কিরণ পাঠাগার - ছোটগল্প

কিরণ পাঠাগার - ছোটগল্প

 বাড়িতে আমরা তিনজন মহিলা আর আমার শ্বশুর থাকি। শ্বাশুড়ি, জা আর আমি - অনু। আমার বর ঢাকায় চাকরি করেন আর দেবর থাকে কাতার। দুই ননদ শ্বশুরবাড়ি। ভালমম্দ মিলিয়ে চলে যাচ্ছে আমাদের জীবন। বেশীরভাগ সাদামাটা, কিছুটা রঙিণ।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমাদের কিছু সাংসারিক কাজ থাকে। তারপর অবসর। আমি অনেকবার আমার স্বামী,রবিকে বলেছিলাম গ্রামের একটা স্কুলে চাকরি নেই। বাংলায় অনার্স  শেষ করে আমার বিয়ে হয়েছে। কিন্ত রবি কিছুতেই দিলো না। 

আমার পরিবার এই পরিবার থেকে অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বচ্ছল।আমিতো রাজিই ছিলাম টিনের ঘরে এসে থাকতে। আর একটা বিষয় ছিল - রবির ছোট ফুফু এই বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। এই বাড়ির নাম হয়ে গেলো  ফাঁসি বাড়ি।এসব কারনে আমি দোটানায় ছিলাম। কিন্ত আব্বার খুব ভাল লাগছে রবির বাবাকে। ওনি একজন শিক্ষিত মানুষ ও ভাল একটা চাকরিও করতেন। রবিও শিক্ষাদীক্ষায় ভাল। আব্বার পছন্দই আমার পছন্দ। আমি আর কিছু বলি নাই। 

শ্বশুর সারাদিনই চুপচাপ নিজেকে নিয়ে থাকেন। খাওয়া দাওয়া, নামাজ পড়া, এলাকার মুরুব্বিদের সাথে গল্প এই ওনার জীবন। আমি সাহিত্য নিয়ে পড়েছি বলে আমার সাথে প্রায়ই টুকটাক গল্প করেন।আমি খুব গল্পের বই পড়ি।বাবার বাড়ি থেকে আমি আমার অনেক বই এনে রাখছি। অবসর সময়ে পড়ি। 

আমার শ্বশুরবাড়িটা অনেক বড় জায়গা নিয়ে। খুব সাধারণ কয়েকটা ঘর কিন্ত সামনে পিছনে অনেক জায়গা। বহু নাম জানা অজানা গাছদিয়ে ঘেরা। বাড়ির পিছনে একটা গাছে একটা পুরনো ঘর আছে। বেশীরভাগ সময় তালাবদ্ধই থাকে। সেই ঘরটার পাশেই একটা চালতা গাছ। আমি রবিকে বলে একটা দোলনা বাধছি। আমি আর আমার জা, আমেনা, আমরা বিকেলবেলা সেখানে বসে দোল খাই,  চা খাই আর গল্প করি। অলস সময় পার করি। 

একদিন দুপুরে আমি সেই গাছের নীচে বসে গল্পের বই পড়ছি। হঠাৎ শ্বশুর আসলেন। বললেন - অনু, আসো এই ঘরে।ওনি সেই তালাবদ্ধ ঘর খুললেন। তোমাকে আজকে একটা জিনিস দেখাই। আমি ওনার পিছন পিছন গেলাম। ঘরটা কি গুমোট হয়ে আছে!! শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বাবা পুরনো দুইটা আলমারি খুললেন। আমি তো অবাক। চিৎকার করে উঠলাম - এত বই!! 

কার এগুলো বাবা? 

- আমার বই- রবি,খোকার বই।এক হাজার বইতো হবেই।

- বাবা, এতদিন পরে দেখালেন! একটু যত্নে রাখলে ভাল হতোনা, বাবা?

- মেয়েদুইটা শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পর এই আলমারি আর খোলাই হয় নাই। 

আমি তো  খুব খুশী।প্রায়ই বই আনি, পড়ি। একদিন জায়ের সাথে একটা বুদ্ধি করলাম। তারপর মা,বাবাকে বললাম কথাটা। 

বাবা, আপনার এত বই আপনি তালাবন্ধ করে রেখে দিয়েছেন। বেশীরভাগ বই উইপোকা কাটতেছে। আমি একটা অনুরোধ করি বাবা? 

বাবা খুবই নরমম্বরে বললেন - বলো। 

বাবা আমরা কিন্ত একটা পাঠাগার খুলতে পারি। আপনার এত বড় সংগ্রহ। আপনার বই পড়বে গ্রামের মানুষ। ছেলেমেয়েদের কত উপকার হবে। একটু কি ভাববেন, বাবা?  

বাবা বললেন - কে দেখাশোনা করবে?  

- আমি আর আমেনাই পারবো। দুপুরের পর থেকে তো আমরা অবসরই থাকি। আমার সাথে মাও বলে ওঠলেন - আমিও পারবো। 

অতঃপর রবি বাড়ি এলে আমরা আলোচনা করে ঠিক করলাম আমরা বাড়ির পিছনের ঘরটা আর উঠানটা কাজে লাগাবো। বসার ব্যবস্হা করতে হবে। প্রতিদিন দুইঘন্টা পাঠাগার খোলা থাকবে। এখানে বসেও পড়তে পারবে। আবার কেউ চাইলে বাড়িতেও নিতে পারবে। আমরা বই ভাড়াও দিবো। দুই থেকে পাঁচটাকার বিনিময়ে। টাকা দিয়ে পাঠাগারের উন্নয়ন করা হবে। 

উঠোনের এক পাশে মার কাছে আসা এলাকার মুরুব্বিদের বসার ব্যবস্হা থাকবে। ওনারা পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় আলোচনা করবেন। 

এক শুক্রবার আমরা পাঠাগারটা উদ্ভোদন করলাম। গ্রামের বহুমানুষ ভীড় করলেন আমাদের বাড়িতে আমার শ্বশুর চোখ মুছতে মুছতে পাঠাগারের নাম দিলেন  রবির সেই ফুফুর নামে - কিরণ পাঠাগার। 

আমি আর আমেনা সেদিন যারা এসেছিল সবার জন্য চা আর মিষ্টির ব্যবস্হা করেছিলাম। 

সূর্যের কিরণের মত আমাদের কিরণ পাঠাগার ও খুব অল্পদিনেই পুরো গ্রামে আলো ছড়াতে শুরু করলো। আমরা সবাই এখন খুব ব্যস্ত। সেই অলস সময় কোথায় হারিয়ে গেলো।  দুপুরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের মানুষ আসেন বই পড়তে। শুরু করতে অনেক কষ্ট ও  ভুল ছিল। কিন্ত সবার প্রচেষ্টায় আমরা পাঠাগারটা দাড় করাই। 

কি যে আনন্দ লাগে! 

আমার শ্বশুর একদিন খুব স্নেহ করে পাশে বসিয়ে বললেন -মারে, আমার পুরনো বইগুলোও যে মানুষের এত কাজে আসবে কোনদিন কল্পনাও করিনি। আমি আরেকটা কারনে তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।তুমি আমার বাড়িটার সেই খারাপ নামটা ঘুচিয়ে দিয়েছো। আজ আমার বাড়িকে সবাই বই বাড়ি বলে। আমার যে কি আনন্দ লাগে। 

কথাটা শেষ করেই মা-বাবা চোখ মুছতে থাকলেন। 

"সমাপ্ত"

ছোটগল্প

Post a Comment

أحدث أقدم