লাল ফ্রক - ছোটগল্প

নারায়ণ দাস চিন্তিত। জামার সাইজ কিছুতেই বুঝতে পারছে না। যেটাই পছন্দ হয়, মনে হয় সেটা মিতুর গায় হবে না। চার বছর বয়সী নাতনি। দোকানদার বলেই চলেছে, "ওটা হবে ভাই, এটা চার বছরীদের ভাই, সেটা ফিটিং হবে ভাই", কিন্তু নারায়ণ দাস নিশ্চিত হতে পারছে না। কোমরের সাকুল্যে ছয়শ টাকা জলে ফেলার মতো সাহস তার নাই। সে বিরক্ত। বিরক্ত দোকানদারও।
দুনিয়ার তাবৎ দোকানদার যে উন্নত জাতের মোটিভেশনাল স্পিকার, তার আরেকটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ রেখে দোকানি জামা একটা গছিয়ে দিলো নারায়ণ দাসকে। পাঁচশ পঞ্চাশ টাকা খসিয়ে আড়াইশ টাকা মুনাফা করা ফ্রকটা বেচতে পেরে অতি প্রশান্তিতে দীর্ঘ একটা হাই তুললো দোকানি। হাই তোলার সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া চোখ দু'টো যখন হাই শেষে খুললো সে, শব্দটা তখনই এলো রাস্তার দিক থেকে- 'ক্বড়াৎ!'

লাল ফ্রক - ছোটগল্প


একটি লাল জামা - Grathor.com


গাড়ির তলায় পিষে গেলো নারায়ণ দাস।
কাপড়ের দোকানি নুরুল হকের ভালোমানুষ পরিচিতি নাই। পুরোদস্তুর রক্তচোষা এ লোক। মানুষ বানরের নয়, হায়েনার উত্তরাধিকারী, ডারউইন সাহেব এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতেন, যদি তাঁর দেখা হতো নুরুল হকের সাথে। কিন্তু, মানুষের চরিত্র উদ্ভট! আমরা দুর্ধর্ষ নিজাম ডাকাতকে আউলিয়া হয়ে যেতে দেখেছি, আমরা দেখেছি রক্তপিয়াসী অশোককে ঋষিরাজায় পরিণত হয়ে যেতে।
নুরুল হক স্তব্ধ হয়ে বসে আছে নারায়ণ দাসের থ্যাঁতলা লাশটার পাশে। কিছু মানুষ ভিড় জমিয়েছে; কিছু মানুষ পেরিয়ে যাচ্ছে, এড়িয়ে যাচ্ছে। নুরুল হকের বুকের ভিতর হাহাকার নেই, তার চরিত্রে এ আবেগ বেমানান বটে; কিন্তু, সে বিস্মিত! সে বিস্মিত এই দৃশ্য দেখে যে, বুড়া লোকটা এখনও দুই হাতে বুকের সাথে আঁকড়ে রেখেছে লাল ফ্রকটা! 'এই লোক কি মরে নাই!'
নিজের ভাবনায় নিজেই লজ্জিত হলো নুরুল হক। ভিড় নাই। মানুষের কৌতূহল ফুরিয়েছে। মাছিদের কৌতূহল বাড়ছে। নুরুল হকের কাণ্ড দেখে দোকানের ছেলেপেলেগুলো বিস্ময়াভিভূত হলো! মানুষ যেহেতু খারাপ ভাবনাটা আগে ভাবে, অতএব আশপাশের সবাই খানিকক্ষণ বিড়বিড় করলো- 'নুরু মিয়া হাগল হই গেসেনি!' বাংলা ছোটগল্প 
এদেশে যে এখনও ফুটা ছনের ছানির ঘর আছে, নারায়ণ দাসের ঘরটা না-দেখলে নুরুল হকের বিশ্বাস হতো না। নুরুল হকের দালানটা ছ'তলার। নারায়ণ দাসের ঘরটা ভঙ্গুর হলেও পরিচ্ছন্নতায় ঝকঝকে। উঠোনে তিল পরিমাণ আবর্জনা নাই। গরুটাও তকতকে পরিচ্ছন্ন, যদিও প্রায় কঙ্কালসার। একটা পেয়ারা গাছ, একটা সুপারি গাছ, একটা তুলসী গাছ, আরেকটা ছোট নারকেল গাছ। আজ আকাশটা ভীষণ নীল! সম্বিৎ ফিরলো নুরুল হকের, নারীকণ্ঠের বিলাপ শুনে। লাশ ঘরে ঢুকিয়েছে এতক্ষণে। পুলিশের ঝামেলা নিজে দাঁড়িয়ে সম্পন্ন করে কিসের টানে লোভী নুরুল হক ঠিকানা খুঁজে-খুঁজে বুড়ো নারায়ণ দাসকে বাড়িতে নিয়ে এলো, সে নিজেই বুঝতে পারছে না! সে কি এটা জানে, যে, রাস্তার মাঝখানে মরে পড়ে থাকা থ্যাঁতলা নারায়ণ দাসের মতোই ঠিক অমনভাবেই সে নিজেই এখন দুই হাতে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে আছে লাল ফ্রকের প্যাকেটটা?বাংলা ছোটগল্প 
একটা চার-পাঁচ বছরের শিশু দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছে হতভম্ব! বারবার উঁকি দিচ্ছে ঘরের ভিতরে, কিন্তু মানুষের ভিড়ে যাচ্ছে না। মুখটা তার বিষণ্ণ। চোখ দু'টোয় অসহায়ত্ব। নুরুল হক এগিয়ে গেলো।
"নারায়ণ ভাই তুমার কে হয় গো মা-জননী?"
দু'হাতের তেলোয় চোখ মুছছে শিশু। তেলো ভিজে উঠেছে। জবাব দিচ্ছে না সে। জবাব দিলো নুরুল হকের পেছনে দাঁড়ানো লোকটা।
"অয় মিতু। নারাইণ দা'র নাতিন, হরি'র বেডি।"
নুরুল হক বেরিয়ে যাচ্ছে উঠোন ছেড়ে। চিতা নেভা শেষে পুনরায় নারায়ণ দাসের উঠোনে এসেছিলো সে। কেনো? জানে না। ইতিমধ্যেই এ-বাড়ির অনেকের কাছে সে মহাপুরুষে পরিণত হয়ে গেছে। মুদিদোকানি হরি দাস তাকে হাত জোড় করে অনুরোধ করছে একটিবার বসে যাওয়ার জন্য, ঘরে। নুরুল হক ইতিউতি তাকাচ্ছে। সে একটি শিশুকে খুঁজছে, চার-পাঁচ বছর বয়সী। নুরুল হকের হাতে একটা লাল ফ্রক, আজ সকালে যে-ফ্রকটা প্রায় আধাআধি মুনাফায় বিকিয়েছিলো সে।
বহু বছর কেটে গেলো। মিতু বড়ো হলো। প্রায় সবাই ভুলে গেলো একজন দুখী নারায়ণ দাসের স্মৃতি, যে বুড়োটা এক সকালে নাতনির জন্য নিজের শেষ সম্বল দিয়ে একটি লাল টকটকে ফ্রক কিনে মরে গিয়েছিলো। সেবার দুর্গাপূজায়, চারপাশের শিশুদের নতুন জামা দেখে, ভয়ে মা-বাবাকে বলতে না-পেরে দাদাকে বলেছিলো সাতসকালে তার নাতনি- "আমালে নাল জামা কিইন্যা দিবানা দাদুই?" উপার্জনহীন বুড়ো নারায়ণ দাসের বুকের ভিতরে হাহাকার উঠেছিলো। বহুবছর আগেকার সেই হাহাকারের কিঞ্চিৎ এখনো বয়ে বেড়ায় মিতু। সে ভুলতে পারেনি ধুতির গিঁট খুলে পয়সা গুনতে-গুনতে তার জন্য একটা লাল জামা কিনতে বেরিয়ে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরা দাদাকে। চাকার তলায় থ্যাঁতলা অবস্থায়ও ছোট্ট ফ্রকটা বুকের সাথে লেপ্টে রাখা বুড়োটাকে ভুলতে পারেনি নুরুল হকও। নিরঞ্জনপুরের কাপড়ব্যবসায়ী নুরুল হক, তারপর থেকে প্রতি বছর পূজায়, একটা করে লাল জামা রেখে আসতো নিজ হাতে, দরিদ্র মুদি দোকানি হরি দাসের দাওয়ায়।বাংলা ছোটগল্প 
নুরুল হক মারা গেছে। কবর দিয়ে সবাই চলে গেলে, গোরস্থানের বাইরে এসে দাঁড়ালো এক সদ্যতরুণী। তার হাতে একটা বড়ো থলে, থলের ভিতরে ছোটবড়ো ষোলোটা জামা। থলেটা বুকের সাথে আঁকড়ে হুহু করে কাঁদছে মেয়েটা, আর বারবার তাকাচ্ছে গোরস্থানের ভিতরের একটি নতুন কবরের দিকে। তার মনে পড়ে যাচ্ছে বহুবছর আগের কয়েকটা দৃশ্য- ধুতির কোমর থেকে টাকা বার করে গুনতে-গুনতে উঠোন পেরিয়ে যাচ্ছে তার দাদুই, থ্যাঁতলা দাদুই শুয়ে আছে ঘরের ভিতরে, দাদুইয়ের জন্য কান্না পাচ্ছে তার, ভয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে না-পেরে ফোঁপাচ্ছে সে, আর, দাদুই'র মতো এক বুড়ো বুকের সাথে একটি লাল জামা চেপে রেখে তাকে জিজ্ঞেস করছে- "নারায়ণ দা তুমার কে হয় গো জননী?"
মানুষের মায়া বড়ো মন্দ।

-Salah Uddin Ahmed Jewel

 তথ্যসুত্র Facebook 

Post a Comment

أحدث أقدم