর মাত্র ১০০ টাকা।


জীবনের অন্তিম মুহূর্তে এই পুরস্কার তার ভেতরে কোন ভাবান্তর আনতে পারেনি। অথচ তার লেখা তখনকার মানুষ মূল্যায়ন করেনি বলে তার ছিল অপরিমেয় অভিমান আর ক্ষোভ। ততদিনে তিনি চুড়ান্ত হতাশও হয়ে পড়েছিলেন।


জীবনান্দ কখনও কোন সাহিত্য সভায় যান নি। অথচ তার সময়কালে বুদ্ধদেব বসু, সুধিন্দ্রনাথ দত্তের বাসায় সাহিত্য নিয়ে মজমা হত। তিনি সঞ্জয় নামীয় এক কবিকে বলেছিলেন, "এসব সাহিত্য সভা-টভা করে আসলে কিছু হয়না"। তিনি ঠিকই বলেছিলেন। সাহিত্য মূলত একাগ্রভাবে চর্চার বিষয়। এসব সভা করে অনেকেরই কিছু দিনের জন্য হয়ত নামডাক হয়। কিন্তু এই নামডাকের মেয়াদ খুব স্বল্পকালের।

 

ইদানিং যারা নিয়মিত সাহিত্য নিয়ে সভা সমিতি করে বেড়ায়, পুরস্কার-ক্রেস্ট বানিয়ে বিতরণ করে এবং নিজেরাও গ্রহণ করে, তারা কে কয়টা বই পড়ে আমি জানিনা। তবে আমার মনে হয় এদেরকে বই পড়ার কথা জিজ্ঞেস করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে। অথচ এসময়ে এদের বাগারম্বতায় সাহিত্যাঙ্গনে মূখর! হুমায়ূন আজাদের বলে যাওয়া সেই নষ্টরা চারদিক দখল করে আছে এখন। আর নিভৃত নিরব চর্চাকারীরা লোক চক্ষুর আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে।


সাহিত্যের মানুষ বলতে যা বোঝাায় জীবনানন্দ তা'ই ছিলেন। ইংরেজীতে পড়াশুনা শেষ করেও তিনি কোন চাকরী দীর্ঘস্থায়ীভাবে করতে পারেন নি। প্রায় প্রতিটি চাকরী থেকেই তাকে বরখাস্ত করা হত। বলতে গেলে তার চিরটা কালই গিয়েছে বেকার। বরিশাল বিএম কলেজে মাত্র কয়েক বছর চাকরী করতে পেড়েছিলেন। মূলত কবিতার বাইরে তিনি কিছু করতে পারতেন না। অবশেষে দেশ ভাগের কারণে বিএম কলেজের চাকরী ছেড়ে তাকে কলকাতা পাড়ি জমাতে হয়। অথচ তার অন্তরাত্মা পড়ে থাকতো বরিশালের শান্ত দিঘির জলে, শ্যাওলা পথে, হিজলের বনে, পেঁচা, ফসলী ইঁদুর আর ধানের শীষে মিশে।


হয়ত এসব কারণেই স্ত্রীর কাছেও চিরকালের বিড়াল হয়ে থাকতে হয়েছ। স্ত্রী লাবন্য'র সাথে তার সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিলনা। ইডেন কলেজে পড়া ডাকাবুকা মেয়েটি জীবনান্দের মত এক নীরস, নীরব, মুখচোরা মানুষের সাথে হয়ত সেভাবে মিশতেও পারতেন না। "সাংসারিক অশান্তি এবং আর্থিক অনটন, সাহিত্য ক্ষেত্রে মানুষের অবহেলা" এসব মোক্ষম বিষয় জীবনান্দকে পিশে ফেলেছিল।


হতাশায়, আত্মশ্লাঘায়, নিজের মধ্যে ডুবে থাকা জীবনান্দ ১৯৫৪ সালে কলকাতার সেদিনের শেষ ট্রামের সাথে এ্যাক্সিডেন্ট হন। তিনি তার কিছুদিন পরেই পৃথিবীর পথে উড়ে যাওয়া বকেদের মত পৃথিবী ছাড়েন। কাজী নজরুলের সাথে একই বছরে (১৮৯৯) জন্ম নেয়া জীবনান্দ আর নজরুলের চিন্তার জগৎ ছিল একেবারেই বিপরীত। অথচ দুজনই নিজেদের জগতে মহাত্মা, মহান মানব চরিত্র। দুজনই জীবনের পরতে পরতে পোড় খেয়ে খেয়ে মৃত্যুপথের যাত্রী হয়েছিলেন। একজন মৃত্যুর প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে কলকাতা গিয়েছিলেন, অন্যজন কলকাতা থেকে বাংলাদেশে...


গল্পঃ একজন কমলালেবু

লেখকঃ শাহাদুজ্জামান

Post a Comment

أحدث أقدم