![]() |
| বেওয়ারিশ লাশ - রহস্যময় ভুতের গল্প |
বাবা কথা দিয়েছিলেন আমার কলেজের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে তার মাসীর বাড়ি বাংলাদেশ ঘুরতে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশের খুলনা জেলার খালিশপুর গ্রামে আমার বাবার মাসীর বাড়ি। সেই মতো পরীক্ষা শেষ হতেই আমরা তিন জন আমি, বাবা আর মা রওনা দিলাম মাসী ঠাম্মির বাড়ির উদ্দেশ্যে। ছোটবেলায় বাবার মুখে খুব শুনেছি বাংলাদেশের গল্প, গল্প শুনে নিজের মনে মনে মাসী ঠাম্মির বাড়ির গ্রামের একটা কল্পনা করে নিয়েছিলাম, এখন সেই কল্পনার গ্রামের সাথে বাস্তবের গ্রাম কে সামনা সামনি মিলিয়ে নেওয়ার পালা। বাংলাদেশ যাওয়ার বিবরণ না হয় অন্যদিন বলবো খন, আজ না হয় একজনের মুখে শোনা ওই দেশের একটা ভুতের গল্প বলি।রহস্যময় ভুতের গল্প
বাবার বলা সেই বাংলাদেশের গ্রাম এখন আর নেই, তার বদলে জায়গায় জায়গায় উঁচু ফ্ল্যাট বাড়ি ও পাকা বাড়ি, রাস্তাঘাট ও আগের মতো মাটির নেই। মাতৃভাষা বাংলা হলেও কথার মধ্যে একটা অদ্ভুত টান আছে। বাবার মাসতুতো দাদার ছেলে আমার বয়সী তাই বন্ধুত্ব হতে সময় লাগলো না। ছেলেটার নাম রাহুল। রাহুল ওদের মফস্বল শহর টা আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালো, সেই সাথে ওর বন্ধুদের সাথে আলাপ ও করিয়ে দিলো। কলকাতায় থাকি শুনে, দেখলাম ওদের মধ্যে সবারই আগ্রহ মেট্রো রেল নিয়ে, এছাড়া আরো টুকটাক বিষয়ে আগ্রহ থাকতো ওদের। আমি যতটা সম্ভব চেষ্টা করতাম ওদের আগ্রহ মেটাতে। সকাল সন্ধ্যা দুই বেলায় চলতো আমাদের আড্ডা। এমনই এক সন্ধ্যা বেলায় আমরা মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম ভূত নিয়ে। বিষয় কলকাতার ভূত ও বাংলাদেশের ভূত, তখনই আমার সাথে আলাপ হয় হাফিজুল মিঞার। রাহুল যদিও আমাকে পড়ে বলেছিলো হাফিজুল মিঞা পাগল, কেউ একটা ওর সাথে কথা বলে না, তবে সেই দিনের সেই গল্প শুনে আমি কোনো পাগলামির লক্ষণ হাফিজুল মিঞার মধ্যে খুঁজে পাই নি। ঘটনাটা সত্যি কিম্বা মিথ্যা সেটা জানা না থাকলেও পাগল সে মোটেও না।
হাফিজুল মিঞা যেমনভাবে আমাদের গল্পটা বলেছিলো আমি সেই ভাবেই লিখলাম।
"সরকারি হাসপাতাল থেকে পাঠানো বেওয়ারিশ লাশগুলোকে কবর দেওয়া হয় যে কবরস্থানে তার পাহারাদার ছিলাম আমি। ভয় ডর কোনো দিন আমার ছিলো না। কবর খোঁড়া, কবরে লাশ নামানো, তারপর তাকে মাটি দেওয়া এইটাই আমার কাজ। হাসপাতালের মুর্দা ঘরে পড়ে থাকা বেশিরভাগ বেওয়ারিশ লাশ সেই কবরস্থানে কবর দেওয়া হতো। যখন এইসব লাশগুলোকে কবর দিতাম তখন হাজারো চিন্তা মাথায় আসতো সেই সব লাশ দেখে। তোমরাই ভাবো না একসময় তারা হয়তো কতোই না বিলাসিতা করেছে, কিন্তু শেষদিনে তাদের সাথে কেউ নেই, এমনকি মাটি ও দিতো না। কিন্তু সেই দিন যে লাশটা আসলো, সেটা দেখে আমি প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলাম। সেই লাশটা দেখে আমার নিজের কোন অনূভুতি কাজ করেনি, বরং জীবনে সেই প্রথম ভয় পেয়েছিলাম। মানুষ পশুর থেকেও হিংস্র, সেটা এই লাশটাকে দেখলেই বোঝা যায়। লাশটা চেনার মতো অবস্থায় নেই। কেউ বা কারা প্রথমে লোকটার মুন্ডুটা কেটে দেহ থেকে আলাদা করেছে, তারপর চপার জাতীয় কিছু দিয়ে দেহটাকে কুপিয়েছে, আর শেষে গোটা দেহটা অ্যাসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উঃফ কি নৃশংস, এখনো মনে পড়লে শিউরে উঠি। লাশটার অবস্থা এমন ছিল যে তার পরিচয় পাওয়া যায়নি। এমনকি চার-পাঁচ দিন এই শহর থেকে কেউ হারিয়ে গেছে এমনটাও শোনা যায় নি, তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে থানা থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে পোস্ট মর্টেম করে লাশ কবর দিয়ে দিতে। কিন্তু মফস্বলের সরকারী হাসপাতাল গুলোতে যা হয়, তাই হয়েছিলো সেই লাশটার ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ পোস্ট মর্টেম করে কোনমতে দায়সারা সেলাই দিয়ে লাশ পাঠিয়ে দিয়েছিলো কবরস্থানে। সেদিন যখন এ্যাম্বুলেন্স এসে সেই লাশটাকে কবরস্থানে রেখে গেলো তখন প্রায় সন্ধা হয়ে এসছে, তাই তাড়াতাড়ি ঝন্টুকে ডাক দিয়ে কবর খুঁড়তে লেগে গেলাম, কিন্তু বারবার আমার চোখে ভাসতে লাগলো দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথাটা। সরকারি হাসপাতাল গুলো এত গাফেলতি করে যে বেওয়ারিশ বলে লাশটার মাথা সেলাই করে এমনভাবে লাগিয়েছিল যে আনতে আনতে গাড়ির ঝাঁকুনিতে সেটা খুলে দেহ থেকে আলাদা হয়ে গেছে।" রহস্যময় ভুতের গল্প
"আমি আর ঝন্টু মিলে যখন লাশটা কবর দেয়া শেষ করলাম ততোক্ষণে সন্ধ্যার আজান শেষ হয়ে গেছে। কবর দেওয়া শেষ করে গেলাম গোসল (স্নান) সারতে, আর কাজ শেষ বলে ঝন্টু ও বাড়ি চলে গেলো। ঝন্টু দশ-এগারো বছরের একটা ছেলে, আমাকে কাজে সাহায্য করতো, সন্ধা পর্যন্ত থাকতো আমার সাথে সাথে, তারপর চলে যেতো বাড়ি। কবরস্থানে যে জায়গাটায় মৃতদেহের জানাযা পড়ানো হতো, তার সামনে গেট থেকে বের হয়েই পাশে খুপরি মত একচালা ঘরে আমি থাকতাম। মফস্বলের কবরস্থান বলে কথা, তার উপর আবার বেওয়ারিশ লাশের, তাই জনবসতি থেকে একটু দূরে শহরের শেষ কোনায় একটা জায়গা বেছে নিয়ে তাতে কবরস্থান বানানো হয়েছিল।"
"একজনের মতো রান্না তাই বেশি দেরী হতো না, যতো তাড়াতড়ি পারতাম রাতে খেয়ে শুয়ে পড়তাম। রাতে যখন ঘুম ভাঙত তখন মাঝে মাঝে বাইরে এসে একবার কবরস্থানের দিকে দেখে নিতাম, সব ঠিক আছে কিনা। মাঝে মাঝে পুলিশের বড়ো কর্তা আমাকে সাবধান করে বলতেন বড় বড় শহরে কবরস্থান থেকে লাশ চুরি হয়, তাই ঠিক করে পাহারা দিতে। কিন্তু এই শহরে এমন কিছু ঘটেছে বলে আমি শুনিনি ও দেখিনি, তাই আমি মনে করতাম না কবরস্থান পাহারা দেওয়া দরকার। তবুও সরকারি চাকরী যখন, কিছু ঘটলে দায়ভার আমার, তাই ঘুমানোর আগে সেইদিন নিয়মমাফিক খাওয়া দাওয়া সেরে একটা বিড়ি ধরিয়ে তাকালাম কবরগুলার দিকে। স্বভাবমতই চোখ যায় নতুন দেয়া কবরটার দিকে। কবরটার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম, স্পষ্ট দেখলাম কবরটার মাথার দিকে কি যেন দাঁড়িয়ে আছে। চোখের ভুল কিনা সেটা দেখার জন্য ঘরে গিয়ে টর্চ নিয়ে এসে দৌড়ে গেলাম সেই কবরটার দিকে। কাছে গিয়ে দেখলাম মাটি খোড়া। কি ব্যাপার? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম। মাত্র তিন-চার ঘণ্টা আগেই তো আমি আর ঝন্টু মিলে পরিপাটি করে কবর দিয়েছিলাম। সন্ধ্যে হয়ে যাওয়াতে আর মৃতদেহ দেখে ভয় পেয়ে একটু তাড়াহুরা করেছিলাম অন্যদিনের তুলনায় কিন্তু এমন ভাবে তো রেখে যায়নি মোটেও। টর্চের আলোতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কেউ মাটি খোঁড়ার চেষ্টা করেছে এবং কিছুটা খুঁড়েও ফেলেছে। খোঁড়া জায়গাটা দেখে বুকটা কেঁপে উঠলে ও, এটা হয়তো কোনো শেয়াল বা কুকুরের কাজ ভেবে আমি নিজেকে শান্ত করলাম। কি আর করা, আবার নিজের হাতে খোড়া জায়গাতে মাটি চেপে দিলাম। কিন্তু সে দিন একবারও চিন্তা করেনি যে কবরস্থানের এতো উঁচু পাঁচিল ও তালা বন্ধ গেট শেঁয়াল বা কুকুর কেন, কোনো মানুষের পক্ষেও পার হয়ে ভিতরে ঢোকা সম্ভব না।" রহস্যময় ভুতের গল্প
"কবরের মাটি ঠিক করে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে নিশ্চিত মনে ঘুমিয়ে পড়লাম। মাঝ রাতে প্রচন্ড অস্বস্তিতে ঘুমটা ভেঙে গেলো। এমনটা হয় না কখনো, বরাবর একঘুমেই রাত শেষ হয়ে যায়। ঘুম ভেঙে যেতেই আমার সেই কবরের কথা মনে হলো, কেউ যেনো আমার কানে কানে বলছে দরজা খুলে বাইরে বেরোলে আবারও সেই দৃশ্য দেখতে পাবো। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দরজা খুলে বাইরে যেতেই নাকে একটা পচাঁ কটু গন্ধ এসে লাগলো। গন্ধের উৎস খুঁজতে আশে-পাশে তাকালাম। পরিষ্কার চাদেঁর আলোয় দেখলাম মৃতদেহের জানাযা পড়ানো হয় যে জায়গায় সেখানে সাদা কাপড়ে মোড়া কিছু একটা রয়েছে, সম্ভবত একটা লাশ!"
"প্রথমেই বলেছি আমি ভীতু না, লাশ দেখে সাময়িক ভয় পেলেও, পড়ে থাকা লাশটার কাছে এগিয়ে গেলাম ভালো করে দেখার জন্য। ঠিক মৃতদেহের খাটিয়া যেখানে রেখে জানাযা পড়ানো হয় সেখানেই সাদা কাপড়ে জড়ানো একটা লাশ পড়ে আছে। এতরাতে কারা লাশ নিয়ে আসলো ভাবতে শুরু করলাম আমি। যদি কেউ এনে থাকে তাহোলে আমাকে ডাকলো না কেন? ঠিক সেই সময় আমার মনে পড়লো, ভিতরে ঢুকতে হলে গেট দিয়েই ঢুকতে হবে যার চাবি একমাত্র আমার কাছেই আছে। তবে কি এটা.... আর ভাবতে পারলাম না, চারিদিক থেকে ভয়ের অনূভুতি গ্রাস করলো আমাকে। হাঁটার শক্তিও মনে হলো কেউ কমিয়ে দিয়েছে, তবুও বিকারগ্রস্থের মত এগিয়ে গেলাম লাশটার দিকে। কাপড় সরাতেই যা দেখলাম তাতে মনে হলো আমি এখনই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব। কি দেখলাম জানো? দেখি সেই মুখটা, যে লাশটা সন্ধের সময় আমি কবর দিয়েছি, সেই কাটা মুণ্ডুর লাশ। কিন্তু বিকালে কবর দেয়া লাশটা এখানে কিভাবে আসবে? অ্যাসিডে পোড়া পচা শরীর থেকে তখন ভুরভুর করে পচা গন্ধ বের হচ্ছে। আমার মাথা তখন কাজ করছিলো না, কি করবো? কাকে ডাকবো? কিছু মনে করতে পারছিলাম না। হঠাৎ মনে হলো লাশটা একটু নড়ে উঠলো, সাথে সাথে ভয়টা যেনো আরো জোড়ালো হলো। ওই এখনই বুঝি এই কবরস্থানের প্রত্যেকটি লাশ উঠে এসে আমার গলা টিপে ধরবে। বুকে একটা চাপ অনুভব করলাম। আস্তে আস্তে সময় যেতে লাগলো কিন্তু এরকম কিছু ঘটলো না। নিথর হয়ে পড়ে আছে লাশটা। এবার মনে হলো আমি আবার গায়ে শক্তি ফিরে পেলাম, হঠাৎ ভয়ের ব্যাপারটা চলে গেলো আমার উপর দিয়ে। কিভাবে, কেন লাশ কবর থেকে উঠে আসলো এসব চিন্তা না করে প্রথমেই আমার মনে হলো, লাশটাকে আবার কবর দিতে হবে। এই ভাবা মাত্রই লাশটাকে আবার কাধে তুলে নিলাম। জীবনে মনে হয় এত ভারী লাশ কোনদিন বহন করেনি। ভার সামলাতে বেশ বেগ পেতে হলো, তারউপর পাঁচ-ছয় দিনের পুরানো লাশ জোরে ধরা মাত্রই দুমড়ে মুচড়ে গেলো। মনে হলো এখনই বুঝি হাত বা পা খুলে পড়বে। লাশটাকে কোনো মতে ঘাড়ে চাপিয়ে আর কাটা মুন্ডু টা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলাম কবরের দিকে। সেই সময় যে কি করে মনে অতটা সাহস এসেছিলো সেটা আজও মনে পড়লে বিস্মিত হয়ে যাই। রহস্যময় ভুতের গল্প
"লাশটা কে কবরে শুইয়ে মাথাটা ঠিক জায়গায় বসিয়ে রাখলাম। কবরে আবার মাটি ফেলার তোড়জোড় করছিলাম, ঠিক তখনই খেয়াল করলাম, বড় বড় হলুদ চোখ দিয়ে লাশটা তাকিয়ে আছে আমার দিকে আর একটা হাত এগিয়ে আসছে আমার দিকে। সেই হাতটা এসে আমার হাতটা চেপে ধরলো এবং এত জোরে যে কারো সাধ্য নাই সেই হাত ছাড়ানোর। আমার আর সাহসে কুলায় নি, ওখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম।"
"যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সকাল, দেখলাম ঝন্টু আমার মুখের উপর ঝুকে আছে। ঝন্টু জিজ্ঞেস করলো রাতে কি হয়েছিলো? এবং কিভাবে নতুন কবর দেয়া লাশটা মুর্দার জানাযা পড়ানোর জায়গায় গেলো? এই কথা শুনে আমার আবার জ্ঞান হারানোর জোগাড় হলো। আমি নিজে কাল দ্বিতীয় বারের মত লাশ কবরে রেখে এসেছিলাম শুধু মাটি দিতে পারিনি। আগের রাতের ঘটনা কাউকে বললাম না, বললে কেউ আর কাজ করবে না ওই কবরস্থানে। তার একদিন পড়েই আমি আমার ইস্তফা পত্র দিয়ে দিয়েছিলাম কবরস্থান কর্তিপক্ষ কে। কবরস্থান কর্তিপক্ষ এরপর ঝন্টু কে ওই কবরস্থানের দায়িত্ব দিয়েছিলো কিন্তু তারপরের রাতেই ঝন্টুর অবস্থা ও আমার মতই হয়েছিলো। এরপর ওই কবরস্থান বন্ধ করে দেওয়া হয়। তোমরা কেউ আজও ওই কবরস্থানের ভিতরে ঢুকলে দেখতে পাবে ওই জানাযা পড়ানোর জায়গায় আজও সাদা কাপড়ে মোড়া এক কঙ্কাল শুয়ে আছে।
"গল্প শেষ এবার আমি যাই" এই বলে হাফিজুল মিঞা চলে যেতেই রাহুল বলেছিলো, "পাগলের পাগলামি"। কিন্তু আমাদের কারো সাহস হয়নি পাগলামিটা সত্যি না মিথ্যা তা যাচাই করা, মানে কবরস্থানে গিয়ে একবার উঁকি দিয়ে দেখা আসা লাশটা সত্যি ওখানে আছে? না কি হাফিজুল মিঞা এতক্ষন গুল দিলো সেটা যাচাই করা।
"সমাপ্ত"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন