আদর্শ হিন্দু হোটেল বই রিভিউ

 

রাণাঘাট রেল বাজারে বেচু চক্কত্তির হিন্দু হোটেল। সেখানে রসুয়ের কাজ করেন বামুন হাজারি ঠাকুর। ঠাকুরের হাতের রান্নার স্বাদ চমৎকার। আমিষ হোক কিংবা নিরামিষ যেকোনো পদ সে এমনভাবে রান্না করে একবার খেলে মুখে লেগে থাকে। মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়া সুখ্যাতি কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেখানকার বাবুরা হাজারি ঠাকুরের হাতের রান্না খেতে চলে আসেন রাণাঘাটের মতো জায়গায়। শুধু কলকাতা নয়, এদিকের রেলের যত যাত্রী হোটেলে খায় তারা শুধুমাত্র হাজারি ঠাকুরের জন্য বেচু চক্কত্তির হোটেলে আসে। রাতদিন এক করে স্বপ্নে বিভোর হয়ে নামমাত্র মাইনেয় কাজ করে যায় হাজারি ঠাকুর।

মনমুগ্ধকর রন্ধনশৈলী দিয়ে হোটেলের কাস্টমারদের খুশি করা গেলেও হোটেল মালিক সবসময় নাখোশ। সেই সাথে আছে হোটেলের ঝি পদ্ম'র লাঞ্ছনা। পদ্ম যেনো হোটেলের ঝি নয়, হর্তাকর্তা। সে হাজারি ঠাকুরকে দুচোখে সহ্য করতে পারে না। কখনো কাজের প্রশংসা তো করেই না, বরং উঠতে বসতে খোঁটা দেয়। প্রশংসার বদলে বঞ্চনা নিত্যদিনের সঙ্গী। হাজারি ঠাকুরের স্বপ্ন সে একদিন নিজের হোটেল দেবে। যেখানে লোক ঠকানো কোনো কারবার হবে না। সবাই আরাম আয়েশে তৃপ্তি সহকারে তাঁর হাতের রান্না খাবে। কিন্তু মাঝবয়সী হাজারি ঠাকুরের স্বপ্ন পূরণ হবে কিভাবে? সামান্য মাইনে দিয়ে হোটেল দেওয়ার অসম্ভব। তবুও হাজারি ঠাকুর থেমে থাকে না। সততা ও নিষ্ঠার সাথে পরিশ্রম করে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে অবিচল।


বাংলার অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর অনন্য সৃষ্টি 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে গ্রাম বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য্য। আবার কখনো অরণ্যের আদিমতম তাড়না। ব্যতিক্রমী এই সৃষ্টি তিনি শহুরে প্রেক্ষাপটে ফেঁদেছেন। যার পরতে ছড়িয়ে আছে খাবারের সরস বর্ণনা। হাজারি ঠাকুরের রান্নার জাদুকরী হাতের মতো বিভূতিভূষণের হাতে পরম মমতায় গড়ে উঠেছে 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হাজারি ঠাকুর। যে কাজ করে রাণাঘাট রেল বাজারের হিন্দু হোটেলে। গ্রামের মানুষ হাজারি শহরে কাজ করলেও শহুরে জীবনযাত্রায় তেমন অভ্যস্ত না। তাঁর ধ্যানজ্ঞান পুরোটাই রান্না ও হোটেল কেন্দ্রিক। রান্নাঘর ও হোটেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে যাঁর জগৎ। হোটেল মালিক বেচু চক্কত্তি ও ঝি পদ্মের লাঞ্ছনা হাজারির নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। যখন এদের দুর্ব্যবহারে প্রাণ বিষিয়ে ওঠে তখন সে চলে যায় চূর্ণী নদীর ধারে। দুর্ব্যবহার উপেক্ষা করে যাদের থেকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা পায় অন্তত তাদের কথা ভেবে নিজের একটা হোটেল খোলার পরিকল্পনা করে।


ভালো কাজের বিপরীতে বঞ্চনা পেলে উৎসাহ হারিয়ে যায়। তবে কেউ যদি ভালোবেসে, শ্রদ্ধার সাথে সাহস যুগিয়ে যায় তবে শত বঞ্চনা-লাঞ্ছনা ঠুনকো হয়ে দাঁড়ায়। হাজারির হাতে যারা খেয়েছে সবাই তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এছাড়াও কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছে। নিজ গ্রামের মেয়ে কুসুমের বিয়ে হয়েছে এই রাণাঘাটেই। কুসুম হাজারিকে পিতৃসম শ্রদ্ধা করে, তেমনি হাজারি কুসুমকে আত্মজা মনে করে। আরেকজন আছে হাজারির গ্রামের জমিদার কন্যা অতসী। সেও হাজারিকে ভক্তি শ্রদ্ধা-করে। এই দুই আত্মজাসম কন্যার অনুপ্রেরণা হাজারির এগিয়ে চলার পাথেয়। মেয়েরা নিজেরা নেতৃত্ব স্থানীয় অবস্থান থেকে এগিয়ে না এলেও তাদের অনুপ্রেরণা যে অনেক বড় ব্যাপার তা এই উপন্যাসে লেখক পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে উপস্থাপন করেছেন।

মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো এখানে উপস্থাপিত হয়েছে। সাফল্যের শীর্ঘে অবস্থান করেও যে অনেকসময় আমরা দ্বিধাদ্বন্দে ভুগি, পিছুটান কাজ লেখক তা তুলে ধরেছেন। অবস্থার পরিবর্তনে একেবারে অমানবিক হতে নেই আবার দুর্বলতা প্রকাশ করা অনুচিত। সবসময় মানবিক একটা দিক বজায় রাখা। সেই সাথে নিজের দিকটাও সামলে চলতে হয়। সুযোগের সাপেক্ষে ব্যক্তিগত চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাবার পরেও যে আরো বহুদূর যাওয়া যায় হাজারি ঠাকুর এর অনন্য উদাহরণ।


বিভূতিভূষণ এর লেখায় বারবার বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায়। এখানেও তিনি শহুরে আবহের বাইরে ঘটনাপ্রবাহে গ্রামের মানুষ, পথঘাট ও পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন। কিছু বিষয় বারংবার এসেছে। যা হয়তো কিছু পাঠকের কাছে বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। তবে আমার মতে এটার দরকার আছে। গল্পের ভুবনে পুরোপুরি হারিয়ে গেলে যেনো হাতড়ে ফিরে আসা এজন্য। 

স্বপ্ন মানুষকে অনেকদূর নিয়ে যায়। তা আজ হোক কিংবা দুদিন পর। অনেকটা সময় বয়ে গেলেও যেনো লক্ষ্যের বিচ্যুতি না ঘটে। মাঝবয়সী হাজারি ঠাকুরের মাধ্যমে লেখক স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আমাদের কোনো স্বপ্ন থাকে সাময়িক ছোট আবার কোনোটা দীর্ঘমেয়াদী বড়। ছোট ছোট স্বপ্নের ভীড়ে একটা হতে পারে রাণাঘাটের আদর্শ হিন্দু হোটেলে অন্তত একবেলা খাওয়া। লেখক এমন লোভনীয় বর্ণনা দিয়েছেন যে এটাও একটা পূরণীয় স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অনন্য অনুপ্রেরণামূলক 'আদর্শ হিন্দু হোটেল' পাঠকের স্বপ্ন পূরণের পাথেয়।


উপন্যাসঃ আদর্শ হিন্দু হোটেল

লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

Post a Comment

أحدث أقدم