ভেতর থেকে আব্বার রুমের দরজার ছিটকিনি বন্ধ।আম্মা কাঁদছেন। হ্যাঁ, আমার আম্মা গুলজার খাতুন কাঁদছেন। খুব আস্তে আস্তে কাঁদছেন। মাঝে মাঝে ব্যথার তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে উহ্ বলে একটু জোরে
আওয়াজ করছেন। আব্বা ভীষণ খারাপ খারাপ গালি দিচ্ছেন আর কিছু একটা দিয়ে আম্মাকে মারছেন। আম্মা চুপ করে আছেন। তার কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। তারপরও আব্বা কিছুক্ষণ পর পর আম্মাকে মেরেই যাচ্ছেন।
আম্মা একবার ব্যথায় উহ বলছেন আর আমরা সব ভাই বোন কেঁপে উঠছি। আমার বুকের ঠিক মাঝখানে ভীষণ ব্যথা হচ্ছে। স্কুল মাঠে খেলতে গিয়ে হঠাৎ বুকের মধ্যে বল লাগলে খুব ব্যথা হয়। খুব ব্যথা। অথচ বুকে আজ কোন বল লাগেনি। তারপরও ব্যথা হচ্ছে। তীব্র ব্যথা।
হ্যাঁ, আমরা কেউ একটুও কাঁদছি না। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আছি। আসাদ ভাই, মিলি আপা, আমি, খসরু আর চার বছরের ফাতেমা। আমরা সব ভাইবোন ভয়ে চুপ করে আছি। কলেজে পড়া বড় ভাই আসাদ ভীতু মানুষ। ভয়ে, লজ্জায় তার চোখ দুটি টলমল করছে। ভাই লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের পানি মুছলেন। আমি দেখেছি, ভাই লুকিয়ে কাঁদছেন। তবে মিলি আপা ভীষণ রাগি। তার খুব রাগ। মিলি আপা দুই দুইবার দরজায় লাথি দিয়ে এসেছে। আপা জানে দরজায় লাথি দেওয়ার জন্য তার ভয়ানক শাস্তি হবে। তারপরও সে এই কাজটি করেছে। মিলি আপা রাগে কাঁপছেন। তার কাঁপাকাপি দেখে ফাতেমা ফিসফিস করে বলল, বুবু তোমার বুঝি শীত লাগছে?
খসরু আর আমি একজন আরেকজনের হাত চেপে ধরে আছি। আমাদেরও ভীষণ ভয় হচ্ছে। আমরা দুজনই অংকে ফেল করেছি। আব্বা রুম থেকে বের হয়ে আমাদের ডাকবেন। যদিও আমি অংকে ফেল করেছি বলে ভয় পাচ্ছি না। আমি ভয় পাচ্ছি আম্মার জন্য। আম্মা আজ অনেকবার ব্যথায় উহ্ উহ্ করে আওয়াজ করেছেন। আমি আর খসরু আম্মার এই আওয়াজ শুনেছি। আব্বাতো প্রায় আম্মার গায়ে এমন করে হাত তুলেন। কারণে অকারণে মারধর করেন। আম্মা কখনও আব্বাকে আমাদের সামনে তার গায়ে হাত তুলতে দেন না। তিনি কখনও চান না আমরা কেউ আম্মাকে মারার দৃশ্য দেখি বা তার কান্নার আওয়াজ শুনি। আম্মা ভয়ানক মার খেয়েও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেন। কেন জানিনা। আম্মাকে মারার সময় আমরা কেউ ঐ ঘরে যাওয়া বারণ। এটা আম্মার আদেশ। উনি মার খেয়ে যতটা কষ্ট পান তার চেয়ে বেশি কষ্ট পান যদি আমরা কেউ ঐ সময় আব্বাকে বাঁধা দিতে যাই। আম্মাকে মেরে আব্বা সাধারণত বাসায় তেমন একটা থাকেন না। তিনি বাসা থেকে বের হয়ে যান। তারপরও আমরা ভয়ে কেউ আব্বার রুমে যাই না। আম্মা একা একা অনেকক্ষণ ঐ রুমে বসে থাকেন। আমি জানি আম্মা তখন লুকিয়ে কাঁদেন। খুব কাঁদেন। কষ্টে, অপমানে আর অসহায়ে। এই কান্না আমরা কেউ দেখিনা। এই কান্না আম্মা আমাদের কাউকে দেখতে দিতে চান না।
হ্যাঁ, আম্মা ঐ রুম থেকে কিছুক্ষণ পর বের হয়ে আসেন। রুম থেকে বের হয়ে আম্মা খুব স্বাভাবিকভাবে রুটি বেলতে বসেন। একটু পর আব্বা আসবেন বাইরে থেকে। তিনি আটার রুটির সাথে বেগুনের তরকারী খেতে পছন্দ করেন। আম্মা মিলি আপাকে ডাকছেন রুটি সেকতে। মিলি আপা এখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। যদিও আম্মার কথা তার কানে যাচ্ছে বলে মনে হয় না। তারপরও আম্মা চিৎকার করে ডাকছেন। আম্মা খুব স্বাভাবিক। মনেই হচ্ছে না একটু আগে তার উপর কী ভীষণ ঝড় বয়ে গিয়েছে। তিনি সবকিছু নিজের মধ্যে চেপে রাখতে চান। সমুদ্র যেমন প্রলয়ংকারী বিশাল ঝড় নিজের বুকের ভেতর নিয়ে মাঝে মাঝে শান্ত করে তুলে। আমার আম্মাও তেমন। এত বিশাল কষ্ট কেমন করে জানি একা একা লুকিয়ে ফেলেন। ঘন্টা পেরুতেই আম্মা স্বাভাবিক হয়ে যান। আব্বার জন্য রুটি বেলা শেষ করে তিনি আমার আর খসরুর স্কুলের টিফিন বক্স রেডি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
আমি আম্মাকে বললাম, আমি আজ টিফিন খাব না মা।
আম্মা চোখ বড় করে আমার দিকে তাকালেন। আমার খুব কান্না পেল। ভীষণ কান্না। আমি আম্মার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি। আম্মা আমার কষ্ট বুঝতে পারে। বুঝতে পারে বলেই আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, খেয়ে-দেয়ে তোমাকে খুব দ্রুত বড় হতে হবে বাবু। তোমাদের বড় হওয়ার জন্যই যে আমার এত সংগ্রাম।
পরের কথাটি মনে হলো আম্মা নিজেকেই শোনালেন। এই কথাটি আম্মা প্রায় বলেন। আম্মার এই কথাটি শুনলে আমার খুব ইচ্ছে হয় এখনি বড় হয়ে যাই। বড় হয়ে আম্মাকে জড়িয়ে ধরে বলি, এই দেখ মা, আমি বড় হয়ে গিয়েছি।
আব্বার রুম থেকে আম্মা বের হলেই আসাদ ভাই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যান। দুপুরের আগে সে বাসায় আসবে না। আসাদ ভাই না আসা পর্যন্ত আম্মাও কিছু খাবেন না। বাসায় এসে আসাদ ভাই কিছু খেতে চায় না। আব্বাকে নিয়ে কিছু বলতে চাইলে আম্মা বাধা দেন। তিনি কখনো চায় না আমরা কেউ আব্বাকে অসম্মান করি। আসাদ ভাই এবার হাউমাউ করে কাঁদেন। আম্মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। ভীষণ কাঁদেন। আম্মা আর আসাদ ভাইয়ের কান্না দেখে আমাদের সবার খুব কান্না আসে। সবার কান্না দেখে ফাতেমা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আমি জানি, এই ছোট্ট ফাতেমারও কান্না আসে। কান্না আসে বলেই ফাতেমা রুম থেকে বের হয়ে কোথায় যেন গিয়ে বসে থাকে।
আমি জানি আম্মা আমাদের কষ্ট বুঝতে পারেন। আর বুঝতে পারেন বলেই এত সবকিছু লুকিয়ে রোজ রোজ খুব স্বাভাবিকভাবে সংসার করেন। হ্যাঁ, আমি জানি অনেক মা-ই এমন। অনেক মা, অনেক মা, অনেক মা-ই এমন। আমি জানি, জানি, জানি। আমার খুব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে অনেক মা-ই এমন করে কষ্ট লুকিয়ে রাখেন। জ্যামিতির নোট আনতে গিয়ে মিতুলের বাসায় গিয়ে দেখি সাত্তার আঙ্কেল মানে মিতুলের বাবা আন্টিকে ডাল ঘুটনি দিয়ে মারছেন। মিতুল কাঁদছে। আমাকে দেখে মিতুল দৌড়ে গিয়ে লুকালো। আমি জানি মিতুল লজ্জায়, কষ্টে লুকিয়ে কাঁদছে। আমি মন খারাপ করে নোট না নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসি। খুব মন খারাপ হয়েছিলো সেদিন। মিতুলও বুঝি আমাদের মত কষ্ট পায়। হয়তো আমাদের চেয়েও বেশি।
আরে না, শুধু মিতুলের বাবা না, শুধু আমার বাবা না। অনেকের বাবা বুঝি আমাদের মা-কে এভাবে মারেন?
হ্যাঁ, মারেন। আমি জানি, সত্যি বলছি, আমি জানি। আমাদের মায়েদের তখন একটুও এই সংসারে থাকতে ইচ্ছে করেনা। তাদের ইচ্ছে করে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে। দিনের পর দিন এভাবে মার খেয়ে কেউ বুঝি থাকতে পারে? তারপরও মায়েরা কেন যে এই সংসারে থাকেন বুঝিনা।
সময় যায়। দিন, মাস, বছর। বছরের পর বছর। আমাদের মায়েরা শুধু সময় গুনতে থাকেন। সময় গুনতে থাকেন। এবং সময় গুনতে থাকেন। এই সময় প্রিয় সন্তানগুলো বড় হওয়ার সময়, মানুষের মত মানুষ হওয়ার সময়।
এখন বুঝি। আমরা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি আর বুঝতে পারি কেন তারা সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে কোথাও পালিয়ে যাননি। রোজ রোজ ষ্টেশন ছেড়ে যাওয়া পাহাড়তলীর ট্রেনটা পেয়েও মা কেন যেতে পারেনি। কষ্ট, ক্রোধ, অসহায়ত্ব নিয়ে রোজ রোজ রুটি সেকতে সেকতে আমাদের মায়ের চোখের পানি শুকিয়ে যায়। তারপরও যে মা পালিয়ে যাননি।
হ্যাঁ, তারপরও আমার মা পালিয়ে যাননি। আমাদের মায়েরা কখন পালাতে পারেনা। কারণ…
কারণ….
আমাদের এই বড় হওয়া, এই মানুষ হওয়া বুঝি তাদের পালিয়ে না যাওয়ার ফল। আমাদের বড় হওয়া, আমাদের এই মানুষ হওয়ার কাছে তাদের সব দুঃখ কষ্ট ম্লান মনে করেন। আমাদের জন্যই হয়তো মায়েদের কষ্টগুলো নিভৃতে থেকে যায়।
বড় হয়ে একদিন আমরাও বাবা হই। নিশ্চয় এবং অবশ্যই তেমন বাবা না। যে বাবাকে দেখে লুকিয়ে ভয়ে, লজ্জায়, কষ্টে কাঁদে কোন সন্তান।
লিখাঃ রুহল আমিন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন