.
টরন্টো! কানাডার প্রখ্যাত এক শহর। নানান পেশাজীবি লোকের বাস এই শহরে। ইলিশা হান্নান, একজন নার্স। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। বাদামী চুল, ফর্সা গায়ের রং। নার্সিং করে জীবিকা চালালেও, পাশাপাশি সে একজন সারোগেসি সার্ভিসার। সারোগেসি বলতে নিজের গর্ভ ভাড়া দেয়া। অনেকে আছেন যারা সন্তানের মুখ দেখেননি বা স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম অথবা সন্তান জন্ম দিতে স্ত্রীর ঝুঁকি আছে, এরকম মানুষদের মুখে হাসি ফোটাতে মূলত ইলিশা এই কাজটা বেছে নিয়েছে। এই পর্যন্ত দশবার সে মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে এই কাজটা করে। বিনিময়ে প্রত্যেকের কাছে সে পেয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। তা দিয়ে দিব্যি কেটে যায় তার একাকী জীবন। সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
সদ্য এক ব্যাংকারের মুখে হাসি ফুটিয়েছে সে। যিনি মূলত একজন চিরকুমার। নাম ড্যানিয়েল হুগো। বিয়ে নামক শব্দে যেন অ্যালার্জি তাঁর। তাই আজীবন বিয়ে করেননি। শেষ বয়সে এসে তিনি একজন সন্তানের বাবা হতে চান। যোগাযোগ করেন তিনি ইলিশা হান্নানের সাথে। দুজনের মাঝে সারোগেসি চুক্তি হয়। মিস্টার হুগোর শুক্রাণু আর ইলিশার ডিম্বাণু নিয়েই আর্টিফিশিয়ালি নিষিক্ত করে ভ্রুণ তৈরি করা হয়। সেই ভ্রুণটি পরে প্রতিস্থাপন করা হয় ইলিশার গর্ভে। তারপর জন্ম হয় ফুটফুটে এক বাচ্চার। কিন্তু বাচ্চাটা হুগোর কাছে হস্তান্তর করতে গিয়ে কেন জানি খুব মায়া হয় তার। এভাবে নিজের গর্ভে সন্তান ধারণ করে শেষে গিয়ে অন্যের হাতে তুলে দিতে দিতে আজ সে মানসিকভাবে বড্ড ক্লান্ত। অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে কেন জানি এক অদৃশ্য মায়ায় জড়িয়ে পড়ে সে। অন্যের জীবন গতিশীল করতে গিয়ে নিজের জীবনটা কোথায় যেন থেমে আছে তার।
সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। সারাদিন আকাশে মেঘ থাকার কারণে আরও আগে যেন সন্ধ্যা নেমেছে। বাইরে ঝুমঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। ইলিশা হান্নান কেবল রাতের খাবার প্রস্তুতি করতে শুরু করেছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছিটকা ভেতরে প্রবেশ করায় কাচটা টেনে দিতে গেল সে। হাতটা বাড়াতেই চোখ আটকে গেল তার বাইরে। বিজলির আলোতে কী যেন চোখে পড়লো তার। মনের ভুল ভেবে ঘটনাটা এড়িয়ে যেতে চাইলো সে। তখন আবার বিদ্যুৎ চমকালো। ইলিশা দেখলো কে যেন দাঁড়িয়ে ভিজছে বাইরে, কিছুটা দূরে। পরনে অদ্ভুত সাদা পোশাক। এবার সে এটাকে মনের ভুল ভাবতে পারলো না। টর্চের আলো জ্বেলে বাইরে ফেললো সে। লোকটা তখন এগিয়ে আসতে লাগলো কাছে। ভয় পেয়ে কাচটা তাড়াতাড়ি টেনে দিলো ইলিশা। তখন বাহির থেকে জানালার কাচে লোকটা দুবার টোকা দিয়ে বললো,
-মিস হান্নান, আপনার কাছে একটা সাহায্য চাইতে এসেছি।'
আগন্তুকের মুখে নিজের নাম শুনে কিছুটা অবাক হলো ইলিশা। জানালার কাচ সরালো সে।
-জি, বলুন...'
-আপনার সাথে একটা চুক্তি করতে চাই, সারোগেসি।
-আসলে আমি এখন এসব নিয়ে ভাবছি না। তাই দুঃখ প্রকাশ করছি।
-মিস হান্নান, অনেক আশা নিয়ে এসেছি আপনার কাছে। দয়া করে ফিরিয়ে দেবেন না।
-দেখুন, আমি শারীরিকভাবে ঠিক নেই। আপনি বরং এক কাজ করুন, আমার পরিচিত একজনের ঠিকানা দিচ্ছি, ওর কাছে যান। সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
-আচ্ছা, ঠিকানা দিন...'
ইলিশা অপরিচিত লোকটাকে ঠিকানা দিলে লোকটা 'ধন্যবাদ' জানিয়ে ভিজতে ভিজতে চলে যেতে লাগলো। লোকটা চলে গেলে ইলিশা হান্নান আবারও কাচটা টেনে দিয়ে কড়াইয়ের তরকারিটা নাড়তে লাগলো কিছুক্ষণ। তারপর কী মনে করে ফোনটা বের করে কন্টাক্ট নাম্বারে গিয়ে "জারা" লেখা নাম্বারে ডায়াল করলো। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হলে ইলিশা বলে ওঠলো,
-জারা, তোর কাছে একটা লোককে পাঠিয়েছি, লোকটা সারোগেসি চুক্তি করতে চায়। জানিস তো আমার শরীর খারাপ, তাই তোর কাছে পাঠালাম।
-হ্যাঁ, লোকটা এসেছে আমার কাছে। এইতো কথা বলছি।
-লোকটা গেছে তোর কাছে?' ধীরে অন্যমনস্ক হয়ে উচ্চারণ করলো ইলিশা। উত্তরের আশা না করে সে ফোনটা রেখে দিলো। লোকটার কথা ভাবছে সে। এতো দ্রুত লোকটা জারার কাছে পৌঁছলো কী করে? গাড়ি করে গেলেও কমপক্ষে বিশ/ত্রিশ মিনিট লাগার কথা। কিন্তু লোকটা এখান থেকে গেছে পাঁচ মিনিটও হয়নি। ভাবনাটা মাথা থেকে সরাতে পারলো না ইলিশা। নাকে তরকারির পোড়া গন্ধ আসায় সে আবার রান্নায় মন দিলো।
.
.
-আপনার নাম?' সামনে বসা লোকটার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে জারা। পুরো নাম সোফিয়া জারা। বয়স ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। ফিটনেস বডি। চেহারায় নজরকাড়া মাধুর্য বিদ্যমান। চাইলেই যেকোনো পুরুষের মন জয় করে সংসারী হতে পারতো। কিন্তু তা না করে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে সারোগেসিকে। সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
-জি আমার নাম আদ্রিয়ান। আমরা কি তাহলে চুক্তিটা করতে পারি?
-আপনি কতো ডলার দিবেন?
-আপনার সারা বছরের দায়িত্ব আমি নিয়ে নেবো। শুধু আমার বাচ্চাটাকে পৃথিবীতে আনুন।
-আপনার স্ত্রী কোথায়?
-আমি অবিবাহিত।
-ও, তাহলে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করুন।' একটা পেপার এগিয়ে দিলো জারা।
-স্বাক্ষরের দরকার নেই। এই নিন, আপনাকে অগ্রিম ডলার দিচ্ছি। এতে আপনার পুরো বছরটা আরাম আয়েশেই কেটে যাবে।" জারার দিকে একটা ডলারের বান্ডিল এগিয়ে দিলো আদ্রিয়ান। জারা মৃদু হেসে বান্ডিলটা লুপে নিলো। তারপর বললো,
-ঠিক আছে, আপনি আগামীকাল হাসপাতালে আসুন।
-মাফ চাচ্ছি ম্যাডাম। আমি হাসপাতালে আসতে পারবো না। আমার কাজ আছে। তাই আমি আজকেই আমার স্যাম্পল নিয়ে এসেছি সাথে। এই যে, এটা রাখুন...' একটা শিশি বের করে সামনে রাখলো আদ্রিয়ান। "আজ তাহলে উঠি আমি। আমার বাচ্চাটার খেয়াল রাখবেন। পেটে থাকতে যেন ওর অযত্ন না হয়।
-আপনি নিশ্চিত থাকুন...' চোখ টিপে ভরসা দিলো জারা।
.সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
মৃদু হেসে বেরিয়ে এলো আদ্রিয়ান। ভেতর থেকে দরজা লক করে দিলো জারা। তখনই আদ্রিয়ানের চেহারা বদলাতে শুরু করলো। ঠোঁটে ভয়ঙ্কর হাসি ফুটে ওঠলো তার। বিদ্যুৎ চমকাতেই তার ভয়ঙ্কর চেহারাটা ভেসে ওঠলো। দ্বিতীয়বার বিদ্যুৎ চমকাতেই কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল সে।
.
.
দুই
.
একটা রেস্তোরাঁয় বসে আছে ইলিশা হান্নান। একজনের জন্য অপেক্ষা করছে সে। ড্যানিয়েল হুগো। উনি তাকে সকালের দিকে ফোন দিয়েছিলেন। কী যেন জরুরি কথা বলবেন। তাই আসা। হাতের কফিটা প্রায় শেষ হতে চললো ইলিশার। ঘড়িতে টাইম দেখে নিলো। তিনটা বেজে পনেরো মিনিট পার হয়ে গেছে। মিস্টার হুগোর তিনটায় আসার কথা, অথচ এখনও তার দেখা নেই। ইলিশা আর অপেক্ষা করবে কি করবে না ভাবতে লাগলো। তখনই তাড়াহুড়া করে ভেতরে ঢুকলো মিস্টার হুগো।
-স্যরি, একটু দেরি হয়ে গেল মনে হয়...' ঠোঁটের মৃদু হাসি বুঝিয়ে দিলো দেরি হওয়ার জন্য তিনি কিছুটা লজ্জিত।
-ইটস ওকে...' কফির খালি কাপটা সামনে রাখলো ইলিশা।
-কী খাবেন বলুন?'সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
-আপনার দেরি দেখে কফি অর্ডার করে আমি খেয়ে নিয়েছি।' হাসলো ইলিশা। "আপনার জন্যই অর্ডার করুন।"
ওয়েটারকে ডেকে মিস্টার হুগো নিজের জন্যও একটা কফি অর্ডার করলো।
-যে কারণে আপনাকে ডাকা...' মিস্টার হুগো কিছুটা আনইজি ফিল করলেন। "আসলে বাচ্চাটার ব্যাপারে কথা বলতে আসছিলাম।"
-জি বলুন... কেমন আছে ও?
-ভালো। একজন আয়া দেখাশোনা করছে ওর। কিন্তু আমি ভেবে দেখলাম এতে বাচ্চাটার ভবিষ্যত ভালো হবে না। একজন মা-ই পারে সন্তানের ভালোভাবে দেখাশোনা করতে।"
ইলিশা হান্নান চুপচাপ মিস্টার হুগোর কথা শুনতে লাগলো। ইতস্তত করে মিস্টার হুগো প্রশ্ন করলেন,
-আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি বুঝতে পারছেন তো?
-না, আসলে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।' বোকার মতো হাসলো ইলিশা।
-আসলে আমি ভেবেছিলাম চিরদিন বিয়ে না করেই থাকবো। বাচ্চাটার কারণে আমরা কি এক হতে পারি না?'
-মানে বলতে চাচ্ছেন আমরা যেন বিয়ে করি?' ভ্রু কুঁচকালো ইলিশা।
-জি... প্লিজ একবার ভেবে দেখুন। হয়তো আমার বয়সটা একটু বেশিই হয়ে গেছে।
-না, বয়স ওটা কোনো ব্যাপার না...
-তাহলে রাজি আপনি?' মিস্টার হুগো ইলিশার একটা হাত নিজের দুহাত দিয়ে চেপে ধরলো। তাঁর হাতের উপর ইলিশা নিজের অন্য হাতটা রেখে চোখ টিপে উপর নিচ মাথা দুলালো। তখন হাসি ফুটে ওঠলো মিস্টার হুগোর ঠোঁটে। ইলিশা নিজেও চেয়েছিল একটু মানসিক প্রশান্তি। এভাবে হঠাৎ মিস্টার হুগো সুযোগটা করে দেবেন ভাবতে পারেনি সে।
খুশিমনে ফিরে আসে ইলিশা। তার ঠিক কিছুক্ষণ পর দেখা করতে আসে সোফিয়া জারা। ইলিশা তাকে বসতে দেয়।
-তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?' জারার মলিন চেহারা দেখে প্রশ্ন করে ইলিশা।
-আসলে তোর সাথে বিষয়টা কীভাবে শেয়ার করবো বুঝতে পারছি না।
-খুলে বল...
-হাসপাতাল থেকে ফিরছি আমি এখন। প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে রিপোর্ট পেলাম, প্রেগন্যান্ট। কিন্তু ডাক্তার বলছে আমার পেটে কোনো ভ্রুণের অস্তিত্বই নেই।
-কী বলিস?
-হ্যাঁ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
-ঐ লোকটা জানে, যার সাথে চুক্তি করেছিস?
-নাহ্, লোকটার সাথে আর যোগাযোগ হয়নি।
-কী বলিস, এতদিন হয়ে গেল লোকটা একবারের জন্যও দেখা করতে এলো না?
-না, যোগাযোগ করার জন্য কোনো নাম্বার বা ঠিকানা কিছুই দেয়নি।
-লোকটাকে শুরু থেকে কেমন জানি লেগেছিল। বড্ড অদ্ভুত টাইপের। তোর আর আমার বাসার এতটা দূরত্ব সে পাঁচ মিনিটে কী করে পাড়ি দিলো, ব্যাপারটা আমাকে এখনও ভাবিয়ে তুলে।
-ওসব বলে আমার মাথার চাপটা আর বাড়িয়ে দিস না।
-তা কী করবি বলে ভাবছিস?
-আর কয়েকদিন অপেক্ষা করে দেখবো, লোকটা যদি এরই মধ্যে না আসে, তাহলে বাচ্চাটা নষ্ট করে দেবো।
-হুমম, এটাই ভালো হবে। আচ্ছা শুন, এসেছিস ভালো হয়েছে, আজ রাতটা আমার এখানেই থেকে যা।
-বলছিস?
-হুমম...' ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেল ইলিশা মিস্টার হুগোর বিয়ের প্রস্তাবের কথাটা।
.
.
রাত বাড়তেই জারার পেটব্যথা শুরু হলো। ধীরে ধীরে ব্যথাটাও বাড়তে লাগলো। একসময় অসহ্য হয়ে ওঠলো ব্যথা। পাশে ঘুমিয়ে আছে ইলিশা। হাত দিয়ে নাড়া দিলো সে তাকে,
-ইলিশা, এই ইলিশা...
-হু..উ..মম... কী হয়েছে? ঘুমাসনি এখনও?' ঘুমের ঘোরে উচ্চারণ করলো ইলিশা।
-ঘুমাতে পারছি না, পেটের ভেতর কেমন জানি করছে। খুব ব্যথা।
-কী বলিস? সবে তো প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট পেলি, এরইমধ্যে প্রসব বেদনা?' উঠে বসলো ইলিশা।
-আরে মজা করিস না। ওসব কিছু না। আসলেই প্রচণ্ড ব্যথা। আমি সহ্য করতে পারছি না, মনে হচ্ছে ভেতরে কয়েকটা প্রাণী দৌড়াদৌড়ি করছে। আহহহ...' চিৎকার করে ওঠলো জারা। ইলিশা খেয়াল করলো জারার পেটটা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠছে।
.
.
[[চলবে...]]



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন