চিলেকোঠার প্রেম পর্বঃ- ৪ (ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।)

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।


পুষ্প দুই কানে হাত দিয়ে চেপে ধরে বসে আছে টেবিলে।নিচতলা থেকে ঝগড়ার শব্দ কানে আসছে পুষ্পের।মাঝেমাঝে কাঁচের জিনিস ভাঙার আওয়াজ আসছে।মনে হচ্ছে যেন,ভূমিকম্পে নিচতলা তছনছ হয়ে যাচ্ছে।সে কোনো দৈব শক্তির জোরে বেঁচে আছে উপরতলায়।মাথার ভেতরটা যন্ত্রনায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।মনে হচ্ছে যেন,গুঁটি কয়েক পোকা মগজে হাঁটছে।মাঝেমাঝে ছোট্ট দাঁত দিয়ে মগজে কামড় ধরে পোকাগুলো।পুষ্পের যখন ছয় বছর বয়স তখন থেকেই এই পোকাগুলো মগজে থাকতে শুরু করেছে।সেদিন রাতে টেবিলে বসে ক্লাসের পড়া মুখস্থ করছিল পুষ্প।সামনে ফাইনাল পরীক্ষা।ক্লাসে এবার বেশি নাম্বার পেতে হবে।নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই।হঠাৎ নিচতলা থেকে বাবার গলার আওয়াজ শুনতে পেল ছোট্ট পুষ্প।বাবাকে কখনো এত জোরে কথা বলতে দেখেনি সে।চেয়ার ছেড়ে উঠে সিড়ি দিয়ে নামছে ভয়ে ভয়ে।একসময় নিচতলায় নেমে দেখে,মায়ের চুলগুলো এলোমেলো।চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে আছে।বাবার হাতে চামড়ার বেল্ট।ছোট্ট মনে হাজার প্রশ্ন জন্ম নিয়েছিল ক্ষণিকে।হঠাৎ বাবার দিকে চোখ পড়তেই ভয়ে কু্ঁকড়ে যায় পুষ্প।দাঁত কটমট করে বলেছিল,"উপরে যাও,বেয়াদব মেয়ে।দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছো এখানে?"পুষ্প সেদিন কাঁদতে কাঁদতে সিড়ি দিয়ে দোতলায় গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসেছিল।অপেক্ষা করছিল,কখন শেষ হবে এমন চেঁচামেচি।কিন্তু শেষ হয়নি।সারারাত চলেছিল ভূমিকম্প।দু'হাতে কান চেপে ধরে নতুন সূর্য উঠার অপেক্ষায় একসময় ঘুমিয়ে যায় পুষ্প।সময় পেরিয়েছে,পুষ্প বড় হয়েছে।কিন্তু এখনও চিৎকার ভেসে আসে মাঝেমাঝে।কখনো বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেনি,কেন এমনটা করে তারা?হয়তো দুইজনেই কেউ হার মানার তাড়াহুড়ায় নেই।কাঁচ ভাঙার আওয়াজ,চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে পোকাগুলো ঘুম থেকে জেগে উঠে।কামড় দিতে থাকে একের পর এক।কখনো কখনো সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে যায় বাসা থেকে।শব্দ কমে এসেছে নিচতলা থেকে।ঝড় বোধহয় থেমে গেছে।পুষ্প হাত সরিয়ে টেবিলে মাথা রাখে।চোখের কোণ থেকে টপটপ করে পানি বেরিয়ে আসে।মুখ বেয়ে টেবিলের অংশ ভিজিয়ে দেয় নোনা জল।হঠাৎ দরজায় টোঁকা দেয়ার শব্দ ভেসে আসে কানে।ভেতরে আসবো,পুষ্প?
পুষ্প আঙুল দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলে।নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে,হ্যাঁ আম্মু,দরজা খোলা আছে,ভেতরে আসো।
ভালোবাসার গল্প
-কি করছো এখানে একা বসে বসে?বিছানায় বসতে বসতে বলল সেলিনা হোসেন।চেহারায় ক্লান্তের ছাপ ফুটে উঠেছে।ঠোঁট দুটো কাঁপছে।চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে।

পুষ্প চেয়ার ছেড়ে উঠে বিছানায় মায়ের পাশে এসে বসলো।সেলিনা হোসেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন।কিছু বলতে চেয়ে পারলেন না।পুষ্প হঠাৎ সেলিনা হোসেনের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,আজ মায়ের সাথে এত ভালোবাসা?কি ব্যাপার,পুষ্প?

-আম্মু,আমাকে খুব করে আদর দাও তো।মাথায় পোকাগুলো কেমন যেন করছে,বলল পুষ্প।

সেলিনা হোসেন যেন ভিঁড়মি খেয়ে বসলেন।মেয়ে বলে কি!মাথায় পোকা কিলবিল করছে মানে?ডাক্তার মাসুদকে ফোন করে বাসায় নিয়ে আসবো নাকি?জিজ্ঞেস করলেন সেলিনা হোসেন।ভালোবাসার গল্প

-না,আম্মু,ডাক্তার দিয়ে আমার কিছু হবে না।যেদিন আমি শান্তির সুবাস শরীরে মাখবো,সেদিন এই পোকা মারা যাবে।ভূমিকম্পে যেদিন ভেতরটা নড়ে উঠবে না,উতাল-পাতাল করবে না,সেদিন এই পোঁকা মগজ কামড়ে ধরবে না।

সেলিনা হোসেন মেয়ের কথার কিছুই বুঝতে পারলেন না।ইদানিং মেয়েটা কেমন যেন হয়ে গেছে।মহাপুরুষদের মতো কঠিন কঠিন কথা বলা শুরু করে।তিনি পুষ্পের হাতে হাত রেখে বললেন,তোর কিছু হয়েছে,মা?

পুষ্পের চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।কিন্তু মুহূর্তে আঙুল দিয়ে মুছে ফেলল।অনেকদিন পর মায়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে নিজেকে সামলাতে কয়জন সন্তান পারে?জানালার দিকে তাকিয়ে বাইরের আকাশ দেখছে পুষ্প।দুইজনে চুপ করে আছে।পুরো রুম জুড়ে নিরবতা।বেশ কিছুক্ষন পর পুষ্প নিরবতা ভেঙে বলল,আচ্ছা আম্মু,তুমি আর বাবা আগের মতো হয়ে যেতে পারো না?সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দেষ স্বীকার করে নিয়ে সব ঠিক করে নাও।

সেলিনা হোসেন কোল থেকে পুষ্পকে উঠিয়ে দিলেন।চোখ-মুখ শক্ত করে বললেন,অসম্ভব,পুষ্প।ওই মানুষটা দশ বছর ধরে আমাকে জ্বালিয়ে মারছে।সবসময় নিজের ব্যক্তিত্ব,ক্ষমতা দিয়ে সবকিছু বিচার করে।অথছ আমিও যে মানুষ সেদিকে খেয়ালই নেই।সারাক্ষণ যা নয় তাই বলে।

-আচ্ছা আম্মু,তুমিও তো বাবাকে সময় দাওনি।সবসময় বান্ধবী,আড্ডা-ঘুরাঘুরি এসব নিয়ে ব্যস্ত ছিলে।তাহলে মানুষটার কষ্ট হয়না বলো?

-তুমি কি তোমার বাবার হয়ে কথা বলছো,পুষ্প?যদি বলো তাহলে শুনে রাখো,এই মানুষটার সাথে আমি আর পারছি না।খুব শীঘ্রই একটা কিছু জানতে পারবে তুমি,রেগে বলল সেলিনা হোসেন।

-দুজনে আলাদা হয়ে যাবে নাকি?জিজ্ঞেস করল পুষ্প।

-সেটা সময়ই বলে দেবে।তবে আমি এই অশান্তি থেকে মুক্তি চাই।প্রতিদিন আর এভাবে ভালো লাগছে না,বলল সেলিনা হোসেন।

পুষ্প বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।পর্দা সরিয়ে বলল,তোমরা মুক্তির স্বাদ নেয়ার আগে আমি যেন পেয়ে যাই।আকাশে পাখির মতো উড়তে পারি,কথাটা বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল পুষ্প।

সেলিনা হোসেন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল জানালার দিকে।

পাঁচ.
ভালোবাসার গল্প
কাব্য ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ছেলে রাসেলের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।আজ জানালা বন্ধ।দু'একবার টেনেও কোনো লাভ হয়নি।মনে হয়,গতকাল রাসেলের সাথে কথা বলতে দেখে ভেতর থেকে জানালা বন্ধ করে দিয়েছে কেউ।কাব্য হেঁটে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো।দরজায় তালা দেয়া।কাব্য হঠাৎ উপরে তাকাতেই দেখতে পেল,দরজার উপরের দেয়ালে রশিতে বাঁধা দুটো চাবি ঝুঁলছে।হতে পারে,এই চাবিই দরজার তালা খুলবে।ছোট চাবি দিয়ে তালায় ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই তালা খুলে গেল।কাব্যের মুখে হাসি ফুটে উঠল।দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল কাব্য।বাইরের রোদ রুমে পড়তেই রুম আলোকিত হয়ে উঠল।কাব্য দেখতে পেল,রাসেল বিছানা শুয়ে আছে।ডান হাতের নিচে বই রাখা।বই এর নাম "The Life Of A Journey"।বইটি কাব্য পড়েছে।বেশ দারুন একটি বই।চোখে আলো পড়তেই রাসেল চোখ খুলল।কাব্যকে দেখতে পেয়ে রাসেলের মুখে হাসি ফুঁটে উঠল।হেসে বলল,আরে কাব্য যে,আজ আমার রুমে কি মনে করে?

-আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?বাহ,খুব দারুন লাগল,বেশ খুশি হয়ে বলল কাব্য।

-হুম চিনতে পারলাম।তা দাঁড়িয়ে কেন,বিছানায় বসে পড়ো,ইশারায় বসতে বলল বিছানায়।আমার রুম পুরোটাই অগোছালো।পাগল মানুষের রুম বোধহয় এমনই থাকে,কথাটি বলে হেসে উঠল রাসেল।

কাব্য বিছানায় বসল।সে বেশ অবাক না হয়ে পারে না।মানসিক সমস্যায় জর্জরিত মানুষটি কত সুন্দর গুঁছিয়ে কথা বলতে পারে।সত্যিই কি তিনি পাগল,নাকি অন্ধকার রুমে থেকে থেকে এমনটা হয়েছে?পাগল কিছিমের মানুষ এমন হতে পারে না।কাব্য রাসেলের পুরো রুম বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছে।মেঝেতে বই এর ছড়াছড়ি,সবই ওয়েস্টার্ন সিরিজের বই।কয়েকটা বাংলা বইও পড়ে আছে।দেয়াল জুড়ে কিছু একটা লেখা রয়েছে।কিন্তু নতুন রঙের প্রলেপ পড়াতে লেখাগুলো অস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।কাব্য রাসেলের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল,রাসেল বিছানায় আঙুল দিয়ে কি যেন লিখার চেষ্টা করছে।কাব্য জিজ্ঞেস করল,ভাই,কি লিখছেন বিছানায়?

রাসেল কাব্যের দিকে না তাকিয়ে বলল,ভালোবাসা লিখছি।যে ভালোবাসায় শিরির জন্য ফরহাদ মাটি কেটেছিল।

কাব্য রাসেলের কথায় মুচকি হাসল।বলল,আপনি এখানে বন্দী কেন,ভাই?

-ওইযে বললাম,ভালোবাসার জন্য।আমি এখন বনবাসে বন্দী।ইট-পাথরের তৈরি বনবাস।আমাকে মুক্ত করতে সে আসবে,কথাটি বলে হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল রাসেল।

কাব্য এমন পরিস্থিতিতে বেশ হকচকিয়ে গেল।বুঝতে পারল,এখন এখানে থাকা ঠিক হবে না।ফুলি কিংবা ইয়াজউদ্দিন সাহেব ব্যাপারটা দেখে ফেললে বিষয়টা খারাপ দেখাবে।কাব্য বিছানা থেকে উঠে রাসেলের দিকে তাকিয়ে বলল,আজ আসি ভাই,ভালো থাকবেন।কাব্য রুম থেকে বেরিয়ে একটা জিনিস খেয়াল করল।বাড়ির সব রুমের রঙ একরকম,আর রাসেলের রুমের রঙ আরেকরকম।বিষয়টা বড় অদ্ভুদ।ভেতরের রুমের দেয়ালেও কি যেন লেখা আছে!কাব্য দরজায় তালা মেরে চাবি আগের জায়গায় রেখে বেরিয়ে গেল বাইরে।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বারান্দায় বসে চা পান করছেন।বেশ বিরক্ত মনে হচ্ছে তাকে।ফুলি ওনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ।ব্যাথা এখনও রয়ে গেছে।একটু আগে ফার্মেসীর ছেলেটা এসে ঔষধ দিয়ে গেছে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ চা শেষ করে ফুলির দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,কাব্য,আজ তাহলে রাসেলের রুমের তালা খুলে ভেতরে ঢুকেছে?

-জ্বি খালুজান,আমি নিজ চোখে দেখেছি।ঘটনা অতি সত্য,কাপ হাতে নিয়ে বলল ফুলি।

-আমি কাব্যকে এখানে আসতে বলেছি।ব্যাপারটা আর সামনে বাড়ালে সমস্যা হবে।তবে তোকে চাবিটা ওই দরজায় রাখতে কে বলেছিল?চাবি না পেলে সে তো তালা খুলতে পারতো না,বলল ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

ফুলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই দেখতে পেল,কাব্য চলে এসেছে।ফুলি চুপ করে রইল।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ফুলির দিকে তাকিয়ে বলল,ফুলি,চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে যাও।

ফুলি কাব্যের দিকে তাকিয়ে ভেতরে চলে গেল।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ একটা চেয়ার কাব্যের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,এখানে বসো।কেমন আছো,কাব্য?জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

কাব্য চেয়ারে বসল।হেসে বলল,এইতো চাচা,আলহামদুলিল্লাহ ভালো।আপনার শরীর কেমন আছে?
ভালোবাসার গল্প
-এইতো আল্লাহপাক ভালো রেখেছেন।তোমাকে একটা কথা বলার জন্য এই সন্ধ্যাবেলায় একটু বিরক্ত করলাম,বললেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

-না,চাচা,বিরক্ত হবো কেন?আপনি বললে যেকোনো সময় আমি চলে আসবো,হেসে বলল কাব্য।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ মুখখানা শক্ত করতে চেয়েও পারলেন না।তিনি কাব্যের বিনয়ে সত্যিই মুগ্ধ।এই ছেলে মানুষের মন জয় করার অসাধারন ক্ষমতা নিয়ে দুনিয়াতে এসেছে।বড় কোনো অন্যায় করার পর যখন কাঠগড়ায় দাঁড়াবে,তখনও হাসিমুখে বলবে,আপনি যা বলবেন তাতেই আমি রাজি।কোনো কার্পন্য করবো না।কাব্যের এই বিনয়ী হাসিমুখ দেখে হয়তো সাজা কিছুটা কমতেও পারে।তিনি কাব্যের দিকে তাকিয়ে বললেন,তুমি কি আজ রাসেলের রুমের তালা খুলে ভেতরে ঢুকেছো?

কাব্য কিছুটা ভয় পেল কথাটা শুনে।পরমুহূর্তে স্বাভাবিক হয়ে বলল,চাচা,রাসেল ভাইয়া,খুব মেধাবী একজন মানুষ।তিনি কিন্তু পাগল নন।দিব্যি সবকিছু চিনতে পারে।

-আমি জানি,কিন্তু তবুও সে পুরোপুরি সুস্থ নয়।সেদিন ফুলির মাথা ফাঁটিয়ে দিয়েছে খাবার দিতে দেরি হওয়াতে,বললেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

-চাচা,এটা স্বাভাবিক বিষয়।আমরা সবকিছু এই পেটের জন্যই তো করছি।মানুষ সব সহ্য করতে পারে,কিন্তু ক্ষুধা লাগলে নিজেকে সামলাতে পারে না।আপনাকে একদিন খাবার ছাড়া রুমে তালাবন্ধ রাখলে,পরদিনই ফুলিকে আপনি তুলে আঁছাড় মারবেন।আচ্ছা,রাসেল ভাইয়ার এই অবস্থা কিভাবে হলো?জিজ্ঞেস করল কাব্য।

-আমার স্ত্রীর ঘর আলো করে প্রথম আসে কন্যা সন্তান তুলি।তারপর আসে দ্বিতীয় কন্যা সন্তান তুবা।কন্যা সন্তান মানে এক একটা জান্নাত।দুই মেয়ে আমার ঘর আলো করে রাখলো।তারপর সাত ভাই চম্পার মতো আমারও দুই মেয়ের একটা ছোট্ট ভাই আসে।শখ করে নাম রাখলাম রাসেল।সবার চোখের মনি।একটু চোখের আড়াল হলেই সবাই খুব অস্থির হয়ে যেতো।আমার স্ত্রী ছোট ছেলে বলতেই পাগল।একদিন আমার শ্বশুড়বাড়ি থেকে খবর আসে,শ্বশুড় খুব অসুস্থ।আমার ব্যবসায়ের কাজে সঙ্গে যেতে পারিনি।তুলি আর তুবার সামনে পরীক্ষা।আসার পথে গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায় আমার স্ত্রী রাহেলা।রাসেল এই ধকল নিতে পারেনি।কেমন যেন মানসিক রোগীর মত হয়ে যায়।অনেক চিকিৎসা করে এখন মোটামুটি সুস্থ।তবুও দরজা খোলা পেলে বাইরে চলে যায়।তাই আজ দু'বছর এভাবেই বাসায় বন্দী করে রেখেছি,একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

-রাসেল ভাই,এখন বেশ সুস্থ।আজ সকালেই আমার সাথে কি সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলল।হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে,বলল কাব্য।

-কি জানি,তবে তুমি রাসেলের রুমে কম যাবে।ছেলেটা কখন কি অঘটন করে বসে বলা যায় না,বললেন তিনি।

-আচ্ছা চাচা,আপনি নিশ্চিত থাকবেন এই ব্যাপারে,বলল কাব্য।

-রাতে ছাদ থেকে হাঁটার আওয়াজ কানে আসে।তুমি কি রাতে ছাদে উঠে হাঁটাহাঁটি করো?জিজ্ঞেস করলেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

সত্যটা বললে তিনি হয়তো ব্যাপারটা খারাপভাবে নিতে পারেন।কাব্য বলল,না,চাচা,আপনি সেদিন বলার পর ছাদে কম আসা-যাওয়া করি।ভালোবাসার গল্প

-আচ্ছা ঠিক আছে।হয়তো ফুলি এমন করে।এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারি না।তুমি চা খাবে,কাব্য?চা দিতে বলি,ফুলিকে?জিজ্ঞেস করলেন,ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

-না,চাচা,চা খাবো না।আমি কি তাহলে এখন উঠবো?বলল কাব্য।

-তোমার সাথে কথা বলে ভালো লাগল।মাঝেমাঝে এসে এই বুড়ো লোকটার সাথে একটু সময় দিবে।দু'জনে জমিয়ে আড্ডা দিবো,বললেন তিনি।

-জ্বি অবশ্যই,চাচা,কাব্য চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেল।

মৃদু বাতাস বইছে চারপাশে।আকাশ মেঘলা হয়ে আছে।মাঝে মাঝে মৃদু গর্জন শোনা যাচ্ছে বৃষ্টি আসার বার্তা হয়ে।কাব্য দাঁড়িয়ে আছে ছাদে।আজ এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।হাঁটাহাঁটি করলে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের কানে যেতে পারে।হয়তো লাঠি নিয়ে ছাদেই চলে আসবেন,কথাটা ভাবতেই মুচকি হেসে উঠল কাব্য।প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেছে ছাদে এসেছে।অথচ মেয়েটি এখনও আসছে না।এক অদ্ভুদ মায়া আছে চেহারায়।কিন্তু এখনও নামটি জানা হয়নি।আচ্ছা মেয়েটির নাম কি হতে পারে?এমন সময়ে পেছনে কারো পায়ের আওয়াজ কানে আসল কাব্যের।বলল,আমি আপনার জন্য কতক্ষন ধরে অপেক্ষা,কথাটি বলে ঘুরে তাকাতেই চমকে উঠল কাব্য।সেই মেয়েটি নয়,বরং ফুলি কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

-কি ব্যাপার,ভাইজান,ছাদে কার জন্য অপেক্ষা করেন?জিজ্ঞেস করল ফুলি।

কাব্য থতমত খেয়ে গেল ফুলির কথা শুনে।বলল,না,কেউ না।ঘুম আসছিল না দেখে,কবিতা আবৃত্তি করছিলাম।তুমি এত রাতে ছাদে কি করো?জিজ্ঞেস করল কাব্য।

-না,এমনে হাঁটতে আসছি।খালুজান,রাতে ছাদে হাঁটতে বারন করছে কিন্তু আপনারে!কথাটি কি ভুলে গেছেন,ভাইজান?বলল ফুলি।

-না,ভুলবো কেন?রাতে ছাদে তেমন আসা হয়না।আজ রুমের ভেতর ভালো লাগছিল না,তাই একটু হাঁটতে আসছি,বলল কাব্য।

-আচ্ছা এখন ভেতরে যান,বেশ রেগে বলল ফুলি।

মেয়েটি কি গোয়েন্দাগিরি শুরু করল নাকি?মনে হয় ইয়াজউদ্দিন সাহেব মেয়েটাকে পাঠিয়েছে নজর রাখতে।ছাদে আসা কমিয়ে দিতে হবে।কাব্য আর দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে চলে গেল।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।
ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।

ছয়.

ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ঘুম ভেঙে গেছে।ঘামে পুরো শরীর ভিজে আছে তার।খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছেন তিনি।"জমি-জমার কাজে সকালে বের হয়েছেন কাগজপত্র হাতে নিয়ে।রাস্তা পার হতে গিয়ে হঠাৎ একটা ট্রাক এসে শরীরের উপর দিয়ে পিঁষে চলে যায়।তার নিথর দেহকে ঘিরে মানুষজন দাঁড়িয়ে আছে।এলাকায় লাশ নিয়ে আসার পর পরিচিত অনেকে বলছে,আহারে লাশ বহন করার কেউ নাই।"
সত্যিই স্বপ্নটা খুব ভয়ঙ্কর।চারপাশে বৃষ্টি পড়ছে।মৃদু বাতাস বইছে।জানালার ফুঁটো দিয়ে সেই বাতাস ইয়াজউদ্দিন আহমেদের শরীরে লাগছে।কিন্তু তিনি এখনও ঘামে ভেজা পান্জাবি পড়ে শুয়ে আছেন বিছানায়।বুকটা এখনও ধড়পড় করছে।হঠাৎ এই স্বপ্ন কেন দেখেছেন বুঝতে পারছেন না তিনি।বিছানার পাশে রাখা মোবাইল হাতে নিয়ে দেখতে পেলেন,রাত প্রায় সাড়ে চারটার কাছাকাছি।ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়।ইয়াজউদ্দিন সাহেব খুব ছোটবেলায় ওনার দাদীর কাছে শুনেছেন কথাটা।এখন প্রায় ভোরের সময়।যদি স্বপ্নটা সত্যিই হয়?ইয়াজউদ্দিন আহমেদের শরীর বেশ খারাপ লাগছে।এই মৃদু বাতাসের মাঝেও খুব গরম লাগছে।কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে।পেশার বেড়ে গেল না তো?ফুলিকে একবার ডাক দিবে কিনা ভাবছেন তিনি।একটু তেঁতুল পানিতে মিশিয়ে গেলে পেশার কমে যায়।দক্ষিনের রুম থেকে রাসেলের হাসির আওয়াজ কানে ভেসে আসল।বৃষ্টি দেখে খুব আনন্দ মনে হচ্ছে ছেলেটার।হঠাৎ চিৎকার করছে,আমাকে বাইরে বের হতে দাও।আমি বৃষ্টিতে ভিজবো।আমার সুহাসিনী,আমাকে ডাকছে ছাদে ভিজতে যেতে।
ইয়াজউদ্দিন আহমেদের কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে।অস্ফুটস্বরে বলছে,এই রাসেল,কেউ নেই।চুপচাপ বাসায় বসে বৃষ্টি দেখ।পাগলামি করলে বেঁতের লাঠি দিয়ে খুব মারবো বলে দিলাম।
ভালোবাসার গল্প
কথাগুলো কেউ শুনতে পেল না বোধহয়।চার দেয়ালের মাঝেই হারিয়ে গেল।বৃষ্টির ধাপট বাড়ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ভাবছেন,কাব্যকে সন্ধ্যেবেলায় মিথ্যা বলা ঠিক হয়নি।উপরওয়ালার কাছে কি জবাব দিবেন তিনি?কিন্তু কাব্য তো আমার আপনজন নয়।থাকার জায়গা নেই দেখে,ছাদের চিলেকোঠায় থাকার জন্য দেয়া হয়েছে ছেলেটাকে।পরমুহূর্তে মনে পড়ে,এই শহরে আপন কে আছে?মেয়ে দুটো মাসে একবার খবর নেয় না।ছয়মাসে বেড়াতে আসে বছরে একবার।কাব্য ছেলেটা তো তাকে আপন বাবার মতো খোঁজখবর নেয়।খুব সম্মান করে।ছেলেটা যদি আসল সত্যিটা জেনে আমাকে ভুল বুঝে?নর্দমার নোংরা কাঁদা মনে করে?নিজেকে সামলাতে পারব তখন?কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চোখ বুঝে আসে ইয়াজউদ্দিন আহমেদের।বৃষ্টির দাপট বাড়ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।দক্ষিনের রুম থেকে কান্নার শব্দ আসছে,আমাকে বের হতে দাও।আমি বৃষ্টিতে ভিজবো।আমাকে ডাকছে সে!

ভালোবাসার সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস।


..........চলবে.......

written by Habib Khan Hridoy

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন