বইঃ ছায়াতরু
লেখকঃ সমরেশ মজুমদার
চা বাগানে চাকরি করতে যাওয়াটা শুভা সেনের পরিবারের কারোরই পছন্দ হয়নি। চা বাগান ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত গল্পগুলো শুনে কোনো মেয়ের পরিবারই চাইবে না সেটা। তবে বাবা শেষমেশ মেনে নিয়েছিলেন। ডাক্তারি পড়ার সময় যে সংকল্প সে করেছিল তা আজ পূর্ণ হতে যাচ্ছে।
ডুয়ার্সের এই রাস্তাটা মানুষের চেয়ে গাছপালা আর পাখিদের দখলেই থাকে বেশি। সারাদিন হাতে গোনা কিছু বাস চলাচল করে। নিয়মিত দেখা যায় শুধু শুকরার টানা গাড়িটি। আজও তাকে দেখা গেল সন্ধ্যে নামার মুখে। এই অচেনা নির্জন জায়গায় শুভা সেন যেন ভরসা পেল। বৃষ্টি নামল বলে! আশ্রয় নিল শুকরার বাড়িতে। এই সময় চা বাগানে আসাটাই ভুল হয়েছে।
বৃষ্টি থামলে আবার সে বেরিয়ে পড়ল। এবার পথেই পেয়ে গেল বাগানের ম্যানেজার ম্যাকফারসনকে। যাক এখন আর চিন্তা নেই।
নতুন এই পৃথিবী শুভা যতই দেখছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে। সদ্য স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগীত গাওয়া হয় স্কুলে, অধীস্থ কাজের লোকেরা ভালোবাসে তাকে আর মি. ম্যাকফারসন তাকে উদ্দীপনা জুগিয়ে চলে। তার চেনা গল্পের সাথে এ জগতের কোনো মিল নেই। সহকারী বাকি তিনজন ম্যানেজার মি. রায়, মি. গুপ্তা আর মি. মিশ্রকে নিয়ে রাজত্ব মি. ম্যাকফারসনের। তাকে সে যতই দেখে ততই অবাক হয়। বিনয়ী, হাস্যোজ্জ্বল আর কর্মোদ্যম মানুষটাকে দেখে মনে হয় পৃথিবীটা এখনও এদের জন্যই সুন্দর।
তবে জগতের কুৎসিত দিকটা একেবারে আবৃত থাকে না। সুযোগ পেলেই নিজেকে নির্লজ্জের মত প্রদর্শন করে। চা বাগানের হাসপাতালের ঔষধ আসে তৃতীয় ব্যক্তির মন জুগিয়ে, কম্পাউন্ডার নৃপেনবাবুরও যেন সায় তাতে। চা বাগানে মাথা চাড়া দিচ্ছে বিদ্রোহ। ইংরেজদের দালাল বলে একজনকে খুনের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিদায় ঘন্টা বাজছে মি. ম্যাকফারসনের। বিচিত্র রোগ নিয়ে হাজির হচ্ছে শ্রমিকরা। ভুইফোঁড় মাদুলি বিক্রেতা রাতারাতি কামিয়ে নিচ্ছে মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে। শোনা যাচ্ছে মালিকানা বদলের সাথে সাথে বদলে যেতে পারে এই চা বাগানের সাথে জড়িত সকলের ভাগ্যও। বাতাসে ষড়যন্ত্রের আভাস। এই দূর্দিনে কি করতে পারে শুভা? তার স্বপ্ন কি তবে এখানেই শেষ হয়ে যাবে?
সমরেশ মজুমদারের লেখায় ঘুরে ফিরে চা বাগান আর পাহাড়ই চলে আসে বেশিরভাগ সময়। এখানেও গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি চা বাগানকে কেন্দ্র করে। সেখানকার শ্রমিকদের মানবেতর জীবন-যাপন আর চা বাগানের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা উঠে এসেছে। সেই সাথে নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর কিছু সুন্দর মনের মানুষের পরিচয়।
মুদ্রার ওপিঠ নিয়ে ভাবার সময় আমাদের খুবই কম। চর্মচক্ষুতে আমরা যা দেখি তার বাইরে কিছু কল্পনা করা আমাদের জন্য কষ্টকর। আর এখানে ওপিঠটাকেই মেলে ধরেছেন লেখক। যে ব্রিটিশদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে সেই ব্রিটিশদের একজনই এখানে ভিন্ন পৃথিবী গড়ে তুলেছেন। তবে স্বাধীন দেশে আর সেসবের মূল্য নেই। আজ তার জাত আর রংটাই মুখ্য বিষয়। স্বজাতি খুন করে ফেললেও কিছু যায় আসে না, কিন্তু সাহেবের পক্ষে কথা বললেই দালাল।
অস্থির এই পরিবেশে আশ্চর্য শান্ত এক চরিত্র শুভা সেন। কোনো কিছুই তাকে বিব্রত করতে পারে না। এখানকার লোকেদের জীবন-যাপন তাকে ভাবায়। শুকরা, মাংরা আর এতোয়ারি তাকে ভরসা করে। মি. ম্যাকফারসন তাকে বিশ্বাস করেন।
বেশ অন্যরকম একটা গল্প পড়লাম। ছকে বাঁধা গল্পের চেয়ে আলাদা। গল্পটা হয়ত শুভার, হয়ত ম্যাকফারসনের বা হয়ত শুকরার। গল্পটা একটা বদলে যাওয়া পৃথিবীর। স্বার্থ আর লোভের বিষাক্ততায় ছেয়ে যাওয়া এক লোকালয়ের। আবার একই সাথে সীমাহীন ভালোবাসার। সময় সব মুছে ফেলতে পারে, পারে না শুধু ভালোবাসা মুছে ফেলতে। সে নানারূপে হাজির হয় কালের আবর্তে। স্বার্থের পাঁকে আটকে পড়া মানুষদের ফেলে ছায়াতরু হয়ে এগিয়ে যায় ভালোবাসার বার্তা নিয়ে।
প্রচ্ছদের লোভে পড়ে বইটা কিনেছিলাম। পড়েও মন্দ লাগেনি। পরিবেশনা সুন্দর। প্রিন্টিং মিস্টেক তেমন চোখে পড়েনি।
চা বাগানের ভিন্ন এই পৃথিবীতে হারিয়ে যেতে ডুব দিতে পারেন ছায়াতরুতে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন