![]() |
| ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস। |
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।
চারদিকে আবছা ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।অন্ধকারের রেশ এখনও রয়ে গেছে কিছুটা।প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এই স্নিগ্ধ সকালের সময়টুকু।মন ভালো করার এক অব্যর্থ ঔষধ।চারদিকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে।কাব্যের ঘুম অনেক আগেই ভেঙেছে।ফজরের নামাজ পড়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসলো সে।ছাদে কিছু কবুতর হেঁটে বেড়াচ্ছে।বেশ ভালো লাগলো কাব্যের।মনে হয়,খাবারের খোঁজ করছে কবুতরগুলো।কাব্য বাসায় ঢুকে কৌটা থেকে এক মুঠো মুড়ি নিয়ে এসে ছাদে ছিটিয়ে দিল।কবুতরগুলোও যেন অপেক্ষা করছিল কাব্যের জন্য।খাবার দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল সেগুলো।বাগবাকম বাগবাকম শব্দে যেন কাব্যের প্রতি কৃতজ্ঞতার জানান দিচ্ছিল।খাওয়া শেষে উড়ে চলে গেল কবুতরগুলো।কাব্য উড়ে যাওয়া দেখে মুচকি হেসে উঠল।অস্ফুট স্বরে বলল,কি সুন্দর দৃশ্য!
ভালোবাসার গল্প ছবি
পান্জাবির পকেট থেকে চশমা বের করে চোখে পড়ল কাব্য।কাব্যের ধারনা,চশমা পড়লে তাকে বোকা বোকা লাগে।একবার কাব্যের গণিতের শিক্ষক পরিমল দত্ত ক্লাসে সবার সামনে বলেছিল,এই বোকা ছেলে,এই অংকটা করে দিতে পারবে?কথাটা শুনে ক্লাসের সবাই বেশ জোরে হেসে উঠেছিল।কাব্যের তখন লজ্জায় মাথা কাটা যায়।শিউলির দিকে তাকিয়ে দেখে,মেয়েটিও মুচকি মুচকি হাসছে কাব্যের দিকে।শিউলির প্রতি কাব্যের আলাদা ভালো লাগা কাজ করতো।কিন্তু ভয়ে সে কথা বলতে পারেনি কাব্য।এসএসসি পরীক্ষার পর শিউলির বিয়ে হয়ে যায়।তবে অদ্ভুদ হলেও সত্য,শিউলির বিয়ের কথা শুনে কাব্যের একটু খারাপ লাগে নি।বরং গ্রামের সবার সাথে কনেপক্ষে বেশ মজা করেছিল সে।সেগুলো অনেক পুরানো কথা।কাব্যের ধারণা,শিউলির প্রতি ভালো লাগা কাজ করতো,ভালোবাসা নয়।তাই হয়তো বিয়ের কথা শুনে খারাপ লাগেনি অতটা।
কাব্য হাঁটতে হাঁটতে ছাদের রেলিং এর পাশে এসে দাঁড়ালো।ছাদের রেলিং-এ হাত রাখবে এমন সময়ে বুকটা ধুক করে উঠল গতকাল রাতের ঘটনা মনে পড়তেই।মাঝরাতে ঘুম ভাঙা,তারপর সেই সুরেলা মিষ্টি কন্ঠে গান ভেসে আসা।কাব্য লক্ষ্য করলো,সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে,গতকাল সেই মেয়েটিও ঠিক এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল।বাতাসে মেয়েটির চুল উড়ছিল।তবে মুখখানা ভালো করে দেখতে পায়নি কাব্য।কাব্য ভাবছে,আচ্ছা মেয়েটি কি অতি রূপবতী হবে?শুনেছি,রূপবতীদের কন্ঠ অতটা সুরেলা হয়না।সৃষ্টিকর্তা তাদের রূপ দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়ে বলে,রূপই হবে তোমার গুণ।রূপ দিয়ে তুমি পৃথিবী জয় করতে পারবে।আর কোনো সুযোগ তোমাকে দেয়া হবে না।
গেট খোলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে কাব্য নিচে তাকালো।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ সাদা টি-শার্ট পড়ে কোথাও বের হচ্ছেন।লোকটার বয়স হলেও শার্ট পড়লে এখনও কেমন তরুণ দেখায়!বেশ রসিক মানুষ বটে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ উপরে তাকিয়ে দেখতে পেলেন,কাব্য তার দিকে তাকিয়ে আছে।
-কি ব্যাপার,কাব্য সাহেব,এত সকালে ছাদে?হুম বুঝেছি,ভোরের সৌন্দর্য দেখতে উঠেছেন বুঝি,জিজ্ঞেস করলেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
-জ্বি চাচা,অনেক দিনের অভ্যাস।ফজরের নামাজ পড়ে বাইরে একটু হাঁটাহাঁটি করতে হয়,বলল কাব্য।
-তা বেশ,এখনকার ছেলে-ছোখরাগুলো তো দুপুরের আগে ঘুম থেকে উঠতেই চায় না।তা শুনো,আমি একটু বের হবো।জমির ব্যাপারে একটু গাজীপুর যেতে হবে।ফিরতে ফিরতে বিকেল হতে পারে।বুঝতেই পারছো,সবকিছু আমাকেই দেখতে হয়।তোমার কিছু দরকার হলে বাসায় ফুলি আছে,ফুলিকে বলবে।মেয়েটা বেশ কাজের,বলল ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
-আচ্ছা চাচা,আপনি চিন্তা করবেন না,বলল কাব্য।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ গেট থেকে বেরিয়ে একবার ডানে তাকালেন।তারপর বেশ হাক ছেড়ে একটা রিকশাকে আঙুলের ইশারায় ডাক দিলেন।দর-দাম না জিজ্ঞেস করে উঠে পড়লেন রিকশায়।কাব্য সেদিকে একবার তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,বয়স বাড়লে কত কষ্ট।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল সকাল ৭ টা বাজতে চলেছে।কাব্যের সকাল থেকে এখনও কিছুই খাওয়া হয়নি।বাসায় ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়ালো কাব্য।চোখ থেকে চশমা খুলে বিছানায় রেখে দিল।বাইরে যাওয়ার সময় চশমা পড়বে না।চিরনি নিয়ে এলোমেলো চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে চিরনি রেখে দিল।ছোট্ট টুলে রাখা চাবি পান্জাবির পকেটে রেখে হাতে তালা নিল।দরজা টেনে বাইরে বের হতেই আবার কি মনে করে বাসায় ঢুকলো।বিছানা থেকে চশমা নিয়ে দরজায় তালা মেরে বেরিয়ে পড়ল বাসা থেকে।ভালোবাসার গল্প ছবি
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।
সকাল সাতটা মানে শহরে অনেক সময়।জ্যাম থেকে রেহাই পেতে অনেকে কোনোমতে দু'গ্রাস খেয়ে বেরিয়ে পড়ে বাসা থেকে।গার্মেন্টসে চাকরিরত মানুষগুলোর ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো।কাব্য হাঁটছে রাস্তা ধরে।এই সকালে এত মানুষ দেখে কাব্য বিস্মিত!মাঝেমাঝে গাড়ির হর্নের আওয়াজে কানে তালা লাগার জোগান।হঠাৎ একটি লোকের সঙ্গে বেশ জোরে ধাক্কা লাগল কাব্যের।লোকটি চেঁচিয়ে বলল,চোখ কই নিয়ে হাঁটেন?কাব্য কিছু না বলে আবার হাঁটতে শুরু করল।লোকটি মনে হয় ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছে।হ্যাংলা করে শরীর,সামনের দাঁত ফাঁকা।কিন্তু এমনভাবে ধাক্কা খেল কেন বুঝতে পারছে না!যদিও দোষটি লোকটির।কিন্তু নিজেই আমার উপর চেঁচিয়ে উঠল।একটা চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো কাব্য।বিশাল এক গাছের নিচে দোকানটি দাঁড়িয়ে।উপরে ছাউনি,পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা।দোকানের ভেতরে মাঝবয়সী একজন লোক বসে আছে উদাস ভঙ্গিতে।সামনে সদ্য পানিতে ধোয়া চায়ের কাপ।এখনও মনে হয়,দোকানে কেউ আসেনি।গাছের সাথে ঘেঁষা বেঞ্চের নিচে কালো একটি কুকুর বসে আছে।মনে হয়,লোকটির পোষা কুকুর।মাঝেমাঝে কুঁইকুঁই করে আওয়াজ করে আবার মাথাটা নিচু করে শুয়ে থাকে।কাব্য বেঞ্চে গিয়ে বসতেই লোকটির মুখে হাসি ফুটে উঠল।বলল,ভাই চা দিবো?সঙ্গে কি খাবেন?
-আপনার নাম কি ভাই?দোকানটা বেশ ভালো লাগল,বলল কাব্য।
লোকটি মনে হয় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।চায়ের দোকানে মানুষ আসবে চা খেতে।নাম জেনে কি করবে?নাম দিয়ে কি পেট ভরবে,নাকি সংসার চলবে?কাস্টমার হলো দোকানের লক্ষী।হাতের লক্ষী পায়ে নেয়ার কোনো দরকার নেই ভেবে লোকটি নিজের জামার কলার টেনে বলল,আমার নাম মোঃ মজিদ।তবে সবাই মইজ্জা নামে ডাকে।
ভালোবাসার গল্প ছবি
-আমি আপনাকে মজিদ ভাই বলে ডাকবো।মইজ্জা নামটা বড্ড বেমানান।মজিদ ভাই,আমাকে দারুন করে এক কাপ চা বানিয়ে দেন।চিনি দিবেন এক চামচ।চায়ের সঙ্গে দুটো টোস্ট বিস্কুট একটা পিরিচে দিবেন,বলল কাব্য।
এই কথাটা শোনার অপেক্ষা যেন করছিল মজিদ নামের লোকটি।কেটলি থেকে ধোঁয়া উঠা চা,ধুঁয়ে রাখা কাপে ঢেলে আবার কেটলি আগের জায়গায় রেখে দিল।গরম গরুর দুধ ঢেলে দিল কাপে।বেশ পুরানো সাদা রঙের কোটা থেকে এক চামচ চিনি চায়ের কাপে দিয়ে চামচ দিয়ে বেশ কয়েকটা নাড়া দিয়ে হাসি দিয়ে বলল,নেন ভাই,চা বানিয়ে ফেলছি।
-বাহ,আপনি তো দেখছি বেশ দ্রুত।এই কুকুরটি কি আপনার পোঁষা?জিজ্ঞেস করল কাব্য।
পিরিচে করে টোস্ট বিস্কুট কাব্যের দিকে বাড়িয়ে দোকানদার মজিদ বলল,আমার বড্ড আদরের কুকুর।ওর নাম কালাপাহাড়।সকাল থেকে দোকানের বেঁচা নেই।কুকুরটাও খালি মুখে বসে আছে।
![]() |
| ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস। ভালোবাসার গল্প ছবি |
কাব্য বেশ কিছুক্ষন চিন্তা করে বলল,"বড্ড আজব এই দুনিয়া।মানুষকেও তার পেটের চিন্তা করতে হয়।প্রানীগুলোও সেই মানুষের দিকে চেয়ে থাকে।খাবার না পেলেও তাদের কোনো প্রতিবাদ নেই।নিরবে সহ্য করে যায়।"
পিরিচের থেকে একটা টোস্ট বিস্কুট ছুড়ে দিল কাব্য।কুকুরটি বিস্কুট কামড়ে খেতে শুরু করল।লেজ নেড়ে যেন কৃতজ্ঞতা জানান দিচ্ছে কাব্যের প্রতি।মজিদও বেশ খুশি হয়েছে।ঘামে ভেজা মুখ গামছায় মুছে আবার বসে পড়ল ছোট্ট টুলে।চা খাওয়া শেষে কাব্য উঠে দাঁড়াল।পান্জাবির পকেটে হাত দিতেই চমকে উঠল সে।পান্জাবির পকেট ছেঁড়া বেশ বড় জায়গা জুড়ে।পকেটে রাখা ১০০ টাকার নোটখানা নেই।এতক্ষনে বুঝতে পারলো,লোকটি ইচ্ছে করে কেন ধাক্কা খেতে গেল?কিন্তু অঘটন যা ঘটার ঘটে গেছে।এখন দোকানদার মজিদ অপরিচিত মানুষকে বাকিতে ছাড় দেয় কিনা সেটাই দেখার বিষয়।
কাব্য চোখ থেকে চশমা খুলে পরিষ্কার করতে করতে বলল,মজিদ ভাই,আমি যদি বলি আমার কাছে টাকা নেই,আপনি কি আমাকে ধরে মারবেন?
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।
এমন অদ্ভুদ কথা শোনার জন্য দোকানদার মজিদ মনে হয় তৈরি ছিল না।সে রেগে উঠবে,নাকি হাসবে ঠিক বুঝতে পারছে না।বলল,মানে,ভাই ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা!
-মানে আসার সময় পান্জাবির পকেটে করে ১০০ টাকার একটা নোট নিয়ে এসেছিলাম।মাঝপথে আসার পর একটা হ্যাংলা মত দেখতে লোক আমার সাথে ইচ্ছে করে ধাক্কা খায়।এখন পকেটে হাত দিয়ে দেখি,পকেট ছেঁড়া,১০০ টাকার নোটও নেই।
মানুষ যখন মিথ্যা বলে তার চোখ-মুখের দিকে তাকালেই অনুমান করা যায়।কাব্যের কথা দোকানদার মজিদ বিশ্বাস করেছে।হেসে বলল,ভাই,আপনারে ভালো লোকে পাইছে।এই শহরে পকেট সাবধানে না রাখলে চলতে পারবেন না।আপনি টাকাটা সময় করে আমার দোকানে দিয়ে যাইয়েন।ভালোবাসার গল্প ছবি
-আমি ইয়াজউদ্দিন সাহেবের বাসায় তিন তলায় ভাড়া থাকি।আজকে মাত্র বাসা থেকে বের হলাম।আমি সময় করে টাকা দিয়ে যাবো।কাব্য দোকান থেকে বের হওয়ার সময় কালাপাহাড়ের মাথায় আদর করে একটা হাসি দিল।কালাপাহাড় লেজ নেড়ে বিদায় দিল কাব্যকে।
কাব্য চায়ের দোকান থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলো ডানদিকের রাস্তা ধরে।এই শহরে থাকতে হবে কয়েকটা বছর।একটু ঘুরে দেখে নেয়া ভালো।আশপপাশের পরিবেশে নিজেকে যত আপন করে নেয়া যায় ততই বেঁচে থাকতে সুবিধা হয়।একটা জায়গায় থমকে দাঁড়ালো কাব্য।সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা-"একটি কুকুরের যত্ন নেয়ার জন্য বিশেষ দক্ষতার লোক প্রয়োজন।কুকুরটি জার্মান শেপার্ড।অভিজ্ঞ লোককে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।"
লেখাটি কাব্যের কাছে বেশ অদ্ভুদ মনে হয়।কুকুরের যত্ন নেয়ার জন্য মানুষেরও প্রয়োজন হয়?অথচ এই শহরে কত মানুষ প্রতিনিয়ত অযত্ন-অবহেলায় বড় হয় তার খবর কে রাখে?
-এই যে মিস্টার,নিজেকে কি হিমু ভাবার চেষ্টা করছেন নাকি?রাস্তায় এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?
কাব্য পেছনে তাকিয়ে দেখে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।চোখে ওর মতই চশমা পড়ে আছে।তবে চশমাটি একটু স্টাইলিশ।কাব্য মেয়েটির দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলল,হিমু তো খালি পায়ে হাঁটে।আমার পায়ে জুতা।হিমুর চুল থাকে উস্কোখুসকো।কিন্তু আমার চুল সুন্দর করে আঁচড়ানো।ভালোবাসার গল্প ছবি
-হিমু সাহেবের তো দেখি বেশ কথার বুলি আছে।তা এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে ও'পাশ থেকে মানুষ যাবে কিভাবে?রাস্তায় হাঁটলে তো গাড়ি এসে সোজা উপরে পাঠিয়ে দিবে,মুচকি হেসে বলল মেয়েটি।
কাব্যের খেয়ালই ছিল না,সে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল।আর মেয়েটি কাব্যের জন্য যেতে পারছে না।কাব্য বেশ লজ্জা পেল।মাথা চুলকে বলল,সরি,আসলে একটা লেখা দেখে বেশ অদ্ভুদ লাগল।তাই খেয়াল করিনি।
-এই শহরে অনেক অদ্ভুদ জিনিস চোখে পড়বে।কিন্তু এই অদ্ভুদ জিনিসের থেকে নিজের জন্য আসল কিছু খুঁজে নিতে হয়।নাহলে পুরো জীবনই বৃথা,মুচকি হেসে মেয়েটি হাঁটতে শুরু করল।কাব্য তাকিয়ে রইল মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে।
তিন.
বাড়ির নাম শান্তিনিবাস।মিরপুর-১,ব্লক-এ।বাড়িটি বিখ্যাত শিল্পপতি সাজ্জাদ জহিরের।শান্তিনিবাস নাম হলেও গত কয়েক বছর এই বাড়িতে শান্তি বিরাজ করছে কিনা তা শান্তিনিবাসের দারোয়ান মকবুল আলীও বলতে পারেনা।কাজের মেয়ে ঝরিনা,মাঝেমাঝে চিন্তা করে,এই বাড়িটির নাম শান্তিনিবাস রাখলো কে?লোকটির মাথা কি গোবর দিয়ে ভরা নাকি?নাম রাখার দরকার ছিল অশান্তি নিবাস।
সাজ্জাদ জহির বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছেন।সঙ্গে চুরুট টানছেন আপন মনে।ভাবখানা এমন,এই জগতে একটি মাত্র মানুষ আছে সে হচ্ছে তিনি।আশেপাশে কি ঘটছে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।টেবিলের থেকে প্লেট পড়ার শব্দ কানে আসল সাজ্জাদ জহিরের।পেছনে তাকিয়ে দেখল,একটি বিড়াল টেবিলের উপর ম্যাঁউ ম্যাঁউ করছে।পাত্তা না দিয়ে আবার পত্রিকা পড়াতে মনোযোগ দিলেন তিনি।ভালোবাসার গল্প ছবি
ওনার স্ত্রী সেলিনা হাসান এসে দাঁড়ালেন বারান্দায়।গোলাপি কালারের শাড়ি পড়ে আছে।চুলগুলো একপাশে খোঁপায় বাঁধা।স্বামীর এমন গা ছাড়া ভাব দেখে তিনি বেশ বিরক্ত।নিজেকে সামলে বললেন,এই শুনো,আমি বের হচ্ছি।ফ্রিজে খাবার রাখা আছে।ঝরিনাকে বললে গরম করে দিবে।
সাজ্জাদ জহির পেছনে না তাকিয়ে মুখ থেকে চুরুট বের করে বললেন,হুম যাও।আমাকে না বললেও চলবে।
সেলিনা হাসানের টেবিলের দিকে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলেন।পুরো টেবিলে খাবার ছড়ানো।মেঝেতে ভাঙা কাঁচের প্লেট পড়ে আছে।চিৎকার দিয়ে বললেন,এই এসব কি?টেবিল এমন নোংরা করেছে কে?
সাজ্জাদ জহির স্বাভাবিকভাবে বললেন,বিড়াল করেছে।এমন ভাবখানা,বিড়াল টেবিল নোংরা করবে বিষয়টা স্বাভাবিক।
ভালোবাসার গল্প ছবি
-তুমি বারান্দায় বসে থাকতে বিড়াল বাসায় ঢুকে টেবিল কিভাবে নোংরা করে?কাঁচের প্লেট পর্যন্ত ভেঙে ফেলছে,রেগে বললেন মিসেস জহির।
-আহ!বিড়ালের দিকে নজর রাখাও কি আমার কাজ?সারাদিন অফিসের ঝামেলা শেষ করে বাসায় একটু শান্তিমতো পত্রিকাও পড়তে দিবে না নাকি?বিরক্ত হয়ে বললেন,সাজ্জাদ জহির।
-হুম,তুমি শুধু অফিসে কাজ করো তাই না?আর আমি তো বাসায় বসে টিভি দেখি,কথাটা বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেল মিসেস জহির।
সাজ্জাদ জহির পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে, ওনার স্ত্রী চলে গেছে।এই ঝরিনা,টেবিলের ম্যাট পরিষ্কার করে রুমটা ঠিক করে দে,মুখে চুরুট দিয়ে আবার পত্রিকা পড়ায় মনোযোগ দিলেন তিনি।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ইয়াজউদ্দিন সাহেব দেখলেন,ফুলি প্লেট হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে আছে ফুলির।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ফুলির দিকে এগিয়ে এসে বললেন,কি ব্যাপার,এই সন্ধ্যাবেলা প্লেট হাতে নিয়ে বারান্দায় কেন?ভালোবাসার গল্প ছবি
-খালুজান রাসেল ভাইয়ার রুমের দরজা খুলতে ভয় লাগে।গতকাল দরজা খোলার পর বলছিল,আমারে নাকি কামড় দিবে।তাই আপনের জন্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি,বলল ফুলি।
-তোদের নিয়ে তো আর পারলাম না।এই বয়সে কত জায়গায় সামলাবো আর?শরীর তো কুলায় না।দেখি,তোকে কে কামড় দেয়?
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ পায়ের থেকে জুতা খুলে সিড়ির পাশে রাখলেন।ফুলি প্লেট হাতে নিয়ে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের পেছন পেছন আসছে।মেয়েটি এখনও ভয় পেয়ে আছে।ইয়াজউদ্দিন সাহেব রাসেলের রুমের সামনে এসে সুইচে চাপ দিলেন।ভেতরে লাইট জ্বলে উঠল।কিন্তু রাসেলের কোনো আওয়াজ আসছে না ভেতর থেকে।তিনি দরজার পাশে থাকা বেঁতের লাঠি হাতে নিয়ে দরজার তালা খুললেন।খোলার সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পেলেন,রাসেল প্লাস্টিকের চেয়ার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।তিনি বেশ ভয় পেলেন।আজ যদি ফুলি দরজা খুলতে আসতো,নির্ঘাত ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যেত।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেকে সামলে লাঠি উঁচিয়ে বেশ রেগে বললেন,এই ছেলে,চেয়ার রাখো বলছি।নাহলে কিন্তু খুব মারবো বলে দিলাম।ভালোবাসার গল্প ছবি
-ওই বজ্জাত মেয়েটার মাথা ভেঙে ফেলবো।আমাকে রুমে আটকে রাখে।খেতে দেয় না,রেগে বলল রাসেল।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ পেছনে ফিরে ফুলির দিকে তাকিয়ে বললেন,তুই দুপুরে রাসেলকে খাবার দেস নাই?
ফুলি মাথা নিঁচু করে বললো,কেমনে দিমু খালুজান?দরজা খুললে বলে,কামড় দিবো।তাই আমি ভয়ে খাবার দিতে আসি নাই।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ রাসেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,ওকে আমি খুব বকা দিবো।তুমি এখন এই খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।আমি রাতে এসে তোমার সাথে কথা বলবো।
রাসেল হাত থেকে চেয়ার রেখে সেখানে বসে পড়ে।ফুলি ভয়ে ভয়ে রুমের ভেতরে ঢুকে প্লেট আর পানির গ্লাস টেবিলের উপর রেখে বেরিয়ে আসে রুম থেকে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দরজায় তালা মেরে দেন।মাগরিবের আযান পড়েছে অনেকক্ষন হয়ে গেছে।তিনি পকেট থেকে টুপি বের করে ভেতরে চলে গেলেন।ভালোবাসার গল্প ছবি
বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল কাব্যের।হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গিয়েছিল।পকেট ফাঁকা থাকায় আসার পথ হেঁটেই আসতে হলো।ফেরার পথে দোকানদার মজিদের দোকানের সামনে দিয়ে আসার সময় বেশ ভিড় ছিল।লোকটার মুখে যেন জোৎস্নার আলো কেউ মাখিয়ে দিয়ে গেছে।হাসতে হাসতে কাব্যের দিকে তাকিয়ে বলল,ভাই,আজকে আপনার দোআতে সারাদিনে খুব বিক্রি হইছে।কাব্য মজিদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সোজা বাসার দিকে চলে আসে।কাব্যের শরীর খুব ক্লান্ত লাগছে।পা খুব ব্যাথা করছে।দুপুরে রান্না করা আলুভাজি গরম করে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়।বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখে ঘুম এসে ভিড় করল।
আবারও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল কাব্যের।কানে ভেসে আসল সেই সুরেলা কন্ঠ-
"সখী ভাবনা কাহারে বলে
সখী যাতনা কাহারে বলে
তোমরা যে বলো দিবস রজনী,ভালোবাসা
সখী ভালোবাসা কারে কয়"
![]() |
| ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস। ভালোবাসার গল্প ছবি |
কাব্য বিছানা থেকে উঠে চোখে চশমা পড়লো।জানালার পর্দা সরাতেই দেখতে পেল,গতকালের সেই মেয়েটি।আজও শাড়ি পড়ে আছে।কাব্য জানালা খুলে বলল,এই যে শুনছেন?
হঠাৎ গান থেমে গেল।মেয়েটি পিছনে ফিরে হাঁটতে শুরু করল।কাব্য আর দেরি না করে দরজা খুলে বাইরে আসল।কিন্তু ছাদে কেউ নেই।দৌঁড়ে সিড়িতে এসে দেখে,সেখানে কারও ছায়াও নেই।এত তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া সম্ভব?ভাবতে লাগল কাব্য।বুঝতে পারছে না,মেয়েটি এত লুকোচুরি করছে কেন কাব্যের সাথে?
কাব্য অনেকক্ষন ছাদে পায়ছারি করে ভেতরে চলে গেল।কাল মেডিকেলে প্রথম ক্লাস।সকাল সকাল উঠতে হবে।কেটে গেল আরও একটি রহস্যময় রাত।
..........চলবে........
written by Habib Khan Hridoy



إرسال تعليق