সকাল থেকেই ফোন করে এসআই আনিসুর রহমানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।হাসনাত করিম উনার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন শ্যালক আনিসের জন্য।নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ঘন্টাখানেক দেরি হয়ে গেছে।তবুও আসার কোনো খবর নেই তার।গতকাল রাতে "আবার কল করবে" বলে মোবাইল রাখার পর আর ফোন করেনি সে।হাসনাত করিম কল আসার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েন।সকালে ঘুম ভেঙে যখন মনে পড়ল তখন একবার ফোন করলেন।কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর পেলেন না।প্রথমে ভেবেছিলেন,হয়তো কাজে ব্যস্ত আছে।নাস্তা করে আরও কিছুক্ষণ পরও যখন শ্যালক আনিসের ফোন আসলো না,এরপর তিনি নিজে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন।শেষে বেরিয়ে আসলেন বাইরে।মনে মনে বেজায় ক্ষেপে আছেন আনিসের উপর।আসতে না পারলে জানাবে তো।কিন্তু সেটাও বলছে না।হাসনাত করিম শেষবারের মতো শ্যালক আনিসকে ফোন দিলেন।ওপাশ থেকে রিং পড়ছে,একসময় বন্ধ হয়ে গেল।বিরক্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করলেন।রাস্তা একদম ফাঁকা।দু'একটা রিকশা মাঝেমাঝে চোখে পড়ে,কিন্তু উল্টোদিকে যাবে না।শেষে দেখতে পেলেন,রাস্তার কোণায় একটি রিকশা দাঁড়িয়ে আছে।ড্রাইভার রিকশার হুট তুলে ভেতরে বসে বিড়ি টানছে।হাসনাত করিম হেঁটে রিকশার ভেতরে উঁকি দিয়ে বললেন,এত সুখে টানলে হবে?আমাদের দিকে তাকাবে কে?
এমন উদ্ভট কথা মনে হয় রিকশাওয়ালা লোকটি কখনো শুনেনি।সে ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,আপনিও এক টান দিবেন নাকি?
-আরে না ভাই,আমি টান দেয়ার কথা বলিনি।বলছিলাম কি,আমাকে একটু সামনে দিয়ে আসবে?এই বয়সে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার অতদূর হেঁটে যাওয়া সম্ভব না।কোনো রিকশাও চোখে পড়ছে না।
লোকটি বিড়িতে লম্বা টান দিয়ে বলল,দেখেন,মন-মেজাজ ভালা না।ভালা হইলে কেউ বিড়ি টানে না।কষ্ট পাইলে তবেই বিড়ি টানে।এখন যাওয়ার মন নাই।আসতে পারেন।
হাসনাত করিম গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,এই বয়সে ছ্যাঁকা দিল নাকি কেউ?তাহলে তো বিড়ি টানাই স্বাভাবিক।
লোকটি এবার রেগে বলল,ওই মিয়া,মশকরা করেন ক্যান?এই বয়সে কে ছ্যাঁকা দিবো।বউ এর লগে ঝামেলা হইছে।এত অশান্তি ভালো লাগে না।
-এগুলা কোনো ব্যাপার না।চলেন তো,আর রিকশাও চোখে পড়ছে না।না গেলে কিন্তু আমিও পথ ছাড়বো না।
লোকটা বিরক্ত হয়ে হাত থেকে জলন্ত বিড়ি ফেলে দিয়ে বলল,এই দুনিয়ায় শান্তি নাই।একটা শান্তির জায়গার বড়ই অভাব।উঠেন এখন।
হাসনাত করিম রিকশায় উঠে লোকটার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,আপনার শান্তির ব্যবস্থা করছি।এখন আমাকে নিয়ে চলেন।
ইমিগ্রেশন ঝামেলা মিটিয়ে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে মুনিরা।ভাবছে,একা একা কতদূর চলে এসেছে সে।এবার এখানে মাসখানেক থেকে দাদুকে বুঝি দিবে,সে এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে।একা একা পথ চলতে শিখে গেছে।তার সঙ্গে বাড়তি কেউ সবসময় থাকবে ব্যাপারটা সত্যিই বিরক্তিকর।কিছু করতে গেলেই বলবে,ম্যাডাম,এটা করতে বারন করা হয়েছে।ওই কাজটা কেন করছেন?এত বড় হওয়ার পরও এই প্রশ্নগুলো শোনা কতটা অপমানকজনক তা হয়তো দাদু জানে না।অবশ্য মুনিরা জানে,দাদু তাকে খুব ভালোবাসে বলেই এত খেয়াল রাখেন।এখানে এসে অন্তত এই ঝামেলা থেকে রেহাই মিলবে।কথাগুলো ভাবতেই আনমনে হেসে উঠল মুনিরা।ব্যাগ নিয়ে সামনে হাঁটতেই হঠাৎ একজন লোক আচমকা মুনিরার সামনে এসে দাঁড়ালো।পড়নে কালো প্যান্ট,সাদা শার্ট পড়ে আছে।লোকটি ভালো করে মুনিরার দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখছে।সামনে থেকে সরছে না,কিছু বলছেও না।এমন ঘটনায় মুনিরা ভেতর ভেতর ভয়ে মুচড়ে যাচ্ছে।কি চায় লোকটি?
-আপনার নাম কি মুনিরা?আপনি কি মিনহাজ সাহেবের নাতনী?জিজ্ঞেস করল লোকটি।
কথাটা শুনে মুনিরার ভয় যেন আরও বেড়ে গেল।সে মুভিতে দেখেছে,আসল নাম বললে মুখ চেপে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।তারপর বিরাট অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে।না দিতে পারলে মেরে ফেলে।মুনিরা বলল,না,আমি মুনিরা হতে যাবো কেন?আমার নাম তো নুসরাত।আর মিনহাজ সাহেব আবার কে?
লোকটি ভ্রুঁ কুচকে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সেখানে তাকিয়ে আবার বলল,আপনি সত্যিই মিনহাজ সাহেবের নাতনী না?
মুনিরা বলল,বললাম তো না।শুধু শুধু মিথ্যা বলতে যাবো কেন?
-তাহলে স্যার কি আমাকে ভুল ছবি পাঠিয়েছে?কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা নয়।আচ্ছা ঝামেলায় পড়লাম তো।এখন কি করি?
-আপনাকে দাদু পাঠিয়েছে এখানে?কিন্তু এয়ারপোর্টে কেউ আমাকে নিতে আসবে এমনটা তো বলেনি।
-আপনিই তাহলে মুনিরা।কিন্তু বললেন যে,আপনি নুসরাত।অযথা মিথ্যা বলে আমাকে দ্বিধায় ফেললেন কেন?
-আমি ভেবেছিলাম,আপনি পাচারকারী দলের লোক।আসল নাম বললে যদি আমাকে মুখ চেপে গাড়িতে তুলে নেন।সে জন্যই মিথ্যা বলেছি।
-কি!আমাকে দেখে পাচারকারী মনে হয়?আমার নাম শাহেদ।আমি আপনার দাদুর অফিসের ম্যানেজার।গতকাল রাতেই আমাকে বলল,আপনি আসছেন।আমি যেন সকালেই গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে গিয়ে অপেক্ষা করি।
-এখানে এসেও দেখছি,একা কোথাও যাওয়া যাবে না।যাই হোক,আমি আপনার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট।আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন।আর আপনার গাড়ি কোথায়?দেখছি না তো।
-এইতো একটু সামনেই।ব্যাগটা আমাকে দাও।তুমি আমাকে সত্যিই ভয় পাইয়ে দিলে।শাহেদের কথায় মুনিরা খিলখিল করে হেসে উঠল।
মুনিরা গাড়িতে উঠে বসলো।শাহেদ বসলো গাড়ির সামনের সিটে ড্রাইভারের সাথে।মুনিরা বেশ উত্তেজিত।মাথা বের করে মাঝেমাঝে রাস্তার আশপাশের দৃশ্য দেখছে।একসময় বলল,খুব পাল্টে গেছে সবকিছু।আগের মতো কিছুই নেই।
শাহেদ বলল,হ্যাঁ,তা তো হবে।এতদিন পর আসলে পরিবর্তন তো চোখে পড়বেই।যখন সবকিছু ঘুরবে,তখন বুঝতে পারবে।তা তোমার ভালো লাগছে তো?
-হ্যাঁ,খুব ভালো লাগছে।আপনি কি পুরোটা সময় আমার সঙ্গে থাকবেন নাকি?জিজ্ঞেস করল মুনিরা।
-স্যার তো তাই বলল।তুমি যেখানে যাবে,সবসময় আমি যেন থাকি।বলা তো যায় না,কি ঝামেলা হয়।
-উফফ,এখানে এসেও শান্তি নেই।মুনিরা চুপ করে আবার বাইরে তাকিয়ে রইল।হঠাৎ বলল,শাহেদ ভাইয়া,আমার মনে হচ্ছে,কেউ আমাদের অনেকক্ষণ সময় ধরে দেখছে।আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে।
-তুমি দেখছি একেবারে গোয়েন্দার মতো সবকিছু সন্দেহের চোখে দেখো।কে আমাদের পিছু নিবে?তুমি তো আজই এখানে আসলে।হতেই পারে,আমাদের সাথে এক রাস্তায় যাবে।এসব বাদ দিয়ে চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করো।
কিছুক্ষণের মাঝেই শাহেদের সাথে ভাব হয়ে গেল মুনিরার।দুজনের মাঝে যেন অনেকদিনের পরিচয়।শাহেদ মনোযোগ দিয়ে মুনিরার কথাগুলো শুনছে।মাঝেমাঝে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ছে।গাড়ি চলছে গন্তব্যে।অথচ জানেই না,সত্যিই কেউ একজন এদিকেই তাকিয়ে আছে।
দোতলা একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন হাসনাত করিম।শ্যালক আনিসের গতকাল রাতের দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী এই বাড়িটি মুনিরার দাদুর।রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে বিদায় করে গেইটে আওয়াজ দিলেন তিনি।একটু পরেই একজন বৃদ্ধ লোক গেইট খুলে বেরিয়ে এসে বলল,কাকে চান?
-আমি হাসনাত করিম।এটা মিনহাজ সাহেবের বাড়ি তো?
-হ্যাঁ,কিন্তু উনি তো এখানে থাকে না।তবে আজ উনার নাতনীর আসার কথা।
-আমি মিনহাজ সাহেবের নাতনী মুনিরার সাথেই কথা বলতে এসেছি।কথা বলা যাবে?
-আচ্ছা ভেতরে আসুন।হাসনাত করিম গেইট পেরিয়ে ভেতরে গিয়ে বসলো।তা মিনহাজ সাহেব এখানে তেমন আসেন না তাই না?
লোকটি বলল,শেষ এসেছিল বছরখানেক আগে।তখন উনার শরীর ভালোই ছিল।কিন্তু হঠাৎ করে প্যারালাইজড হয়ে এখন এক জায়গায় বসে থাকেন।খুব একটা হাঁটাচলা করতে পারেননা।এদিকে না আসার এটাও একটা কারন।শুনেছি,আর আসবেনও না।তবুও যদি দেশের প্রতি দয়া হয়,একবার দেখে যাবেন এই আশা।
-উনার নাতনী কি ছোটবেলা থেকেই লন্ডনে বড় হয়েছে?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।
-জ্বি না।আপামনি,স্কুলের পরীক্ষা শেষ করে দাদুর সাথে চলে গেলেন লন্ডনে।তারপর আর এদিকে আসেনি।এখানে একা এসে কি করবে?কিন্তু আজ আসছে।গতকাল রাতেই আমাকে সব জানানো হয়েছে।সকাল থেকে পুরো বাড়ি পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখেছি।আপামনির ভালো লাগলেই হলো।
হাসনাত করিম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,সবকিছু ঠিক থাকলে কিছুক্ষণ পরই চলে আসার কথা।তাহলে বসে অপেক্ষা করি।
লোকটি বলল,আমি তাহলে একটু আসি।আপনার জন্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা করি।
নয়.
চোখ মেলে তাকালো এসআই আনিসুর রহমান।সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা মনে হচ্ছে তার।কোথায় শুয়ে আছে সে?মাথার পেছনের দিকে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছে।উঠে দাঁড়াবে সে শক্তি নেই।হঠাৎ তার মনে পড়ল,গতকাল রাতের কথা।ডিউটি থেকে ফিরে দুলাভাইকে কল করার মাঝে একটা শব্দ শুনতে পেল।তারপর সে শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে ভয়ঙ্কর সেই চেহারার মুখোমুখি।এখনও যেন সেই দৃশ্য ভাসছে চোখের সামনে।তবে এই ভেবে ভালো লাগছে,খুনি তাকে তাহলে খুন করেনি।কিন্তু খুন না করার কারন কি?শুধুই কি ভয় দেখানোর জন্য এসেছিল?এসআই আনিসুর রহমান উঠে বসলো।শরীর প্রচন্ড দূর্বল।গতকাল রাতে এখানেই দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়েছিল।তারপর আর কিছু মনে নেই।মাথার পেছনে হাত দিয়ে বুঝতে পারল,কিছু একটা দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।পেছনের দিকে রক্ত জমাট হয়ে গেছে।দেখতে পেল,পাশেই মোবাইল পড়ে আছে।দুলাভাই এর নাম্বার থেকে ত্রিশটার উপরে কল এসেছে।আর থানা থেকে এসেছে আরও বেশি।হামাগড়ি দিয়ে কোনোমতে সোফায় এসে বসলো এসআই আনিসুর রহমান।ফোনে একটা নাম্বারে কল করে অপেক্ষা করতে লাগল।রিসিভ করতেই বলল,হ্যাঁ,হামিদ সাহেব?
কনস্টেবল হামিদ বলল,স্যার,আপনি কোথায়?সকাল থেকে এতবার ফোন করছি।ধরছেন না কেন?এদিকে বড় স্যার তো আপনাকে খুঁজছে।
-আমার শরীর প্রচন্ড খারাপ।জ্ঞান ছিল না গতরাত থেকে।এইমাত্র চোখ মেলে তাকালাম।আপনি একটু ব্যাপারটা স্যারকে বুঝিয়ে বলেন।আশা করি,তিনি বুঝবেন।
-আচ্ছা স্যার,আমি বলছি।আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন।
এসআই আনিসুর রহমান সোফায় গা এলিয়ে দিল।পাশ থেকে একটা তোয়ালে নিয়ে মাথার পেছনের অংশ চেপে ধরেছে এমন সময়ে টেবিলের উপরে একটা কাগজে চোখ পড়ল।কাগজটা খুলে দেখতে পেল,সেখানে টাইপ করা হাতের লেখা।লেখা রয়েছে-"আপনাকে ভয় দেখানোর জন্য আসিনি।এসেছি অন্য কারনে এবং সেটা সঠিক সময়ে জানিয়ে দেয়া হবে।"
বাসার ভেতরে ঢুকে অচেনা একজনকে দেখে চমকে উঠল মুনিরা।ভাবছে,পরিচিত বলে তো মনে হচ্ছে না।কখনো কথাও হয়নি।শাহেদ ভাইয়ার পরিচিত নাকি?কিন্তু ভাইয়া তো আমাকে কিছু বলেনি।মাত্রই বাসায় এসে কি ঝামেলায় পড়লাম?মুনিরা বলল,আপনি কি আমার দাদুর পরিচিত কেউ?
হাসনাত করিম অপরিচিত কন্ঠ শুনে সেদিকে তাকালেন।একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কাঁধে ব্যাগ ঝুলছে।সঙ্গে হাতে বড় ব্যাগ।এই হয়তো মুনিরা।বললেন,তুমি কি মুনিরা?
-হ্যাঁ,আমি মুনিরা।আপনি কে বলুন তো?আগে কখনো আপনাকে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না,বলল মুনিরা।
-তুমি একটু বসো।তোমার সাথে জরুরি কথা আছে।আমি হাসনাত করিম।একটা দরকারে তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি।
মুনিরা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,আমি মাত্রই এসেছি।খুব ক্লান্ত।এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।আপনি কাল আসুন।আমরা কাল কথা বলবো।
-শুনো,এখন সময় নেই।এর সাথে অনেকগুলো জীবন জড়িয়ে আছে।
-অনেকগুলো জীবন!অবাক হয়ে বলল মুনিরা।কথার সাথে জীবনের কি সম্পর্ক?আচ্ছা বলুন,কি বলবেন?
-তুমি কি ইরা নামের কাউকে চিনো?কলেজে পড়ে সে।
-হ্যাঁ,আমার বান্ধবী।পরশু দিন রাতে কথা হয়েছিল ওর সাথে।কিন্তু আচমকা ফোন কেটে দিল।তারপর আর খবর পাইনি।
-মুনিরা,নিজেকে শান্ত করো।ইরা সেদিন রাতেই মারা গেছে।খুন করা হয়েছে তাকে।
-কি!ইরাকে খুন করা হয়েছে?কিন্তু কে খুন করেছে?
-এখনও বুঝতে পারছি না।তবে কি জানো,চারটা মেয়ে অদ্ভুতভাবে খুন হয়েছে।কিন্তু মনে হবে,আত্মহত্যা করেছে।এই চারটি মেয়ের মাঝে আমার নিজের মেয়েও রয়েছে।তুমি কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবে?
মুনিরা কাঁদছে।চোখ মুছে বলল,বলুন।আমি আপনাকে সব সাহায্য করতে রাজি আছি।
-তোমার সাথে ইরার যখন কথা বলছিল,তখন কি সে কিছু নিয়ে ভয় পেয়েছিল?মানে কিছু দেখে চিৎকার দিয়েছিল?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।
-না,চিৎকার দেয়নি।তবে হঠাৎ মাঝে কথা বন্ধ করে বলছিল,কে ওখানে?সম্ভবত দারোয়ানকে ব্যাপারটা বলেছিল তখন।তারপর আমাকে বলল,একটা ছেলে নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।কিছুক্ষণ পরই আমি গোঙানোর আওয়াজ শুনতে পাই।আর তারপরই লাইন কেটে যায়।
-তুমি তুলি আর আনিকা নামে কাউকে চিনো?কখনো কথা হয়েছিল দুজনের সাথে?
মুনিরা বলল,এই নামে তো কাউকে চিনি না।এই দুজন কে?
-তুলি আমার মেয়ে।আর তুলির বান্ধবী আনিকা।ইরা তো তোমার বান্ধবী।সাবিহা কে?
মুনিরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,আমাদের স্কুলে একবার প্রতিযোগিতা হয়েছিল।তখন সাবিহা নামের একটি মেয়ের সাথে পরিচিত হই।কিছুদিন কথাও হয়।কিন্তু লন্ডনে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ হয়নি।সেও কি খুন হয়েছে?
হাসনাত করিম কি যেন ভাবছিলেন।গম্ভীর হয়ে বললেন,হুম,সাবিহাও খুন হয়েছে।তোমরা কোন স্কুলে পড়েছিলে?
মুনিরা বলল,খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুলে।ভেবেছিলাম,এখানে এসে ইরার সঙ্গে মজা করবো।দুজনে ঘুরবো।কিন্তু এমন একটা কান্ড হবে কে জানতো?
হাসনাত করিম উঠে দাঁড়ালেন।বললেন,নিয়তি হয়তো তাই ছিল।আমি আসছি তাহলে।খুব শীঘ্রই খুনীকে ধরবো।
মুনিরার বাসা থেকে বের হতেই হাসনাত করিমের মোবাইলে শ্যালক আনিসের নাম্বার থেকে কল আসল।রিসিভ করে বললেন,এই তুই কোথায়?এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ হয়?গতকাল রাতে ফোন করার কথা ছিল।আমি পরে ঘুমিয়ে গিয়েছি।সকালে অন্তত সঠিক সময়ে আসতে পারতি।তাও সম্ভব না হলে,একটু জানাবি তো।
-দুলাভাই,গতকাল রাতে ওই খুনী আমার বাসায় এসেছিল।তছনছ করে গেছে সবকিছু।আমি যে বেঁচে রয়েছি এই অনেক,বলল এসআই আনিসুর রহমান।
-কি বলিস!তোর কিছু হয়নি তো?তা সেটা আগে বলবি তো।
-মাথার পেছনে আঘাত করেছে শক্ত কিছু দিয়ে।একটু আগে জ্ঞান ফিরেছে।তবে একটা কাগজে লিখে গেছে-"আমাকে খুন করতে আসেনি।এসেছে অন্য কারনে এবং সেটা পরে বলবে।"
-খুন করতে আসেনি!তা খুনীর চেহারা দেখেছিস?নাকি মুখোশ পড়ে এসেছিল?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।
-অন্ধকারে যা ভয়ানক চেহারা,আমি আর দেখতে চাইনা।ভয়ে তখন হাত থেকে মোবাইলও পড়ে গিয়েছিল।কি কুৎসিত হাসি!
-তাহলে ডাঃ রফিকের কথাই সত্যই।খুনীর এমন চেহারা দেখেই সাবিহা আর ইরার চোখদুটো এমন হয়েছিল।কিন্তু আনিকা আর তুলির হয়নি কেন?তবে কি জানিস,সাবিহা,ইরা,মুনিরা একই স্কুলে পড়েছিল।কিন্তু সাবিহার সাথে এদের দুজনের যোগাযোগ ছিল না।এমনকি আনিকা আর তুলির সাথে তিনজনের কখনো কথা হয়নি।তাহলে আনিকা আর তুলিকে খুন করলো কেন?ধরনটাও আলাদা।
-দুলাভাই,সবকিছুর উত্তর ওই ভয়ানক চেহারার খুনীই বলতে পারবে।তাকে ধরতে পারলে সব রহস্যের সমাধান হবে।
হাসনাত করিম দেখতে পেলেন,ফারহান এদিকেই আসছে।ওর সঙ্গে একটি ছেলে।শ্যালক আনিসকে বললেন,তুই একটু ফোনটা রাখ।আর শোন,নিজের খেয়াল রাখবি।পরে কথা হবে।হাসনাত করিম এগিয়ে গিয়ে বললেন,আরে ফারহান তুমি এখানে?সঙ্গে দেখছি আরও একজন আছে।
-আমি একটু ওইদিকে গিয়েছিলাম।আমার সাথে এই ছেলেটার নাম রাকিব।বেশ ভালো ছেলে।এদিকে একটা নতুন স্কুল খুলেছে,ফ্রি তে শিখানো হয়।রাকিবকে সেখানে ভর্তি করে দিলাম।একদম ফাঁকিবাজ।সারাদিন রাস্তায় ঘুরে।
হাসনাত করিম বললেন,বেশ ভালো।এই ছেলেটাকে কোথায় যেন দেখেছি।হাসনাত করিমের মনে পড়ল,আনিকাদের বাসায় যাওয়ার সময় গাড়ির ভেতরে একটি মেয়ে ভয়ে কাঁদছিল।সেখানে এই ছেলেটি দাঁড়িয়ে ছিল।মুখের একটি অংশ পোঁড়া।বিশ টাকার একটা নোটও দিয়েছিলেন তিনি।বললেন,হুম মনে পড়েছে।রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল।
ফারহান বলল,সারাদিন রাস্তায় থাকে।এজনই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলাম।এবার বুঝবে মজা।
হাসনাত করিম দুজনকে সঙ্গে নিয়ে একটি হোটেলে ঢুকলেন।নিরিবিলি দেখে একটা টেবিলে বসে বললেন,বলো কি খাবে দুজনে?
-আমি কিছু খাবো না।রাকিব,কি খাবি বল,বলল ফারহান।
রাকিব হাত দিয়ে রুটির দিকে ইশারা করল।
হাসনাত করিম বললেন,ফারহান,হাত-মুখ ধুয়ে আসো।সবাই একসঙ্গে তাহলে রুটি নিয়ে খাওয়া শুরু করি।
-না,আমি একটু আগে টিউবওয়েল থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসেছি।আমার লাগবে না।
-ঠিক আছে,আমি তাহলে খাবার দিতে বলি।তিনি রাকিবের দিকে তাকিয়ে বললেন,তা,রাকিব বড় হবে কখন?এতটুকু শরীরে শক্তি আছে তো?
রাকিব বলল,হুম আছে।
হাসনাত করিম ফারহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,ওর মুখের এই অবস্থা কি করে?
ফারহান বলল,গরম কি যেন পড়েছিল।ডাক্তার বলেছে,আগের অবস্থায় আসা সম্ভব না।তবে রোদে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে দেখার মতো অবস্থা হয়।
হাসনাত করিম মাথা নাড়লেন।বাম হাতে রাকিবের মুখে হাত দিয়ে বললেন,এটা কিসের?
-ওইযে তাড়াতাড়ি শুকানোর জন্য।এত করে বলি,রোদে না বের হতে।তারপরও কে কার কথা শুনে?
হাসনাত করিম বললেন,ঠিক আছে।খাওয়া শুরু করি।আমাকে আবার এক জায়গায় যেতে হবে।
ফারহান আর রাকিব চলে যেতেই হাসনাত করিম একটা গাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালেন।পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বামহাত সেখানে মুছে ফেললেন।তারপর ডাঃ রফিকের নাম্বারে কল দিলেন।রিসিভ করতেই বললেন,ডাঃ সাহেব,আমি হাসনাত করিম বলছি।
-কি খবর আপনার?হঠাৎ এই সময়ে?আবার নতুন কেউ আত্মহত্যা করেছে,বললেন ডাঃ রফিক।
-ওই কথা মুখেও আনবেন না।গতকাল রাতেই আপনার বন্ধু আনিসেরও সেই খুনীর হাতের শিকার হতে গিয়েও প্রাণে বেঁচে গেছে।এখন মাথায় আঘাত পেয়েছে।
-বলেন কি,শেষে আনিসও তাহলে!এই খুনী তো সাংঘাতিক দেখছি।
-তবে আপনি যা বলেছিলেন,তা একদম সত্যিই।খুনীর চেহারা ভয়ঙ্কর দেখতে।অন্ধকারে পিলে চমকে দেয়ার মতো চেহারা।আপনাকে একটা কাজ করে দিতে হবে,বললেন হাসনাত করিম।
-কি কাজ?জিজ্ঞেস করলেন ডাঃ রফিক।
-ইরার কাপড়ের থেকে যেই ওষধের নমুনা সংগ্রহ করেছেন তার রিপোর্ট আপনার সঙ্গেই রয়েছে।এখন আমি আপনাকে একটা ঔষধ পাঠাবো।ফরেনসিকে দেখবেন তো,ওষধ দুটো এক কিনা?
ডাঃ রফিক বললেন,ঠিক আছে।আমি হাসপাতালেই রয়েছি।আপনি সেটা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
ঘুম ভেঙে গেল ফারহানের।এখন কয়টা বাজে?এই সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা নয়।পাশে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠল ফারহান।মিলি পাশে নেই।কোথায় গেছে মিলি?ফারহান উঠে লাইট জ্বালিয়ে মিলি বলে ডাক দিল।কিন্তু সাড়াশব্দ নেই।বাথরুমের দিকে গিয়ে দেখে,দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।তার মানে বাথরুমে যায়নি।তাহলে কোথায় গেছে?হঠাৎ চোখ পড়ল গেইটের দিকে।গেইট খোলা।তাহলে মিলি বাইরে গেছে?রাত তো অনেক।এত রাতে বাইরে কি করবে?
ফারহান আর দাঁড়িয়ে না থেকে শার্ট পড়ে বেরিয়ে পড়ল বাইরে।কিন্তু যাবে কোনদিকে?রাস্তা চলে গেছে দু'দিকে।অবশ্য প্রথম রাস্তার শেষে আর কোনো পথ নেই।একটু পরেই সেখানে গিয়ে উল্টো ফিরতে হবে।আর বাকি আছে একটি রাস্তা।ফারহান সে রাস্তা ধরে দ্রুত হাঁটছে।পুরো রাস্তা ফাঁকা।কুকুরগুলো শুনশান রাস্তা ধরে হাঁটছে।ফারহানকে এতরাতে হাঁটতে দেখে পিছু নিয়েছে।মাঝেমাঝে ঘেউঘেউ শব্দে ডাকছে।ফারহানের সেদিকে খেয়াল নেই।সে আশপাশে তাকিয়ে মিলিকে খুঁজছে।এতরাতে কখনো তো বের হয়না।আর বের হয়ে যাবে কোথায়?ফারহানের শরীর ঘামে ভিজতে শুরু করেছে।সে যেন এখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়বে।কি জবাব দিবে নিজেকে?একটা মাত্র বোন।কোথায় হারিয়ে গেল মিলি।ফারহানের ভীষণ কান্না আসছে।তাহলে কি মিলির কিছু হয়েছে?
.........চলবে..........
written by Habib Khan Hridoy

إرسال تعليق