মধ্যবিত্তের দায় - ভালোবাসার গল্প

একটু পর নাটক শুরু হবে। অয়োময়।

আব্বা এশার নামাজ শেষ করে দীর্ঘ একটা মোনাজাত করেন। আজ মোনাজাত দীর্ঘ করলেন না। তিনি নামাজ শেষে অল্প সময় মোনাজাত করে টিভির সামনে এসে বসলেন। আমি, পলাশ আর বিনু আগে থেকেই টিভির সামনে বসে আছি। আব্বা পলাশকে ইশারা করলেন টিভির সুইচ অন করতে। চৌদ্দ ইঞ্চি সাদাকালো টিভি। এই টিভির সুইচ একটু নষ্ট। একমাত্র পলাশই এই সুইচ কেমন করে জানি অন করে। টিভির সুইচ আরেকজন অন করতে পারত সে হলো বড়ো বু। মানে আমাদের বড়ো আপা। তার বিয়ে হয়েছে সাত মাস হলো। বড়ো বু চলে যাওয়ার পর এই দায়িত্ব এখন পলাশের কাঁধে। আব্বা টিভি অন করার সময় পলাশকে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বলে ডাকেন। আব্বা বলেন, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এবার টিভিটা অন করেন দেখি।

পলাশ হাসি হাসি মুখ করে কী সব করে টিভি অন করে ফেলে। তাকে দেখে মনে হয় বিশাল এক দায়িত্ব সে পালন করছে। মাত্র সেভেনে পড়ে। আমি নাইনে পড়েও তার এই সুইচ টিপাটিপির কিছুই যেন বুঝলাম না।

নাটক শুরু হতে আরও কিছুক্ষণ সময় বাকি আছে। এখন রূপসা স্যান্ডেলের বিজ্ঞাপন হচ্ছে। লাল, সাদা, নীল স্যান্ডেল। আমি এই স্যান্ডেল পরেই স্কুলে যাই। রূপসা স্যান্ডেলের এই বিজ্ঞাপন দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তারচেয়ে বেশি ভালো লাগে যখন ঠিক আমার মতো স্যান্ডেল টিভিতে দেখায়। আমার স্যান্ডেল টিভিতে দেখাচ্ছে। ভীষণ এক ভালো লাগা কাজ করে।

নাটক শুরুর ঘোষণা দিলেন উপস্থাপিকা। এমন সময় বাসায় ঢুকল আমার ছোটোমামা। তাকে দেখে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। ঘরে ঢুকে ধমকের সুরে আমাকে বলল, অ্যাই, টিভি বন্ধ কর।

আমি যেই নাটকের কথা বললাম অমনি আমার গালে একটা চড় দিয়ে বলল, চাপকায়ে পিঠের চামড়া তুলে ফেলব হারামজাদা। সব শেষ হয়ে গেল আর তুই আসলি নাটক দেখতে। কথাটা শেষ করেই ছোটোমামা কেমন করে যেন কেঁদে উঠল।

আমরা সবাই এবার ভয় পেয়ে গেলাম। ছোটোমামার কান্নার আওয়াজ শুনে আম্মা ভেতরের রুম থেকে দৌড়ে এলেন। আব্বা ছোটোমামাকে টেনে নিয়ে গেলেন ভেতরের রুমে। ছোটো মামা ফোঁপাচ্ছে। কান্নায় তার মুখে কথা বেরুচ্ছে না। আমরা সবাই মামার দিকে তাকিয়ে আছি। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর মামা বলল, আমাদের বড়ো বু মানে শিমু আপার স্বামী মারা গেছেন। রাজবাড়ি সদরে তার ফার্মেসির দোকান । দোকান থেকে সাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন। ফেরার পথে একটা পাটবোঝাই ট্রাক তাকে চাপা দিয়েছে।

মামার কথা শুনে আম্মা হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠলেন। আম্মা খুব চাপাস্বভাবের মানুষ। তাকে খুব একটা কান্নাকাটি করতে কেউ দেখি নি। কিন্তু বড়ো বুর কথাটা শুনে তিনি খুব ভেঙে পড়লেন। আব্বা কিছু বলছেন না। তিনি মামার সামনে থেকে উঠে টিভির রুমে আগের চেয়ারটাতে গিয়ে বসলেন। আম্মার সাথে বিনু আর পলাশও কাঁদছে। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। আমি আব্বার পাশে দাঁড়িয়ে আছি।

আমার আব্বা আজিজুল হক। ফুলতলি বাজার পার হলেই একটা ছোটো জুটমিল আছে। আব্বা সেই জুট মিলের হিসাবরক্ষক। খুব সামান্য বেতনের চাকরি। হিসাব করে সংসার চালান। আমাদের সংসারের খরচ, খাওয়া দাওয়া আর পড়ালেখার খরচ চালাতে দিন দিন তিনি ভীষণ হাঁপিয়ে উঠছেন। সাত মাস আগে বড়ো বু’র বিয়ে দিলেন অনেক কষ্টে। হাতে জমানো কোনো টাকা পয়সা নেই কিন্তু ছেলেপক্ষ আর ছোটো মামার জোরাজুরিতে আব্বা রাজি হলেন। ধার-দেনা নিয়ে বিয়ের আয়োজন করলেন। উপায়ও ছিল না। বড়ো বু’র কানের সমস্যা। কানে কম শোনেন। পাত্রপক্ষ জানার পরও রাজি। বড়ো বু’র বিয়ে নিয়ে আব্বা খুব চিন্তায় ছিলেন। তাছাড়া হঠাৎ এমন পাত্র পেয়ে আব্বাও হাতছাড়া করতে সাহস পেলেন না। ফুলতলি বাজারের মিজান কাকার কাছ থেকে টাকা ধার করে বিয়ে হলো বড়ো বু’র। এখনো কিছু টাকা শোধ করা হয়নি। মিজান কাকা প্রায় বাসায় এসে বসে থাকেন টাকার জন্য। আব্বার ভীষণ লজ্জা লাগে। লজ্জায় মাঝে মাঝে তিনি লুকিয়ে থাকেন। আমার তখন ভীষণ কষ্ট হয়। ইচ্ছে করে এত এত টাকা নিয়ে আব্বার হাতে দিয়ে বলি, চলেন আব্বা আজ মিজান কাকার সব টাকা শোধ করে দিব। আপনাকে আর লুকিয়ে থাকতে হবে না। আপনি তো কখনো মিথ্যা কথা বলেন না, চুরি করেন নি, তবে আপনি কেন লুকিয়ে থাকবেন। ফেরার পথে আব্বাকে নিয়ে ফুলতলি বাজার হয়ে যাব। আব্বার জন্য বড়ো দেখে একটা খাসির মাথা কিনব। আব্বা খাসির মাথা খেতে ভীষণ ভালোবাসেন। হ্যাঁ, সব সময়, সব সময় আমার মনে হয়েছে আমার কখনো সুযোগ হলে প্রথম কাজটি হবে আব্বার জন্য খাসির মাথা কেনা। খাসির মাথা আমারও ভীষণ প্রিয়। আম্মা খাসির মাথা খুব ভালো রাঁধেন। যেদিন খাসির মাথা রান্না হয় সেদিন আমি পেট ফুলিয়ে ভাত খাই। আমার খাওয়া দেখে বিনু বলে, আর ভাত খাস না। দেখবি পেট ফুটে যাবে।

দুলাভাই মারা যাওয়ার দু’মাস পর বড়ো বু স্থায়ীভাবে ফিরে এলেন আমাদের বাসায়। বড়ো বু’র জন্য আমার খুব মায়া হয়। আব্বার জন্যও খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাদের বাসাটা কেমনজানি হয়ে গেল। আব্বা তো খুব ছোটো একটা চাকরি করেন। তারপরও আমরা ভীষণ সুখী ছিলাম। এত অভাব অনটনের মাঝেও সবাই একসাথে বসে যখন টিভিতে রূপসা স্যান্ডেলের বিজ্ঞাপন দেখতাম তখন মনে হতো আমাদের আর কিছুর প্রয়োজন নেই। তখন শুধু মনে হতো, ইশ, টিভির ওই সুইচটা যদি একটু ঠিক থাকত।

আস্তে আস্তে আমরা সবাই পাল্টে যেতে শুরু করেছি। পলাশ আর টিভির সুইচে হাত দিতে চায় না। কতদিন হলো অয়োময় নাটক দেখি না। বড়ো বু কারও সাথে তেমন কথাবার্তা বলেন না। সারাদিন মায়ের সাথে রান্নাঘরে বসে থাকেন। আব্বা চুপচাপ থাকেন। মনে হচ্ছে এই কয় মাসে আব্বার বয়স অনেক বেড়ে গেছে।

আগে আব্বা প্রায় সন্ধ্যার আগে-আগে বাসায় ফিরতেন। বাসায় ফিরে পলাশ আর আমাকে অঙ্ক পড়াতেন। কী সুন্দর করে যে আব্বা পাটিগণিত বুঝাতেন। আব্বার কাছে পাটিগণিত করলে মনে হতো অঙ্ক হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ পড়া। আমরা সব ভাইবোন স্কুলে অঙ্কে ফার্স্ট হতাম। কিন্তু বড়ো বু’র স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে আব্বা রোজ দেরি করে বাসায় ফিরেন। প্রায় দিন এশার নামাজ শেষ করে আসেন। বাসায় এসে খেতে বসেন। খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে চলে যান। এই কয়দিন আব্বাকে শুধু একটা কথা বলতে শুনেছি তা হলো, শিমু ঠিকমত খেয়েছে?

আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা চলছে। সকালে আম্মার চিৎকারে ঘুম ভাঙলো। দৌড়ে বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখি আমাদের আমগাছটায় বড়ো বু’র লাশ ঝুলছে। লোকজন এসে বড়ো বু’র লাশ নামাল। আমি কী করব বুঝতে পারছি না।

আমার অঙ্ক পরীক্ষা। পরীক্ষা আর দেওয়া হলো না। বড়ো বুর লাশ রাখা হয়েছে বাড়ির সামনে। আব্বা লাশের পাশে বসে খুব স্বাভাবিকভাবে কোরআন তেলাওয়াত করছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না বিশেষ কিছু হয়েছে। বড়ো বু’কে আব্বা খুব ভালোবাসতেন। পলাশকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিনু আম্মার সাথে বসে কাঁদছে।

আমি বসে আছি বাড়ির পেছনে আমগাছটার নিচে। এই গাছটা বড়ো বু’র হাতে লাগানো। গাছটায় কখনো আম ধরেনি। বড়ো বু বলত বেটা আমগাছ। এই গাছে আম ধরবে না। সবার গাছে যখন এত এত আমের মুকুল হতো তখন আমার খুব রাগ হতো। রেগে গিয়ে আমি আম গাছটা কাটতে চাইলে বড়ো বু বলত, ধুর বোকা এভাবে কেউ গাছ কাটে? এতে গাছের কষ্ট হবে। সবকিছুর একটা দায় থাকে। এই গাছেরও একটা দায় আছে। দেখবি একদিন না একদিন এই গাছ থেকে ফল আসবে।

বড়ো বু’র কথা তখন আমি কিছুই বুঝিনি। তবে এখন বুঝি। স্বল্প চাওয়া পাওয়া নিয়ে বেঁচে থাকা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোর দায় নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন। বড়ো বু উপলব্ধি করেছিলেন সহজ সরল আর খুব অল্প চাওয়া পাওয়া নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর পরিবারে তিনি দায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এই দায় সে নিজের কাঁধে নিতে চেয়েছেন।

বড়ো বু মারা যাওয়ার ঠিক মাসখানেক পরে আম গাছটা এমনি এমনি মরে গেল। বড়ো বু মারা যাওয়ার পর আমার অনেকবার রাগ হয়েছে। ইচ্ছে হয়েছে গাছটা কেটে ফেলি কিন্তু বড়ো বু’র সেই কথা খুব মনে পড়ত। গাছটা মরে যাওয়ার পর মনে হলো এই গাছটাও বুঝি দায়মুক্ত হলো।

আমাদের মতো মধ্যবিত্তের মানুষের দায় এড়ানো ভীষণ কঠিন। অনন্তকালের জন্য বড়ো বু’র কাছে অদৃশ্য এক দায়ের সুতোয় আটকে গেলাম আমরা।

"সমাপ্ত"

 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন