"দ্যা ম্যানিটু"
মূল - গ্রাহাম মাস্টারটন
রূপান্তর - অনীশ দাস অপু
(পর্ব ৫)
কাটায় কাঁটায় সাড়ে এগারােটায় আমার দরজার ডােরবেল বাজল। আমি
জ্যাকেট খুলে ক্লজিটে রাখলাম, লম্বা সবুজ আলখেল্লাটি পরে নিলাম, মাথায়
চাপালাম হ্যাট, তারপর চেহারায় রহস্যময় একটা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে
গেলাম মিসেস হার্জকে স্বাগত জানাতে।
‘আসুন, মিসেস হার্জ। সব রকম আধিভৌতিক বিষয়ের জন্য আজকের
সকালটি অতীব চমৎকার।
মিসেস হার্জের বয়স কমপক্ষে পঁচাত্তর। তাঁর হাত জোড়া মুরগির ঠ্যাং-এর
মতাে, সরু সরু, অসংখ্য বলীরেখায় ভরা। চোখের চশমার পাওয়ার এত বেশি
যে দেখলে মনে হয় গােল্ডফিশের বাটিতে ঝিনুক সাঁতার কাটছে। লাঠিতে ভর
দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকলেন তিনি। তার গা থেকে ন্যাপথালিন আর
ল্যাভেন্ডারের গন্ধ আসছে। নাক দিয়ে পিইই শব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার
আর্মচেয়ারে ধপাশ করে বসলেন তিনি।
কেমন আছেন, মিসেস হার্জ?' হাত ঘষতে ঘষতে খুশি খুশি গলায় জিজ্ঞেস
করলাম আমি। আজকাল কী ধরনের স্বপ্ন দেখছেন?
নিশ্চুপ রইলেন বৃদ্ধা। একদমই কথা বলছেন না। আমি শ্রাগ করে ট্যারট
নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম । কার্ড বাটার সময় গত রাতের শূন্য কার্ডটি দেখার
চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনাে ফাঁকা কার্ড পেলাম না। কাল রাতে হয়তাে
কোনাে ভুল হয়েছে আমার, অতিরিক্ত ক্লান্তিতে চোখে ভুল দেখেও থাকতে
পারি । ঠিক জানি না। যদিও অতীন্দ্রিয় বিষয় নিয়ে কাজ কারবার আমার কিছু
এখন পর্যন্ত অলৌকিক কোনাে ঘটনা আমার জীবনে ঘটেনি। আমি কার্ডগুলাে
মেলে ধরলাম টেবিলে। মিসেস হার্জকে প্রশ্ন রেডি করতে বললাম।
কার্ডগুলােকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করবেন তিনি।
“আপনার ভাতিজা স্ট্যানলির অনেকদিন কোনাে খোঁজ-খবর নেওয়া হয় না,
বৃদ্ধাকে মনে করিয়ে দিলাম। ওই বাড়িতে কী ঘটছে না ঘটছে সে ব্যাপারে
একটু উকি দেওয়া দরকার না? আচ্ছা, আপনার সৎ-বােন অ্যাগনেসেরই বা
কী খবর?'
কিন্তু জবাব দিলেন না মিসেস হার্জ। আমার দিকে মুখ তুলে চাইলেন না
পর্যন্ত । ঠায় তাকিয়ে রয়েছেন ঘরের কোনায়, ডুবে গেছেন নিজের ভাবনায় ।
‘মিসেস হার্জ? সিধে হলাম আমি। মিসেস হার্জ, আপনার জন্য কার্ড বেঁটেছি
আমি।'
আমি সামনে এসে ঝুঁকে দেখলাম বৃদ্ধাকে। মনে তাে হচ্ছে সুস্থই। অন্তত
নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যা করছি, এমন সময় আমার কোনাে বুড়ি
মক্কেল পটল তুলুক, এটা আমি মােটেই চাইব না। তাহলে আমার ব্যবসা লাটে
উঠবে।
মিসেস হার্জের হাড় জিরজিরে হাতখানা নিজের হাতে তুলে নিয়ে মৃদু গলায়
বললাম, “মিসেস হার্জ? আপনি ঠিক আছেন তাে? আপনাকে এক গ্লাস ব্রান্ডি
দিই?'
কোকের বােতলের মতাে চশমার পেছনে তার চোখ জোড়া কেমন ভীতিকর
ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে । চাউনিটা আমার দিকে, কিন্তু আদৌ আমার দিকে দৃষ্টিটা
নেই। যেন আমাকে ভেদ করে তার চাউনি চলে গেছে আমার পেছনে। আমি
পেছনে কেউ আছে কিনা দেখার জন্য মুখ ঘুরিয়ে না তাকিয়ে পারলাম না।
‘মিসেস হার্জ, আবার ডাকলাম আমি। আপনি কি বড়িটড়ি কিছু খাবেন
মিসেস হার্জ? আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?
পাতলা শিসের মতাে একটা শব্দ বেরিয়ে এলাে বৃদ্ধার কুঞ্চিত দুই ঠোটের
দিয়ে । মনে হলাে উনি কিছু বলতে চাইছেন কিন্তু পারছেন না। তেলের বাটিটা
হঠাৎ দপদপ করে উঠল, পাগলের মতাে নাচছে শিখা, মুখের ওপর দুলছে বলে
বােঝা যাচ্ছে না মিসেস হার্জের চেহারায় সত্যি কোনাে বিচিত্র
অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে কিনা।
মিসেস হার্জ,' খেকিয়ে উঠলাম
সুউউউউ...' নিস্তেজ গলায় বললেন তিনি।
না' খেকিয়ে উঠলাম আমি। আমার সঙ্গে কি ফাজলামাে শুরু করেছেন?
বন্ধ করুন এসব। আপনার জন্য চিন্তা হচ্ছে আমার। এরকম
হলে আমি কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স ডাকব। আমার কথা বুঝতে পারছেন, মিসেস
হার্জ?”
আবার ফিসফিস করলেন তিনি। তাঁর হাত কাঁপছে, বড়,
এমারেন্ডের আংটিটি চেয়ারের হাতলে বাড়ি খেয়ে ঠকঠক আওয়াজ তুলছে।
কোটরে ঘুরতে শুরু করেছে চক্ষু, হাঁ হয়ে গেছে মুখ । পিচ্ছিল জিভ বেরিয়ে
পড়েছে। বিকট লাগছে দেখতে।
“ঠিক আছে,' বললাম আমি, বুঝতে পারছি অ্যাম্বুলেন্স ডাকতেই হবে ।
শুনুন,
আমি ফোন করব। এই দেখুন ডায়াল করছি। মিসেস হার্জ, রিং হচ্ছে।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন বৃদ্ধা। হাত বাড়িয়ে লাঠি ধরতে চাইলেন। হাত ফস্কে
লাঠি মেঝেতে পড়ে ঠকঠক শব্দ তুলল। দাঁড়িয়ে দুলছেন মিসেস হার্জ, নাচের
ভঙ্গিতে ঘুরতে লাগলেন কার্পেটের ওপর। গানের সুরে কী যেন বলছেন আর
নাচছেন। আমি ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। এদিকে অপারেটর ফোনে
বলছে, বলুন আপনাকে কী সাহায্য করতে পারি?' আমি ফোন নামিয়ে রেখে
এগােলাম নৃত্যরত বৃদ্ধার দিকে।
আমি হাত বাড়িয়ে মহিলাকে ধরতে গেলাম। উনি খসখসে হাতের এক থাবড়া
মেরে আমার হাত সরিয়ে দিলেন। তিনি লাফাচ্ছেন, নাচছেন আর সারাক্ষণ
বিড়বিড় করে কী সব আউড়ে চলেছেন। এ বুড়িটাকে নিয়ে কী করব মাথায়
কিছু খেলছিল না। একে নির্ঘাত মৃগী রােগে ধরেছে। কিন্তু কোনাে মৃগী
রােগীকে আমি কস্মিনকালেও এভাবে নাচানাচি করতে দেখিনি।
বুউউউ...' আবার ফিসফিস করলেন মিসেস হার্জ।
আমি বৃদ্ধার নাচের তালে তাল মেলানাের চেষ্টা করতে করতে জিজ্ঞেস
করলাম, 'বু' মানে কী? মিসেস হার্জ, প্লিজ, একটু শান্ত হয়ে বসুন তারপর
বলুন এসব হচ্ছেটা কী?'
মৃদ্ধ যেমন আকস্মিক শুরু করেছিলেন তেমনি হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিলেন। বােধহয় নাচানাচি করতে গিয়ে শরীরের শক্তি ফুরিয়ে গেছে। হাত
বাড়ালেন কিছু একটা আঁকড়ে ধরে দাঁড়াতে। আমি তাকে ধরে আর্মচেয়ারে
শুইয়ে দিলাম। তারপর তাঁর পাশে হাঁটু মুড়ে বসলাম।
"মিসেস হার্জ, আমি আমার মক্কেলদেরকে উপদেশ দিতে পছন্দ করি না । তবে
আমার মনে হয় আপনার ডাক্তার দেখানাে উচিত।'
আমার দিকে শুন্য দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি, আবার সেই কুত্সিত ভঙ্গি
হয়ে গেল মুখ । বাধ্য হয়ে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকালাম ।
বু' খ্যাসখ্যাসে গলায় বললেন তিনি, বুট' ।
বুট,' প্রবল ভাবে কেঁপে উঠলেন তিনি। 'বুট । বুউউউট!
যীশাস!' চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। 'মিসেস হার্জ, একটু শান্ত হােন, প্লিজ । আমি
এক্ষনি আপনার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করছি। বসে থাকুন। একদম
নড়াচড়া করবেন না।'
আমি সিধে হলাম। রিসিভার তুলে ইমার্জেন্সি নাম্বারে ফোন করলাম। মিসেস
হার্জ থরথর করে কাঁপছেন আর মুখস্থ করার মতাে একভাবে আউড়ে চলেছেন
বুট, বুট, বুট...'
বলুন কী করতে পারি?' জানতে চাইল অপারেটর।
‘শুনুন, আমার এক্ষুনি একটি অ্যাম্বুলেন্স দরকার। আমার অফিসে এক বৃদ্ধা
মহিলা বােধহয় ফিট হয়ে যাচ্ছেন। তাঁকে মৃগী রােগে ধরেছে। তাড়াতাড়ি
অ্যাম্বুলেন্স পাঠান। যে অবস্থা দেখছি তাতে উনি মৃত্যুবরণও করতে পারেন।'
আমি আমার ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দিলাম। তারপর ফিরলাম মিসেস
হার্জের দিকে। গা মােড়ামুড়ি বন্ধ করেছেন তিনি, চুপচাপ বসে আছেন। কী
যেন ভাবছেন।
‘মিসেস হার্জ...' ডাকলাম আমি।
আমার দিকে ফিরলেন বৃদ্ধা। চোখের তারা স্থির, শক্ত মুখ । জলে ছলছল চোখ
জোড়া অপলক আমার দিকে তাকিয়ে। ‘ডি বুট, মিজনহির, কর্কশ গলায়
বললেন তিনি। ডি বুট।
“মিসেস হার্জ, শুনুন, একদম চিন্তা করবেন না। অ্যাম্বুলেন্স রওনা হয়ে গেছে।
আপনি শান্ত হয়ে বসুন।
মিসেস হার্জ চেয়ারের হাতল ধরে খাড়া হলেন। সােজা হয়ে দাড়িয়ে থাকতে
পরেশান হয়ে যাচ্ছেন, যেন বরফের ওপর দিয়ে হাঁটছেন। তারপর এক
ঝটকায় শিরদাঁড়া টানটান হয়ে গেল তার, শরীরের দু'পাশে হাত দুটো ঝুলতে
লাগল, তাকে এমন ঋজু এবং দৃঢ় ভঙ্গিতে কোনাে দিন দাঁড়াতে দেখিনি।
“মিসেস হার্জ, আপনি বরং...'
আমার কথা কানে তুললেন না বৃদ্ধা, কার্পেটের ওপর দিয়ে সরসর করে এ
যেতে লাগলেন। এভাবে কক্ষনাে কাউকে হাঁটতে দেখিনি আমি। বৃদ্ধার পা
মেঝে ছোঁয় কি ছোঁয়নি, অথচ প্রায় পিছলে যাবার ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছেন
তিনি। প্রায় হাওয়ায় ভেসে দরজার কাছে পৌছে গেলেন মিসেস হার্জ। খুলে
ফেললেন কপাট । "আপনি একটু অপেক্ষা করলে ভালাে হতাে, দুর্বল গলায়
বললাম আমি। সত্যি বলতে কী, মহিলার হাঁটার ভঙ্গি দেখে আমার রােম খাড়া
হয়ে গেছে। ওঁকে কী বলব কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমার কথা উনি
শুনতে পাচ্ছেন কিনা জানি না আর শুনলেও হয়তাে আমলে নিচ্ছেন না।
‘ডি বুট,' আবার শব্দটা উচ্চারণ করলেন তিনি খসখসে গলায়। তারপর দরজা
থেকে প্রায় উড়ে চললেন করিডাের অভিমুখে।
আমিও ছুটলাম বৃদ্ধার পেছন পেছন । তারপর যে ঘটনা ঘটল তা কোনােদিন
দেখব কল্পনাও করিনি। বৃদ্ধা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছেন, আমি হাত বাড়িয়ে
তাঁকে ধরতে গেছি কিন্তু উনি আমার হাত ফস্কে প্রায় হাওয়ায় ভেসে
আলােকিত, লম্বা করিডাের ধরে এগিয়ে চললেন, যেন ছুটছেন। কিন্তু উনি
মােটেই দৌড়াচ্ছিলেন না। একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে
যাচ্ছিল। কারণ বৃদ্ধার পা জোড়া মােটেই নড়াচড়া করছিল না।
‘মিসেস হার্জ!' চেঁচাতে চাইলাম আমি। কিন্তু কে যেন আমার গলা টিপে ধরল,
রা বেরুল না। প্রচণ্ড ভয়ে কেঁপে উঠলাম, যেন মাঝরাতে জানালায় বীভৎস,
সাদা একটা মুখ উঁকি দিতে দেখেছি।
করিডােরের শেষ মাথায়, সিঁড়ি গােড়ায় পৌছে গেছেন বৃদ্ধা। একবার শুধু
ঘুরলেন আমার দিকে। যেন ইশারা করতে চাইছেন, হাত তুলে রেখেছেন-যেন
আমার সাহায্য চাইবার চেয়ে কারাে সঙ্গে লড়াই করে তাকে হঠিয়ে দেওয়ার
চেষ্টা করছেন। তারপর সিঁড়ির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেলেন তিনি। শুনতে পেলাম
তার দুর্বল, বুড়াে শরীরটা পড়ে যাচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে, প্রতিটি ধাপে ডিগবাজি
খেয়ে পড়ছে বিশ্রী একটা শব্দ তুলে ।
আমি ছুটে গেলাম করিডােরের মাথায়। করিডােরের দু'পাশে আমার
প্রতিবেশীদের অনেকেরই দরজা খুলে গেল। গােলমালের আওয়াজ শুনে গলা
বাড়িয়েছে কী হয়েছে দেখতে।
আমি সিঁড়ির নিচে তাকালাম। ভাঙা চোরা একটা পুতুলের মতাে ওখানে পড়ে
আছেন মিসেস হার্জ। তাঁর পা জোড়া বেঁকে রয়েছে অদ্ভুত ভাবে । আমি কয়েক
লাফে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম। বৃদ্ধার কাঠির মতাে হাত তুলে নাড়ির স্পন্দন
টের পেতে চাইলাম। নেই। কোনাে সাড়া নেই। মাথাটা তুলে ধরলাম,
আঠালাে রক্তের লম্বা একটা ধারা বেরিয়ে এলাে মুখ থেকে।
“উনি ঠিক আছেন তাে? সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল আমার এক পড়শী
“কী হয়েছে?
-উনি সিড়ি দিয়ে পা পিছলে পড়ে গেছেন,' জবাব দিলাম আমি। 'পঁচাত্তর বছর
বয়স । হাঁটাচলা করাই দায় ছিল। মনে হচ্ছে মারা গেছেন। আমি তো
হাসপাতালে আগেই খবর দিয়েছি।'
“ওহ, গড, গুঙিয়ে উঠল এক মহিলা। 'মরা মানুষ আমি সহ্যই করতে পারি না।
সিধে হলাম আমি। খাড়া হতে গিয়ে কীসের সঙ্গে যেন বেঁধে গিয়ে পরনের
সবুজ লম্বা গাউনটা পড়পড় করে ছিড়ে গেল। ব্যাপারটা বিশ্বাস হতে চাইছে
না। মনে হচেছ দুঃস্বপ্ন দেখছি। ঘুম ভাঙলেই দেখব সব স্বাভাবিক। ফিরোজ
রঙের সিল্কের পাজামা পরে শুয়ে আছি বিছানায় । মিসেস হার্জের দিকে
তাকালাম । চুপসে যাওয়া একটা বেলুনের মতাে দেখাচ্ছে লােল চামড়া সর্ব
হাডিডসার কাঠামােটাকে। আমার গলা দিয়ে বমি ঠেলে আসতে চাইল।
হােমিসাইড স্কোয়ারের লেফটেনেন্ট ম্যারিনাে সমঝদার লােক। তার ধারণা
মিসেস হার্জ তাঁর উইলে আমার জন্য কিছু রেখে গেছেন তবে তা এমন
মূল্যবান নয় যে সেজন্য আমি তাকে সিঁড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে
পারি ।
আমার আর্মচেয়ারে মেরুদন্ড খাড়া করে বসেছে ডিটেকটিভ, তার কালাে
চুলগুলাে শজারুর কাঁটার মতাে খাড়া, এক টুকরাে কাগজে চোখ বুলাচ্ছে।
এখানে লেখা আছে আপনাকে বৃদ্ধা তাঁর উইলে একটি ভিক্টোরিয়ান ফ্লাওয়ার
ভাস দিয়েছেন, নাক টানল সে। “জিনিসটির বাজার মূল্য কত তা জানার
দায়িত্ব ইতিমধ্যে একজনকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হয় না
একটা ফুলদানীর জন্য আপনি কোনাে বৃদ্ধাকে সিড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে
দিতে পারেন।
শ্রাগ করলাম আমি। বৃদ্ধারা আমার রুটি-রুজির প্রধান অবলম্বন। আপনি
নিশ্চয় আপনার রুটি-রুজি সিঁড়ি দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবেন না।'
মুখ তুলে চাইল লেফটেনেন্ট ম্যারিনাে। প্রশস্ত, চওড়া একটা মুখ। শজারুর
কাটায় খচমচ করে খানিক আঙুল চালাল চিন্তিত ভঙ্গিতে, তার চোখ ঘুরছে
ঘরের চারপাশে।
‘আপনি বােধহয় ফরচুন-টেলার জাতীয় কিছু একটা, তাই না?'
“ঠিক ধরেছেন। ট্যারট কার্ড, চায়ের পাতা ইত্যাদি নিয়েই আমার কারবার।
আমার বেশিরভাগ ক্লায়েন্ট মিসেস হার্জের মতাে বয়সী।'
ঠোট কামড়ে ধরে মাথা নাড়ল লেফটেনেন্ট। শিওর। উনি এখানে আসার পর
থেকে অস্বাভাবিক আচরণ করেছিলেন।'
‘জি। ওঁকে ঠিক সুস্থ এবং স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। যদিও অনেক বয়স হয়ে
গিয়েছিল ভদ্রমহিলার, কিন্তু আমার সঙ্গে খানিক গল্প-গুজব না করে যেতেন না।
বলতেন কেমন যাচ্ছে তার দিনকাল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এবারে ঘরে
ঢুকে একদম মুখে তালা মেরে রেখেছিলেন। একটি কথাও বলেননি।'
হাতের কাগজ খণ্ডের দিকে তাকাল লেফটেনেন্ট ম্যারিনাে। আপনি কি ওর
ভাগ্যে কী আছে তা বলেছিলেন? মানে এমন কি হতে পারে না যে তিনি
নিজের সম্পর্কে কোনাে দুঃসংবাদ শুনে আত্মহত্যা করেছেন?
না আমি তাকে কোনাে দুঃসংবাদ শােনাইনি। আমি তাঁকে ট্যারট কার্ড
দেখানাের সুযােগই পাইনি । তিরি ঘরে ঢুকেই বুট নিয়ে বিড় বিড় করে কীসব
বলছিলেন।
‘বুট? বুট মানে?
‘আমি জানি না । উনি বারবার বলছিলেন, বুট, বুট।
বুট?' ভুরু কুঁচকে গেল ম্যারিনাের। কীভাবে কথাটা বলছিলেন তিনি? ওটাকে
কী কোনাে নামের মতাে উচ্চারণ করছিলেন? উনি কি আপনাকে বুট নামে
কোনাে লােকের কথা বলতে চাইছিলেন?'
নাক চুলকাতে চুলকাতে জবাব দিলাম। আমার কাছে ওটা কোনাে মানুষের
নাম বলে মনে হয়নি। তবে তাকে খুব চিন্তিত লাগছিল।'
কৌতুহলী দেখাল লেফটেনেন্টকে, ‘চিন্তিত? কী রকম চিন্তিত?
উনি বুটবুট' বলে বিড়বিড় করছিলেন। তারপর দরজা খুলে ছুট দিলেন
করিডাের ধরে । আমি তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু উনি এত
দ্রুত দৌড়াচ্ছিলেন যে তাকে ধরতে পারিনি। আমার দিকে তাকিয়ে একবার
হাত নাড়লেন তারপর সিঁড়ি দিয়ে ডিগবাজি খেতে খেতে পড়ে গেলেন।
নােট নিল গােয়েন্দা। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘দৌড়াচ্ছিলেন?'
আমি দুপাশে দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে জবাব দিলাম, আমাকে এ প্রশ্ন করে লাভ
নেই। কারণ ব্যাপারটা আমার নিজের কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। যদিও
করিডোের ধরে তিনি পনেরাে বছরের ছুকরির মতাে ছুটছিলেন।
কপালে ভাঁজ পড়ল লেফটেনেন্ট ম্যারিনাের। মি. আর্সকিন, মৃতা মহিলার
বয়স পঁচাত্তর । তিনি লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারতেন না। আর আপনি বলছেন
তিনি করিডোের ধরে ছুটছিলেন?
‘আমি তা-ই বলছি।
‘ঝেড়ে কাশুন তাে, মি. আর্সকিন-আপনার কি মনে হচ্ছে না কল্পনার ফানুস
একটু বেশি মেলে দিয়েছেন? আমি বিশ্বাস করি না আপনি ভদ্রমহিলাকে খুন
করেছেন, কিন্তু তিনি দৌড়াদৌড়ি করছিলেন এও বিশ্বাসযােগ্য নয়।'
মেঝেয় তাকালাম আমি । মনে পড়ল মিসেস হার্জ কীভাবে প্রায় শূন্যে ভেসে
ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তারপর কীভাবে করিডাের ধরে ক্রমে দূরে সরে
যাচ্ছিলেন, যেন রেইলের ওপর ছুটছিলেন।
‘না, সত্যি বলতে কী তিনি আসলে দৌড়াদৌড়ি করছিলেন না,' বললাম আমি
তাকে।
‘তাহলে তিনি কী করছিলেন? ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়ে প্রশ্ন করল লেফটেনেন্ট
ম্যারিনাে। বােধহয় হাঁটছিলেন? নাকি পা টেনে টেনে যাচ্ছিলেন?
‘না, তিনি হাঁটছিলেন না কিংবা পা টেনে টেনেও যাচ্ছিলেন না। তিনি পিছলে
যাচ্ছিলেন।
লেফটেনেন্ট ম্যারিনাে নােট নিতে যাচ্ছিল, কলম থেমে গেল কাগজের ওপর।
ঘোঁতঘোঁত করে উঠল সে তারপর মুচকি হেসে কাগজের টুকরােটা পকেটে
পুরল। সিধে হলাে ডিটেকটিভ, আমার দিকে এগিয়ে এলাে ঠোটে প্রশ্রয়ের
হাসি এটে।
‘শুনুন, মি, আর্সকিন, কেউ মারা গেলে শক পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আর
শক পেলে মানুষ উল্টোপাল্টা অনেক কথাই বলে। এ ব্যাপারটা আপনার
ভালােই জানার কথা। কারণ আপনার কাজটা মানুষজন নিয়েই। আসলে যা
ঘটেছে সেটাকে হয়তাে আপনি একটু ভিন্ন ভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করছেন।'
হতে পারে, ভোঁতা গলায় বললাম আমি।
মােটা, বেঁটে একটা হাত রাখল সে আমার কাঁধে, আন্তরিক ভঙ্গিতে চাপ দিল।
‘মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পােস্টমর্টেম পরীক্ষা করা হবে তবে আমার মনে
হয় না নতুন কোনাে তথ্য মিলবে। আমি আপনার কাছে এক লােককে পাঠাতে
পারি দু'একটি প্রশ্ন করার জন্য। এছাড়া আপনি ক্লিয়ার । অনুরােধ করব
আগামী দু'এক দিনের মধ্যে শহরের বাইরে যাবেন না। তবে আবার ভাববেন
যেন আপনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বা এমন কিছু।'
আমি মাথা ঝাকালাম। “ঠিক আছে, লেফটেনেন্ট। আমি বুঝতে পারছি।
জলদি আসার জন্য ধন্যবাদ।'
‘ইট’স আ প্লেজার। আপনার ক্লায়েন্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি -তিনি তাে
এখন প্রেত লােকের বাসিন্দা হয়ে গেছেন।'
আমি কষ্টার্জিত হাসি ফোটালাম মুখে । "উনি নিশ্চয় আমার সঙ্গে যােগাযােগ
করবেন। ভালাে আত্মাকে তো আর দূরে ঠেলে রাখা যায় না।'
লেফটেনেন্ট ম্যারিনাে আমার কথা শুনে নিশ্চয় ভেবেছে আমি পাগল বিশেষ।
সে শজারুর কাঁটার মতো চুলের ওপর ছােট, কালাে হ্যাটটি চাপাল । তারপর
পা বাড়াল দরজায় ।
‘সাে লং দেন, মি. হ্যারি আর্সকিন।"
চলবে.......
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন