শিক্ষনীয় গল্পঃ বাবা মায়ের প্রতি ভালবাসা ( Golpo Share গল্প শেয়ার)


জারা ব্যাগ গোছাচ্ছে।বার বার উঁকি দিচ্ছে কেউ দেখে ফেলে না কি।ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে ইফতি ম্যাসেজ করছে।
"ঠিক আর আধ-ঘন্টা পর বাস স্টান্ডে থেকো"
ওরা দুজনে পালাচ্ছে আজকে।ইফতি -জারা দুজন দুজনকে ভীষণ ভালোবাসে।জারার মা-বাবা কেউ মেনে নেয় নি।অনেক বুঝিয়েছে ওরা দুজনে।কেউ বুঝতে চায় নি।উল্টা জারার বাবা-মা জারার বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে।জারা রেডি হয়ে নিলো।সবকিছু ঠিক আছে কি না চেক করে নিলো আবার।বাবা-মার জন্য লেখা চিঠিটা টেবিলে রেখে দিলো।
-কিরে খেয়ে যাবি না?
-না মা।খিদে নেই
-তাড়াতাড়ি ফিরবি
-আচ্ছা
জারার মা জানে মেয়ে প্রাইভেট পড়তে যাচ্ছে।বুক ফেটে কান্না আসছে জারার।কিছু করার নেই।নিরুপায় ওরা দুজন।
জারা বাসা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগল।এখান থেকে বাসস্টান্ড যেতে আধা-ঘন্টা লাগবে।রিকশা নিলে ২০ মিনিটের বেশি লাগবে না।এই দুপুরবেলা কড়া রোদে রিকশা পাওয়া যায় না।জারা কিছুদূর সামনে গিয়ে একটা রিকশা পেলো।লোকটা মধ্য বয়সী ঠিক জারার বাবার মত।দুপুরের কড়া রোদে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে।
-মামা যাবেন?
-কই যাবেন আফা?
-বাসস্টান্ড
-আচ্ছা
-ভাড়া কত?
-আপনে যা দেন
জারা রিকশায় উঠে বসলো।বাবার কথা মনে পড়ছে।যে কখনো জারাকে ছাড়া খায় না,সবসময় মা মা বলে।জারার বিয়ে নিয়ে তার কত স্বপ্ন।ভীষণ কান্না পাচ্ছে।কোনরকম সামলে নিলো নিজেকে।ফোন দিয়েছে ইফতি।
-হ্যালো জারা
-হুম বলো(হালকা কান্না জড়ানো কন্ঠে)
-তোমার কন্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেনো??বাসায় কোন ঝামেলা হইছে আবার?
-না,কিছু হয় নাই
-জানি অনেক খারাপ লাগছে কিছু করার নেই।কয়টা দিন যাক দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।
-হুম
-তুমি কই?
-এইতো রিকশায়
-আচ্ছা তাড়াতাড়ি আসো আমি বের হইছি।
-আচ্ছা
বলে কেটে দিলো জারা।রিকশাওয়ালাটা কিছুক্ষন পর পর পেছন ফিরে দেখছে জারাকে।জারা ভীষণ অস্বস্থিতে পড়ছে।ওর বিরক্ত ভাবটা চেহারায় ফুটিয়ে তুলছে।
-কিছু মনে করবেন না আফা।আপনেরে একটা কথা কই?
জারা ভীষণ বিরক্তি নিয়ে বলল
-বলেন
-আফা আপনের লাহান আমার একটা মাইয়া ছিল।অনেক ভালো আছিলো।ঠিক আপনের মত বয়স।
জারা কিছু বলে না।
-আপনে কি বাড়ি থেকা পালায়ে যাইতাছেন আফা?
হঠাৎ জারা চমকে উঠে।মুখে কিছু বলে না।
-আপনার ভাবসাবই বোঝা যাইতাছে।এমনটা কইরেন না।বাবা-মা অনেক দুঃখ পাইবো।আপনারে তারা অনেক ভালোবাসে।
আবারো নিশ্চুপ জারা
-আপনের মত আমার মাইয়াটাও ভুল করছিলো।আমারো দোষ আছিল।এই একটা ভুলের লেগা আজীবন আমার মাইয়াটা হারাইলাম।শুনবেন আফা?বিরক্ত মনে হইলে কমু না।
-বলেন
-আমার একটাই মাইয়া।অনেক স্বপ্ন আছিলো বড় হইবো।অনেক লেখাপড়া করামু ওরে।অনেক মেধাবী ছাত্রী ছিল আমার মাইয়া।সবসময় ভালো রেজাল্ট করত।ম্যাট্টিক পরীক্ষাতেও অনেক ভালো করে।কলেজে উঠছে।মাইয়া আমারে অনেক ভালোবাসে।আমারে রাইখা কখনো খায় না।সারাদিন টিউশনি কইরা রাতে বাসায় আসে।তারপর একসাথে খাই।তিনজনের ছোট্ট সুখী পরিবার ছিল।মাইয়া আমারে কইতো আব্বা দেইখো আমি অনেক পড়ালেখা করমু।দেইখো তখন আমি চাকরী পাইলে তোমাগো কষ্ট দূর করমু।আমি দোয়া করতাম মা তুই অনেক বড় হও।তোর সব স্বপ্ন পূরণ হোক।আমি আর তোর মা বেশিকিছু দিতে পারি নাই তোরে।এই দোয়া ছাড়া আর কি দিমু মা।আমার মাইয়া রাগ দেখায়ে কইতো ক্যান তোমরা আছো না??তোমারা আর তোমাগো দোয়াই তো আমার অনেক কিছু।আমার আর কিছুই লাগবো না।
একটানে বলে শ্বাস ফেললো রিক্সাওয়ালা।জারাও মনোযোগ দিয়ে শুনছে।ওর বাবাও তো ওর জন্য এমন স্বপ্ন দেখে।কিছুখন পর আবার বলা শুরু করল
-কলেজে উইঠা মাইয়াটা কেমন পরিবর্তন হইয়া গেলো।কেমন জানি!(একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল)কলেজ ফাঁকি দে,পড়ালেখায় অমনোযোগী,পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করে।ওর মায় আর আমি কিছুই বুঝবার পারতাছিলাম না।একদিন মাইয়ারে ডাইকা বলি মারে কি হইছে তোর? কোনো সমস্যা হইছে? এমন করতাসোস ক্যান? মাইয়া আমার উত্তর না দিয়া আমার লগে ঝাড়ি দিয়ে কথা কয়।জীবনে এমন কইরা কোনোদিন আমার লগে কথা কইতে দেখি নাই ওরে(হয়তো চোখের কোনে পানি এসে পড়েছিল)
কয়দিন পর মাইয়া ৩ হাজার টাকা চায় মোবাইল কিনবো।পুরান ফোন নিয়া মানুষের সামনে যাইতে ওর লজ্জা লাগে।আমি এত টাকা কই পামু।ওর মা অসুস্থ টাকা লাগব অনেক।দিতে পারমু না কইলে রাগ দেখায়,রাতে খায় না।ওর মায়ের ওষুধের জন্য কিছু টাকা জমাইছিলাম।ওর মা আর ওষুধ কিনতে দিলো না।১৫০০ টাকা ছিল।মাইয়ার ফোন কিনার লেগা দিয়া দেয়।দিন দিন মাইয়াটা কেমন জানি হইতাছিল।মাইনষে কইতো আমার মাইয়া না কি কোন পোলার লগে ঘুরে বেড়ায়।আরো কত কি!বিশ্বাস করতাম না।মাইনষে কত কি কইবো।তয় একদিন....
(দম নিলো বুড়ো মানুষটা)
রাস্তায় জ্যাম পড়েছে।রিকশা আটকে গেছে।
-একদিন???
-দুপুর বেলা রিকশা চালানোয় বিরতি দিয়া একটা পার্কের সামনে বইয়া আছি।দেখি আমার মাইয়ার মত একটা মাইয়া এক পোলার লগে হাসাহাসি,ঢলাঢলি করতাছে।আমি ভাবছি কে না কে।সামনে স্পষ্ট দেখলাম আমার মাইয়াই!!
দিলে কি পরিমাণ যে কষ্ট পাইসি।মাইয়াও আমারে দেইখা চিনা ফালাইছে।কিছু কইতে পারি নাই।যাত্রী আসছিলো দেইখা।(হঠাৎ থেমে গেলেন।প্রচুর গরম বাইরে।ঘেমে গেছেন অনেক)বাসায় আইসা ইচ্ছা মতন বকসি।ওর মায়ে ওরে মাইর ও দিছিলো।আজকে থেকা বাইরে যাবি না।তোর লেখা-পড়া বন্ধ।অনেক কানছিল।আমি আর ওর মায় ওর বিয়ার লেগা পোলা খুঁজতাছিলাম।মাইয়া উল্টা-পাল্টা কিছু করলে সমাজ আমারে একঘরে করব।একদিন মাইয়া পালায়ে যায়।ওর মায়ে কানতে কানতে আরো অসুস্থ হইয়া গেছিলো।এমনিতেই ফুসফুসের সমস্যায় ভুগতাছে।সমাজের ছি ছি আর আমার মুখে চুনকালি দিল আমার মাইয়া। ৩ মাস পর বাড়ি আহে।কি ছিল আমার মাইয়া কি হইয়া গেছে!!(গলা কাঁপছিল) শুকায়ে গেছে।চোখের নিচে কালি।মুখটা ফ্যাকাশে।এক ফোঁটা রক্ত নাই মনে হয়।মারের দাগ কালশিটে পড়ছে। আমার পাও ধইরা কানতাছিল।ভুল হইছে মাফ করতে।মাইয়া তো মাফ করছি।জামাই না কি ভালো মানুষ না।গ্যাঞ্জা-মদ খায়।ওরে খালি মার-ধর করে।যৌতুক চায়।মাইয়া ভুল করছে।আমার কাছে ছিল কিছুদিন।তারপর চইলা যায়।কোনো খোঁজ পাই না।একদিন খবর পাই আমার পুতুলের মতো মাইয়াটারে ওরা মাইরা ফালাইছে যৌতুকের লেগা।মাইনষের কাছে কইছে আগুনে পুইড়া আত্মহত্যা করছে।(এক বুক হাহাকার)
জ্যাম ছেড়ে দিছে।রিকশা চলছে।
-তারপর?(জারার চোখ ভিজে এসেছে)
-তারপর আর কি? ওর মায়ে একেবারে বিছনায় পড়ল।নড়তে-চড়তে পারে না।আমি যদি ওর বিয়ার লেগা জোর না করতাম ভালো কইরা বুঝাইতাম।তাইলে আমার মাইয়া আপনের মত বাঁইচা থাকত।আপনে এই ভুল কইরেন না আফা।বাপ-মা কত কষ্ট করে সন্তানের জন্য।ভালো কইরা বুঝান।বুঝবো।মা-বাপ কি খারাপ চায় সন্তানের?
-রিকশা একটু থামান মামা।
-আইচ্ছা
জারা রিকশা থেকে নেমে ফোন টা নিয়ে ইফতিকে কল করে।২-৩ বার রিং হতে ধরে।
-কই তুমি জারা?১৫ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছি।
-ইফতি আমি পালাতে পারবো না।আমি মা-বাবকে কষ্ট দিতে পারবো না।তুমি বাসায় যাও।
-কি বলছ এসব?? তোমার মাথা ঠিক আছে?
-যা বলছি ঠিকই বলছি
-তাহলে কি তুমি তোমার মা-বাবার ঠিক করা ছেলেকে বিয়ে করবে??
-আমি তা বলি নি।আমরা বাবা-মাকে বোঝাবো আবার ভালো কর।তারা বুঝবে।তারা আমাদের জন্য এত কষ্ট করে।তারা আমাদের ভালোই তো চায়,তাই না?
-আচ্ছা, তুমি যেমন চাও তাই হবে
-তুমি কাল বাসায় এসো।দুজনে মিলে আবার বুঝাব।
-আচ্ছা
জারা ফোনটা রেখে রিকশাওয়ালার দিকে তাকাল।বুড়ো লোকটা অবাক হয়েছে।
-মামা আবার উল্টা দিকে যান।বাসায় যাবো
-আচ্ছা
রিকশা থামে একটা দোকানের সামনে।
-মামা নেন।(১০০ টাকার নোট দিয়ে)
-আফা এত ভাড়া না তো।
-নেন টাকাটা রাখেন।আমি খুশি হয়ে দিচ্ছি।ভালো মন্দ কিছু খাবেন।আপনি সত্যি আমার চোখ খুলে দিছেন।নাহলে কত বড় ভুল যে করতে যাচ্ছিলাম।আপনার কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবো।
-(টাকাটা হাতে নিয়ে) মা-বাপরে কোনদিন কষ্ট দিয়েন না।
জারা হেসে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে।
বাসায় জারার মা চিঠিটা দেখে পাগল হয়ে গেছেন।বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন।বাবা টেনশন করছেন।বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন এসেছে।মা-বাবাকে স্বান্তনা দিচ্ছে।জারা আস্তে আস্তে বাসায় পা বাড়ায়।হয়ত আজকে বাসায় অনেক বকা দিবে।
জারাকে ঢুকতে দেখে বাবা ওকে জড়িয়ে ধরেন।
-(কাঁদতে কাঁদতে) মা রে তুই কই গেছিলি? এই বুড়ো মানুষগুলোর কথা একবারও ভাবলি না??আমরা কি এতটাই খারাপ?তুই যার সাথে চাস তার সাথেই বিয়ে দিবো। তুই সুখে থাক এটাই তো চাই আমরা।আর এমন পাগলামী করিস না।
মাও জড়িয়ে ধরেছেন শক্ত করে।জারা ভাবছে সত্যি তার বাবা-মা তাকে অনেক ভালোবাসে।
আসলেই পৃথিবীতে কোন বাবা-মাই তার সন্তানের খারাপ চান না।নিঃস্বার্থভাবে সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন।তাদেরকে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়।আমরা যত ভুলই করি না কেন তারা আমাদের ক্ষমা করে দেন।আমদের ভালো থাকাতেই তাদের সুখ।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন