বোবা বর - রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প উপন্যাস

বোবা বর - রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প উপন্যাস

 বিয়ের প্রথম রাতে বর ঘরে প্রবেশ করা মাত্র, আমি বলতে শুরু করি --লজ্জা করছেনা আপনার নিজের থেকে চৌদ্দ / পনেরো বছরের ছোট একটা মেয়েকে ঘরে বউ করে আনতে?


কিন্তু উত্তর পেলাম না, লোকটা ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়েই আছে। ওনার হ্যাবলার মতো তাকানোর ভঙ্গি দেখে আমার রাগ শুধু বেড়েই যাচ্ছে।


কি হলো কিছু বলছেন না যে কেনো বিয়ে করলেন আমায়? আমার জীবনটাকে বিষিয়ে দেওয়ার জন্য!


আমি নাহয় মেয়ে মানুষ আমাকে জোরপূর্বক বিয়ে দিছে পরিবার থেকে, কিন্তু আপনি তো পুরুষ মানুষ। কেমন পুরুষ আপনি যে নিজের থেকে এতো ছোট একটা মেয়ে কে বউ করে নিয়ে আসলেন। 

রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প উপন্যাস

একটা কথারো উত্তর না দিয়ে লোকটা ওয়াশরুমে চলে গেলেন। এদিকে আমার রাগের মাত্রাও অধিক হারে বাড়ছে। আমি আবার অতিরিক্ত রাগ উঠলে রাগের প্রভাবে কেঁদেই ফেলি।


আধা ঘণ্টা পার হয়ে গেলো লোকটা ওয়াশরুম থেকে এখনো বাইরে আসছে না। তাতে আমার কি, আমি তো এই অর্ধবয়স্ক লোকটাকে বিয়ে করতেই চাইনি।


বাবা মা কে এতো করে বললাম এই লোকটাকে বিয়ে করতে পারবো না আমি, শুনলোনা আমার কথা কেউ।


পালিয়েও আসতাম রবির সাথে (আমার বয়ফ্রেন্ড) পরিকল্পনা করছিলাম ওর সাথে কিন্তু পরদিন রাতেই বিয়ে দিয়ে দিলো। কাছের আত্নীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী দিয়ে বাড়ি ভর্তি ছিলো তাই আর পালাতে পারলাম না।


কবুল, কবুল, কবুল তিনবার বলেই দিলাম শুধু মুখদিয়ে মনথেকে নয়।

রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প উপন্যাস

রাগে দুঃখে কিছুক্ষণ নিরবে কান্না করে রবির কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম, যে কাল রবির সাথে কথা বলতে হবে আমি এই লোকটার সাথে থাকতে পারবোনা ও যেনো এখান থেকে নিয়ে যায় আমাকে।


সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম লোকটা ফজরের নামাজ পড়ছেন। পাশে আর একটা জায়নামাজ বিছিয়ে রেখেছেন হয়তো আমার জন্য, অন্য দিন নামাজ পড়লেও আজ ওনার জন্য নামাজ পড়লাম না আমি (চলে যাওয়ার পর একা পড়ে নিলাম)   । নামাজ পড়ে বাইরে বেড়িয়ে গেলেন উনি। আমি নামাজ শেষ করে    

 ঘরেই বসে আছি।


একটু পর দরজায় কড়া নাড়লেন ওনার মা - বউমা উঠছো তোমরা এই বলে, আমি জ্বী মা বলে দরজার কাছে গিয়ে শ্বাশুড়ি কে ভিতরে নিয়ে আসলাম ।


একটা ছোট মেয়ে বয়স নয়-দশ হবে হয়তো, সে ট্রেতে সকালের নাস্তা নিয়ে আসছে। 

শ্বাশুড়িমা - জুলি তুই খাবারের ট্রেটা টেবিলে রেখে রান্নাঘরে তোর ছোট ভাবি কে কাজে সাহায্য কর যা।


শ্বাশুড়ি মা - কাল তোমাদের খোঁজ ঠিকভাবে নিতে পারিনি, কোনো অসুবিধা হয়নি তো মা তোমাদের ?


আমি- না মা, কোনো সমস্যা হয় নি। 

শ্বাশুড়িমা - আচ্ছা ঠিক আছে নাস্তা করে বিশ্রাম নেও তোমরা।

রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প উপন্যাস

আমি ঠিক আছে মা। তখন বিছানায় বসা অবস্হায় শ্বাশুড়িমা আমাকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন আমার কেনো জানি ওনার এই সময় আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাটা স্বাভাবিক লাগলো না। কান্না থামিয়ে শ্বাশুড়িমা আমার মাথায় হাত দিয়ে বলছে আমার ছেলেটা অনেক সহজসরল ওকে দেখে রেখো মা।


তখনি রুমে লোকটা প্রবেশ করেন। মা কথা থামিয়ে বলেন বাবা তোরা নাস্তা করে নে আমি যাচ্ছি, লোকটা মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে হ্যা সূচক সম্মতি জানায়।

লোকটা রুমে সোফায় বসে হাতে করে আনা খবরের কাগজ এ মুখ ডুবাই আছে।


এদিকে আমার পেটে ক্ষুধাতে ইঁদুর দৌড়াচ্ছিল। খাবার টেবিলে, কিন্তু আমার খেতে কেমন একটা দ্বিধা লাগছে নিজে থেকে।


আমি - শুনেন মা তো নাস্তা করতে বলে গেলো খেয়ে নিন।লোকটা একটু মাথা উঠায় আবার খবরের কাগজ পড়তে লাগলেন।

আমি আর অপেক্ষা না করে একাই কিছু খেয়ে নিলাম। একটুপর লোকটা ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন না খেয়েই। 

আমিও এই সুযোগে রবি কে কল দিলাম রিং হচ্ছে কিন্তু রিসিভ করছে না। পাঁচবার বার কল দেয়ার পর ষষ্ঠ বার কল রিসিভ করলো।


রবি - দেখো জান্নাত (আমি) তুমি এখন অন্যের বিবাহিত স্ত্রী, এভাবে আর আমাকে কল দিবা না। 

আমি - এই অর্ধবয়স্ক লোকটার সাথে আমি থাকতে পারবো না, তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।


রবি - পাগলামি করোনা জান্নাত, আমার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়। তুমি এখন একজন এর বউ, আমার কেউ নও। আর কখনোই কল দিওনা, ভালো থেকো। এই বলে ফোনটা কেটে দিলো রবি।


আমি হতাশ হয়ে, আবার কল দিচ্ছি রবিকে কিন্তু নাম্বার ব্যস্ত একবার রিং হয়ে ব্যস্ত বলে কেটে যাচ্ছে । তার মানে রবি আমার মোবাইল নাম্বার টা ব্লাকলিস্টে রেখে দিলো!


এমনি মনটা খারাপ আরো খারাপ হয়ে গেলো রবির আচরণে। জানালার পাশে এসে দাড়িয়ে প্রকৃতি দেখছি আর চোখ থেকে পানি ঝড়ছে।


এমন সময় আমার ছোট জা রুমে এসেই, কি ভাবি বাসর রাত কেমন কাটলো বলেন শুনি ?


আমি - জ্বি ভালো। 

জা - আমাদের ভাইয়া কিন্তু অনেক ভালো মানুষ ভাবি। এ বাড়ির সবাই ওনাকে অনেক পছন্দ করে, আমিও ওনাকে ভাসুর নয় নিজের ভাই আর উনিও আমাকে নিজের ছোট বোনের মতোই স্নেহ করেন। 

আমি - চুপ করে আছি।রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প উপন্যাস


জা - আরে ভাবি আপনার চোখ দেখছি লাল হয়ে আছে! বাবা মার জন্য মন খারাপ লাগছে বুঝি? প্রথম প্রথম আমারো অনেক খারাপ লাগতো কিন্তু এ বাড়ির সবার সাথে থেকে এখন বাবা মার কথা খুব কম মনে পড়ে। 

আসেন তো আমার সাথে নিচে যাই, একা একা থেকে বেশি নিঃসঙ্গ বোধ করছেন, ভাইয়াটাও যে কোথায় নতুন বৌ কে একলা রেখে উধাও।


আমি কিছু বলতে যাবো ওমনি ছোট জা আমার হাত ধরে নিচে নিয়ে যাচ্ছে, আমিও আর কিছু না বলে ওনাকে অনুসরণ করে চলছি আর দেখছি বাড়িটা বেশ বড়ো আর সুসজ্জিত দুইতলা বিশিষ্ট । লোকটার ছোট ভাইয়ের বউ হলেও আমার থেকে আমার ছোট জা বয়সে অনেক বড় হবে।


ছোট জা একটা রুমের সামনে এসে পিউ বলে ডাকতেই ছোট্ট একটা পরীর মতো সুন্দর মেয়ে দৌড়ে আসলো।


জা - ভাবি আমার ছোট মেয়ে পিউ, আর বড় ছেলেকে ওর বাবা স্কুলে নিয়ে গেছে। পিউ মা এইযে তোমার বড়আম্মু এই কথা বলতেই পিউ আমার কোলে আসার জন্য হাত উঠালো।


আমিও খুশি মনে পিউকে কোলে নিয়ে গালে একটা আদর দিলাম, পিউও আমার গালে আদর দিলো তখন জড়িয়ে নিলাম বুকে পিউ কে।


পিউ এর সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে রান্না ঘরে গেলাম। 

ছোট জা কে আপু সম্মোধন করে বল্লাম আপু আমিও হেল্প করবো আপনাকে? ওমা সেকি কথা মা জানতে পারলে আমাকে অনেক বকবেন, ভাবি আপনি তারচেয়ে বিশ্রাম নিন রুমে গিয়ে । আর আমার নাম আশা আপনি আমাকে আশা বলেই ডাকেন।


আমি - না তা হয়না আমার কোনো বোন নেই আমি আপনাকে আপু বলেই ডাকবো। 

জা - খুশি হয়ে ঠিক আছে ভাবি।


আমি টুকটাক সাহায্য করছি আশা আপু কে। রান্নাঘরে আরো দুজন মহিলা অন্যান্য কাজ করছে, কিন্তু রান্না আশা আপুই করছে একা।


শ্বাশুড়ি মা রান্নাঘরে প্রবেশ করেই, একি আশা তুমি প্রথম দিনেই নতুন বউমা কে রান্না ঘরে নিয়ে আসছো? 

আশা আপু কিছু বলতে যাবার আগেই আমি বললাম, 

না মা আমি নিজে থেকেই আসলাম আর আপু তো আমাকে রান্নাঘরে ঢুকতেই দিচ্ছিলো না। 

শ্বাশুড়িমা ঠিক আছে বউমা, আর আশা তোমার ভাইয়ার ভাতের সাথে খাওয়ার জন্য মিষ্টি চাটনি টা করছো?


আশা আপু - না মা এখনো করিনি সবকিছু রেড়ি, করে ফেলবো একটু পর। 

শ্বাশুড়িমা - ঠিক আছে, আমার দিকে তাকিয়ে বড় বউমা আমার ছেলেটা খাওয়ার শুরুতে কোনোকিছুর টক মিষ্টি চাটনি ছাড়া খেতে পারে না, বলে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন।


আশা আপু বেগুন তেঁতুল এর টক দিয়ে চাটনি করছে, আমি পাশে দাড়িয়ে দেখছি, আর আপুর বিয়ে কিভাবে হলো সেই গল্প শুনছি। 

মহিলা দুজন যেনো কোথায় বেড়িয়ে গেলেন, এমন সময় পিউ মা মা বলে চিৎকার করছে আপু দৌড়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে পিউ এর খোঁজে গেলেন।

রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প উপন্যাস

আমিও এই সুযোগে চাটনিতে ইচ্ছে মতো মরিচের গুঁড়ো, লবন আর পাশে রাখা করলার জুস এর কিছু মিশিয়ে দিলাম। আমার শ্বশুর এর ডায়াবেটিস তাই তিনি করলার জুস খান করলার মৌসুমে । 

একটু পর আশা আপু ফিরে এসে, চাটনি হয়ে গেছে বলে নামায় ফেললো।


আমিও রুমে চলে আসলাম মন অনেক খারাপ থাকলেও চাটনিতে ওসব মিশিয়ে এখন বেশ ফুরফুরে লাগছে এটা ভেবে যে লোকটা ওই চাটনি খাবে কিভাবে!


জোহরের নামাজের পর মসজিদ থেকে বাড়ির পুরুষেরা ফিরলে সবাই একসাথে দুপুরের খাবার খেতে বসলাম। 

দুপুরে খেতে বসে দেখলাম আমার আরো একটা ছোট দেবর আছে আর বড় ননদ ও ছোট ননদ দুপুরে খেয়েই তাদের নিজের স্বামীর বাড়িতে চলে যাবে দুলাভাইরাও সঙ্গে আছেন।


সবাই কে খেতে বসায় দিয়ে আশা আপু আর শ্বাশুড়িমা পরিবেশন করছেন, সবমানুষের মুখে এতো কথা কিন্তু ওই লোকটা কোনো কথাই বলেনা। এ কেমন মানুষ ( আমি মনে মনে) !


সবাই খেতে শুরু করেছে, আমি অপেক্ষা করছি লোকটা ওই চাটনি টা খেলে তার প্রতিক্রিয়া কি হবে তা দেখার জন্য । ছোট মেয়ে কে বিয়ে করার শখ কতো তা বুঝানোর জন্য ।


এমন সময় লোকটা বসা অবস্থায় আআ'''''আআআআ বলে চিৎকার করতে করতে দাড়িয়ে মুখে হাত দিয়ে বাতাস করছে, সবাই খাওয়া বাদ দিয়ে উত্তেজিত হয়ে ওনাকে জিঙ্গেস করছে কি হইলো কিন্তু উনি শুধুই চিৎকার আর ছটফট করছেন। এতো ঝাল, লবন, তিতা সহ্য করতে পারেন নাই বেচারা।


শ্বাশুড়িমা কান্নার কণ্ঠে বললেন আমার ছেলেটা কথা বলতে পারেনা, কিভাবে বুঝবো ওর কি সমস্যা হচ্ছে।


এই কথা শোনামাত্র কারেন্ট এর শক্ খেলাম পুরো শরীরে আর বজ্রপাত হলো মাথায় পুরো শরীর কাঁপছিল আমার। নিজেকে সামলিয়ে পানি এগিয়ে দিলাম লোকটাকে, একনিমিশে সব পানি খেয়ে গ্লাস নাড়িয়ে আরো পানি চাইলেন এবার আশা আপু পানি দিলেন।


পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগলো। ভাগ্যিস বেগুনে সবার এলার্জি জন্য চাটনি কেউ খায়নি। 

সবাই হালকা ভাবে দুপুরের খাবার খেয়ে যার যার স্থানে ফিরে গেলেন। আমি রুমে এসে ওয়াশরুমের দরজা আটকালাম, আর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম শেষ পর্যন্ত এই ছিলো আমার কপালে বোবা, বুড়া স্বামী। কি পাপ করছিলাম আমি আল্লাহ বলে, আয়নায় নিজেকে দেখে আরো ভিতর থেকে কষ্টে কাঁদতে লাগলাম। বেশকিছু সময় পর রুমে এসে শুয়ে পড়লাম, এতো কান্নার পরো ভিতর থেকে আবার কান্না আসছে দূর্ভাগ্যের জন্য।


এভাবে শুয়ে বিকেলটা কাটালাম, সন্ধায় আব্বু আম্মু আর ছোট ভাই আমাকে আর লোকটাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এ বাড়িতে আসলো।


আমি ওদের কারো সাথেই ভালো ভাবে কথা বললাম না। তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া শেষ করে আমাদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে ক্লান্ত লাগছিল বলে শুয়ে পড়লাম, খুব কষ্ট পেয়ে কান্না করলে আমার আবার ঘুম পায়।


বিছানায় শুয়ে আছি, লোকটা আমার বিছানার এক পাশে শুয়ে পড়লো দেখে আমি নিজে তার মাথা থেকে বালিশ নামিয়ে মেঝেতে ফেলে দিয়ে সেখানে শুতে বললাম। লোকটা বাধ্য ছেলের মতো মেঝেই শুয়ে পড়লো। কিন্তু কিছু বললে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকানোটা ত্যাগ করতে পারলো না যা আমার কাছে খুব অসহ্য লাগে।


আমাদের বাড়িটা একটু গ্রামের পাশে তাই নতুন বিয়ে হলে গ্রামের অনেক মানুষ নতুন বর / বউ দেখতে আসেন। আজ সকালে উঠেই অনেক মানুষের কোলাহল দেখছি আমার বর দেখার জন্য।


লোকটা দরজার কাছে চেয়ার এ বসে আছে আর লোকজন বারান্দার নিচে দাড়িয়ে দেখছে নতুন বর কেমন তা। 

আমি চলে আসার সময় শুনতে পেলাম কেউ কেউ বলছে এতো কথা বলছি নতুন বর এর এতো অহংকার একটা কথাও বলছে না বড়োলোক জন্য এমন হয় মানুষ , আমাদের জান্নাত কতো সুন্দরী, পরীর মতোন তার কপালে এমন একটা বুইড়া জামাই জুটলো, বরটা লম্বা আর সুন্দর আছে তয় বয়সটা একটু বেশি। এসব কথা শুনে আমার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেলো।


রান্না ঘরে গিয়ে রাগে আম্মু কে বললাম, আম্মু আমি আর ওই বাড়িতে যাবো না কিছুতেই না, ওই লোকটার এতো বয়স আর উনি কথাও বলতে পারে না বোবা। তোমরা কিভাবে এমন একটা লোকের সাথে আমার বিয়ে দিলে বলো?


আম্মু চুপ করে আছে, আব্বু রান্নাঘরে এসে আমার সব কথা শুনে আমাকে বললো মা কোনো পিতামাতা তার সন্তান এর খারাপ চায় না। 

জামাই বাবা কিছুদিন আগে গ্রামে এসে তোকে দেখে খুব পছন্দ করে, আর তোর শ্বাশুড়ি সম্পর্কে আমার বড় বোন হন ছোটবেলা আমি একবার পুকুরে পড়ে গেছিলাম তখন তিনি আমায় বাঁচান, ওই ঋণ একটু হলেও শোধ করতে চাই আমি। আব্বু আমার মাথায় হাত রেখে বলছে তুই অনেক সুখী হবি রে মা দেখে নিস, হাতটা সরায় দিলাম আমি আর বললাম বোবা জামাই নিয়ে কি সুখী হবো আমি বলো তুমি?


আব্বু -- জামাই আগে স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন, একটা দুর্ঘটনার পর থেকে কথা বলতে পারে না। একটা কথা মনে রাখবি মা মানুষের সবথেকে বড় পরিচয় সে মানুষ।


আমি -- কি দুর্ঘটনায়? 

আব্বু কিছু বলার আগেই শ্বাশুড়ি মা মেবাইলে কল দিয়ে কান্না করতে করতে বললেন আমার শ্বশুর বাবা অনেক অসুস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন, আমরা যেন দ্রুত সেখানে যাই।


তখনই তাড়াতাড়ি বের হয়ে আব্বু, আম্মু, লোকটা, ছোট ভাই সহ রওনা দিলাম,,


শ্বশুর সাহেব হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন আজ। বাড়িতে অনেক আত্নীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীর সমাগম । সবমিলিয়ে ভালোই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি আমি।


এ বাড়ির সবাই অনেক ভালো, সবার সাথে অল্প সময়ে বেশ ভাব হয়েছে আমার। শুধু ওই লোকটাকেই এখন পর্যন্ত সহ্য করতে পারছি না যদিও এ কয়দিন হাসপাতালে বেশির ভাগ সময় বাবার সাথে ছিলো।


এবার বাড়িতে গেলে আর আসবো না আমি, তাতে যা হবার হবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।


এখন শুধু অপেক্ষা কখন বাড়িতে যেতে পারবো, কিন্তু হঠাৎ শ্বশুরের অসুস্থতার জন্য সব এলোমেলো হয়ে গেছে। কবে যে আর বাড়িতে যেতে পারবো আমি ।


এইকয়দিন আমি পিউ আর আশা আপু একসঙ্গে ছিলাম। ছোট ভাইয়া, মা আর লোকটা হাসপাতালে ছিলো। ছোট দেবর বাড়িতেই ছিলো।


আজ রাতে লোকটা আমার পাশে শোয়াতে আমি উঠে ফ্লোরে বিছানা করে শুয়ে পড়লাম। ওনার বাড়ি ওনার ঘর উনি থাকুক খাটের উপর, তাছাড়া এইকয়দিন হাসপাতালে ঠিকমতো ঘুম হয়নি লোকটার শ্বাশুড়ি মা বলছিলেন।


সকালে উঠে দেখি লোকটাও রুমের অন্য পাশে ফ্লোরে ঘুমাচ্ছে, কি নিষ্পাপ লাগছে ঘুমন্ত মুখটা লোকটার মনে হয় সারাজীবন চেয়ে থাকি।


ছি, আমি কেনো এই লোকটাকে দেখছি ওনার জন্য আমি আমার রবিকে হারালাম, ওনার জন্যই রবি আমার সাথে কথা বলে না এখন। আর সেই আমি কিনা,


ঘৃণা করি আমি লোকটাকে অনেক ঘৃণা করি। এরপর ফ্রেশ হয়ে নিচে রান্নাঘরে যাই আপুকে সাহায্য করার জন্য।


সকালের নাস্তা করে, যে যার অফিসে চলে যায়। একি লোকটাও কোট, টাই পড়ে হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন। শ্বাশুড়ি মা বলেন -- বাবা আজ অফিসে না গেলে হয়না, বউমা তো নতুন মানুষ তাকে তোর সময় দেওয়া উচিত। 

লোকটা মা কে কি যেনো বলে বেড়িয়ে গেলেন, যাওয়ার সময় মা তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে বলেন।


বোবা একটা লোকেরো অফিস আছে, আমি ভাবছি।সারাদিন সবার সাথে স্বাভাবিক ভাবে থাকলেও একটা কথাই ভাবি কিভাবে লোকটাকে হেনস্তা করা যাবে। 

আপু সহ দুপুরের খাবার রান্না করি, আর মা সবসময় বাবার পাশেই থাকেন।


লোকটাও দুপুরের খাবার খেতে আসে, খাওয়া শেষে রুমে যায় বিশ্রাম করার জন্য। আশা আপু আমাকেও জোর করে রুমে পাঠায়, রুমে যাওয়ার পর আয়নার পাশে কিছু বেলি ফুল দেখতে পাই।


বেলি ফুলতো আমার পছন্দের অনেক, ফুল দেখে আনন্দিত হয়ে হাতে নিলাম, তখন লোকটা ইশারায় ফুলটা মাথার খোঁপাতে গেঁথে নিতে বললেন। 

আমি খানিকক্ষণ চুপ থেকে ফুলটা হাত দিয়ে ছিড়ে কুটি কুটি করলাম লোকটার সামনেই।


খোঁপায় বাঁধবো না আমি ওই লোকটার আনা বেলি ফুলের মালা। আজ কেন, আমি আর জীবনে কখনো খোঁপায় বেলীফুলের মালা বাঁধবো না।


লোকটা তবুও আমার দিকে চেয়ে আছে, সত্যি লজ্জা বলতে কিচ্ছু নাই লোকটার। ফুলের মালাটা সামনেই ছিড়ে এতো অপমান করলাম, তারপরেও যদি একটু ওনার আত্মসম্মানে লাগতো।


সহ্য করতে পারছি না লোকটার তাকানোটা, 

রুম থেকে বের হয়ে ছাঁদে গেলাম। ছাঁদে লাগানো বাগানে অনেক রঙ্গের ফুল ফুটে আছে, ফুল গুলো দেখে আমার সেই ফুলের গাছ হতে ইচ্ছে করছে।


আমি যদি ফুলের গাছ হতাম তাহলেই আর এই লোকটাকে বিয়ে করতে হতো না। ছাঁদে অতিরিক্ত রোদ থাকা স্বত্বেও চেয়ারে পা তুলে আয়েশ করে বসে কোন ফুলের কি রং, কার আকৃতি কেমন তা মনোযোগ দিয়ে দেখছি। মাঝে মধ্যে কোথা হতে যেনো ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছিল, রোদের তাপ ও কমে যাচ্ছে 

সবমিলিয়ে মনোরম একটা পরিবেশ ভালোই লাগছে আমার।


আজ আর ছাঁদ থেকে রুমে যাবো না আমি, ফুল গুলোর সাথেই সময় কাটাবো আর ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করবো ভাবছি । বিকেল হয়ে গেছে, আছরের আযান শুনা যাচ্ছে পাশের মসজিদ থেকে।


কিছুক্ষণ পর লোকটা সেখানে উপস্থিত হয়ে ক্যাবলার মতো একটা হাসি দিয়ে ঈশারায় বোঝালেন এই ফুলের বাগানটা তার নিজের হাতে গড়া।


আমি বুঝেও না বুঝার ভান করে আছি। 

আমার মুখটা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে লোকটার জন্য ভালোই ছিলাম এতোক্ষণ, লোকটা এসে আমার মুডটাই নষ্ট করে দিলো।


লোকটা পানি দিচ্ছেন ফুলের গাছগুলোতে অনেক খুশি মনে, আমি ওনার জন্য ছাঁদ থেকে নেমে আসলাম।


শ্বাশুড়ি মা -- আশা, তোমার ভাবি কে চা করে দাও ছাঁদে তোমার ভাইয়ার জন্য নিয়ে যাবে । বিকেলের চা' তো তোমার ভাইয়া ছাঁদে বসেই খায়।


আমি -- আপু আমি চা করে নিয়ে যাচ্ছি ওনার জন্য, আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না। সরাটাদিন কতো পরিশ্রম করেন আপনি।


আশা আপু -- ঠিক আছে কিন্তু ভাইয়া একবারে ঠান্ডা চা খান আর চায়ে চিনি বেশি লাগে।


আমি -- ঠিক আছে আমি করে নিবো আপু, বলে চা অনেক গরম করলাম আর চিনির বদলে একটু ডিটারজেন্ট পাউডার এর গুড়া মিক্স করছি।


ছাঁদে চা নিয়ে গেলাম লোকটার জন্য, লোকটা চেয়ারে বসে আছে। আমি পাশে গিয়ে হাসি মুখে চা ওনার সামনে এগিয়ে দিলাম।


লোকটাও খুশি মনে চায়ের কাপে এ মুখ লাগালো আর সাথে সাথে আআআআআ করে হালকা চিৎকার করলো, অসাবধানতার কারনে সব চা ওনার পায়ে পড়াতে পানির বালতিতে পা চুবালেন।


আমি এবার আশেপাশে কেউ নেই জন্য মুচকি হাসতে লাগলাম। লোকটা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এমন কাজ ইচ্ছে করেই করেছি আমি, মাথা নিচু করে বিষন্ন মনে বসে থাকেন।


আমি চায়ের কাপটা তুলে সেখান থেকে চলে আসলাম। জিহ্বা পুড়ে যাওয়ার জন্য সেদিন রাতে লোকটা আর কিছু খেতে পারলো না, না খেয়েই শুয়ে পড়লো।

আজো লোকটা বেলি ফুলের মালা এনে রাখছেন আয়নার পাশে। আজ না ছিড়ে এমনিতেই লোকটার সামনে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম।


রাতে আবার অনেক চকলেট, চিপ্সের প্যাকেট এনে আমার বালিশের পাশে রাখছে। 

খেতে ইচ্ছে করলেও খেলাম না।


ফ্লোরে শুয়ে ঘুমায় পড়লাম, একটা স্বপ্ন দেখে হঠাৎ মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলো আমার তখন দেখলাম লোকটা চার্জার লাইটের আলোয় কি যেনো লিখছে আর কাঁদছে। লোকটাকে দেখে আমার মনে একটু মায়া হয়, আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।


সকালে উঠে পিউ রুমে আসলে, লোকটার সামনে সব চকলেট আর চিপ্সের প্যাকেট বের করে পিউ কে দিলাম। পিউ খুশি হয়ে, প্রথমে লোকটার গালে তারপর আমার গালে আদর দিলো। 

পিউ এর কান্ড দেখে লোকটা মুচকি হাসছে, আর আমার নিজের গালটাই ছিলে ফেলতে মন চাচ্ছিলো।


পিউ কে কোলে তুলে বাইরে বেড়িয়ে আসলাম। 

আজ কলেজে আমার অনার্স প্রথম বর্ষ পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করতে যাবো আমি, শ্বাশুড়ি মা লোকটার সঙ্গে আমায় কলেজে পাঠালেন, যা আমি একদম চাই নি।


কলেজের কাজ শেষ করে, একটা পার্কের সামনে গাড়ি থামলো লোকটা। 

কিন্তু আমি গাড়ি থেকে নামলাম না। লোকটা তখন আমার দিকে তাকাচ্ছিলো, বললাম বাড়িতে যাবো আমি । আবার সেখান থেকে ফিরে বাড়িতে আসলাম।


এক সপ্তাহ কেটে গেছে এভাবে লোকটা প্রতি দিন বেলি ফুলের মালা নিয়ে আসে আর আমি ফেলে দিই। আজ আয়নার পাশে বেলি ফুলের মালা না দেখে মনটা কেমন করে উঠলো। পিছন ফিরে দেখলাম লোকটা হাত দিয়ে আমার খোঁপায় ফুল গুঁজে দিচ্ছে। এক ঝটকায় হাত সরায় দিলাম, লোকটা কষ্ট পেলেও কিছু বললো না।


এতোকিছুর পরেও রাতে একটা নীল রঙের শাড়ী আর চুড়ি এনে আমার হাতে দিলো, সাথে সাথে আমি শাড়ি, চুড়ি লোকটার হাতে দিয়ে বললাম লাগবে না আমার এসব। লোকটা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলো আবার আমার দিকে।


বাবা এখন পুরোপুরি সুস্থ, কিন্তু আরো কিছু দিন বিশ্রাম নিতে হবে। তাই লোকটার উপর কাজের চাপ বেশি শুনলাম। 

বড় ননদ এর কাছে বাড়ির সবাই আজ সকালে বেড়াতে গেছে হয়তো দুই এক দিন থাকবে সেখানে। 

লোকটার অফিসের জন্য যেতে পারেনি সেই সাথে আমিও বাড়িতেই আছি।


ছোট মেয়েটা সহ রান্নার কাজ শেষ করে দুপুরে খেয়ে নিলাম, আর মেয়েটাকে ঘুমাতে বললাম।


আধাঘন্টা পরে লোকটা বাড়িতে আসে, ফ্রেশ হয়ে খাবারের টেবিলে গিয়ে বসে খাওয়ার জন্য প্লেট কাছে নিলো। কিন্তু সব খাবারের বাটি ফাঁকা ছিলো, তারপর রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় লোকটা আমি দুর থেকে দেখছি এসব। 

রান্নাঘরেও কোনো খাবার না পেয়ে তিন গ্লাস পানি দ্রুত পান করে চেয়ারে বসে রইলো সেখানে লোকটা। সব খাবার আমি আগেই ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলাম যাতে লোকটা খেতে না পারে।


রুমে আসলাম, লোকটার ফ্লোরে ঘুমানোর বিছানা, বালিশ অগোছালো হয়ে আছে। সেগুলো গুছানোর সময় একটা ডাইরি পাই। 

কারো ব্যক্তিগত ডাইরি পড়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিলো না কখনো, কিন্তু আজ লোকটার লেখা ডাইরি পড়ার আগ্রহ যেনো আমায় গ্রাস করে বসলো।


ডাইরির প্রথম পাতা খুললাম, 

আমি মুরাদ আহমেদ। 

জন্মসাল : ১৯৮৪ 

লোকটার নাম তাহলে মুরাদ,,,,,,,

আমি সে-সময় অষ্টম শ্রেণিতে পড়তাম। মা সহ ছোট খালার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছি, সব ভাই বোন একসাথে হৈ,চৈ আনন্দে মেতে ছিলাম সবাই।


রোজ বিকেলে খালাতো ভাই আর পাড়ার ছেলেরা মিলে ক্রিকেট খেলা হতো। খেলার এক পর্যায় বল গিয়ে পড়ে পাশের এক বাড়িতে। সবাই মুখ কালো করে আছে, আজ আর সেই বলটা তাদের পাওয়া হবে না বলে। সে বাড়ির মেয়েটা অনেক ঝগড়াটে নাকি, যেই বল আনতে যাবে তার জন্য কানে ধরে ওঠাবসা অবধারিত, খেলার ছোট মাঠটার পাশেই বাড়িটা ছিলো।


আমি নতুন জন্য সবাই জোরজবরদস্তি করে আমাকেই পাঠালো বলটা আনতে। আমি বল আনতে গেলাম, দেখি একটা মেয়ে বলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। ভালো করে দেখলাম এমন সুন্দর মেয়ে কি করে এতটা ঝগড়াটে হতে পারে, টানা টানা চোখ, জোড়া ভ্রু যুগল যেন শ্যামা মেয়েটার সৌন্দর্য অনেক গুন বৃদ্ধি করেছে।


মেয়েটা আমাকে নতুন দেখে একটু অপ্রকৃতস্থ হয়ে গেলো, আমি নিজে থেকে বললাম ম্যাডাম বলটা আমার। 

মেয়েটি কোনো কথা না বলে বলটা আমার সামনে এগিয়ে দিলো।


বল নিয়ে ফিরে আসছি, কিন্তু মেয়েটাকে আরো একবার ভালো করে দেখতে ইচ্ছে করছে এখন খুব আমার। ঠিক তখনি মেয়েটা আমায় বলওয়ালা বলে ডাক দিলো। 

সাথে সাথে ঘুরে দাঁড়ালাম, বললাম আমাকে বলছেন?


জ্বী, আপনাকেই। এ পাড়ায় আগেতো আপনাকে দেখিনি কে আপনি? আমি নিহানের খালাতো ভাই মুরাদ, আপনি? 

মেয়েটা -- আমি সামিহা। 

আমি আবার জিঙ্গাসা করলাম কোন ক্লাসে পড়েন আপনি?


মেয়েটা -- ক্লাস এইটে, আপনি? 

আমি -- এমা আমিও ক্লাস এইটে পড়ি, তাহলে আমরা তো এখন বন্ধু, বান্ধবী হয়েই গেলাম। সামিহা কিছু না বলে বাড়ির ভিতরে চলে যায়।


বল নিয়ে ফেরার পর সবাই আমার আর সামিহার কথোপকথন শুনে অবাক হয়, তারপর থেকে সবাই সামিহা কে দিয়ে ক্ষ্যাপায় আমাকে।

আমার খারাপ লাগে না, খালার বাড়িতে যতদিন ছিলাম সবসময় সামিহার সেই চোখ, মুখের মায়াভরা দৃশ্য ভাসতো আমার সামনে।


আরো তিনদিন দেখা হয় সামিহার সাথে আমি প্রথম কথা বলি দু'দিন, তিনদিনের দিন সামিহা নিজে থেকেই কথা বলে। 

একই ক্লাসে পড়লেও সামিহা আমাকে আপনি আর আমি সামিহাকে তুমি সম্মোধন করি। 

মেয়ে মানুষ মনেহয়না সহজে কোনো ছেলে মানুষকে তুমি বলতে পারে।


সামিহাকে আমার ভালো লাগে, সামিহাও কথা বলার সময় আমার দিকে আঁড় পানে তাকায়। সেবার খালার বাড়ি থেকে চলে আসতে, বুকের ভিতর প্রথম এক অজানা কষ্ট অনুভব করি।


এরপরে যতবার ছুটি পেতাম স্কুলে ততবারই ছুটে যেতাম খালার বাসায়। দেখা হলেই টুকটাক কথা হয় সামিহার সাথে, আমি রাতে ঠিক করে রাখতাম কাল দেখা হলে কি বলবো কিন্তু সামিহা সামনে আসলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় আমার।


এসএসসি পরীক্ষার পর সামিহার আম্মুর মোবাইল নাম্বার নিয়ে আসি, তারপর থেকে মোবাইলে এসএমএস এ কথা বলতাম আর এইচএসসি পরীক্ষার পর অনার্স ফাস্ট ইয়ারে মোবাইল কিনে সামিহা। সামিহার আম্মু আমাকে অনেক পছন্দ করেন, বাসার আশেপাশে দেখলেই বাড়িতে ডেকে নিতেন গল্প করতে।


আমি ঢাকার এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই আর সামিহা ফেনীর এক কলেজে ভর্তি হয় বাড়ির থেকে কাছে জন্য । 

এভাবে কথা বলতে বলতে কখন যে আমারা দু'জন এক হয়ে যাই ঠিকভাবে বুঝতে পারি না আমি।


সারাদিন রাত সামিহার খোঁজ না নিলে নিজেকে অসমাপ্ত লাগতো আমার। আর সামিহাও একবার মোবাইলে চার্জ না থাকার কারনে বন্ধ হয়ে যায় পরেরদিন কল দিলে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটা।


তখনই সিদ্ধান্ত নেই আমরা সারাজীবন একসাথে কাটাবো, কেউ কাউকে ছাড়া একদিনও চলতে পারি না। একদিনের কষ্ট হাজার দিনের মতো হয়ে যায়। 

এতোদিনের কথায় কখনো আমাদের ঝগড়া হয়নি, কোনো কারনে কেউ রাগ করলে অন্যজন নিজেকে শান্ত রাখতাম।


বেশ চলছে এভাবে হঠাৎ বাড়ি থেকে সামিহার বিয়ে দেওয়ার জন্য সামিহার বাবা অস্থির হয়ে পড়েন। 

সামিহা আমার কাছে অনেক কান্নাকাটি করে কিছু একটা করতে বলে। 

আমি তখন আন্টির (সামিহার আম্মু) সাথে কথা বলে বুঝাতে সক্ষম হই।


কিন্তু আমাকে শর্ত দেওয়া হয়েছিলো, নিজের একটা চাকরি জোগাড় করতে হবে যতদ্রুত পারি তবেই সামিহা কে বিয়ে করতে পারবো, তার আগে নয়। 

সামিহার বাবা বেকার কোনো ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দেবেনা বলে, তাহলে যে তিনি সমাজের মানুষের কাছে ছোট হয়ে যাবেন।


আমাদের বাড়িতে আব্বা, আম্মা সবাই রাজি ছিলেন 

সামিহা সুন্দরী, মেয়ে ভালো জন্য। 

অনার্স শেষ করেই একটা বেসরকারি চাকরি তে যোগদান করি। তারপর ঘরোয়া ভাবেই বিয়েটা সম্পন্ন হয় আমাদের।


বিয়ের পর একবছর ঢাকায় থাকি আমরা, জীবনের এতো প্রশান্তি, সুখ আর কখনো পাইনি আমি যতটা সামিহার সাথে থাকা কালিন পেয়েছি। একবছর পর সামিহা প্রেগন্যান্ট হলে, আমার খুশির অন্ত থাকে না। অফিসের কাজের চাপের জন্য সামিহা কে বাড়িতে রেখে আসি, এসময় ওর অনেক যত্নের প্রয়োজন বলে।


সামিহাকে বাড়িতে রেখে আসার পর আমার দিন গুলো অনেক কষ্টে কাটে। সামিহা আমার অবস্থা বুঝে ওই অবস্থায় ঢাকা আসতে চাইলে আমি বারণ করি।


সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে আমাদের এক কন্যা সন্তান পৃথিবীতে আসে। আমার আর সামিহার নামের সাথে অক্ষর মিলিয়ে মেয়ের নাম সামাহ্ রাখি। 

আগে মাসে দুই /তিন বার বাড়িতে গেলও সামাহ্ হওয়ার পর প্রতিটা সপ্তাহে বাড়িতে যেতাম।


সন্তানের প্রতি এক বাবার কতটা আত্নার সম্পর্ক, টান তা এই প্রথম বুজতে পারলাম। 

মা, মেয়েকে ছেড়ে আসার সময় কষ্টে আমার বুকের ভিতরটা কেঁদে উঠতো কিন্তু চোখ কাঁদত না ছেলে মানুষ বলে কথা। ছেলেদের এতো সহজে কাঁদতে হয়না।


ছয়মাস পর সামিহা, মেয়ে সহ ঢাকায় গেলাম। 

গাড়ি থেকে নামার পর আমি কি একটা কাজের জন্য সামিহা আর মেয়েকে রাস্তার একপাশে রেখে অন্যপাশে যাই।


অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছি আমি, সামিহা হঠাৎ সামাহ্ কে কোলে নিয়ে এপাশে আসতে চাইছে আমি হাত দিয়ে বার বার নিষেধ করছি যে আমি আসছি তোমাদের কাছে। কিন্তু সামিহা কি বুঝলো কে জানে আমার চোখের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা বাস এসে সামিহার উপর দিয়ে চলে যায়। আমি চিৎকার করে দৌড়ে ওদের কাছে আসি, মূহুর্তে সেখানে অনেক লোক জড়ো হয়। সামিহার মাথার মগজটা রাস্তায় লাফাচ্ছিলো আর সামাহ্ কে আমি দেখতে পারি নাই কোথায় হারিয়ে গেছে আমার কলিজাটা , মাথার মগজটা নিয়ে সামিহার রক্তাক্ত মাথার ভিতর রাখছিলাম আর আল্লাহ আল্লাহ বলে চিল্লাতে থাকি।


তারপর আমার আর কিছু মনে নেই, অতিরিক্ত কষ্ট সহ্য করতে না পারায় আমার ব্রেইন স্ট্রোক করে। 

বয়স কম থাকায় সেবার বেঁচে যাই কিন্তু কথা বলার শক্তি টুকু হারায় ফেলি আমি। অবশ্য আমি চাই না কথা বলতে যেখানে আমার সামিহা আর সামাহ্ নাই। 

গ্রামের বাড়ির সামনে ওদের কবর দেখে কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি আমি। 

সেসময় পরিবারের মানুষ, আম্মার কাছে অনেক মানসিক সাপোর্ট পাই।


কোনোদিন রাতে ঘুম ভাঙলে আমার বুকের ভিতরটাই ভেঙে চুরমার হতো কষ্টে, চারিদিকে হাহাকার, শূন্য লাগতো সবকিছু এতটা খারাপ লাগতো ভাষায় বুঝাতে পারবো না, গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট লাগে তখন নিজের ।


সবসময় নিজেকে ঘরবন্দী করে রাখতাম জন্য আব্বা ওনার ব্যবসার দায়িত্ব আমায় দেন, আমি কথা বলতে পারি না জন্য সবকিছু দ্রুত লিখে দিই। অল্পদিনে ব্যবসায় সফল হই, কিন্তু কষ্ট লাগে খুব বাড়ির সামনে কবর দুটো দেখে তাই সপরিবারে শহরের বাড়িতে এসে থাকা শুরু করি।


এই পাঁচ বছরে আল্লাহর রহমতে ব্যবসাটাকে সফলভাবে অনেক দুরে নিয়ে যাই।


আজ অনেক বছর পর নানার বাড়িতে গেলে একটা মেয়ে কে আমার চোখে লাগে, তার নাম আমার অজানা,,,,


এরপর আরো কয়েক পৃষ্ঠা ভর্তি লেখা আমার আচরণের কথাই লিখছেন মনেহয়, আর পড়তে পারলাম না।


আমার চোখের পানি কোনো কথা শুনছে না ডাইরির পাতা ভিজে গেছে, মানুষটার জীবনে এতো কষ্ট আর আমিও কতো অত্যাচার করেছি। ডাইরিটা বন্ধ করে, ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ওনার আনা নীল রঙের শাড়ী আর চুড়ি পড়লাম। খোঁপা করছি কিন্তু বেলি ফুলের মালা আজ কোথাও নাই, আবার চোখ থেকে পানি পড়ছে।


নিজেকে সামলিয়ে চুল খোলা রেখেই রুম থেকে বের হলাম, ওনার খোঁজে পুরো বাড়ির প্রতিটা রুম তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কিন্তু কোথাও নেই। 

এখন আমার বুকের ভিতরে ঝড় উঠছে কালবৈশাখী, যতক্ষণ খুঁজে না পাচ্ছি ওনাকে এ ঝড় থামবে না।


ছাঁদের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, হঠাৎ মনে হওয়ার দৌড়ে ছাঁদে যাই। ছাঁদের একপাশে দাঁড়িয়ে পশ্চিম আকাশের রক্তিম সূর্য দেখছিলেন তিনি।


একদৌড়ে পিছন থেকে জড়ায় ধরি ওনাকে আর কেঁদে ক্ষমা চাই আমার এতোদিনের আচরণের জন্য, তখন উনি আমার ঠোঁটে ওনার একটা আঙ্গুল রেখে চুপ করতে বলে আমায় সেই সাথে চোখের পানি মুছে দেয়। 

এপাশ ফিরে উনিও জড়িয়ে ধরে আমায় মাথায় হাত বুলায়, খোলা চুল দেখে নিজেই খোঁপা বেঁধে তাঁর বাগানের কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে গুঁজে দেয় খোঁপায় সেই সাথে আমার কপালে তার দুই ঠোঁটের আলতো ভালোবাসার ছোঁয়া দেয়।

রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প উপন্যাস

আমি আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরি তাকে, আর বলি সারাজীবন এভাবে জড়িয়ে থাকবো আপনাকে যেনো আমাদের কলিজা দু'টো মিশে এক হয়ে থাকে।


(সমাপ্ত)

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন