সেলিনা বানুর ডিপ ফ্রিজ - বই রিভিউ

সেলিনা বানুর ডিপ ফ্রিজ - বই রিভিউ

 বিছানায় বসে বিনুনি বাঁধতে বাঁধতে প্রবাসী মেয়ের সাথে দু'মিনিট কথা বলে নেন সেলিনা। আরো বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল- কিন্তু মেয়ে ব্যস্ত, মায়ের জন্য দু'মিনিটের বেশি সময় নেই তাঁর। 


তাও তো ভালো মেয়ে ফোনটা ধরে, ছেলেকে তো মাসে দু'মাসে একবার ধরা গেলে সেই-ই  ঢের বেশি! যদিও ছেলে দেশেই থাকে, চট্টগ্রামে। বউ-বাচ্চা নিয়ে আগে ঈদে-চাঁদে আসতো, এখন তাও আসে না। সেলিনা অবশ্য অপেক্ষা করেন প্রতিবারেই, আর প্রতিবারেই চাঁদ রাতে ছেলে জানান দেয়- টিকিট পায়নি, নাহয় বাচ্চা অসুস্থ, নাহলে অফিসের কাজ পড়ে গেছে।  

বাহানা ওসব, বোঝেন সেলিনা। বোঝেন বলেই আর জোর করেন না। মাঝে মাঝে কেবল ফোন করেই খোঁজ নেন। 


ছেলে অবশ্য  অর্ধেক কথা ইংরেজিতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে আজকাল। সেলিনা অর্ধেক বোঝেন, বেশিরভাগই বোঝেন না। সেই কোন স্কুল জামানায় অল্প-স্বল্প ইংরেজি পড়া সেলিনার এখন আর ওসব মাথায়ও ধরে না। ইংরেজি শিখবেন কীভাবে, কলেজে পা দেবার আগেই তো বিয়ে হয়ে গেলো উকিল সাহেবের সাথে, বছর ঘুরতেই কোল জুড়ে ছেলেটা এলো... এক ইংরেজির চক্করে পড়ে ফোনের অন্যপাশে নিজের সেই নয় মাস পেটে ধরা ছেলেটাকেই এখন কেমন অপরিচিত ঠেকে!

থাক, ছেলেকে আজ আর কল দেবেন না। ঘুম পাচ্ছে।  

দুপুরে ঘুমিয়ে উঠেছেন, তাও ঘুম পাচ্ছে। 


সত্যি বলতে কী, গত কয়েকমাস যাবত তাঁর চমৎকার ঘুম হচ্ছে রাতে, এত বছরের সঙ্গী ঘুমের ওষুধ ছাড়াই এক ঘুমে রাত পার। সকাল ৯ টায় যখন চোখ খোলেন নিজেকে দিব্যি ঝরঝরে  লাগে, এত বছরে যা কখনো লাগেনি।। ছুটা বুয়াটা আসে দশটায়, তার আগ পর্যন্ত বিছানাতেই শুয়ে থাকেন একা একা। জানালা গলে নামে নরম সোনালি রোদ্দুর, বারান্দার মাথা দোলায় সবুজ গাছের সারি, কোলের কাছে কুন্ডুলি পাকিয়ে ঘুমায় মেয়ের ফেলে যাওয়া পোষা বেড়ালটা... বেশ লাগে সেলিনার। জীবনকে এত সুন্দর তার বহুকাল লাগেনি!  ডাক্তার সাহেব ঠিকই বলতেন- "আপনার কোন ওষুধ লাগবে না আপা, আপনার লাগবে বিশ্রাম আর বিশ্রাম। বহুকাল কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে শরীর।" 

মেয়ে মানুষের আবার ক্লান্তি কী, ঘরের কাজে কি ক্লান্তি আসে?  

উকিল সাহেব তো বলতেন সংসার করা কোন কাজই না!


কাজ বলতে তো সেই কোন কাক ডাকা ভোরে উঠে হেঁসেল ঠেলা দিয়ে দিনের শুরু। উকিল সাহেব যখন স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে মর্নিং ওয়াক করতে যেতেন, সেলিনা তখন চুলার পাড়ে ঘেমে-নেয়ে রুটি বেলছেন। শ্বাশুরি মায়ের রুটি, উকিল সাহেবের লাল চালের ভাত, ছেলেমেয়ের জন্যে আবার পরোটা। ভাতের সাথে উকিল সাহেবের চাই দুটো ডিমের সাদা অংশ ভাজা, গরম গরম ডাল আর টমেটো পুড়িয়ে ভর্তা। খাওয়ার শেষে আদা দিয়ে এক কাপ চাপ, একটা মশলা দেয়া পান। অন্যদিকে দেবরের আবার মাংস ছাড়া চলতই না। একবেলা মাংসে কম পড়লে এক সপ্তাহ শাশুড়ির মুখ হাঁড়ি। ছেলেমেয়ের ছিল আরেক হ্যাপা- স্কুলে প্রতিদিন নিত্য-নতুন টিফিন চাই, ব্যাগটা গুছিয়ে দেয়া চাই, হোমওয়ার্কগুলি দেখে দেয়া চাই। এদের স্কুলে দিয়ে ফিরতে ফিরতেই দুপুরে রান্না বসাবার সময় হয়ে যেতো,। শ্বাশুড়ি মায়ের ডায়াবেটিস, বেলা একটার এক মিনিট পরেও দুপুরের খাবার তিনি খান না। বুয়ার রান্না তাঁর মুখে রোচে না, মাছ-সবজির ৩/৪ পদ চাই-ই চাই। সবদিক সামলে সেলিনার কখনো সুযোগ হয়নি সকাল বেলা নাস্তাটাও কখনো টেবিলে বসে খাওয়ার। প্রতিদিনই কাজের ফাঁকে ফাঁকে নাকেমুখে গুঁজে নিতেন কিছু, যেন কেবল শরীরটা চলে। ছুটির দিনগুলিতে ছিল আরও যন্ত্রণা। উকিল সাহেবের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন আপ্যায়ন করতে করতে নাভিশ্বাস উঠে যেতো। রাত দুটো-তিনটের আগে কখনো বিছানায় পিঠ ঠেকাতে পেরেছেন বলে মনে করতে পারেন না, সাথে ছিল ক্লান্ত দেহে নিজের কথা ভুলে স্বামীর দেহের ক্ষুধা মেটানোর হ্যাপা। একটু ঘুমিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারো ভোরের সেই হেঁসেল ঠেলা শুরু... 

সেলিনা এখন তাই নিজেকে আরাম দেন খুব। 

রোজ সকালেই এটা-সেটা কিনিয়ে এনে আয়েশ করে খান। কখনো নেহারির তুলতুলে নান, কখনো গরম গরম রসগোল্লার সাথে ঘিয়ে ভাজা পরোটা, কখনো বেশি করে ঝাল-মাংস দিয়ে পোলাও চালের ভুনা খিচুড়ি কিংবা তেহারি। স্বাস্থ্য সচেতন উকিল সাহেবের বাড়িতে হোটেলের এসব খাবার ঢোকা বারণ ছিল, মনে মনে খুব আইঢাই করলেও ধমকের ভয়ে চুপ থাকতে বাধ্য হতেন সেলিনা। বাইরে গিয়ে খেয়ে আসবেন, সেই উপায় ছিল না। তাঁদের সময়ে মেয়েরা চাইলেই বাইরে গিয়ে পরিবারের সবাইকে ফেলে এটা-সেটা খেয়ে আসতে পারতো না। 


উকিল সাহেব নেই, তাই এখন খান সেলিনা। 

মনের সব শখ মিটিয়ে খান।

খাওয়া হতেই বুয়া চা করে দেয়, তা নিয়ে খবরের কাগজ পড়েন এক ঘন্টা। বুয়া ততক্ষণে মাথায় তেল ঘষে দেয় যত্ন করে, চুলায় চাপিয়ে দেয় গোসলের পানি। পানি গরম হতে হতে বারান্দার গাছগুলিকেও যত্ন-আত্তি সেরে ফেলেন। এই গাছগুলিতেও উকিল সাহেবের বড্ড এলার্জি ছিল। বারান্দায় গাছ রাখলে নাকি মশা হয়... কী সব বোকার মত কথাবার্তা! 

গোসল সেরে দুপুরের রান্না করেন নিজেই। বহুকালের অভ্যস, ছাড়লেও যে ছাড়ে না। কাটারিভোগ চালের ভাতের সাথে পাকা মাছের পেটি, কালিয়া কিংবা কুমড়ো বড়ি দিয়ে ঝোল। কোনদিন সোনা মুগের ডালের সাথে মাথের মুড়োটা, আলু দিয়ে ছোট মাছের চচ্চড়ি,  উচ্ছে ভাজা কিংবা শাকের ঝোল, রূপচাঁদা শুটকির ঝাল ঝাল ভুনা। শেষ পাতে হয়তো টমেটোর টক, তেঁতুলের চাটনি কিংবা এক চামচ ঘরে পাতা দই। 

নিজের জন্যে রাঁধেন, বুয়াকেও বোঁচকা বেঁধে দেন। 

ড্রাইভার ছেলেটাকে ডেকেও ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে আদর করে খাওয়ান। উকিল সাহেব থাকতে এসব করা যায়নি, উনি পছন্দ করতেন না। বড়জোর খাবারটা নিচে পাঠিয়ে দেয়া পর্যন্ত মেনে নিতেন। 


খাওয়ার পর ঘণ্টাখানেকের একটা ঘুম দিয়ে তারপর হাঁটতে বের হোন এখন সেলিনা। সোসাইটির আরো অনেকেই নামে, বাচ্চারা বের হয় খেলতে। হাঁটতে হাঁটতে গল্প হয়, একসাথে বসে ডাবের পানি খাওয়া হয়, মাগরিবের আযান মিলিয়ে গেলে তবেই আস্তে-ধীরে ঘরে ফেরা যায়। এখন আর সেলিনার তাড়া নেই। মাগরিবের আজানের ঠিক পর পর চা-নাস্তা না পেলে উকিল সাহেব ক্ষেপে বাড়ি মাথায় তুলবেন, সেই আতংক নেই। সেলিনা মন ভোরে অন্যান্য সঙ্গিনীদের সাথে গল্প করে তবেই বাসায় ফেরেন। এই এক জীবনে কত্ত গল্প আছে যে তাঁর বলার! 

এরপরের সময়টুকু কেটে যায় সিরিয়ালে। 

মেয়ের বেড়ালটাকে কোলে নিয়ে বসে দুজনেই টিভি দেখেন চুপচাপ, শান্তি করে। উকিল সাহেবের ওই নিউজ চ্যানেলের কড়কড়ে আলাপ আর শুনতে হয় না, বাংলা নাটক দেখেন পছন্দ করে করে। একই নাটক বারবার দেখতে হলেও খারাপ লাগে না সেলিনার। বিয়ের পর বরের পছন্দেই টিভি দেখেছেন আজীবন, নিউজ চ্যানেলের বাইরেও যে অন্য কিছু দেখা যায়- সে তো ভুলেও গেছিলেন। 


রাতের খাবারের পর যত্ন করে বিনুনি বাঁধেন চুলে, মুখে মাখেন মেয়ের পাঠানো বিদেশি ক্রিম। শাড়ি বদলে ঢিলেঢালা একটা ম্যাক্সি পরেন, উকিল সাহেবের ভয়ে যা আগে কখনো পরা হয়নি। এখন আর তাঁর এত্তগুলো ওষুধ খেতে হয় না, বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে হয় না, সারাক্ষণ একটা দমবন্ধ ভাব নিয়ে ছটফট করতে হয় না। বালিশে মাথা রাখতেই ঘুমিয়ে পড়তে পারেন, রাতের পর রাত বাজে স্বপ্নেরাও তাড়া করে ফেরে না... নিজেকে সুখী মানুষ মনে হয় সেলিনার। সুখী আর স্বাধীন, জীবনে প্রথমবার! 


এবং-

এই সবকিছু পাবার বিনিময়ে তাঁকে যা করতে হয়, তা আসলে অতি সামান্য।  

পাড়া-পড়শিকে বলতে হয় যে উকিল সাহেব মেয়ের কাছে আমেরিকায় গেছে, হয়তো ওখানেই থেকে যাবে। আত্মীয় স্বজনকে কিছুই বলতে হয় না, কারণ তারা খোঁজ নিতেও আসে না। মাঝে মাঝে টাকা-পয়সা চেয়ে ফোন এলে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেই হয় কেবল। উকিল সাহেবের সই সুন্দর অনুকরণ করতে পারেন সেলিনা, টাকা তুলতে কোন সমস্যাই হয় না। ষাটোর্ধ একজন বয়স্কা মহিলাকে কেউ এতটুকু সন্দেহ করে না। 


আর ছেলেমেয়ে? 

তাঁদের অত সময় নেই বৃদ্ধ-পিতা মাতার খোঁজ নেয়ার। বাবা হিল্লি-দিল্লি যেখানেই থাকুক, তাঁদের অত মাথা ব্যথা নেই। বেঁচে থাকতে মেয়েকে কোনদিন দেখতে পাবেন কিনা, সেটা জানা নেই। বিদেশে একবার গেলে নাকি কাগজপত্র না হলে আর আসা যায় না। আর ছেলে এই বাড়িতে আসে না দুই বছর হয়ে গেছে... 


আজ অবশ্য ব্যাপারটা ভিন্ন। 

বিনুনি বাঁধতে বাঁধতে তাই নিজের মনেই মুচকি হাসেন সেলিনা। ছেলে কনফার্ম করেছে, কাল সকালে আসবে। ব্যবসায়ে নাকি কী লস হয়েছে, বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা চাই। 


সেলিনা আপত্তি করেন নি। 

ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবে, এতে আপত্তি করার কী আছে? বরং ভাবছেন, ছেলেকে এবার নিজের কাছেই রেখে দেবেন। বাবা-মায়ের কাছে শান্তিতে থাকবে তাঁর পুত্রধন। কাজের বুয়াটাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছেন তাই, ড্রাইভারেরও কাল ছুটি। ছেলে বলেছে নিজেই এয়ারপোর্ট থেকে চলে আসতে পারবে... 


যত্ন করে রান্নার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন সেলিনা।

তিনি রাঁধবেন, ছেলে আসবে, মায়ের হাতে আরাম করে খাবে। তারপর ছেলেটাকেও সেখানেই রেখে দেবেন তিনি, যেখানে উকিল সাহেবকে রেখেছেন। বাসার ডিপ ফ্রিজে!   


কীভাবে মেরে ফেলবেন, সেটা অবশ্য এখনো ঠিক করেন নি। উকিল সাহেবকে মারতে বড্ড রক্তারক্তি হয়েছিল, এখন আর সেটা চান না। তাছাড়া যুবক একটা ছেলের মাথা থেঁতলে মেরে ফেলাটাও চাট্টিখানি কথা না। যাই হোক, ওসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। ছেলের প্রিয় দুধ সেমাইতে করা ডোজের ঘুমের ওষুধ মিলিয়ে রেখেছেন তিনি। আগে একবার ছেলে ঘুমিয়ে পড়ুক, তারপর ভাবা যাবে তাঁর চিরনিদ্রা নিয়ে... 

ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রতিদিনকার মতই লক করে রাখা বড় ডিপ ফ্রিজটা একবার খোলেন সেলিনা। ওই তো, ভেতরেই দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে উকিল সাহেবের দেহ,তাঁর প্রিয়তম স্বামীর দেহ। কি সুন্দর চুপচাপ শুয়ে আছেন উকিল সাহেব! চেঁচামেচি নেই, চোখ রাঙানি নেই, কথায় কথা "না" বলা নেই। উকিল সাহেব এখন শান্ত, স্থির, চির নিদ্রায় শায়িত... দেখলেই মনটা কেমন ভালো লাগে, ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। 


জানেন না কেন, উকিল সাহেবকে এত ভালো এর আগে আর কখনো লাগেনি সেলিনা বানুর! 


(গল্পের বাকি অংশ পাওয়া যাবে প্রকাশিতব্য  গল্প সংকলন "আয়ো" তে। )


গল্প: সেলিনা বানুর ডিপ ফ্রিজ

লেখক: রুমানা বৈশাখী

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন