ট্যুর শেষে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলাতেই মা এসে পাশে বসলো।
খুব ক্লান্তি আর বিরক্তি নিয়ে মা'কে প্রশ্ন করলাম, 'কিছু বলবে মা?'
মা হাসি হাসি মুখ করে বললো, 'হ্যাঁ রে খুকি।'
বিরক্তিকর মুখ নিয়ে বললাম, 'মা! আমি বড় হয়েছি। এভাবে খুকি টুকি বলে আর ডেকো না তো। তোমার এই খুকি ডাক নিয়ে ভার্সিটিতে বন্ধুরা আমায় খুব খেপায়।'
'ও মা! এতে খেপানোর কী আছে! আর ওরা বললেই বা তুই খেপিস কেন?'
'তোমায় হাজারবার বারন করা সত্বেও তুমি খুকি বলেই ডাকো। সেদিন নিশিতা বাসায় আসার আগে কতবার বললাম যে ওর সামনে খুকি বলে ডাকবে না। কিন্তু ও যেই বাসায় এলো ওমনি তুমি ওর সামনেই বলে উঠলে, খুকি দ্যাখ নিশিতা মা চলে এসেছে।'
আমার গোমড়া মুখ দেখে মা হেসে বললো, 'আচ্ছা, ঠিক আছে। আর তোকে খুকি বলে ডাকবো না।'
'একটু বাদেই আবার তুমি ওই খুকি বলেই ডাক পাড়বে, ও আমার খুব ভালো করে জানা আছে। কী বলতে এসেছিলে, তাই বলো।'
মা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, 'তোদের ট্যুর কেমন কাটলো রে? কী কী দেখলি? কেমন মজা হলো?'
'প্রত্যেকবার ট্যুর শেষে বাসায় ফিরলেই তুমি এই একই প্রশ্নগুলো করো। মা, ট্যুরে মজা হবে বলেই তো সকলে যায়। আর বাগেরহাটের ষাট গম্বুজের ভিডিও তো তুমি টিভিতে দেখেছো।'
'সে তো দেখেছি। কিন্তু টিভিতে যেভাবে দেখায় জায়গাটা কী ওরকমই নাকি আরও বেশি সুন্দর?'
'কেন ভাইয়া তো গত মাসেই তার বন্ধুদের সঙ্গে ষাট গম্বুজ, খান জাহান আলী মাজার ঘুরে এলো। তুমি না তাকে কতো প্রশ্ন করলে, তো তোমাকে বলেনি কেমন ছিলো জায়গাগুলো?'
মলিন স্বরে মা বললো, 'খোকার কথা বাদ দে। ওকে হাজারটা প্রশ্ন করলেও ও ওই হুম, না, ভালো, হ্যাঁ এসবের মাধ্যমেই উত্তর দেয়।'
বাগেরহাট সম্পর্কে মা'কে বলা শুরু করতেই বাবা ডেকে উঠলো মা'কে।
মা তাড়াতাড়ি করে যেতে যেতে বললো, 'পরে শুনবো রে খুকি।'
'মা! আবার খুকি!'
মা কিছু না বলেই চলে গেলো। আমি চুপ করে শুয়ে রইলাম। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি আর কোচিংয়ের সুবাদে ঘোরাঘুরি হয়েছে বাংলাদেশের দর্শনীয় অনেক জায়গাতেই। পরিবারের চারজনের মধ্যে আমি, বাবা আর ভাইয়া আমরা তিনজনই ঘুরতে খুব পছন্দ করি। বাবা তার চাকুরির সুবাদে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বেশ ঘুরেছে। ভাইয়া তো যখন তখন বন্ধুদের সঙ্গে কয়েকদিনের জন্য ট্যুরে চলে যায় দূর দূরান্তে। শুধু মায়েরই সময় হয় না বাড়ি থেকে বের হয়ে কয়েক পা দূরে ফেলতে।
তবে যখনই আমি কিংবা ভাইয়া ট্যুর শেষে বাড়ি ফিরি মা এত্তগুলো প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়৷ একটার পর একটা প্রশ্ন করতে থাকে। বিরক্ত হলেও কেন যেন মায়ের সেই প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করতে পারি না। উত্তর দেওয়ার সময় মনে হয়, মা যেন ডুবে আছে কথার মাঝে। যেন সে নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছে আমার বর্ননার স্থানটা। বাবার কাছে অবশ্য সাহস করে প্রশ্ন করতে পারে না মা৷ বাবা নিজ থেকে যতটুকু বলে, ততটুকুই মন দিয়ে শুনে খুশি হয় মা৷
পাশের রুমে ভাইয়া ফোনে কথা বলছে। এমন সময় ডাইনিং রুম থেকে মায়ের ডাক, 'খেতে আয় খোকা।'
সম্ভবত ফোনের কলটা কেটে দিয়েই ভাইয়া রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে এসে বললো, 'মা, আমার বয়স কতো? আমাকে কী এখনো তোমার খোকা মনে হয়?'
আমি ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়াতেই মা হাসি চেপে বললো, 'সেদিন তো ফোনে মারিয়া তোকে খুব বাবু বাবু বলে ডাকছিলো, কই তখন তো ওকে একবারও বললি না যে তুই বড় হয়েছিস।'
ভাইয়া চোখ বড় বড় করে বললো, 'তুমি শুনলে কিভাবে?'
প্লেটে ভাত দিতে দিতে মা বললো, 'তোর ফোনের স্পিকার অন ছিলো। আমি তখন তোকে তোর রুমে ডাকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এই বাবু বাবু ডাক শুনে দরজার কাছ থেকেই ফেরত এসেছিলাম।'
ভাইয়া এবার চুপ করে রইলো৷ বাবা এসে বসতেই আলাপ শুরু হয়ে গেলো ট্যুর নিয়ে। আগামী সপ্তাহে ভাইয়া সাজেক যাচ্ছে এলাকার বন্ধুদের সঙ্গে, আজকের আলোচনা এটা নিয়েই। আমরা যখন ট্যুর নিয়ে কথা বলি মা তখন যেন ডুবে থাকে আমাদের কথার মাঝে।
কথার মাঝেই ভাইয়া মা'কে প্রশ্ন করে বসলো, 'মা, তোমার প্রিয় জায়গা কোনটা?'
বাবা হেসে বললো, 'তোর মায়ের প্রিয় স্থান হলো, রান্নাঘর।'
হেসে উঠলাম আমরা সকলে মিলে৷ মা তার অপমানটাকে উপেক্ষা করে বলে উঠলো, 'রান্নাঘর প্রিয় বলেই কিন্তু তোমরা এতো স্বাদ করে খেতে পারছো।'
খাওয়া শেষে বিছানায় গা এলিয়ে ফেসবুকের নিউজফিডে চোখ রাখতেই একটা পোস্টে দৃষ্টি স্থির হলো। মায়ের সঙ্গে মেয়ের বিশতম ট্যুর নিয়ে মেয়ের আবেগঘন পোস্ট।
পোস্টের শেষের লাইনটাতে মায়ের বলা একটা কথা লেখা ছিলো, 'ছোট্ট রান্নাঘরের চার দেয়ালের মাঝ থেকে বোঝাই যায় না পৃথিবীটা এত্ত বড়।'
কথাটা আঘাত করলো মস্তিষ্কে। মায়ের মুখটার কথা খুব মনে পড়তে লাগলো। এই মানুষটাও জানে না পৃথিবীটা কতোটা বড়। রান্নাঘরের চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে আবদ্ধ করে উপভোগ করতেই পারলো না, পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য। অথচ তার ভেতরেও গোপনে ছটফট করে ওঠে জানার আর দেখার ইচ্ছেরা। নিজের সবটা সময় সংসার আর আমাদের পেছনেই দিয়ে রেখেছে৷ বরাদ্দ রাখেনি নিজের জন্য একটু সময়ও। অথচ আমরা এই মানুষটার কথা চিন্তা না করেই স্বার্থপরের মতো উপভোগ করে চলছি একারাই সব আনন্দ। ভেতরে অপরাধবোধেরা জেগে উঠেছে। যত ভাবছি, ততই নিজেকে অপরাধী লাগছে। আর একটা লাইনও ভাবতে পারছি না। এপাশ ওপাশ করছি, ঘুম আসছে না৷
সারা রাতেও ঘুম আসেনি। সূর্যের আলো রুমে আসার সঙ্গেই উঠে পড়লাম। এতো সকালে হয়তো কেউ ওঠেনি। ডাইনিং রুমে পা দিতেই রান্নাঘর থেকে থালা বাটির আওয়াজ ভেসে আসলো। রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখি মা রান্না করছে।
অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, 'মা, তুমি এতো সকালে উঠলে?'
মা হেসে বললো, 'আমি তো রোজই সকালে উঠি। তোরা দেরি করে উঠিস তাই এতোদিন দেখতে পাসনি। তুই আজ এতো সকালে উঠলি কেন?'
'ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে তাই। কিন্তু তুমি এতো সকালে ওঠো কেন?'
'পাগলি মেয়ে কী বলে! কত কাজ থাকে বাসায়। সকালে না উঠলে তোরা ঘুম থেকে উঠেই টেবিলে নাস্তা সাজানো পেতিস? কাজের মেয়েটাও তো আসে বেলা করে। আর ও থাকলেও তো রান্নাবান্নার কাজটা আমাকেই করতে হয়। আমার হাতের রান্না ছাড়া তো তোরা খেতেই পারিস না।'
আমি চুপ করে রইলাম। মা রান্না করে চলছে।
আমার চুপ থাকা দেখে খানিক বাদে মা প্রশ্ন করলো, 'কিছু বলবি খুকি?'
আমি মাথা ঝুঁকালে মা বললো, 'বল।'
মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে গড়গড় করে বললাম, 'আগামী সপ্তাহে তোমায় নিয়ে বাগেরহাট যাব ঘুরতে। যাবে তো আমার সঙ্গে?'
মা হেসে উঠলো।
'কী বলিস এসব! বাগেরহাট তো গতকালই গেলি। আবার যাবি কেন?'
'তুমি তো যাওনি। তোমায় নিয়ে যাব। সংসার, সন্তান, স্বামী এসব করতে করতে তোমার সব সময় তুমি বিলিয়ে দিলে। নিজের জন্য রাখলে না একটুও। এখন আর কোনো অজুহাত টেনে বের করো না দয়া করে।'
মা চুপ করে রইলো। আমি আবার বললাম, 'মা যাবে তো?'
'খোকা আর তোর বাবা?'
'তারা গেলে যেতে পারে। আর না গেলে তুমি আর আমি। এবার তোমার সঙ্গে পৃথিবী দেখবো মা।'
মা হেসে উঠলো। এই হাসিতে আমি তার মৃতপ্রায় ইচ্ছেগুলোর বেঁচে ওঠা দেখতে পেলাম। তার চোখে চকচক করছে জলেরা।
ছলছল চোখে মায়ের হাতের মধ্যে আমার হাতটা গুঁজে দিয়ে বললাম, 'এবারের ঘোরাঘুরিতে মা এবং খুকি। খুব মজা হবে তাই না মা?'
মা একগাল হেসে মাথা ঝুঁকে বললো, 'হ্যাঁ রে খুকি।'
"সমাপ্ত"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন