And do not say about those who are killed in the way of Allah, “They are dead.”
Rather, they are alive, but you perceive [it] not.
অধ্যায় ৮
বাংলাদেশ
‘মামনি, দ্যাখো, দ্যাখো, টিভিতে পাপাকে দেখাচ্ছে…’ শিশুসুলভ উচ্ছাস ঝরে পরে টিয়ারার কন্ঠে; উত্তেজনায় সে কখন যে একেবারে টিভির সামনে গিয়ে দাড়িয়েছে সেই হুশ নেই তার।
মুখে কিছু না বললেও টিভি স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে পারছে না মোনা। মালির রাজধানী বামাকোতে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে নিহত বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের কফিনগুলো পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা। প্রত্যেকটি কফিন জাতিসংঘের আকাশী নীল রঙা পতাকা দিয়ে মোড়ানো। শান্তিরক্ষীদের চৌকস ড্রিল শেষে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি (এসআরএসজি) কফিনের গায়ে পুস্পস্তবক অর্পন করলেন। তারপর ফোর্স কমান্ডার এসে প্রথমে ফুল দিয়ে এক পা পিছিয়ে গিয়ে দীর্ঘ স্যলুট দিলেন। সব শেষে কফিনের পাশে দাঁড়ানো দেশি বিদেশী অফিসারদের মাঝে সাইরাসকে আরেকবার দেখা গেল।
***
ভিডিওটি শেষ হবার আগে রিপোর্টারের শেষ কথাগুলো স্পষ্ট শোনা গেল, ‘…শান্তিরক্ষীদের মরদেহ আগামীকাল বেলা দশটা নাগাদ দেশে এসে পৌছাবে…’
আর শুনতে পারল না মেহনাজ, সোফায় তার পাশেই শোকে পাথর হয়ে বসে থাকা শাশুড়ির হাতে নিজের গাল চেপে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পরল সে। রাশেদ আর নেই আর কাল তার মরদেহ দেশে ফিরছে, এই বাস্তবতা সে মেনে নিতে পারছেন না কিছুতেই!
অধ্যায় ৯
মালি
চোখে মুখে কড়া সূর্যের আলো অনুভব করল রাশেদ।
চোখ মেলে মাথার দুপাশে সবুট কিছু পা দেখতে পেলো সে; বুটগুলো সব দীর্ঘ ব্যবহারে জীর্ন আর জায়গায় জায়গায় একাধিক তালি দেয়া।
দৃষ্টি প্রসারিত করতে করতেই সে পিঠের নিচে ঝাঁকুনি টের পেলো; সঙ্গে গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন আর তেল পোড়া গন্ধ। বুঝতে পারল, সম্ভবত একটি পিক আপের মেঝেতে শুইয়ে রাখা হয়েছে ওকে।
জিম্মি হিসেবে ওকে বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা করছে ওরা, সেটা বুঝতে পারার পর থেকে রাশেদ নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিল। বয়স্ক সেই মহিলাটি সম্ভবত স্থানীয় কবিরাজ গোছের কেউই হবে। পায়ে, পাঁজরে আর কাঁধে অজানা কোনো এক পাতা বেটে মাখিয়ে দিয়েছিল সে। হাটুর নিচে চার পাঁচটা খেজুরের ডাল দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেয়ার পর থেকে সে বাম পায়েও সারা পাচ্ছে। তবে নড়তে গেলেই পাঁজরে প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে।
সকালে কঠিন চেহারার দুজন তুয়ারেগ যুবক মিলে তাকে বিছানা থেকে জোর করে উঠিয়ে আনবার সময় এই পাঁজরের ব্যথায়ই সে আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। এখন বোঝা যাচ্ছে যে, সংজ্ঞাহীন অবস্থায়ই তাকে পিক আপে তুলে পিক আপের মেঝেতে শুইয়ে দেয়া হয়েছিল।হঠাৎ করেই প্রশ্নটা রাশেদের মাথায় খেলে গেল; ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওরা? কেনই বা নিয়ে যাচ্ছে?
অধ্যায় ১০
বাশার বিমানঘাঁটি, ঢাকা সেনানিবাস, বাংলাদেশ
রানওয়ে থেকে একের পর এক হেলিকপ্টার তিনটিকে পাঁচটি ভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উড়ে যেতে দেখল মেজর সাইরাস। সিসির সাথে সেই রাতে কথা বলার পরপরই ক্যাপ্টেন রাশেদের মৃত্যুর সংবাদের ব্যাপারে সংশোধনী দেয়া হয়েছেঃ
গত ১১ জুলাই ২০১৮ তারিখে আফ্রিকার মালিতে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে প্রাথমিকভাবে ছয় বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছিল বলে ধারনা করা হলেও পরে অধিকতর তদন্তে প্রতীয়মান যে, অন্তত একজন শান্তিরক্ষী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। সামরিক পরিভাষায় তাকে ‘মিসিং ইন একশন’ বলা হচ্ছে। নিখোঁজ শান্তিরক্ষীর নাম ক্যাপ্টেন রাশেদ। তিনি মালিতে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের দোভাষী হিসেবে কাজ করতেন। ক্যাপ্টেন রাশেদকে উদ্ধারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা।
গতকাল থেকেই পাঁচটা কফিনের সাথে আছে সে। সকালে মালিতে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ডেপুটি ফোর্স কমান্ডারের উপস্থিতিতে গাও বেইজ ক্যাম্পে জানাজা শেষে কফিনসহ হেলিকপ্টারে চেপে রাজধানী বামাকো বিমানবন্দরে পৌছে তারা। সেখানে এসআরএসজি এবং ফোর্স কমান্ডারের উপস্থিতিতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ফিউনারেল প্যারেড শেষে টার্কিশ এয়ারের এক ফ্লাইটে ইস্তাম্বুল হয়ে ঢাকায় পৌছেছে আজ সকালে।
এরপর সকল বাহিনী প্রধানের উপস্থিতিতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সামরিক মর্যাদায় নিহতদের প্রতি সম্মান জানাবার পর জানাজা শেষে কফিনগুলো হেলিকপ্টারে করে নিজ নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকের কবরের পাশে সেনাবাহিনীর একটি করে ছোট দল অপেক্ষায় আছে। মৃতদেহ পৌছুবার পর যথাযথ ড্রিল শেষে তাদের সমাহিত করে তারা নিজ নিজ সেনানিবাসে ফিরে যাবে।
সাইরাসের খুব ইচ্ছে ছিল নিজ হাতে প্রত্যেককে কবরে নামাবার। কিন্তু এই মুহুর্তে তারচাইতেও জরুরী একটি কাজ তাকে করতে হবে। বাশার বিমানঘাঁটির পার্কিং এ মোনা তার অপেক্ষায় আছে।
***
মেহনাজ এক আজব পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে!
পরশু দিন সকালে রাশেদের মৃত্যু সংবাদ জানতে পেরেছে ওরা। তারপর কাল আবার আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকেই ফোন করে জানিয়েছে, রাশেদ বেঁচে আছে, তবে নিখোঁজ। রাশেদ মারা গেছে আর রাশেদ নিখোঁজ, ব্যাপার দুটোর মধ্যে আকাশ পাতালের ফারাক। সম্ভবত ওদের খুশীই হবার কথা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, রাশেদ মারা গেছে শোনার পর যতটা ধাক্কা আর কষ্ট তারা পেয়েছিল, রাশেদ নিখোঁজ জানার পর উৎকণ্ঠার মাত্রা যেন বহুগুনে বেড়ে গেছে। আত্মীয় স্বজনেরা সবাই ইতোমধ্যে এগিয়ে এসেছে। সবাই যথাসাধ্য চেষ্টা করছে তাকে আর তার শাশুরীকে সান্তনা দিতে। কিন্তু রাহেলা বেগমের কান্না থামছে না। মেহনাজ নিজেও দুদিন ধরে মুখে কিছুই তুলতে পারেনি।
মেহনাজের কষ্টটা অদ্ভুত! ঠিক কতটা কষ্ট তার পাওয়া উচিত কিংবা স্বামী হারাবার কষ্ট ঠিক কতটা তীব্র হবার কথা, তা তার জানা নেই। আসলে তার নিকটাত্মীয় কাউকেই সে মারা যেতে দেখেনি। তাই এই অনুভূতিটাই তার জন্য ভীষণ নতুন। কোনো এক অজানা কারনে কষ্টের পাশাপাশি খানিকটা লজ্জাও যেন সে পাচ্ছে; সেই সাথে অনিশ্চয়তার এক দুর্ভাবনাময় অনুভূতি!
রাশেদ ছুটি কাটিয়ে মালি ফিরে গেছে প্রায় সাড়ে চার মাস হতে চলল। ভাইবার, ইমো কিংবা হোয়াটস এপে কথা হতো, আর ভিডিও কল দিলে চেহারাও দেখা যেতো। গত কয়েকটা দিন ধরে শুধু মনে হচ্ছে এই বুঝি রাশেদের কল এলো। সাথে সাথেই সত্যটা নির্মমভাবে মনে পড়ে। তখনই দুচোখ বেয়ে কান্না আসে। রাশেদ এখন নিখোঁজ, বেঁচে ফিরবে কিনা সে নিশ্চয়তা নেই। মেহনাজ অবাক হয়ে ভাবে, রাশেদ সত্যি সত্যি মারা যাবার আগেই এই আজব পরিস্থিতিতে ওরা জেনে গেছে যে ও মারা গেলে ঠিক কতটা কষ্ট ওরা পেতে পারে!
***
সাইরাস জানেনা ঠিক কিভাবে তার শুরু করা উচিত। তার অনুরোধে একে একে অন্যসব আত্মীয় আর অতিথিরা ধীরে ধীরে ড্রয়িং রুম ত্যাগ করে চলে যাওয়া পর্যন্ত সে আর মোনা অপেক্ষা করল। সবশেষে শুধু রাহেলা বেগম আর মেহনাজ সোফায় বসা রইল। সবাই চলে যাবার পর মোনা তার পাশ থেকে উঠে গিয়ে রাহেলা বেগমের পাশে বসতেই সামনে বসা শোক ম্যুহমান চেহারা দুটো আরেকবার দেখে নিয়ে সাইরাস শুরু করল, ‘আন্টি এবং ভাবী, রাশেদ আমার সাথেই পেট্রোলে গিয়েছিল। অলরেডি আপনারা জানেন রাশেদ নিখোঁজ। আমি এখন আপনাদের যে তথ্যটি জানাবো তা জানানো কতোটা ঠিক হচ্ছে তা আমি জানিনা। তবে এটুকু জানি যে এই মুহুর্তে আপনাদের দোয়া রাশেদের সবচেয়ে বেশি দরকার।’
মুহুর্তেই কান্না জড়ানো বিলাপে ড্রয়িং রুমের পরিবেশ আবারো ভারি হয়ে উঠল। রাহেলা বেগম সম্ভবত ফের মূর্ছা গিয়ে মোনার কাঁধে ঢলে পরলেন। কিন্তু সাইরাস এই মুহুর্তে কথা বলা থামানো সমীচিন ভাবল না, পরে আবার কখন সব খুলে বলার সুযোগ পাবে, সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়।
‘ভাবী, রাশেদ মালির স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসীদের হাতে ধরা পড়েছে। কিন্তু আপাতত এই কথাটা আপনাকে গোপন রাখতে হবে।’
কথাটি শুনে শাশুরীকে সামলাতে ব্যস্ত মেহনাজের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পরল! এতোটা সহ্য করার ক্ষমতা সত্যি তার নেই। তার হাহাকার ভরা আর্তনাদে মোনা রীতিমত কেঁপে উঠল, তার গাল ভিজে উঠল নিরব কান্নার অশ্রুতে! কিন্তু সাইরাসের হাতে যেমন সময় নেই, তেমনি অন্য কোনো উপায়ও তার জানা নেই। কথা তাকে আজ এখনই শেষ করে উঠতে হবে। তাই সে সোফায় শক্ত হয়ে বসে থাকল সামনে শোকে আকুল দুই নারীর সামলে উঠবার অপেক্ষায়।
এখানকার কাজ শেষেই তাকে ছুটতে হবে বঙ্গভবনের পথে!

إرسال تعليق