এক.
বাসার ভেতর থেকে অপরিচিত পুরুষ কন্ঠ শুনে ভীষণভাবে ধাক্কা খেল সাদমান।যেন ঝড়ের গতির তান্ডবে ছুঁটে আসা গাছপালাগুলো একে একে আঘাত করছে সাদমানের শরীরে।আঘাতের তীব্রতায় নিজেকে সামলে রাখা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।নিজের চেয়ে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করা বিয়ে করা স্ত্রী কিনা পরপুরুষের সাথে বাসায় বসে হাসাহাসি করছে তা নিজের কানে শোনার চেয়ে আজ অফিস থেকে ফেরার পথে বাসের ধাক্কায় মৃত্যু হলেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভালো ছিল।কি সব নোংরা নোংরা শব্দে কথা বলছে,কানে ভেসে আসতেই ঘৃণায় চোখ থেকে পানি পড়ল সাদমানের।ভালোবাসার এই প্রতিদান দিবে কখনো কল্পনায়ও ভাবেনি সে।কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে সিঁড়িতে বসে পড়ল সাদমান।ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করতেই হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল সে।প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে বোতল নিয়ে দৌঁড়ে এসে ফারহানা মুচকি হেসে বলে,বেশি করে পানি খাবে কিন্তু।সাদমান ভাবছে,তাহলে এসব মিথ্যে ছিল?বামহাতে বোতল ধরে ডানহাতে মাথায় কিছুটা পানির ঝাঁপটা দিয়ে মাথা নিঁচু করে বসে আছে।ছোটবেলা থেকেই চিন্তা বাড়লে মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে যায় সাদমানের।পানির ঝাঁপটা দেয়াতে এখন কিছুটা কমে এসেছে।নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে সিড়ি থেকে উঠে দাঁড়ালো সাদমান।কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন শরীরের সবটুকু রস চুষে নিয়েছে।এতটুকু শক্তি নেই হাঁটার।কলিং-বেলে হাত রাখতেই ভেতর থেকে কথা বলার আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেল।হাসাহাসি কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে মুহূর্তে!আরও কয়েকবার কলিং-বেলে চাপ দেয়ার পর ভেতর থেকে ফারহানার কন্ঠ শুনতে পেল সাদমান,দাঁড়াও!আসছি আমি।
অথচ গতকালও কলিং-বেলে হাত রাখার সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে বেরিয়ে আসতো ফারহানা।যেন দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল তার জন্য।
-কি ব্যাপার আজ এত তাড়াতাড়ি অফিস ছুটি?তোমার কি শরীর খারাপ,দরজা খুলে বলল ফারহানা।
ফারহানাকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে।শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে দাঁড়িয়ে আছে।অবশ্য পরপুরুষের সঙ্গে এতক্ষন ঢলাঢলি করলে ক্লান্ত হওয়াটা স্বাভাবিক।হাতে থাকা ব্যাগ ফারহানার দিকে বাড়িয়ে সাদমান বলল,এমনি মাথাটা একটু ধরেছে।তোমাকে এত ক্লান্ত লাগছে!দরজা খুলতেও বেশ সময় লাগল?
ফারহানা দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে ভেতরে যেতে যেতে বলল,রান্নাঘরে কাজ করছিলাম।একটু লেবুর শরবত দিবো তোমাকে?জিজ্ঞেস করল ফারহানা।
জুতা খুলে বাসার ভেতরে ঢুকে একটা জিনিসের গন্ধ খুঁজছে সাদমান।নিকোটিনের তাজা গন্ধ।পুরুষ মানুষ এই নিকোটিন ছাড়া চলতে পারে না।মাস চারেক আগে চার রুমের এই বিশাল ফ্ল্যাট কিনেছিল সাদমান।দুটি বেডরুম,একটি ডাইনিং,অপরটি গেস্টরুম।পা থেকে মোজা না খুলে পুরো বাসা হেঁটে হেঁটে গন্ধটা খুঁজছে সে।কিন্তু খুবই চালাকির সঙ্গে সিগারেটের ঘ্রাণ সরিয়ে নেয়া হয়েছে।হতেও পারে,লোকটি সিগারেট খায় না।ফারহানা ব্যাগ হাতে নিয়ে ভেতরে চলে গেল।সাদমান কি মনে করে রান্নাঘরে ঢুকতেই দেখে,সবকিছু ঠিকঠাক।রান্নাঘরে কাজ করার কোনো চিহ্নই নেই।গ্যাসের চুলা বন্ধ রয়েছে।নিশি রান্নাঘরে কাজ করছিল এই মিথ্যাটা ধরা পড়ে গেছে।বাকি আছে লোকটি কে?বাসা থেকে বের হওয়ার দরজা একটি।আর চলে যাওয়ার পথ নেই।তবে কি খাটের নিচে লুকিয়ে আছে?সাদমান আর দেরি না করে নিজের বেডরুমে এসে মাথা নিঁচু করে খাটের নিচে চোখ রাখলো।নাহ,কেউ নেই।বাকি আছে পশ্চিমদিকের রুম।নিচ থেকে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে পশ্চিমদিকে হাঁটতে শুরু করল।সোজা গিয়ে ডানপাশে ঢুকে দেখে ফারহানা বসে আছে।সাদমান ভাবছে,তবে কি এখানেই লুকিয়ে আছে?সন্দেহ না করার জন্যই কি খাটের উপর বসে আছে ফারহানা?
সাদমান ফারহানার দিকে তাকিয়ে কুৎসিতভাবে হাসতে হাসতে বলল,লুকিয়ে কোথায় যাবে?ধরা তো পড়বেই আমার হাতে।সাদমান আর দেরি না করে মাথা নিচু করে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।কিন্তু না,এখানেও কেউ নেই।
ফারহানা সাদমানের এমন আচরনে বেশ চমকে উঠল।বিছানা থেকে দাঁড়িয়ে কোমড়ে হাত রেখে বলল,এই তোমার কি হয়েছে?অফিস থেকে আসার পর ফ্রেশ না হয়ে এমন চিৎকার করে কি খুঁজছো?ভূতে ধরেছো নাকি?
সাদমান আমতাআমতা করে বলল,না,তেমন কিছু না।আমার একটা ফাইল খুঁজছি।খুবই দরকারি ফাইল।তুমি শরবত না বানিয়ে এখানে বসে কি ভাবছো?জিজ্ঞেস করল সাদমান।
-একটু ক্লান্ত লাগছে।তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো।আমি শরবত নিয়ে আসছি,এই বলে ফারহানা রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
ফারহানার মুখ থেকে ক্লান্তের কথা শুনে সন্দেহ আরও দানা বাঁধতে শুরু করল সাদমানের মনে।বাসায় মানুষ মাত্র দুইজন।এত কাজ থাকার কথা নয়।তাছাড়া স্পষ্ট বাইরে থেকে পুরুষের কন্ঠ শুনতে পেয়েছে সে।কিন্তু লোকটি কি উধাও হয়ে গিয়েছে নাকি?দুই বেডরুম ছাড়া বাসার লুকানোর জায়গা কোথায়।তাহলে বাসা থেকে বের হয়ে গেল কিভাবে?ভৌতিক কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে কি তা বের করতেই হবে।
সাদমান রুম থেকে বেরিয়ে পাশের রুমে ঢুকে বিছানায় বসে পড়ল।গামে ভেজা শার্ট খুলতে খুলতে হঠাৎ আলমারিতে চোখ পড়ল।আলমারির একটি অংশ কিছুটা খোলা।বিছানা থেকে উঠে আলমারি খুলতেই সাদমানের মনে সন্দেহ আরও তীব্র হলো।শার্টের অংশ অগোছালো।তাহলে কি ফারহানা আমার শার্ট অন্য কাউকে পড়তে দিয়েছে?ভাবতেই বাইরে থেকে ফারহানার কন্ঠ শুনতে পেল সাদমান,এই শুনছো,টেবিলে খাবার দিয়েছি,খেতে এসো তাড়াতাড়ি।
সাদমান শার্ট রেখে রুম থেকে বেরিয়ে আসল।টেবিলে ফারহানা বসে আছে।কেমন যেন চিন্তিত মনে হচ্ছে ওকে।সাদমান টেবিলে বসতেই ফারহানা বলল,তোমার তো কিছুই ভালো ঠেকছে না।বাসায় আসার পর থেকেই কেমন যেন গোয়েন্দার মতো কিছু খুঁজছো।আমাকে দেখতে পেয়ে আবার চোরের মতো করছো।কি হয়েছে খুলে বলবে?
সাদমান ভাতের প্লেটে হাত দিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবছে।ফারহানার কথায় যেন কল্পনায় ছেদ পড়লো।ফারহানার দিকে তাকিয়ে বলল,আচ্ছা ফারহানা,তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো?
সাদমানের কথা শুনে ফারহানা খিলখিল করে হেসে উঠল।চেয়ার ছেড়ে উঠে সাদমানের পাশে এসে কাঁধে মাথা রেখে বলল,হঠাৎ এই কথা?আমি কতটুকু ভালোবাসি সেটা বলতে পারবো না।ভালোবাসা তো পরিমাপ করা যায় না।তবে হ্যাঁ,কখনো ছেড়ে চলে গেলে সহ্য করতে পারবো না।
সাদমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।কিছু না বলে মাথা নিচু করে ভাত খেতে শুরু করল।সাদমানের কাছে এসবই এখন অভিনয় মনে হচ্ছে।ফারহানা স্বামীর এমন ব্যবহারে কিছুটা মর্মাহত হয়েছে বোধহয়।আশা করেছিল,সাদমান ওর মাথায় হাত দিয়ে কিছু অন্তত বলবে।ফারহানা নিঃশব্দে চেয়ারে গিয়ে বসল।সাদমানের দিকে একবার তাকিয়ে খেতে শুরু করলো মাথা নিঁচু করে।
সাদমান বিছানায় শুয়ে আছে।পাশে ফারহানার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছে।নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে গাঢ় হতেই বুঝতে পারলো ফারহানা ঘুমিয়ে পড়েছে।সাদমান চোখ বন্ধ করতেই মনে পড়লো চার বছর আগের কথা।সবে চাকরি পেয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল।মা-বাবা ঝেঁকে বসলো বিয়ে করার জন্য।কিন্তু কিছুতেই মন বসছিল না।শেষে শুনতে পেল মেয়েটি খুবই ভালো।কিন্তু আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়াতে বিয়ে হচ্ছে না।বাবা স্ট্রোক করে বাসায় প্যারালাইজড হয়ে পড়ে আছে।উঠতে বসতে মামীর খোঁটা শুনছে।একসময় বাধ্য হয়ে সাদমান যায় ফারহানাকে দেখতে।মেয়েটির নামের সাথে চেহারা বেশ মিল আছে।একটা স্নিগ্ধতা মাখা মুখ নিয়ে বসেছিল সাদমানের সামনে।সাদমান যেন হারিয়ে গিয়েছিল কোথাও।একসময় বিয়ে হয়ে যায় দুজনের।দিন যত পার হতে লাগল ফারহানা যেন ওর পুরো পৃথিবী হয়ে উঠল।ফারহানাকে ছাড়া যেন শূন্য পৃথিবী।হঠাৎ চোখ খুলে শোয়া থেকে বিছানায় উঠে বসলো সাদমান।মনে পড়লো,দরজা দিয়ে পালাতে না পারলে আরও একটি রাস্তা আছে বাইরে পালিয়ে যাওয়ার।সাদমান একবার ফারহানার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল মেয়েটি ঘুমাচ্ছে।কি সুন্দর লাগছে!সে মুগ্ধ হয়ে ফারহানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে।হঠাৎ বিকালের কথা মনে পড়তেই আকাশের কালো মেঘ যেন নেমে আসল সাদমানের মুখে।বিছানা থেকে উঠে ড্রয়ার খুলল সে।ড্রয়ার থেকে মাপার ফিতা বের করে হাতে নিল।ড্রয়ার বন্ধ করে ফারহানার দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
বারান্দার দরজা খুলল সাদমান।পুরো শহর স্তব্ধ হয়ে আছে।চারদিকে অন্ধকার।বারান্দায় টবের সারি সারি গাছ ঝুলছে।দক্ষিনা মৃদু বাতাসে টবগুলো ক্ষনে ক্ষনে দুলে উঠছে আনমনে।ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে ফারহানা রোজ গাছগুলোতে পানি দেয়।বারান্দায় ছোট ছোট ছিদ্র দেয়া আছে।গাছের টবগুলো সেখানে সুন্দরভাবে সেটে দেয়া হয়েছে।তবে বারান্দার একদম কোণায় খুব বড় করে চারকোণা বাক্সের মত বেশ বড় রকম ফাঁকা পড়ে আছে।যতটুকু মনে পড়ে,বাড়ি তৈরির সময়ে ভুলবশত এইদিকটা প্রলেপ দেয়া হয়নি।সাদমান টবগুলো পেরিয়ে খালি অংশটার সামনে এসে দাঁড়ালো।হাতের ফিতাটুকু নিয়ে ফাঁকা অংশ মেপে সাদমান বেশ চমকে উঠল।দেখতে পেল ২৮ ইঞ্চির মতো ফাঁকা।একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বুকের অংশ প্রায় ৩৫ ইঞ্চির উপরে।সে হিসেবে এই ফাঁকা অংশ দিয়ে একটা ছোট বাচ্চা ছাড়া কেউ ভালো করে ঢুকতে বা বের হতে পারবে না।তাহলে লোকটি বাসা থেকে পালিয়ে গেল কিভাবে?বাসায় এমন কোনো জায়গা বাদ পড়েনি যেখানে চোখ দেয়া হয়নি।তবে কি ফারহানা ভৌতিক কারো সঙ্গে কথা বলেছে?রহস্য যেন ক্রমশ আরও বিস্তর ছড়িয়ে পড়ছে।ফারহানা কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে এইটা যেমন সত্য,তেমনি বাসা থেকে সামনের দরজা ছাড়া আর বের হওয়া সম্ভব নয়।তাহলে একটা জলজ্যান্ত মানুষ বাসা থেকে উধাও হয়ে গেল কিভাবে?এই রহস্য আমাকে বের করতেই হবে।নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসার মানুষ এভাবে আমার সাথে বেইমানি করতে পারে না।আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।যদি সত্যিই তাই হয়,তবে নিজের হাতেই শেষ করবো ফারহানাকে।সাদমানের যতদূর মনে পড়ে,এই শহরে ফারহানার একটা বান্ধবী আছে।নাম বলেছিল ইরা।তবে যোগাযোগ হয়না অনেকদিন।কাল ওর সাথে কথা বলতে হবে।কাল সকাল থেকেই আমার গন্তব্য অচেনা পুরুষ কে ছিল?
.........চলবে.......
written by Habib Khan Hridoy

إرسال تعليق