চিলেকোঠার প্রেম পর্বঃ- ৩ (ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।)

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।

ইয়াজউদ্দিন সাহেবের চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল কাব্যের।নিচতলা থেকে চিৎকারের বেশ শব্দ আসছে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদের গলা শোনা যাচ্ছে।বোধহয় ফুলিকে বলছে,আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে এমনটা তো হতো না।এখন মাথা ফাঁটিয়ে দিছে যে,কি জবাব দিবো আমি?

ফুলির কথা শোনা গেল না।কাব্য বিছানা থেকে উঠে বসলো।সকাল সকাল এত চেঁচামেচি কিসের?ইয়াজউদ্দিন সাহেব এলাকার গণ্যমান্য বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি।বিচার করছে নাকি?কাব্য ঘড়ি হাতে নিয়ে দেখে,সকাল সাতটা বেজে পঁচিশ মিনিট।সময় অনেক পেরিয়ে গেছে।ফজরের সময়ে উঠতে পারেনি আজ।গতকালের ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিতেই ঘুমে কাবু সে।আর খবর ছিল না।আজ মেডিকেলের প্রথম ক্লাস।দেরি করা যাবে না।বিছানা ঠিক করে কাব্য ভেতরে চলে গেল।
গোসল সেরে পান্জাবি গায়ে জড়িয়ে নিল।চোখে চশমা পড়লো।চুলগুলো আঁচড়ে আয়না জায়গামতো রেখে চাবি ব্যাগে রেখে দিল।হাতে তালা নিয়ে বের হয়ে আসল রুম থেকে।দরজায় তালা লাগিয়ে বাইরে আসল কাব্য।ইয়াজউদ্দিন সাহেবের গলা শোনা যাচ্ছে না এখন।বাসাই নেই বোধ হয়।আবার হয়তো জরুরি কাজে বাইরে গেছে।টাকা-পয়সার অভাই নেই,অথচ দেখাশোনার মতো একজন লোকের বড় অভাব।মেয়ে দুইজন দেশে থাকলে বেশ ভালো হতো ওনার জন্য।কাব্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সিড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দ্বিতীয় তলায় এসে থেমে গেল।দরজায় তালা দেয়া।কাব্য ভাবছে,তাহলে মেয়েটা এই বাসার নয়?অন্য বাসা থেকে এখানে এত রাতে আসে?নাকি ইয়াজউদ্দিন সাহেবের কাজের মেয়ে ফুলি ভয় দেখানোর জন্য এমন করছে?মনে পড়ে গেল,প্রথমদিন ছাদে উঠতেই ইয়াজউদ্দিন সাহেবের কথা,"বিকেলে ছাদে উঠো সমস্যা নেই।কিন্তু বেশি রাতে ছাদে উঠো না যেন।কি দেখতে কি দেখে ফেলো,একটা হুলুস্তুল কান্ড বেঁধে যাবে।"
কাব্য বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার নিচে নামতে শুরু করল।নিচতলায় ইয়াজউদ্দিন সাহেবের বাসার দরজার সামনে আসতেই কাব্য চমকে উঠল।একটা কন্ঠ শোনা গেল।কে যেন কাব্যকে ডেকে উঠল,"এই ছেলে!"
কিন্তু কাব্য জানে,ইয়াজউদ্দিন সাহেব আর ফুলি ছাড়া এই বাড়িতে কেউ থাকে না।ইয়াজউদ্দিন সাহেব এমন ছেলেমানুষি কখনও করবে না।ফু্লিও হবে না।কারন কন্ঠটা ছেলে কন্ঠ।কাব্য আশপাশ ভালো করে খুঁজতে লাগল কে বলল কথাটি?কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না।হতাশ হয়ে বেরিয়ে যাবে,আবার শুনতে পেল কন্ঠটি।কাব্য নিচতলার জানালায় খেয়াল করে দেখলো,জানালার ফুঁটো দিয়ে কি যেন নড়ছে।শব্দটা ওই ফুঁটো দিয়েই আসছে।
কাব্য এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে জানালা খুলতেই বেশ ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল।রাসেল জানালার ফুঁটো দিয়ে কাব্যকে ভয় দেখাচ্ছিল।কাব্যকে লাফিয়ে উঠতে দেখে রাসেলকে বেশ খুশি মনে হলো।হাত তালি দিয়ে হাসছে।কাব্য দেখতে পেল,সহজ-সরল হাসিতে একজন তাকিয়ে আছে তার দিকে।যে হাসিতে মায়া জড়িয়ে আছে,আছে ভালোবাসা।বয়সে ওর থেকে বড় হবে।চুল উসকোখুসকো,গায়ের জামা খুব ময়লা।পুরো বিছানায় খাবার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।কাব্য সামনে এসে জানালার সামনে দাঁড়ালো।মুচকি হেসে বলল,আপনি খুব খুশি হয়েছেন আমাকে ভয় দেখিয়ে?

রাসেল হাত তালি দিয়ে বলল,হুম খুব খুশি,খুব খুশি।এই ছেলে,তোমার নাম কি?

কাব্য জানালার আরও কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো।বলল,আমার নাম কাব্য।আপনার নাম কি?

-আমার নাম,আমার নাম কি আমি নিজেই জানি না,হাসতে হাসতে বলল রাসেল।

-আপনি এখানে কি করেন?আগে তো কখনও দেখিনি,জিজ্ঞেস করল কাব্য।

-আমাকে ওই মেয়েটা খেতে দেয় না,আজকে একদম মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি,বলে হাসতে লাগল রাসেল।

কাব্য ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে।এখন বাসা থেকে বের না হলে প্রথম ক্লাস করতে পারবে না।কাব্য হাসিমুখে রাসেলের দিকে তাকিয়ে বলল,ভাইয়া,আমার কলেজে যেতে হবে।আপনার সাথে সময় করে জমিয়ে আড্ডা দিবো।এখন না বের হলে খুব দেরি হয়ে যাবে।

-তুমি খুব ভালো।কলেজে পড়ালেখা করবে।প্রেম করলে ভেতরটা ছাঁই হয়ে আকাশে উড়ে যায়,কথাটা বলে রাসেল জানালা দিয়ে আকাশ দেখার চেষ্টা করলো।কিন্তু দেখতে না পেয়ে হঠাৎ করে জানালা বন্ধ করে দেয়।

কাব্য ভেতর থেকে কান্না করার শব্দ শুনতে পায়।আর দাঁড়িয়ে না থেকে গেইট দিয়ে বের হতে যাবে এমন সময়ে ফুলি এসে সামনে দাঁড়ায়।ফুলির মাথায় ব্যান্ডেজ করা সাদা কাপড় পেঁছিয়ে।কপালের অংশ লাল হয়ে আছে।ফুলি কাব্যের দিকে তাকিয়ে আছে।কাব্য অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল,আপনার মাথায় কি হয়েছে?

-তেমন কিছু না,উপর থেকে পাতিল পড়ছে।খালুজান,ঔষধ দিছে,ভালো হয়ে যাবে।আপনি রাসেল ভাইয়ের জানালার সামনে কি করেন?জিজ্ঞেস করল ফুলি।
ভালোবাসার গল্প
-ওনার নাম,রাসেল?ওনি এভাবে রুমে কেন?মানসিক সমস্যাজনিত রোগী নাকি?পাল্টা প্রশ্ন করল কাব্য।

-এত কিছু জানতে হবে না,এই বলে ফুলি ভেতরে চলে গেল।একটুর জন্য কাব্যের শরীরের সঙ্গে ধাক্কা খায়নি।

কাব্য এমন কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিল না।মেয়েটা এত রেগে গেল কেন?রাসেল ভাইয়া বলল,মাথা ফাঁটিয়ে দিয়েছে।অথচ ফুলি মেয়েটি বলে,পাতিল পড়ে এমন হয়েছে।তাহলে মিথ্যে বলল কে?কাব্য বিষয়টা চিন্তা করতে করতে বেরিয়ে পড়ল।
আজ পান্জাবির পকেটে টাকা রাখেনি কাব্য।গতকালের ঘটনার পর সে বেশ সর্তক।কেউ ধাক্কা দেয়ার চেষ্টা করলে সাবধানে এড়িয়ে যেতে হবে।রাস্তায় মানুষের সমাগম বেশ।কারো দিকে কেউ তাকানোর সময় নেই।সবাই ছুটছে আপন গতিতে,আপন গন্তব্যে।
হাঁটতে হাঁটতে মজিদের টং দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল কাব্য।গতকাল এই সময়ের চেয়ে আজকে মানুষের সমাগম বেশি।দোকানদার মজিদ আপন মনে চা বানিয়ে সবাইকে দিচ্ছে।মাঝেমাঝে পাউরুটি-বিস্কুটের ছোট্ট টুকরো কালাপাহাড়ের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে।কাব্য রাস্তা পাড় হয়ে অপরপাশে মজিদের দোকানের বেঞ্চের পাশে দাঁড়ালো।কাব্যকে দেখতে পেয়ে কালাপাহাড় খুশিতে কাব্যের পায়ের কাছে এসে লেজ নাড়াচ্ছে।দোকানদার মজিদ হেসে বলল,চা খাবেন,ভাই?সঙ্গে বিস্কুট দেই?

-না,মজিদ ভাই,আজ চা খাবো না।চা খেতে বসলে অনেক দেরিয়ে হয়ে যাবে।আজকে মেডিকেলের প্রথম ক্লাস।একটু আগে যেতে হবে। আমি এসেছি,আপনার গতকালের টাকা দিয়ে যেতে।কত বাকি আছে আমার,জিজ্ঞেস করল কাব্য।

-বেশি না,মাত্র ১৮ টাকা বাকি হইছে,গামছায় মুখ মুছে বলল দোকানদার মজিদ।

কাব্য মানিব্যাগ বের করে ২০ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল,এই নিন,রেখে দিন পুরোটা।

দোকানদার মজিদ হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দিল।বলল,ভাই,একটা কলা দিব,খেতে খেতে চলে যাবেন?জিজ্ঞেস করল মজিদ।

-না,খালি পেটে কলা খেলে পেটে ব্যাথা শুরু হবে।আমি কলেজ থেকে ফেরার পথে চা খেয়ে যাবো।এখন আসি,এই কালাপাহাড়,যাচ্ছি রে,কাব্য দোকান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল ডানপাশের রাস্তা ধরে।গতকালের সাইনবোর্ডের সামনে এসে দাঁড়াতেই মনে পড়ল চশমা পড়া মেয়েটির কথা।আপন মনে হেসে উঠল কাব্য।হঠাৎ লোকাল বাসের হাঁকডাকে কাব্য দেখতে পেল,তার কলেজ যাওয়ার বাস এসে পড়ছে।লোকাল বাসে লোক সমাগম বেশি হওয়াতে কাব্যের উঠতে বেশ বেগ পেতে হলো।শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে উঠে পড়ল লোকাল বাসে।শুরু হলো আপন গন্তব্যে ছুটে চলা।

সাজ্জাদ জহির অফিসে বসে আছে।তার সামনে কফির মগ।মগ থেকে ধোঁয়া উঠছে।কিছুক্ষন আগে পিয়ন রহমত গরম গরম কফি দিয়ে গেছে।অফিসে এসে কফি দিতে বললেও এখন কফি ভালো লাগছে না।কফির মগ একটু দূরে সরিয়ে রাখলেন সাজ্জাদ জহির।সকাল থেকে তার ভীষণ মেজাজ খারাপ।আর এই মেজাজ খারাপের সময়টুকু ভালো করার জন্য একজন আছে।তিনি হলেন ম্যানেজার শফিকুর রহমান।লোকটির মধ্যে অসম্ভব রকম জাদু আছে।সাজ্জাদ জহির মনে করেন,মানুষের মন নিয়ন্ত্রন করার অসাধারন ক্ষমতা নিয়ে আল্লাহপাক ওনাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।মাঝেমাঝে কথাটা জিজ্ঞেস করবেন করবেন করে আর করা হয়না।আজ বলার মানসিকতা নিয়ে কলিং-বেলের সুইচে চাপ দিলেন।একবার চাপ দিলে বুঝতে হবে,তাড়াতাড়ি আসতে হবে।আর পরপর দুইবার চাপ দিলে একটুও দেরি করা যাবে না।সাজ্জাদ জহির কি মনে করে দুইবার চাপ দিলেন।তিনি এখন শফিকুর রহমানের সাথে কথা বলা খুবই জরুরি মনে করছেন।
ভালোবাসার গল্প
পিয়ন রহমত হন্তদন্ত হয়ে রুমে প্রবেশ করল।হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,স্যার,কিছু লাগবে আপনার?

-কি ব্যাপার,তুমি এত হাঁপাচ্ছো কেন?কোথায় গিয়েছিলে?বিরক্ত হয়ে বললেন সাজ্জাদ জহির।

-স্যার,মির্জা সাহেব তার ডেস্কে এক কাপ চা দিতে বলেছিল।চায়ের কাপ মাত্র ওনার হাতে দিবো এমন সময়ে আপনার ডাকার আওয়াজ আমার কানে পৌঁছালো।তাই একপ্রকার দৌঁড়েই রুমে প্রবেশ করি,এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলল পিয়ন রহমত।

সাজ্জাদ জহির বেশ বিরক্ত হলেন।বললেন,এত কথা আমার সামনে বলবে না।কথাগুলো সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করবে।সময়ের যথেষ্ট দাম আছে।শুধু বাঙালিরা সময়ের গুরুত্ব বুঝার চেষ্টা করে না।যাই হোক,ম্যানেজার,শফিক সাহেবকে,আমার রুমে আসতে বলো।আর বলবে,এক মুহূর্ত যেন দেরি না করে।

পিয়ন রহমত বলল,আচ্ছা স্যার।রুম থেকে বের হয়ে গেল।

কফির মগ থেকে ধোঁয়া উঠছে না এখন।মনে হয়,ঠান্ডা হয়ে গেছে।সাজ্জাদ জহির কফির মগের দিকে একমনে তাকিয়ে রইলেন।

-আসসালামুআলাইকুম স্যার,শরীর কেমন আছে আপনার?

একজন সাদা পান্জাবি পড়া লোক দাঁড়িয়ে আছে সাজ্জাদ জহিরের সামনে।বেঁটেখাটো বলা চলে।চোখে সুরমা দেয়া।দাঁড়িতে মেহেদী লাগানো।হাসিমুখে তাকিয়ে আছে কিছু শোনার অপেক্ষায়।

-আসুন,শফিক সাহেব,এইতো আল্লাহপাক ভালো রেখেছেন।আপনার এই হাসিমুখ দেখে মনটা ভীষণ ভালো হয়ে যায়।

-কি যে বলেন,স্যার!আমি অতি নগণ্য বান্দা।আপনার অফিসের ছোটখাটো পদে চাকরি করে মাস শেষে বেতন পাই।আমার মুখ দেখে আপনার মন ভালো হয়,এটা সত্যিই অবাক করার মতো ব্যাপার,বললেন শফিকুর রহমান।

-আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন?হাতের ইশারায় বসতে বলল সাজ্জাদ জহির।আচ্ছা পৃথিবীতে বিয়ে না করলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়,শফিক সাহেব,জিজ্ঞেস করলেন সাজ্জাদ জহির।

-স্যার,আপনার মন খারাপ।আমি বুঝতে পেরে আর দেরি করিনি আসতে।বিয়ে হলো ফরজ কাজ।সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার জন্য বিয়ে করা খুব দরকার।মানুষ সারাজীবন একাকীত্বে থেকে কাটাতে পারে না।একসময় সঙ্গ দেয়ার জন্য একজনের অভাববোধ কাজ করে।এই অভাববোধ দূর করার জন্য আমি মনে করি,বিয়ে একটি উত্তম কাজ,বলল শফিকুর রহমান।

সাজ্জাদ জহির একবার চাইলেন,তার স্ত্রীর ব্যাপারটা শফিকুর রহমানকে খুলে বলতে।সারাদিন ঝগড়া আর ভালো লাগে না।দিনদিন দুজনের দূরত্ব বাড়ছে।কিন্তু ব্যাপারটা বললে খারাপ দেখাবে।নিজের ব্যক্তিত্ব বলে একটা ব্যাপার আছে।শফিক সাহেব ভাববে,আমি খুবই দুর্বল প্রকৃতির মানুষ।একসময় এটা নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে।তার থেকে ব্যাপারটা বাসার ভেতরে থাকাই ভালো।তবে শফিক সাহেবের কথা শুনে মন কিছুটা হলেও ভালো হয়েছে।হাসতে হাসতে বললেন,এই জন্যই আপনাকে এত ভালো লাগে,শফিক সাহেব।মনটা ভালো করে দিলেন।

শফিকুর রহমান মুচকি হাসলেন।কফির মগের দিকে তাকিয়ে বললেন,স্যার,কফি তো ঠান্ডা শরবত হয়ে গেছে।রহমতকে বলবো নাকি?ভালোবাসার গল্প

সাজ্জাদ জহির বললেন,হুম বলুন।আপনি এখন আসুন,শফিক সাহেব।আজ পুষ্পের মেডিকেলের প্রথম ক্লাস।ওকে একটু ফোন করতে হবে।

শফিকুর রহমান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।

সাজ্জাদ জহির,পকেট থেকে মোবাইল বের করলেন।হঠাৎ মনে পড়ল,আজও বলা হলো না,তিনি কি মানুষের মন নিয়ন্ত্রন করার জাদু জানেন?

চার.

কাব্য মেডিকেল কলেজের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।লোকাল বাসে মানুষের ভীড়ে ইস্ত্রি করা পান্জাবির বেশ কিছু জায়গা কুঁচকে গেছে।হাত দিয়ে পান্জাবি ভাজ করার চেষ্টা করছে কাব্য।অনেকের সাথেই বাবা-মা এসেছে গাড়ি নিয়ে।গেইটের সামনে এসে দিয়ে চলে যাচ্ছে।কেউ কেউ পকেট থেকে মোবাইল বের করে ক্যামেরা বন্দী করছে নিজেকে।কাব্যের বেশ অশস্তি লাগছে।নতুন জায়গা,পরিচিত কেউ নেই।কিভাবে কি করবে বুঝতে পারছে না।গেইটের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বয়স্ক করে একজন জিজ্ঞেস করল,আপনার আইডি কার্ড কোথায়?

কাব্য কিছুটা ভয়ে বলল,আমি নতুন ভর্তি হয়েছি।

-ওওও আচ্ছা,আগে বলবেন তো।ভেতরে চলে যান,সেখানে সবকিছু দেখিয়ে দিবে,মুচকি হেসে বলল বয়স্ক লোকটি।

কাব্য গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল,অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে ব্যাগ নিয়ে।সবার হাতে ফুল।কাছে যেতেই ফুল দিয়ে বরন করে নিচ্ছে সবাইকে।ভেতরটা বেশ সুন্দর করেই সাজানো হয়েছে।একটু সামনে এগিয়ে যেতেই একজনকে বেশ পরিচিত মনে হলো।শাড়ি পড়ে আছে।চুলগুলো খোঁপায় বেঁধে রেখেছে।মনে পড়ল,গতকাল সাইনবোর্ডের সামনে কথা বলা সেই মেয়েটি।কাব্য ভাবছে,মেয়েটি কি তার চেয়ে বড় ক্লাসে?নাকি মেয়েটিও এই বছর নতুন ভর্তি হয়েছে?কাব্য ভাবছে,এড়িয়ে যাবে।কিন্তু মেয়েটির চোখে চোখ পড়তেই কাব্য চোখ নামিয়ে ফেলল।মেয়েটি কাব্যের দিকেই এগিয়ে আসছে।

-এই যে হিমু সাহেব,আপনি এখানে?গতকাল তো ফুটপাতের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলেন।আজ যে একেবারে রাস্তায়,মুচকি হেসে বলল মেয়েটি।ভালোবাসার গল্প

কাব্যের বেশ অশস্তি লাগছে।তাকে দেখতে কি হিমুর মতো লাগছে?নিশ্চয়ই খুব বোকা বোকা লাগছে চশমা পড়াতে।তাই হয়তো মেয়েটি এমন মজা করছে।কাব্য বলল,আমি নতুন ভর্তি হয়েছি।আর আমি হিমু নই,আমার নাম কাব্য।

-নামের সাথে চেহারার মিল আছে।যাই হোক,আমি তোমার সিনিয়র বুঝছো।বেশি বাড়াবাড়ি করলে এমন টাইট দিবো,কেঁদে দিশেহারা হয়ে যাবা,কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলল মেয়েটি।

কাব্যের চেহারাটা যেন বেলুনের মতই চুপসে গেল।গতকাল কেন যে অমনভাবে হাঁটতে গেল রাস্তায়।বের না হলে মেয়েটির সাথে দেখা হতো না।এখন পরিচিত বলে খুব জ্বালাবে নিশ্চয়ই।মেডিকেলের প্রথম দিনটা এভাবে শুরু হবে কে কল্পনা করেছিল!সব পরিকল্পনা মাটি।

কাব্যের অবস্থা বোধ হয় বুঝতে পারল মেয়েটি।বেশ কিছুক্ষন মুচকি হেসে আর নিজেকে আটকাতে পারল না।বলল,বাহ্বা,এত ভীতু কেন আপনি?ভয় পাওয়ার কিছু নেই।আমিও আপনার মতো নতুন ভর্তি হয়েছি।আমার নাম পুষ্প।যাই হোক,আমরা যেহুতু একই ক্লাসের,তুমি করেই বলবো।

কাব্য যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।বুঝতে পারল,মেয়েটি বেশ মিশুক প্রকৃতির।প্রথম দিনেই একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল দেখে মনে মনে বেশ কিছু কাব্য।কিন্তু সেটা বাইরে প্রকাশ করল না।বলল,আচ্ছা ঠিক আছে।

-এখন চলো,ভেতরটা একটু হেঁটে আসি।ক্লাস শুরু হতে বিশ মিনিটের মতো বাকি আছে।সবাই আসার অপেক্ষায় একটু দেরি হবে ক্লাস শুরু হতে,বলল পুষ্প।

কাব্য কিছু বলল না।মেয়েটির কথায় সায় দিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করল হাঁটার।পুষ্প হঠাৎ কাব্যের চশমা নিয়ে দৌঁড় দিল।কাব্য ছুঁটছে পিছু পিছু নতুন শহুরে বন্ধুর দিকে।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বারান্দায় বসে আছে গম্ভীর মুখে।চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ।দুপুরে বাসায় ফিরতেই ফুলির মুখে কথা শুনে আর শান্তিতে বসে থাকতে পারছেন না কোথাও।সকালে বাইরে কাজে বের হওয়াতে আজকের পত্রিকাও পড়া হয়নি।ফিরতে ফিরতে প্রায় বিকাল হয়ে গেছে।বিকালে খাওয়ার পর পত্রিকা নিয়ে বসে মনোযোগ দিতে পারছেন না।রাসেল জানালা খুলে বাইরের কারো সাথে কথা বলা মানে ভীষণ ঝামেলা।যে ঝামেলার ইতি আজ থেকে চার বছর আগে নিয়ে এসেছিল।সবকিছু মিটমাট করার জন্য কতকিছু করতে হয়েছে,ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে।ফুলির সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আরেকবার কথা বলতে হবে।নাহলে মনে কিছুতেই শান্তি আসছে না।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ পত্রিকা ভাঁজ করে ছোট্ট টেবিলের উপর রাখলেন।হাঁক ছেড়ে ডাক দিলেন,এই ফুলি,এদিকে আয় তো।ভালোবাসার গল্প

ফুলি বেশ কিছুক্ষন পর মাথায় ঘোমটা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো।বলল,আমারে ডাকছেন,খালুজান?

-হুম,তোর কপালের এখন কি অবস্থা?ব্যাথা কমছে,নাকি আরেকবার ডাক্তার দেখাতে হবে,জিজ্ঞেস করল ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

-না,খালুজান,ব্যাথা আগের থেকে কমছে।ডাক্তার দেখাতে হবে না,বলল ফুলি।

-তাহলে ভালো।আচ্ছা শোন,তুই সকালে উপরের ছেলেটাকে রাসেলের ঘরের সামনে দেখেছিলি তাই না?

-দেখছি মানে,রাসেল ভাইয়া,জানালা খোলা রাখছে।আর কি যেন নাম,মনে পড়ছে কাব্য ভাই,ওনার জানালার সামনে কি যেন বলতেছিল।আমি দূর থেকে দেখছি,খালুজান,বলল ফুলি।ভালোবাসার গল্প

-এমনিতে,রাসেলের আচরন কেমন ছিল?জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো ইয়াজউদ্দিন আহেমদ।

-রাসেল ভাই খালি হাসি।একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার জানালা বন্ধ করে দিছে,বলল ফুলি।

-তাহলে সমস্যা নেই।রাসেল মনে হয়,কাব্যের নাম জিজ্ঞেস করছিল।তুই এখন যা,আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আয়।চা খেতে খেতে পত্রিকা পড়বো,বলল ইয়াজুদ্দিন আহমেদ।
ফুলি ভেতরে চলে গেল।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।

চারদিকে মৃদু বাতাস বইছে।আকাশ মেঘলা হয়ে আছে।মাঝেমাঝে মেঘের মধ্যে চাঁদ উঁকি দিয়ে আবার হারিয়ে যাচ্ছে গহীনে।যেন লুকোচুরি খেলছে।কাব্য ছাদে দাঁড়িয়ে আছে।বিছানায় তার ঘুম আসছে না।চারপাশ নিঃস্তব্দ।ইট-পাথরের নগরীর মানুষজন বিছানায় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে দিব্যি ঘুমাচ্ছে।কাব্যের হাতে কবিতার বই।বুঝতে পারছে না,এত রাতে কবিতা আবৃত্তি করা ঠিক হবে কিনা?ইয়াজউদ্দিন সাহেব নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে গেছে।লোকটার মন বোঝা ভীষণ দায়।এমনিতে রাতে ছাদে হাঁটতে নিষেধ করেছে।যদি কবিতা কানে যায় তাহলে কি যে করবে!এমনও হতে পারে,বাসা থেকেই তাড়িয়ে দিবে।কাব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।তারপর কি মনে করে,পৃষ্টা উল্টাতে শুরু করল।১৩১ পৃষ্টায় থেমে গেল কাব্যের হাত।

"এইখানে এসে প্রেম শেষ হলো
শরীর মরেছে।
তোমার হাত ধরে আমি দাঁড়িয়েছি
বৃষ্টির ভিতরে।

গাছ থেকে জল পড়ছে,
বৃষ্টি ছটা ছুটে আসছে গায়,
'ভিজে যাবে' তুমি বলছ,
'সরে এসো ছাতার তলায়'।
আমাদের একটাই ছাতা।
তাতে দুজনেরই চলে যায়।

আরো কালো করে এল,
গাছে ডানা ঝাপটায়,
দুজনে দাঁড়িয়ে আছি।
দুজনে দাঁড়িয়ে থাকবো।
যতদিন পাশে থাকা যায়।"
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।

-আপনি ভীষণ সুন্দর করে আবৃত্তি করেন।সত্যিই মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।

কাব্য চমকে উঠল।এত রাতে ছাদে মেয়ের কন্ঠ।সেই মেয়েটি নয়তো?কাব্য পেছনে ফিরলো।আরে,এইতো সুরেলা কন্ঠের মেয়েটি।আজও শাড়ি পড়ে আছে।তবে কাব্যের অনুমান ভুল।মেয়েটি অতি রূপবতী।চেহারায় একটা আলাদা মায়া আছে।মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।কাব্য অপ্রস্তুত হয়ে বলল,আপনি বড্ড অদ্ভুদ।শুধু মাঝরাতেই ছাদে আসেন।তবে আপনার কন্ঠ সত্যিই খুব সুন্দর।

-পৃথিবীটাই তো বড় অদ্ভুদ।চারপাশ হঠাৎ পাল্টে যায়।আপন মানুষগুলো কেমন যেন খোলশ পাল্টে অন্য রূপ ধারন করে,গম্ভীর হয়ে বলল মেয়েটি।

কাব্য কথার কিছুই বুঝলো না।সে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে।কি রূপ দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে সৃষ্টিকর্তা যেন আসমানের পরী!কাব্য বলল,আপনি কি এই বাড়িতেই থাকেন?কিন্তু দেখতে পাইনি তো কখনো?

-আমি এই বাড়িতেই থাকি।দেখবেন কিভাবে,আমি দিনের বেলায় থাকি না যে,বলল মেয়েটি।

কাব্য ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল,পরিবেশটা খুব সুন্দর।আজ বৃষ্টি হলে ভিজবো।আপনি ভিজবেন আমার সঙ্গে?আচ্ছা আপনার নামটাই তো জানা হলো না,কাব্য পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেল মেয়েটি নেই।যাহ,এরই মধ্যে কোথাই চলে গেল?নামটাই তো জানতে পারলাম না।আবার কাল রাতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।কি অদ্ভুদ মেয়ে!কাব্য কবিতার বই হাতে নিয়ে ভেতরে চলে গেল।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।


..........চলবে.........

written by Habib Khan Hridoy

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন