![]() |
| ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস |
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
ইয়াজউদ্দিন আহমেদের বাড়ির সামনে সাদা প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে।গাড়ির সামনে একজন বেঁটেখাটো লোক।লোকটির মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি।বয়স মাঝারি।ঠোঁটের অংশ পানে লাল হয়ে আছে।পকেট থেকে স্টিলের ছোট কৌটা থেকে আবার এক খিলি পান বের করে মুখে দিলেন।কাঁধে থাকা গামছা দিয়ে ঠোঁট মুছে গেটের ভেতরে প্রবেশ করলেন।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।তিনি বোধহয় ড্রাইভার লোকটার চেহারায় বেজায় বিরক্ত।বললেন,আপনি কি সবসময় মুখে পান রাখেন?বিরতি দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না?ভালোবাসার গল্প
ড্রাইভার লোকটি হেসে বলল,জ্বি স্যার,সবসময়ই মুখে পান থাকে।তবে নামাজের ওয়াক্তে পান মুখে রাখা ঠিক না।তখন অযু করে নামাজ শেষ করে আবার মুখে পান দেই।
ইয়াজউদ্দিন সাহেব বললেন,বেশ ভালোই অভ্যাস।তা দিনে কয় খিলি খাওয়া হয় ড্রাইভার সাহেব?
-এই ধরেন,একশ পার হয়ে যায়।তবে অনেকে গাড়িতে পান খাওয়া পছন্দ করেন না।তখন প্রায় সাত-আট ঘন্টা পান ছাড়াই থাকা লাগে।বেশ সমস্যা হয়।হাজার হলেও মানুষ অভ্যাসের দাস,হেসে বলল ড্রাইভার লোকটি।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন,আপনি আমার সাথে সময় করে পরে যোগাযোগ করবেন।গিনেস রেকর্ডের পাতায়, দেখি আপনার নামটা জায়গা পায় কিনা!এখন এই ব্যাগগুলো নিয়ে ঠিকমতো গাড়িতে রাখেন।সেই সদূর অস্ট্রেলিয়ায় যাবে।দূরত্ব কত জানেন?
-জ্বি না স্যার,লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল ড্রাইভার লোকটি।
-খালি পান মুখে না দিয়ে কিছু জেনে রাখবেন।অনেক সময়ে কাজে লাগতে পারে।ধরুন,একজন বিজ্ঞ ভদ্রলোক আপনার গাড়িতে করে চট্টগ্রামে যাচ্ছেন।পরীক্ষা করার জন্য হঠাৎ প্রশ্ন করল,বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় দূরত্ব কত?আপনি খুব সহজে বলে দিতে পারলেন।দেখা যাবে,লোকটি খুশি হয়ে আপনাকে কয়েকশ খিলি পান কিনে দিতে পারে।বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ার দূরত্ব ৭১৭১ কিলোমিটার,বললেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
ভালোবাসার গল্প
-স্যার,আমি তো প্রায়ই ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে থাকি।অতি অল্প সময়ে।সাত হাজার কিলোমিটার যেতে কয়দিন লাগবে?জিজ্ঞেস করল ড্রাইভার লোকটি।
ইয়াজউদ্দিন সাহেব বেশ জোরে হেসে উঠলেন।বললেন,তুমি বেশ বোকা লোক তো।অস্ট্রেলিয়া গাড়ি করে যাওয়া যায় না।প্লেনে করে যেতে হয়।না,তোমার সাথে কথা বলতে বলতে আমিও বোকা হয়ে যাবো।কথায় বলে,সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে।এখন এই ব্যাগগুলো গাড়িতে গিয়ে রাখো।
ড্রাইভার লোকটি বেশ লজ্জা পেল।দাঁড়িয়ে না থেকে ব্যাগগুলো নিয়ে তাড়াতাড়ি বাইরে কেটে পড়ল।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজে নিজে হাসছেন।ভেতরে থেকে তুলিকে বেরিয়ে আসতে দেখে হাসি যেন হঠাৎ মিলিয়ে গেল।মুখে নেমে আসল আষাঢ়ের কালো মেঘ।তুলির সঙ্গে আসছে আরিশা।আরিশার হাতে পুতুল নেই।পুতুলটি তুলির হাতে।আরিশাকে দেখে মনে হচ্ছে,মেয়েটির ভীষণ মন খারাপ।চোখে ভীষণ কষ্টে পানি আটকে রেখেছে।তুলি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সামনে এসে দাঁড়ালে।
-বাবা,অনেকদিন থাকবো বলে বাংলাদেশে এসেছিলাম।কিন্তু আমার ছুটি প্রায় শেষ।তুবারও আর ভালো লাগছে না।তাই বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছি,বলল তুলি।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,বাড়িটা আবার ফাঁকা হয়ে যাবে।এতদিন বেশ ভালোই ছিলাম।এখন আবার সবকিছু নিস্তব্ধ।
-বাবা,তুমি মন খারাপ করবে না।আমি সুযোগ পেলে শীতে একবার আসার চেষ্টা করবো।তুবা না আসলেও আরিশাকে নিয়ে আমি আসবো।তোমার জামাই দেখি কি বলে,বলল তুলি।
ভালোবাসার গল্প
ইয়াজউদ্দিন সাহেব চুপ করে রইলেন।আরিশার দিকে তাকিয়ে বললেন,নানুভাই,তোমার মন খারাপ কেন?বাংলাদেশে থেকে যাবে নাকি?এখানে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবো।আমি আর তুমি সারাদিন গল্প করবো।
আরিশা বলল,রাসেল মামার জন্য খারাপ লাগছে।আচ্ছা মামনি,রাসেল মামাকে আমাদের সাথে নিয়ে চলো।কত মজা হবে তাই না?
তুলি অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,হুম হবে।এই তুবা,তোর কতক্ষণ লাগবে বের হতে?আমাদের কিন্তু তাড়াতাড়ি যেতে হবে।
তুবা ভেতর থেকে বের হয়ে আসল।তুবার কোলে আয়রা।বলল,এইতো আপা,চলে এসেছি।শাড়ি পড়তে একটু দেরি হয়ে গেছে।
তুলি তুবাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছে।তুবা শাড়ি তেমন পছন্দ করে না।অনেকবার বলা হয়েছিল,শাড়ি পড়তে।কিন্তু রাজি হয়নি।আজ শাড়িতে তুবাকে বেশ সুন্দর লাগছে।হাতে কাচের চুড়ি,কপালে টিপ।বেশ মানিয়েছে।তুলি বলল,এই তোকে কি সুন্দর লাগছে!হঠাৎ শাড়ির পড়ার শখ কেন শুনি?
তুবা বেশ লজ্জা পেল।মুচকি হেসে বলল,জাহিদ,শাড়ি পড়তে বলেছে।শাড়ি পড়েছি শুনে ভীষণ খুশি হয়েছে।
-যাক,তাহলে দুইজনের ঝামেলা শেষ হয়েছে।তুবা,আবার দেশে আসা হবে তোর?নাকি ভুলেই যাবি বাংলাদেশকে?জিজ্ঞেস করলেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
![]() |
| ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস |
-না বাবা,দেশে আসবো।তবে ঠিক কখন শিউর করে বলতে পারছি না।জাহিদকে নিয়ে বেড়াতে আসবো সময় করে।তবে আয়রাকে নিয়ে একটু ঝামেলায় পড়তে হয়।ভীষণ জ্বালায় মেয়েটা।তাই আসতে মন চায় না,বলল তুবা।
রাসেল দরজা খুলে বাইরে এসেছে।চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।রাতে বোধহয় ঠিকমতো ঘুম হয়নি।ঢুলতে ঢুলতে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে।বাম হাতে চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকালো।কি মনে হতে বলল,না,আজ বৃষ্টি হবে না।কাল ভীষণ বৃষ্টি হবে।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ রাসেলের দিকে তাকিয়ে বলল,রাসেল,তোমার আপুরা অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাচ্ছে।আবার কখন দেখা হবে,ঠিক নেই।কথা বলবে ওদের সাথে?
রাসেল বোধহয় কথাটা শুনতে পেল না।আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল,তুই চলে যাবি?আকাশের মেলা তো আর দেখা হবে না।
আরিশা দৌঁড়ে রাসেলের পাশে এসে দাঁড়ালো।বলল,আবার বাংলাদেশে আসলে তখন দেখা হবে।
রাসেল বলল,তখন তো আমি থাকবো না।তোকে যে একা একা বসে আকাশের মেলা দেখতে হবে।
আরিশা মন খারাপ করে বলল,তুমি কোথায় যাবে,মামা?ভালোবাসার গল্প
রাসেল হাঁটু গেড়ে নিচে বসে পড়ল।আরিশার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,আমি আকাশের কাছে চলে যাবো।সেখানে আমার দোকান হবে।মানুষ আমার দোকান থেকে রোদ কিনে বাড়িতে যাবে।
আরিশা কথাটা শুনে হেসে উঠল।হাত তালি দিয়ে বলল,কি মজা হবে!
ইয়াজউদ্দিন সাহেব তুলির দিকে তাকিয়ে কিছুই বুঝতে না পারার ইশারা করল।তুলিও কিছু বুঝতে পারল না।
তুলি বলল,রাসেল,আমরা চলে যাচ্ছি ভাই।আশা করি,পরেরবার এসে তোকে সুস্থ দেখবো।এই বাবা,আমরা আসি,তুলি আরিশাকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
রাসেল হঠাৎ কি মনে করে বলল,আর দেখা হবে না।আমি আকাশের কাছে চলে যাবো,এই বলে দৌঁড়ে চলে গেল ভেতরে।
সবাই বিষয়টা বেশ সহজে মেনে নিয়েছে বোধহয়।এমন অদ্ভুদ কথা রাসেলের মুখ থেকে বের হবে এটাই যেন স্বাভাবিক।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বললেন,এই আল্লাহর নাম নিয়ে সবাই গাড়িতে উঠে বসো।এমনিতে দেরি হয়ে গেছে।আর তুবা,তুমি আয়রা মামনির দিকে খেয়াল রাখবে।তুলি,এয়ারপোর্ট পৌঁছে আমাকে কল দিবে।
তুবা গাড়িতে উঠে ড্রাইভার লোকটার আচরনে বেশ রেগে গেল।বলল,এই আপনি পুরো পথে গাড়িতে বসে পান খাবেন?
ড্রাইভার লোকটি হেসে বলল,আম্মাজান,আপনি অনুমতি দিলে অবশ্যই খাবো।
তুবা বলল,না,আমি অনুমতি দিবো না।আমি এত ভালো মেয়ে নই।মুখ থেকে পান ফেলে গাড়ি চালাবেন।এই আপা,উঠে আয়।
তুলি গাড়ির ভেতরে আরিশাকে নিয়ে বসতেই গাড়ির কাঁচ উঠিয়ে দিল ড্রাইভার লোকটি।ইয়াজউদ্দিন আহমেদের চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে।তিনি হাত নেড়ে সবাইকে বিদায় জানালেন।গাড়ি ছুটে চলল আপন গন্তব্যে।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ হাত দিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে গেটের ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলেন,কাব্য নিচে নামছে।হেসে বললেন,আরে কাব্য সাহেব যে,সকাল সকাল কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
কাব্য ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।মুচকি হেসে বলল,চাচা,শরীরটা এখন আগের থেকে ভালো।সামনে থেকে হেঁটে আসবো।
-আমার মেয়েরা একটু আগে চলে গেছে।অনেক করে বললাম,আর কয়েকটা দিন থেকে যেতে।কিন্তু সময় নেই অজুহাত দিয়ে চলে গেল।আসলে তোমার চাচী থাকলে ভালো হতো।আমি বুড়ো মানুষ,কতক্ষণ আর সময় দিতে পারি,বেশ আবেগ তাড়িত হয়ে পড়লেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
কাব্য চুপ করে রইল।কি বলবে এই মুহূর্তে বুঝতে পারছে না।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বললেন,আসলে অনেক দিন পর মেয়েরা বাড়িতে এসেছে,তাই নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি।বাড়িটা আবার ফাঁকা হয়ে গেল।তুমি তাহলে যাও,হেঁটে আসলে মন ভালো হবে।
কাব্য ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।
ভালোবাসার গল্প
তের.
কাব্য রাস্তা ধরে হাঁটছে।শরীরে জ্বর নেই।তবে মাথাটা বেশ ধরে আছে।দোকানদার মজিদের দোকানে এক কাপ চা খেলে তবেই ভালো লাগবে কাব্যের।কাব্য ভাবছে,গতকাল পুষ্পের কথাগুলো।মেয়েটার শেষের একটা কথা গতকাল থেকে মাথায় ঘুরছে,"অপেক্ষায় থাকবো।"মেয়েটা কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসে?কিন্তু আমার কি আছে ভালোবাসার?আর পুষ্পই কেন আমার প্রেমে পড়তে যাবে?গতকাল তবে যে কথাগুলো বলল,তা মিথ্যে ছিল না।শরীরে জ্বর ছিল,কিন্তু আমার কান তো ঠিকই শুনেছে।পুষ্পের সাথে আমার কথা বলতে হবে এই বিষয়ে।
কাব্য দোকানদার মজিদের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো।কিন্তু সে ভেতরে নেই।চুলা জ্বালানো।চুলার উপর চায়ের কেটলি।ধোঁয়া উড়ছে চুলা থেকে।কালাপাহাড় দোকান থেকে একটু দূরে বসে আছে।কাব্যকে দেখে এগিয়ে আসল দোকানের সামনে।কাব্য বেঞ্চে এসে বসল।কালাপাহাড়ের মাথায় হাত দিয়ে বলল,কাল ভীষণ জ্বর ছিল।আসতে পারিনি,আমার উপর রাগ করেছিস?
কালাপাহাড় শব্দ করে কাব্যের গায়ে মাথা ঘঁষছে।লেজ নাড়িয়ে যেন নিজের অভিমানের কথা বলছে।
-আরে কাব্য ভাই যে,কখন আসলেন দোকানে?বললেন দোকানদার মজিদ।হাতে পানি ভর্তি বালতি।
-এইতো বেশিক্ষন হয়নি।আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?হাতে বালতি,পানি আনতে বুঝি?জিজ্ঞেস করল কাব্য।
দোকানদার মজিদ টুলে বসল।গামছা দিয়ে হাত মুছে বলল,হুম ভাই।হঠাৎ বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল,তা কাল তো এদিকে আসেন নাই।ঘটনা কি হইছে শুনবেন?
-কাল শরীরে প্রচন্ড জ্বর ছিল।বিছানা থেকে মাথা তুলতে পারিনি।আজ অবশ্য জ্বর নেই।কিন্তু মাথাটা বেশ ধরে আছে।আমাকে আগে এক কাপ চা বানিয়ে দিন।চা খেতে খেতে আপনার ঘটনা শুনবো,বলল কাব্য।
দোকানদার মজিদের আচরনে মনে হচ্ছে ঘটনা বলার জন্য খুব ব্যাকুল হয়ে আছে সে।তাড়াহুড়ায় এক কাপ চা বানিয়ে বাড়িয়ে দিল কাব্যের হাতে।চায়ের কাপে চিনি দেয়া হয়নি তার।কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই।
কাব্য কাপে চুমুক দিয়ে বলল,আপনি ঘটনা বলার জন্য বেশ অস্থির হয়ে আছেন।আমার চায়ে চিনি দেননি।যাই হোক,আমি খেতে পারবো।এবার বলুন,কি হয়েছে মজিদ ভাই?
দোকানদার মজিদ হঠাৎ টুল ছেড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে কাব্যের পাশে বেঞ্চে এসে বসে পড়ল।উত্তেজিত হয়ে বলল,আমি গতকাল দোকানে বসে আছি।বেঁচা-বিক্রি খুবই কম।হঠাৎ এক আপামনি গম্ভীর কন্ঠে বলল,এটা কি মজিদের দোকান?আমি তো ভয়ে অস্থির।মনে করছি,পুলিশের লোক।বলল,আপনার দোকান সিলগালা করা হবে।আমি ভয়ে বললাম,আমার অপরাধ?তিনি বললেন,আমি দোকান অপরিষ্কার করে রাখি।আমার মাথায় তখন বাজ পড়ল।দোকান বন্ধ হলে আমি কালাপাহাড় কোথায় যাবো?অনেক কষ্টে এক কাপ চা দিয়ে আপামনিরে শান্ত করলাম।শেষে বলল,কাব্য নামে ছেলেকে চিনেন?আমি আপনার নামে সবিস্তারে সব বলছি।মজার ঘটনা হলো,শেষে আমার হাতে পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে বলে,আমি আপনার সাথে মজা করছি।পুরো টাকাটা রেখে দেন।বলেন ভাই,এটা কেমন মজা!আমার এদিকে অবস্থা খারাপ,আর আপামনি মজা করে।
কাব্য চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলল,পুষ্প,মেয়েটা একটু দুষ্টু প্রকৃতির।কিন্তু এতটাও দুষ্টামি করবে,আমার জানা ছিল না।
দোকানদার মজিদ কাব্যের কথায় বোধহয় বেশ অবাক হলো।বলল,ভাই,আপনি হাসেন নাই কেন?ঘটনাটা কি মজার না?আমি তো গতকাল প্রায় ঘন্টাখানেক হাসছি।
কাব্য বলল,না,মজিদ ভাই,মজার নয়।মানুষকে ভয় দেখানো মোটেও মজার কিছু নয়।
দোকানদার মজিদ কাব্যের কথায় সায় দিয়ে বলল,তা ঠিক।তবে কাব্য ভাই,মেয়েটা কিন্তু অত্যাধিক সুন্দর।আপনার সাথে খুব মানাবে।
কাব্য বেশ লজ্জা পেল।বলল,আপনি বেশি কথা বলেন মজিদ ভাই।
ভালোবাসার গল্প
-হয়তো বেশি কথা বলি।মানুষটা একটু বোকা।কিন্তু আমি মানুষ চিনতে ভুল করি না।আপামনি,আপনারে পছন্দ করে।গতকাল আপামনির চোখ দেখে আমি বুঝতে পারছি,বলল দোকানদার মজিদ।
-আপনি সব বুঝে ফেলেন।এখন বিস্কুট দেন তাড়াতাড়ি।আপনার কথা শুনে ক্ষিধে লাগছে কালাপাহাড়ের,সঙ্গে আমারও।
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
দোকানদার মজিদ পিরিচে করে বিস্কুট দিতেই কাব্য কালাপাহাড়ের দিকে বিস্কুট ছুড়ে দিল।বিস্কুট খাওয়া শেষে কাব্য দোকানদার মজিদের দিকে টাকা বাড়িয়ে বলল,আমিও ভাবছি।তবে আকাশের সঙ্গে পাতালের তুলনা না করাটাই সবচেয়ে ভালো।দোকানদার মজিদ কথাটা বোধহয় বুঝতে পারল না।কাব্যের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে।
দোকানদার মজিদের দোকান থেকে বেরিয়ে ইয়াজউদ্দিন সাহেবের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল কাব্য।বাসায় গিয়ে একটু বিশ্রাম করবে।কাব্য হাঁটতে হাঁটতে ভাবছে,দোকানদার মজিদ যা বলল তাই কি সত্যিই?হয়তো গতকাল তাহলে কথাগুলো তেমন ইঙ্গিতই ছিল।বিষয়টা নিয়ে পরে ভাবতে হবে। ইয়াজউদ্দিন আহমেদের বাড়ির ভেতরে ঢুকলো কাব্য।সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতেই চমকে উঠল সে।দ্বিতীয় তলার দরজা খোলা।এই বাড়িতে আসার পর থেকেই ওই ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ ছিল।ইয়াজউদ্দিন সাহেব বলেছিলেন,তিনি ছাড়া আর কেউ এই বাড়িতে থাকেন না।তবে কি নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে?কাব্য ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো।ভেতরে কারো আওয়াজ শুনতে পেল না সে।দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে একটা ভ্যাপসা গন্ধ এসে লাগল।বেশ অবাক হয়ে গেল কাব্য।ভেতরে সবকিছু ঠিকই আছে।ডাইনিং টেবিল,সোফা,চেয়ার সবকিছু গোছানো।মনে হচ্ছে যেন,কেউ এই বাসায় থাকে।টেবিলে পানির জগ রাখা,জগে পানিগুলো বেশ ঘোলাটে হয়ে আছে।আসবাবপত্রে ধুলে পড়ে আছে।হঠাৎ কাব্যে শুনতে পেল,ভেতরে কেউ যেন কথা বলছে।কাব্য ধীর পায়ে শব্দ অনুসরন করে হাঁটতে শুরু করল।সোজা গিয়ে বামপাশে একটি রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল কাব্য।দরজায় উঁকি দিতেই কাব্যের বুক ধক করে উঠল। দেখতে পেল,একটি মেয়ে বিছানায় বসে আছে।মেয়েটির সামনে রাসেল।রাসেল মেয়েটির হাত ধরে বসে আছে।
কাব্য পিছনে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।রাসেলের একান্ত মুহূর্তে বিরক্ত করা ঠিক হবে না।হঠাৎ কাব্যের মনে হলো,রাসেল মানসিকভাবে অসুস্থ।দ্বিতীয় তলার দরজা বন্ধ থাকে সবসময়।তাহলে মেয়েটির সঙ্গে ভেতরে আসলো কিভাবে?কাব্য দৌঁড়ে এসে দরজা খুলতেই দেখতে পেল,রাসেল বিছানায় একা বসে আছে।হাতে কি নিয়ে যেন কথা বলছে।কাব্য এগিয়ে এসে রাসেলের কাঁধে হাত রাখলো।বলল,রাসেল ভাই,আপনি এখানে একা কি করেন?
রাসেল পেছনে ফিরে কাব্যের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।হাতে থাকা কাঠের ফ্রেম দেখিয়ে বলল,সুহাসিনীর সাথে কথা বলি।
কাব্য দেখতে পেল,কাঠের ফ্রেমে একটি মেয়ের ছবি।তবে নষ্ট হয়ে গেছে দাগ লেগে।চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।কাব্য একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ভাবছে।ব্যাপারটা কি চোখের ভুল ছিল কিনা?রাসেলের দিকে তাকিয়ে বলল,রাসেল ভাই,বিছানায় আপনার সাথে কেউ ছিল?
-হুম ছিল তো,এইযে আমার সুহাসিনী ছিল।তোমাকে দেখতে পেয়ে চলে গেছে,এই বলে রাসেল বিছানা থেকে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে গেল হাসতে হাসতে।
কাব্য দেয়ালের দিকে খেয়াল করে দেখলো,দেয়ালের অংশ নতুন রঙ করা হয়েছে।কিন্তু অন্য রুমের সাথে এই রুমের মিল নেই।কেমন যেন সবকিছু জোর করে পাল্টে ফেলা হয়েছে।রঙের প্রলেপের উপরে কিছু যেন লেখা রয়েছে।কিন্তু লেখাগুলো স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে না।ঠিক যেমন,রাসেলের রুমে দেখতে পেয়েছিল কাব্য।তবে কি,এই দুই রুমের মধ্যে কোনো যোগসাজশ আছে?অনেক প্রশ্ন মাথায় নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল কাব্য।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বিছানায় শুয়ে আছেন।শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে ওনার।জ্বর জ্বর মনে হচ্ছে সকাল থেকে।বিছানায় শুয়ে বেশ অস্বস্তি লাগছে।একটু আগে তুলি ফোন করেছিল।বলল,প্লেনে উঠেছে একটু আগে।কথাটা শুনে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।আফসোস করছে,মেয়ে দুটোকে বাংলাদেশে সাধারন পরিবারে বিয়ে দিলে হয়তো মন চাইলে দেখতে যেতে পারতেন।মিষ্টি-জিলাপি নিয়ে মেয়ের শ্বশুড়বাড়ি বেড়াতে পারতেন।এখন মন চাইলে মেয়েরাও আসতে পারে না।তিনিও যেতে পারে না।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাক ছেড়ে ফুলিকে ডাক দিলেন।
ভালোবাসার গল্প
ফুলি যেন দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল।বসে বসে ইয়াজউদ্দিন সাহেবের অবস্থা দেখছিল মেয়েটি।সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকে বলল,আমারে ডাকছেন খালুজান?
-তুই কি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে নাকি এতক্ষন?এক সেকেন্ডও দেরি হয়নি।ব্যাপারটা কি শুনি,বললেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
-ব্যাপার অতি খারাপ,খালুজান।রাসেল ভাইয়া,আজকে দোতলার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ছে।এখন অবশ্য নিজের রুমে বসে আছে।আমি দেখতে পেয়ে জলদি তালা মেরে আসি।এখন বারান্দায় পাহারা দিচ্ছি,বলল ফুলি।
-বলিস কি,চাবি কোথায় পেল রাসেল?বিছানা থেকে উঠে বসলেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
-আমি ভুলে চাবি দরজার উপরে রেখে আসছি।আমি কি জানি,তিনি উপরে যাবেন,বলল ফুলি।
-একটু সুস্থ হয়ে উঠি,তারপর এই বেতের লাঠি তোর পিঠে ভাঙবো।এক ভুল মানুষের কয়বার হয়?তোকে আমি বিদায় করে গ্রাম থেকে নতুন মেয়ে নিয়ে আসবো।আমি সব সহ্য করতে পারি,কিন্তু জেনেশুনে ভুল কাবি নেহি?রেগে বললেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।
ফুলি এই বাড়িতে আসার পর ইয়াজউদ্দিন সাহেবের মুখ থেকে এমন কথা অনেকবার শুনেছে।কিন্তু তিনি ফুলিকে বিদায় করেননি।ফুলি হেসে বলল,খালুজান,চা নিয়ে আসবো?
ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বললেন,এই কথা আমার মনে থাকবে।চায়ের বাহানায় পার পেয়ে যাবি না।শোন,আদা-লেবু দিয়ে এক কাপ চা নিয়ে আয়।মনে হয় জ্বর এসেছে।তাড়াতাড়ি আনবি।
ফুলি মাথা নেড়ে হাসিমুখে রুম থেকে বের হয়ে গেল।
চৌদ্দ.
-আজ আপনাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না কেন?আরও সামনে এসে বসুন,বলল কাব্য।
-হয়তো খুব শীঘ্রই হারিয়ে যাবো।আমাকে আর দেখবে না কেউ।চিরদিনের জন্য চলে যাবো,হেসে বলল বিন্তী।
-কি সব বাজে কথা বলছেন?হারিয়ে কোথায় যাবেন?আমরা কি আর বৃষ্টিতে ভিজবো না?জ্যোৎস্না বিলাস করবো না ছাদে বসে?বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল কাব্য।
-অন্য কেউ আসবে।আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?উত্তর দিতেই হবে এমন কিন্তু নয়।কিন্তু আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছে,বলল বিন্তী।
কাব্য বলল,হ্যাঁ আমি উত্তর দিবো।কি কথা জিজ্ঞেস করবেন?
-আমি হারিয়ে গেলে আমাকে খুঁজবেন ছাদে?জিজ্ঞেস করল বিন্তী।
-কিন্তু কোথায় হারিয়ে যাবেন?এই যে শুনছেন,কোথায় চলে যাচ্ছেন?কাব্য ঘুম থেকে জেগে উঠল।পুরো শরীর ঘেমে আছে।কাব্য বুকে হাত দিয়ে বলল,এতক্ষন তাহলে স্বপ্ন ছিল?এমন ভয়ঙ্কর স্বপ্ন অনেকদিন পরে দেখতে পেলাম।সত্যিই কি বিন্তী হারিয়ে যাবে?কাব্য বালিশের পাশে রাখা ঘড়িতে দেখতে পেল,রাত ১২ টা বেজে ৩০ মিনিট।কাব্য বিছানা থেকে উঠে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালো।পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে খুঁজছে বিন্তীকে।ছাদে আজ কেউ নেই।মৃদু বাতাসে নড়ছে ছাদে থাকা গাছের পাতাগুলো।কাব্য পর্দা ঠিক করে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।নেমে আসল চোখ জুড়ে নিশির ঘুম।
বালিশের উপর শরীর ভাসিয়ে রাসেল বিছানায় শুয়ে আছে।জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।আকাশে চাঁদ হাসছে।রাসেলের হাতে সকালের কাঠের ফ্রেমটি।বিছানার পাশ থেকে গামছা হাতে নিয়ে বেশ যত্ন করে ফ্রেমটি মুছল সে।কি মনে করে নিচে ফেলে দিল গামছাটি।ফ্রেমটির তাকিয়ে আনমনে হেসে উঠল রাসেল।হঠাৎ গতকাল রাতের মতো নুপূরের শব্দে শুনতে পেল রাসেল।ধীরে ধীরে শব্দটি আরও কাছে আসছে।রাসেল বিছানা থেকে উঠে বেশ সাবধানে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসল।নুপূরের আওয়াজ ভেসে আসছে সিড়ির দিক থেকে।সিড়ির কাছে এসে রাসেল দেখতে পেল,কালো ছায়াটি আস্তে আস্তে উপরে উঠছে।রাসেল বলল,সুহাসিনী আমি আসছি।
রাসেল সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল।দোতলায় এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।দরজা কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে পেছনে ফিরে আবার সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করল।ছাদে উঠে দেখতে পেল,ছাদে কেউ নেই।
রাসেল হেসে বলল,তুমি আমার সাথে লুকোচুরি খেলছো?আমিও খেলবো তোমার সাথে।পুরো ছাদে হেঁটে কাউকে দেখতে পেল না রাসেল।হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল সে।ধীরে ধীরে ছাদের রেলিং-এ উঠে দাঁড়ালো।আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল,আমি আসছি তোমার কাছে সুহাসিনী।আকাশের মেলা দেখবো দুজন একসঙ্গে।জ্যোৎস্না মাখবো গায়ে।রাসেলের চোখের কোণে পানি জমেছে।কাঠের ফ্রেমের দিকে তাকিয়ে কান্না করে উঠল।বুকের সাথে বেশ শক্ত করে চেপে ধরল রাসেল।
ভালোবাসার গল্প
মৃদু বাতাসে গা ভাসিয়ে ঝাঁপ দিল উপরে তাকিয়ে।বেশ শব্দ হলো নিচে।দূরে কোথাও যেন ডেকে উঠল অলক্ষুনে পেঁচা।ভেসে আসল ডানা ঝাপটানো পাখির শব্দ।
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
............চলবে.......
written by Habib Khan Hridoy


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন