চিলেকোঠার প্রেম পর্বঃ- ৫ (ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস)

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস


ইয়াজউদ্দিন আহমেদের বাড়ির সামনে একটি সাদা প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে।ড্রাইভার সমানে হর্ন দিয়ে যাচ্ছে কেউ যেন ভেতর থেকে গেইট খুলে দেয়।কিন্তু কারও কোনো সাড়া শব্দ নেই।ড্রাইভার বেশ বিরক্ত হয়ে পেছনে তাকালো।কিন্তু পেছন থেকে সাড়া না পেয়ে আবার হর্ন বাজাচ্ছে।না,এখনও কেউ গেইট খুলে দেয়নি।ড্রাইভার লোকটা বেশ বিরক্ত মুখে বলল,এই বাড়িতে দারোয়ান নেই?ভালোবাসার গল্প

পেছন থেকে একজন মেয়ে কন্ঠ বলল,এই বাড়িতে দারোয়ান নেই।শুধু একটা কাজের মেয়ে আছে,নাম ফুলি।ফুলি কখনো গেইট খুলে দিবে না।মেয়েটা একটু মুখচোরা স্বভাবের।তবে ফুলি খুব ভালো মেয়ে।

ড্রাইভার লোকটা বুঝতে পারল,গাড়িতে বসে থাকলে কোনো লাভ হবে না।রাস্তাটা এমনিতে বেশ সরু।গাড়ি এখানে রাখলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে।পরে মানুষ এসে গায়েও হাত তুলতে পারে,কোনো নিশ্চয়তা নেই।আট ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে এখানে এসেছি।বাড়ির ভেতরে বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর বের হতে হবে।বেশ বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নামল ড্রাইভার লোকটা।গাড়ির দরজা বন্ধ করে ইয়াজউদ্দিন সাহেবের গেইটে ঢুকে দেখতে পেল,তালা লাগানো নেই।লোকটি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।গেইটে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতেই যেন দম বেরিয়ে যাওয়ার যোগান।গেইটের চাঁকাগুলো শক্ত হয়ে আছে।অনেকদিন গেইট খোলা হয়না বোধহয়।ময়লা জমে আছে ফাঁক-ফোকরে।ড্রাইভার লোকটা বিড়বিড় করে বলল,সালার কি বিপদে যে পড়লাম।এখন কি গেইটও পরিষ্কার করা লাগবে নাকি?
আশপাশ থেকে খুঁজে একটা লাঠি নিয়ে ময়লা জমে যাওয়া অংশ পরিষ্কার করতে শুরু করল ড্রাইভার লোকটি।হাত থেকে লাঠি ফেলে দুহাতে খুব সহজে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল গেইট।ড্রাইভার লোকটার মুখে হাসি ফুটে উঠল,যেন বড় কোনো কাজে সফল হয়েছে সে।গাড়ির দরজা খুলে স্টার্ট দিতেই ভেতর থেকে হাত তালির শব্দ শোনা গেল।ড্রাইভার লোকটা গাড়ি নিয়ে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।গাড়ি থেকে প্রথমে নেমে আসল একটা মেয়ে।বয়স ছয় বছর অনুমান করা যায়।চুলগুলো সোনালি রঙের।দেখতে ইংরেজ বাচ্চার মতো।মেয়েটির হাতে একটি মাঝারি ধরনের পুতুল।হাত বুলিয়ে পুতুলকে বলছে,অ্যারাইবা,এটা আমার নানু ভাই এর বাসা।তুমি কি বাংলা বুঝতে পারো?আচ্ছা ইংরেজীতে বলছি,Araiba,This is my grandfather's house.মেয়েটি কি মনে করে খিলখিল করে হেসে উঠল।মনে হয় পুতুলটি তার কথার জবাব দিয়েছে।

তারপর গাড়ি থেকে নেমে আসল একটি মাঝবয়সী মেয়ে।চুলগুলো বেশ লম্বা।শাড়ি পড়ে আছে।মেয়েটির কোলে একটি বাচ্চা মেয়ে।মেয়েটির বয়স চার বছর।তবে চুলগুলো কালো রঙের।মেয়েটির মুখে একটি চকলেট গুঁজে দেয়া।মুখের চারপাশে চকলেট লেগে আছে।সামনের দাঁতগুলো নেই।

-এই তুলি আপা,বাবা কি বাসা নেই রে?কখন থেকে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।অথচ বাবা এখনও বাসা থেকে বের হয়নি,গাড়ি থেকে নেমে আসল চশমা পড়া একটি মেয়ে।জিন্স প্যান্ট আর জামা পড়ে আছে।বেশ খুশি মনে হচ্ছে মেয়েটিকে।বিরক্ত হয়ে বলল,উফফ কি রোদ,দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।

-তুবা,আসতে না আসতেই তোর শুরু হয়ে গেল।একটু ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাক না।তোর মেয়ে আয়রা তো আমার কোলে চুপ করে বসে আছে।দাঁড়া,ফুলিকে ডাক দিয়ে দেখি,মেয়েটা কই আছে।এই ফুলি,জোরে ডাক দিল তুলি।ভালোবাসার গল্প

তুবা দাঁড়িয়ে মোবাইলের ফ্রেমে নিজেকে বন্দী করছে।বেশ কয়েকটা ছবি তোলার পর পুতুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,এই আরিশা,এইদিকে আয় তো মামনি।আমরা কিছু ছবি তুলি।

আরিশা পুতুল হাতে দৌঁড়ে চলে আসল তুবার কাছে।বলল,আন্টি,আমার পুতুলটা কিছু খায়নি।ওর ক্ষুধা লেগেছে খুব।

-তোমার পুতুলও খাবে,আমরাও খাবো।আগে আমরা কিছু ছবি তুলি,আয় তো মামনি।দুজনে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

-আপনারা আসছেন আপামণি?ফুলি ভেতর থেকে দৌঁড়ে আসল।মাথায় ঘোমটা দেয়া।মুখচোরা স্বভাবটা বোধহয় পালিয়ে গেছে।মুখে এক চিলতে হাসি।

-এই বাবা কই রে?কখন থেকে গাড়ি হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে,বাবা বের হলো না।তুই কই ছিলি,ফুলি?জিজ্ঞেস করল তুলি।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস

-আপা,খালুজানে আজকে ফজরের নামাজ পড়তে উঠে নাই।জিজ্ঞেস করলাম,বলল,শরীর নাকি দুর্বল লাগে।এখন তিনি বিছানায় শুয়ে আছে।আমি খাবার দিছি,খায় নাই।

ব্যাপারটা তো ভেবে দেখার মতো।এই তুবা,বাবার কি শরীর বেশি খারাপ নাকি?তুবা এখনও আরশির সঙ্গে ছবি তোলায় ব্যস্ত।কথাটা হয়তো কানে যায়নি।তুলি বেশ বিরক্ত মনে হলো ব্যাপারটায়।ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল,এই ভাইয়া,আপনি সমস্ত কিছু গাড়ি থেকে ভেতরে এনে রাখেন।কিছু খেয়ে যাবেন।ফুলির হাতে আপনার টাকা পৌঁছে দেয়া হবে।তুলি আর দেরি না করে ভেতরে চলে গেল।পেছন পেছন ফুলিও আসছে।তুবা তাকিয়ে দেখলো,তুলি ভেতরে চলে যাচ্ছে।বলল,এই আপা,আমিও যাবো তো।এই আরশি,তোর আম্মু,চলে যাচ্ছে।ফোন ব্যাগে রেখে আরশির হাত ধরে ভেতরে চলে গেল তুবা।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে।মাথার উপরে ফ্যান ঘুরছে।শরীরে সাদা পাতলা একটা গেন্জি।এখন শরীর মোটামুটি ভালো।তবে শরীর কিছুটা ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে।সকালে তেঁতুল মেশানো পানি খাওয়ার পর এখন ভালো লাগছে।চোখে রোদ এসে পড়ছে।তিনি পাশ থেকে গামছা দিয়ে চোখ ঢেকে রাখলেন।পায়ের শব্দ কানে আসল ইয়াজউদ্দিন আহমেদের।অনেক মানুষ একসঙ্গে হাঁটলে যে আওয়াজ হয়।তিনি বামপাশ হয়ে ফিরে দরজার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করলেন।পরিচিত কন্ঠ ভেসে আসল,বাবা,তোমার কি শরীর খারাপ?

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ চোখ খুলে দেখলেন,দুই মেয়ে তুলি-তুবা এসেছে।সঙ্গে নাতনি আরিশা-আয়রাও এসেছে।আরিশার হাতে একটি পুতুল।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বিছানা থেকে উঠে বসলেন।আনন্দে হেসে বললেন,কিরে মা,তোরা কখন আসলি?এইযে নানুভাই কেমন আছো তোমরা?

আয়রা,তখনও তুলির কোলে বসে আছে।মুখে চকলেট।আরিশা পুতুল হাতে নিয়ে বলল,নানুভাই,তুমি কি অসুস্থ?Are you sick?

আরিশার কথা শুনে ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বেশ জোরে হেসে উঠলেন।তুলির দিকে তাকিয়ে বলল,তোর মেয়ে কি সুন্দর বাংলার সাথে ইংরেজী বলছে।শুনতে বেশ লাগছে কিন্তু।একদম ইংরেজ বাচ্চা।তিনি আরিশার গাল দুটো টেনে কোলে বসিয়ে দিলেন।

তুলি বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি এখনও আমার কথার জবাব দাওনি,বাবা।তুমি কি খুব অসুস্থ?

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তুলির দিকে তাকিয়ে বলল,তুই তোর মার স্বভাবেই রয়ে গেলি।গতকাল রাতে পেশার একটু বেড়ে গিয়েছিল।এখন বেশ ভালো লাগছে।তবে তোদের দেখে,আমি পুরোপুরি সুস্থ।এই তুবা,কি খবর তোর?
ভালোবাসার গল্প
তুবা স্বাভাবিকভাবে বলল,এইতো বাবা,আমি বেশ আছি।মনটা ছটফট করছিল,তাই আর দেরি না করে সোজা সিডনি থেকে বাংলাদেশ।কিন্তু মুখে ছটফট করার তেমন কিছুই ফুটে উঠেনি।মনে হয়,বাবাকে খুশি করতে কথাটি বলল তুবা

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।আয়রার দিকে তাকিয়ে বলল,নানুভাই তো চকলেট খেতে খেতে বুড়ি হয়ে যাচ্ছে।আমার কোলে আসবে না?রাগ করেছো আমার উপর?

আয়রার বোধহয় সেদিকে খেয়াল নেই।সে চকলেট খেতেই মনোযোগ বেশি।তুলি একটা হাসি দিয়ে বলল,বাবা,আমি ফ্রেশ হয়ে এসে কথা বলবো।রুম থেকে বেরিয়ে গেল তুলি।তুবাও আর দাঁড়িয়ে না থেকে তুলির পিছু পিছু বেরিয়ে গেল।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ হাক ছেড়ে বললেন,এই ফুলি,সবার জন্য নাস্তা তৈরি কর।আমিও নিচে আসছি।

সাত.

মাথার উপর তীব্র রোদ।সূর্যের তাপ গাছের পাতার ফাঁকে উঁকি দিয়ে মুচকি হাসছে।কাব্য মাঠের কোণে একটি ফাঁকা জায়গায় গাছের নিচে বসে আছে।কাব্যের সঙ্গে পুষ্প বসে আছে একটু দূরে।এইদিকে মানুষজনের আনাগোনা বেশ কম।কাব্য আজ সকাল থেকে খেয়াল করেছে,পুষ্প কেমন যেন চুপচাপ।অন্যদিন তাকে জ্বালিয়ে ভেজা কাকের মতো করে তারপর ছাড়ে।অথচ আজ কলেজে আসার পর প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেনি পুষ্প।কাব্য কিছু জিজ্ঞেস করলে হুম ছাড়া মুখ দিয়ে কিছু বের হয়নি।কাব্য উঠে পুষ্পের আরও কাছে এসে বসলো।কাঁধ থেকে ব্যাগ খুলে পাশে রাখলো।পুষ্পের দিকে তাকিয়ে বলল,আজ কি টমেটোর মন খারাপ?পুষ্প রাগলে ওর মুখ লাল হয়ে যায়।কাব্য মিষ্টি করে টমেটো ডাকে।তখন আরও রেগে যায় পুষ্প।

পুষ্প চুপ করে আছে।আজ সে রাগছে না।স্বাভাবিকভাবে বসে আছে।চুপচাপ সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে আছে।
ভালোবাসার গল্প
কাব্য বুঝতে পারল,কিছু একটা হয়েছে।আজ পর্যন্ত এত চুপচাপ থাকতে কখনো দেখেনি সে।বলল,কি হয়েছে,পুষ্প?তোমাকে আগে কখনো এমন দেখিনি।

পুষ্প একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঠফাটা রোদ্রজ্জল আকাশের দিকে তাকিয়ে কাব্যের দিকে ফিরে বলল,কাব্য তুমি আমাকে বাইরে থেকে খুব হাসি-খুশি স্বাভাবিক একটা মেয়ে হিসেবে জানো।কিন্তু আমি যেই পরিবেশে থাকি সেখানে টাকা-পয়সা,সম্পত্তির অভাব নেই।কিন্তু একটা জিনিসের খুব অভাব।সেটি হলো সুখ।তুমি জানো,সুখ হলো এমনই এক সম্পদ যা তুমি কিনতে পারবে না।তোমাকে আশপাশের পরিবেশ থেকেই এই সুখ গ্রহন করতে হবে।আমার বাবা এবং মায়ের দুইজনের মধ্যে দূরত্বটা দিনদিন বেড়েই চলেছে।সারাদিন ঝগড়ার মধ্যে আমি আর সহ্য করতে পারছি না।আমার বয়স যখন ছয় বছর তখন থেকেই দেখে বড় হয়েছি।ঝগড়া যতই হোক,অন্তত খাবার টেবিলে দুজনকে একসঙ্গে দেখতে পেতাম।ইদানিং এমন অবস্থা হয়েছে যে,কেউ বাসায় খাবারই খায় না।আজ সকালে দুজনের ঝগড়া ডির্ভোস পর্যন্ত গড়িয়েছে।হয়তো এভাবে চলতে থাকলে সত্যিই তারা আলাদা হয়ে যাবে।মাঝে শেষ হয়ে যাবে আমার সবকিছু।এভাবে হয়তো নিতে না পেরে আমিও হয়তো আমার দাদুর মতো পাড়ি জমাবো দূর আকাশে।দাদু যখন বেঁচে ছিল,আমার মন খারাপ হলে ওনার কাছে গিয়ে গল্প শুনতাম।একদিন তিনিও এই যন্ত্রনায় শেষ হয়ে গেলেন।এখন আমি সম্পূর্ণ একা।বাসায় আমার জন্য একটা জগৎ,আর বের হলে রঙিন জগৎ।আমার দম বন্ধ হয়ে আসে বাসায়।

কাব্য কি বলবে বুঝতে পারছে না।পুষ্পের দিকে তাকিয়ে দেখল,পুষ্প কাঁদছে।আচ্ছা,তুমি কখনো দুজনের মাঝে সমাধানের চেষ্টা করোনি,জিজ্ঞেস করল কাব্য।

-হুম করেছিলাম।কিন্তু দুজনের কেউই শুনতে রাজি নয়।সবাই যার যার জায়গায় অনড়।কেউই হার মানতে রাজি নয়,বলল পুষ্প।

কাব্য কি ভেবে বলল,আচ্ছা কাল তুমি দুজনকে কিছু সময়ের জন্য এক ছাদের নিচে আনতে পারবে?

-মানে?তুমি কি ওদের সঙ্গে কথা বলবে নাকি?এটা অসম্ভব,নিজের মেয়ের কথাই তো শুনে না।আবার তোমার কথায় সব ঠিক হয়ে যাবে!বলল পুষ্প।

-দেখো,সব আগের মতো স্বাভাবিক হবে কিনা জানি না।তবে চেষ্টা করতে তো দোষ নেই,বলল কাব্য।

-ঠিক আছে,তুমি কাল তাহলে সকালের দিকে বাসায় আসবে।আমি বাবা-মাকে কিছু একটা বলে রাজি করবো।

কাব্য সবকিছু স্বাভাবিক করার জন্য হেসে বলল,আচ্ছা টমেটো,এবার তো একটু হাসো।

পুষ্প কিঞ্চিত রেগে কাব্যের পিঠে ধুম করে কিল বসিয়ে দিল।চোখের পানি মুছে বলল,আচ্ছা,এই শহরে আমি ছাড়া তোমার আপন কে আছে?

কাব্য মুচকি হেসে বলল,রাস্তার মোড়ের টং দোকানদার মজিদ ভাই আর আমাদের বাড়িওয়ালা ইয়াজউদ্দিন চাচা।ভালোবাসার গল্প

পুষ্প অবাক হয়ে বলল,দোকানদার মজিদ ভাই তোমার আপন মানুষ!বেশ মজার ব্যাপার তো।আমাকে একদিন ওনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিবে?

কাব্য উঠে দাঁড়িয়ে বলল,তোমার সঙ্গে প্রথম যেখানে দেখা হয়েছিল,একটু পেছনে ডানদিকে একটা রাস্তা মোড় নিয়েছে।বামপাশে বড় গাছের নিচে মজিদ ভাইয়ের দোকান।দোকানের পাশে কালো রঙের একটা কুকুর আছে।কুকুরটির নাম কালাপাহাড়।

কুকুরের কথা শুনে পুষ্প ভয় পেয়েছে।বলল,তাহলে থাক।আমার কুকুর ভীষণ ভয় করে।যদি তেড়ে এসে কামড়ে দেয়?

কাব্য পুষ্পের কথায় হেসে উঠল।বলল,কুকুরটি খুব ভালো।মজিদ ভাইয়ের ঘরের মানুষ।এখন চলো,রোদের তাপ খুব বেড়েছে।ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খেয়ে আসি।কাব্য ব্যাগ কাঁধে নিয়ে একটু দূরে গিয়ে বলল,টমেটো,তাড়াতাড়ি আসো।

পুষ্প এবার বেশ রেগে গেল কাব্যের উপর।উঠে দৌঁড়াতে শুরু করল কাব্যকে।ওদের দুষ্টুমি দেখে মাথার উপরে থাকা সূর্য মুচকি হেসে উঠল।

ইয়াজউদ্দিন সাহেব টেবিলে বসে আছেন।বেশ খুশি মনে হচ্ছে তাকে।অনেকদিন পর মেয়ে-নাতনিদের মুখ দেখে খুশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।ফুলি সবাইকে ভাত ভেড়ে দিচ্ছে।তুবা খেতে আসে নি।ওর ভীষণ মাথা ধরেছে।হালকা নাস্তা করে ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।আয়রা তুলির কোলে বসে আছে।সাদা ভাতের সঙ্গে মুরগির ঝোঁল দিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে আয়রাকে।মাঝেমাঝে নিজেও খেয়ে নিচ্ছে ফাঁকে ফাঁকে।আরিশা পুতুল নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত।মেয়েটা নিজের চেয়েও পুতুলের খাবারের দিকে ব্যস্ত বেশি।তুলি বেশ কয়েকবার চোখ রাঙানি দিলেও সে আগের মতই পুতুল নিয়ে টেবিলে বসে আছে।ছোট্ট হাতে ভাত নিয়ে পুতুলের মুখে গুঁজে দেয়।কিন্তু ভাত নিচে পড়ে যায়।সেদিকে খেয়াল নেই আরিশার।টেবিলের নিচে ভাতের ছড়াছড়ি।ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে মনে হলো,ব্যাপারটা তিনি বেশ উপভোগ করছেন।তার মতে,মেয়েরা ছোটবেলায় পুতুল দিয়ে মাতৃত্ব বিদ্যা আয়ত্ব করে।পুতুলের যত্ন থেকেই একটা মেয়ে,মা হওয়ার স্বপ্ন দেখে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল,নানুভাই,তুমি খাবে কখন?সব খাবার তো পুতুলে খেয়ে ফেলছে।

আরিশা যেন একটু অভিমান করল ইয়াজউদ্দিন আহমেদের উপর।বলল,আমি না খেলেও চলবে।আগে আমার পুতুলকে খাবার খাইয়ে দিবো,তারপর আমি নিজে খাবো।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ হেসে উঠলেন।তুলির দিকে তাকিয়ে বললেন,তোর মেয়ে বড় হলে খুব সচেতন মা হবে।সন্তানের খুব যত্ন নিবে।আমার কথা মিলিয়ে দেখিস।ভালোবাসার গল্প

তুলি বেশ বিরক্ত মনে হলো।বলল,এসব কথা রাখো তো।টেবিলের নিচে ভাত ফেলে কি অবস্থা করেছে মেয়েটা?তোমাদের আদরে মেয়েটা দিনদিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে।বাসায় ওর বাবার জন্য কিছু বলতে পারিনা।আর বাংলাদেশে আসলে তোমার জন্য।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ খেতে খেতে বললেন,আহা,এই বয়সে এমন একটু করবে।বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।আচ্ছা,তোদের দু'জনের একজনের জামাইও তো আসেনি।ব্যাপারটা কি বল তো?

-ব্যাপার আর কি হবে?তোমার জামাই সারাদিন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত।কত করে বললাম,চলো ঘুরে আসি।বলল,সময় হবে না।আর সাদমান কি একটা জরুরি প্রজেক্টে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে গেছে।তাই আসতে পারেনি।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,বছরে একবার আসবে।এতেও সময় হয়না।দেশের মায়া বলে তো একটা কথা আছে।সবকিছুর চেয়ে সম্পর্কের টান সবার আগে।

-বাবা,বাদ দাও তো।আচ্ছা রাসেলকে এভাবে আর কতদিন রাখবে?ছেলেটা তো সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবে,বলল তুলি।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ চোখ থেকে চশমা খুললেন।বাম হাত দিয়ে চোখ মুছলেন।ওনার চোখে পানি।তিনি কাঁতর গলায় বললেন,ছেড়ে দিবো।সবাইকে মুক্ত করে দিবো।এই সংসারে কাউকে বেঁধে রাখা যায় না।

তুলি কিছু বলল না।বাবার চোখে পানি দেখে চুপ করে রইল।আরশি পুতুলের মুখে ভাত গুঁজে দিচ্ছে।ফুলি বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছে ব্যাপারটা।

কাব্য দোকানদার মজিদের দোকানের সামনের বেঞ্চে মুখ গম্ভীর করে বসে আছে।মাটির দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে।দোকানদার মজিদের পোষা কুকুর কালাপাহাড় কাব্যের পায়ের কাছে এসে ঘুরঘুর করে কি যেন বলতে চায়।মুখ দিয়ে কুইকুই আওয়াজ করছে।কাব্যের সেদিকে খেয়াল নেই।আজ মজিদের দোকানে ভীড় কম।বিকালের সময়টায় মানুষ একটু কম আসে।দোকানদার মজিদ কাব্যের দিকে তাকিয়ে বলল,ভাইজান,আপনার কি মন খারাপ?অনেকক্ষণ ধরে ঝিম মাইরা বসে আছেন?

কাব্য মাটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল,মজিদ ভাই,মন খারাপ হবে কেন?মন খারাপ না।

-ভাইজান,লিকার বাড়িয়ে এক কাপ চা বানিয়ে দিবো?জিজ্ঞেস করল দোকানদার মজিদ।

কাব্য মাথা তুলে বলল,না,চা খাবো না।আচ্ছা মজিদ ভাই,আপনি আমাকে একটা সমাধান দিতে পারবেন?জিজ্ঞেস করল কাব্য।

দোকানদার মজিদ হেসে বলল,ভাইজান,আমি মূর্খ মানুষ।আপনি কত বড় নামকরা কলেজে পড়াশুনা করেন।আমি আপনারে কি সমাধান দিবো?হাসাইলেন ভাইজান।

-পৃথিবীতে কিছু প্রশ্ন থাকে যার উত্তর শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে নাও থাকতে পারে।শিক্ষিত ব্যক্তিরা বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষা লাভ করে।কিন্তু তাদের মধ্যে মানবিক চেতনার জ্ঞান খুবই সীমিত।আমার ধারনা,আপনি আমার প্রশ্নের সমাধান দিতে পারবেন,বলল কাব্য।

দোকানদার মজিদ কাঁধে ঝুলানো গামছা দিয়ে কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে বলল,আচ্ছা বলেন,দেখি আমি পারি কিনা?

-একটা সম্পর্ক ভাঙার মাঝে কি দিয়ে জোড়া লাগানো যেতে পারে?যেমন ধরুন,একটা কাচের পুতুল হাত থেকে নিচে পড়লে ভেঙে যায়।আঠা দিয়ে কাঁচের পুতুলটিকে আবার জোড়ানো লাগানো যায়।তেমনি,একটা বাবা-মা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর সংসার জোড়া লাগাতে আঠার মতো কিছু আছে আপনার কাছে?

দোকানদার মজিদ কথাটা বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো।সহজ-সরল হাসি দিয়ে বলল,ভাইজান,আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বলে, একজন বাবা-মায়ের কিংবা স্বামী-স্ত্রীর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হলো সন্তান।সেখানে যদি আঠা লাগানো যায় তাহলে আবার জোড়া লাগানো সম্ভব।

কাব্য বেশ জোরে হেসে বলল,মজিদ ভাই,আমার উত্তর আমি পেয়ে গিয়েছি।কালকে গিয়ে তবে একটা রক্তমাংসের পুতুল জোড়া লাগাতে হবে।ধন্যবাদ,মজিদ ভাই।
ভালোবাসার গল্প
দোকানদার মজিদ বেশ লজ্জা পেল।লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,ভাইজান,চা খাবেন?সঙ্গে টোস্ট বিস্কুট দিবো?

কাব্য বলল,হুম দেন,আমার জন্য একটা,কালাপাহাড়ের জন্য একটা।আচ্ছা,আপনার সঙ্গে একজনের পরিচয় করিয়ে দিবো।

মজিদ হেসে বলল,কে,ভাবি নাকি?

কাব্য কথাটা শুনে বেশ লজ্জা পেল।মাথা নিঁচু করে বলল,দূর,কি যে বলেন।আপনি চা দেন তো।আসলে দেখতে পারবেন।কাব্য কালাপাহাড়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।কালাপাহাড় যেন এর জন্য অপেক্ষা করছিল।খুশিতে রাস্তায় গড়াগড়ি শুরু করল  কালাপাহাড়।
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস

আট.

ঝুম বৃষ্টি নেমেছে চারপাশে।বাতাসের হাওয়া বাড়ছে।কাব্য জানালা বন্ধ করে বিছানায় বসে আছে।কাব্যের হাতে বই।নিচতলা থেকে হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে।ইয়াজউদ্দিন সাহেব আজ বেশ আনন্দে আছেন।থেমে থেমে ওনার গলার আওয়াজ আসছে কাব্যের কানে।লোকটা মেয়ে-নাতনিদের পেয়ে বেশ খুশি।কাব্য সিড়ি দিয়ে উঠার সময়ে ইয়াজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে দেখা।তখন হেসে বললেন,"আমার মেয়েরা অস্ট্রেলিয়া থেকে আজ সকালে এসেছে।তোমার সঙ্গে সময় করে পরিচয় করিয়ে দিবো।"
কাব্য বিছানা থেকে উঠে দক্ষিনের জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো।জানালা খুলে দিতেই বৃষ্টির ঝাপটা এসে শরীরে লাগল।সঙ্গে মৃদু বাতাস।জানালায় দাঁড়ালে ইয়াজউদ্দিন সাহেবের বাসার সামনের অংশটুকু পরিষ্কার দেখা যায়।কাব্য দেখতে পেল,ইয়াজউদ্দিন সাহেব চেয়ারে বসে আছে।ওনার কোলে একটা ছোট্ট মেয়ে পুতুল নিয়ে বসে আছে।সামনে বসে আছে বড় দুটি মেয়ে।তিনি সবাইকে কি যেন হাতের ইশারায় বেশ মনযোগ দিয়ে বলছেন।হয়তো মজার কোনো গল্প।একটু পরপর একটা হাসির রোল পড়ে যায়।ফুলি দরজার কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।মেয়েটিও মুচকি হাসছে।কাব্য জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে রইল।কত সুন্দর একটি সময়!কিন্তু এই সময়টা উপভোগ করে বছরে একবার।কাব্য দেখতে পেল,চেয়ার ছেড়ে চশমা পড়া মেয়েটি জানালায় এসে দাঁড়ালো।হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরার চেষ্টা করছে।হঠাৎ উপরে তাকাতেই কাব্যের চোখে চোখ পড়ল।কাব্য সপাট করে জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল।

বিছানায় এসে বসল কাব্য।বৃষ্টির ঝাপটায় শরীর বেশ ভিজে গেছে।কাব্য ভাবছে,এভাবে হুট করে জানালা বন্ধ করে দেয়া কি ঠিক হলো?যদি খারাপ ভাবে আমাকে?হঠাৎ কাব্যের কানে নুপূরের আওয়াজ ভেসে আসল।শব্দটা ছাদ থেকেই আসছে।কেউ নুপূর পড়ে হাঁটছে।কাব্য বিছানা থেকে উঠে জানালা খুলতেই দেখতে পেল,শাড়ি পড়া মেয়েটি ছাদে বৃষ্টিতে ভিজছে।পায়ে নুপূর পড়ে আছে।বৃষ্টির ফোঁটা মুখে এসে পড়তেই মেয়েটিকে আরও সুন্দর লাগছে।কাব্য বলল,আমাকে সঙ্গে নিবেন?আমিও আপনার সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজবো।

মেয়েটি কাব্যের দিকে তাকিয়ে বলল,হঠাৎ করে যদি হারিয়ে যাই তখন তো ভীষণ কষ্ট হবে।প্রিয় জিনিস বেশিদিন সঙ্গে থাকে না।

কাব্য এই কথার কোনো অর্থ বুঝতে পারল না।দরজা খুলে ছাদে চলে আসল কাব্য।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির ধাপট বাড়ছে।কাব্য গিয়ে মেয়েটির পাশে এসে দাঁড়ালো।মেয়েটি দুহাত বাড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে।কাব্য মুগ্ধ হয়নে তাকিয়ে রইল।জিজ্ঞেস করল,আপনার নামটি এখনও আমার জানা হলো না।

মেয়েটি কাব্যের চোখে চোখ রাখল।আস্তে করে বলল,হঠাৎ আসে বাতাস,খুলিয়া যায় দুয়ার,দুঃখ তাহার রন্দ্রে রয় বারটি মাস।আমার নাম বিন্তী।

বিন্তী ছাদে হাঁটছে,নুপূরের শব্দ যেন বৃষ্টিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।কাব্য দু'হাত বাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।যেন মনে মনে বলছে,এই বৃষ্টি যেন না থামে।চলতে থাকে অবিরাম বর্ষণ।হঠাৎ নিচতলা থেকে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের গলা শুনতে পেল কাব্য,এই ছাদে কে হাঁটে?কাব্য তুমি কি ছাদে বৃষ্টিতে কারো সঙ্গে ভিজছো?কথা বলছো কার সঙ্গে?হুশ ফিরে আসল কাব্যের।পেছনে তাকিয়ে দেখল বিন্তী নেই।নুপূরের শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না।

কাব্য কোনো উত্তর দিল না।ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে।বৃষ্টির ফোঁটা এসে চুইছে পড়ছে মুখে।দু'হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করছে।নিচতলা থেকে রাসেলের হাসির শব্দ আসছে।বলছে,সে এসেছে,আমাকে যেতে দাও।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস


..........চলবে.........

written by Habib Khan Hridoy

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন