গোয়েন্দা সিরিজঃ- আত্নহত্যা অথবা খুন পর্ব ০৫ ( গল্প শেয়ার)


হাসনাত করিম ওনার স্ত্রী ফিরোজাকে নিয়ে হসপিটালে বসে আছেন।গতকাল রাত থেকে ফিরোজার প্রেসার বেড়ে গেছে।মাঝে মাঝে নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে ফিরোজার।তুলির শোক হয়তো এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।হাসনাত করিম বারবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে।একটু থানায় যাওয়ার দরকার ছিল।উনার শ্যালক এসআই আনিসুর রহমানের সাথে কথা বলতে হবে।কিন্তু ফিরোজার অবস্থাও বেশ নাজুক।


-স্যার,আপনারা একটু পরে চলে আসবেন।এই রোগীর হয়ে গেলে তারপর উনাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকবেন।


অবশেষে ডাক্তার দেখানোর সুযোগ হয়েছে।একজন রোগী দেখা হয়ে গেলে তাদের ভেতরে যেতে বলেছে।ডাক্তারের সহকারী ছেলেটা পরিচিত হওয়াতে কিছুটা তাড়াতাড়ি হয়েছে।ফিরোজা উনার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,তুমি কি কিছু নিয়ে চিন্তা করছো?কোথাও যাবে নাকি?এত অস্থির মনে হচ্ছে যে?


হাসনাত করিম বললেন,না,এমনি।তোমাকে নিয়ে ভাবছি।এই বয়সে এত অসুস্থ হলে আমাকে দেখবে কে শুনি?রান্না করে আমাকে খাওয়াবে কে?


উনার স্ত্রী ফিরোজা হাসলেন।কিছু বললেন না।


বেশ হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই ছুটে আসছে এসআই আনিসুর রহমান।হাসনাত করিমকে দেখতে পেয়ে কি যেন বলবে,কিন্তু ইশারায় চুপ হয়ে গেল।হাসনাত করিম বললেন,কি ব্যাপার,আনিস,তুই এখানে?তোর আপাকে দেখতে এসেছিস নাকি?দেখ তো,শরীরের কি অবস্থা করেছে।


এসআই আনিসুর রহমান কপালের ঘাম মুছে বলল,হ্যাঁ,খবর পেয়ে ছুটে এসেছি।আপা,তোমার শরীর এখন কেমন?কতবার বললাম,বেশি চিন্তা করবে না।


ফিরোজা বললেন,এইতো এখন কিছুটা ভালো লাগছে।তা চাকরি ফেলে এখানে কষ্ট করে ছুটে আসার কি দরকার ছিল?ঔষধ দিলেই ঠিক হয়ে যেতাম।


হাসনাত করিম বললেন,আনিস,পাঁচ মিনিট অপেক্ষা কর।তোর আপাকে ডাক্তার দেখিয়ে আসি।আমাদের সিরিয়াল চলে এসেছে।তারপর তোর সাথে কথা বলবো।


দুজনে ভেতরে যেতেই এসআই আনিসুর রহমান বসে পড়লেন।তাকে দেখে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে।বেশ কিছুক্ষণ পর হাসনাত করিম বের হয়ে বললেন,তোর আপা ডাক্তারের পরিচিত।সমস্যা হবে না।এবার বল,কি হয়েছে?তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?


এসআই আনিসুর রহমান আতঙ্কিত গলায় বললেন,দুলাভাই,আরেকটা মেয়ের আত্মহত্যা মানে খুন হয়েছে?একটু আগে থানা থেকে জানতে পেরেছি।মেয়েটির নাম ইরা।


-কি বলছিস?আরেকটা খুন!খুনীর উদ্দেশ্যটা কি?কেন একের পর এক মেয়ে খুন করছে কিন্তু মনে হচ্ছে আত্মহত্যা?


-কিছুই বুঝতে পারছি না,দুলাভাই।তবে আমি একটু আগে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম।তোমাকে ফোন করবো ভাবছিলাম।কিন্তু করিনি।


-করেও লাভ হতো না।তোর আপাকে ছেড়ে ওইদিকে যাওয়া সম্ভব ছিল না।আচ্ছা তা কিছু জানা গেল?এবারের মেয়েটির লাশের অবস্থা কি?


-গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা।গিয়ে দেখি,বিছানায় খোলা অবস্থায় বই পড়ে আছে।বারান্দার দরজা খোলা।।ইরা ফোনে কথা বলছিল মুনিরা নামে একটি মেয়ের সাথে এবং মেয়েটির স্থান লন্ডন বলছে।সম্ভবত বই পড়া শেষে বারান্দায় গিয়েছিল ফোনে কথা বলতে।তারপরই এই অবস্থা।


হাসনাত করিম হতাশা ব্যক্ত করে বললেন,সবই তো আগের মতো।নতুন কিছু নয়।আচ্ছা,ফোনের কথা কি শেষ করা হয়েছিল নাকি মাঝপথে?


-না,ফোন হাতে নিয়ে দেখি,কথা শেষ করা হয়েছিল।কথা বলার পরই আত্মহত্যা।কিন্তু তারপরও কয়েকবার মুনিরা ইরা মেয়েটাকে কল করেছিল।


-আনিস,হতে পারে,কথা বলার সময়ই লাইন কেটে যায়।তারপর মুনিরা কল দিচ্ছিল,কিন্তু তখন ইরা সিলিং ফ্যানে ঝুলছে।তা লাশ ময়নাতদন্ত কে করবে?


-ঢাকা মেডিকেলের ডাঃ রফিক।একটু আগে কথা হয়েছে।তা যাবে নাকি সেদিকে একবার?


-হুম যেতে তো হবেই।তোর আপাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি।তারপর সেখানে বাকিটুকু জানা যাবে।


-দুলাভাই,একটা কথা বলতে মনে নেই।দারোয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে,ইরা,নাকি রাস্তায় একটি ছেলেকে দেখেছিল।তাকে ডেকে বলল,নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কিনা দেখতে।কিন্তু সে তখন সেখানে কাউকে খুঁজে পায়নি।


-একটি ছেলে দাঁড়িয়েছিল!তার মানে কি সেই ছেলেটি খুনী?খুন করার আগে এভাবে দেখা দেয় সবাইকে?


-হতে পারে,দুলাভাই,বলল এসআই আনিসুর রহমান।


-আনিস,ফিরোজাকে বাসায় নিয়ে যাই।তুই একটু অপেক্ষা কর আমার জন্য।তারপর মেডিকেলের দিকে রওনা দিবো।সঙ্গে সেই ছেলেটি কে খুঁজে বের করতে হবে।


সাত.


মুনিরা বসে আছে।গতকাল রাত থেকে ইরার ফোনে কল করে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।হঠাৎ এমনটা হওয়ার কথায় নয়।গতকাল সে ভেবেছিল,কলেজের ছুটির কথা ইরাকে বলবে।বাংলাদেশে এসে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াবে দুজনে।কতই মজা হবে!কিন্তু সেটা বলার আগেই ইরার কল কেটে যায়।মুনিরা উঠে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।মুনিরার দাদু মিনহাজ আহমেদ রোদে বসে আছে।প্রতিদিন দুপুরে উনার এটা অভ্যাস হয়ে গেছে।মিনহাজ আহমেদের পাশে উনার প্রিয় ব্যক্তি সালেহ মোর্শেদ দাঁড়িয়ে আছে।লোকটা জাতে তুর্কি হলেও ছোটবেলা থেকেই লন্ডনে পড়ে আছে।প্রতিদিন মুনিরার দাদু মিনহাজ আহমেদ তাকে ঘন্টাখানেক বাংলা ভাষার ক্লাস নেন।তিনি মনে করেন,সবার সব ভাষা জানা প্রয়োজন।এক সময় কাজে লাগবে।তাছাড়া নিজের ভাষায় কথা বলার মধ্যে একটা আনন্দ আছে।মোর্শেদকে পছন্দ করার অন্যতম কারন সে মানুষের হাত দেখে অনেক কিছু বলে দিতে পারে।যাকে গণক বলে সবাই।অবশ্য সবার হাত সে দেখে না।পছন্দ হলে তারপর বিবেচনা।গতবছর এক হাত-এক পা প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার পর মিনহাজ আহমেদ সবসময় সালেহ মোর্শেদকে সঙ্গে রাখেন।হাত দেখে তারপর বের হওয়ার জন্য পা বাড়ান বাইরে।অবশ্য মুনিরা এসব বিশ্বাস করে না।সে মনে করে,এসবই অন্ধকারে আন্দাজে ঢিল মারার মতো।ভবিষ্যতে কি হবে তা কেউ জানতে পারে না।


-দাদু,আমার তো কাল থেকে কলেজ ছুটি।এখন হাতে প্রচুর সময়,বলল মুনিরা।


-তা কোথায় যাবি আমাকে বল?অক্সফোর্ড স্ট্রিট নাকি ছোট্ট ভেনিস?জিজ্ঞেস করলেন মিনহাজ আহমেদ।


-উফফ,ওসবে নাহলেও দশবার করে যাওয়া হয়েছে আমার।আমি এবার বাংলাদেশে যাবো।অনেকদিন যাওয়া হয়না এবং আমি একা যাবো,বলল মুনিরা।


মিনহাজ আহমেদ বললেন,হঠাৎ বাংলাদেশে কেন?আর একা তো থাকতে পারবি না।আমার শরীরটাও তো তেমন ভালো না।এই শরীরে কিভাবে যাবো?


-তোমাকে যেতে হবে না।আমি একাই যাবো।আমার ব্যাগ গোছানো হয়ে গেছে।তুমি আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করো।আর যদি না যেতে দাও তাহলে কিন্তু...


মিনহাজ আহমেদ কি যেন ভেবে বললেন,আচ্ছা ঠিক আছে।এই মোর্শেদ,আমার নাতনীর হাতটা একটু দেখে বলো তো,যাত্রা শুভ তো?


মুনিরা বিরক্ত হয়ে একবার সালেহ মোর্শেদের দিকে তাকালো।কিন্তু কিছু বলল না।সালেহ মোর্শেদ এগিয়ে এসে মুনিরার হাত দেখে বলল,না,স্যার,যাত্রা শুভ।কোনো সমস্যা নেই।একদমই পরিষ্কার।


সালেহ মোর্শেদের মুখে "যাত্রা শুভ" কথাটা শুনে মুনিরার মুখে হাসি ফুটে উঠল।


-শুভ বলছো তাহলে?ঠিক আছে,বিকাল তিনটার টিকেট কেটে দিচ্ছি।বেরিয়ে পড়।কাল সকালেই পৌঁছে যাবি।আর ওইখানে কেয়ারটেকার শামছুল আছে,তাকে আমি ফোন করে সব বলে দিচ্ছি।


মুনিরা খুশিতে দাদুকে এসে জড়িয়ে ধরে ভেতরে চলে গেল।


মিনহাজ আহমেদ সালেহ মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে বললেন,একদম ওর বাবার মতো জেদি হয়েছে।যা বলবে তা না করে ছাড়বে না।কিন্তু আমার মন বলছে,মুনিরার,সামনে বিপদ।দেখা যাক,উপরওয়ালার উপর ভরসা করে দিলাম।


ডাঃ রফিকের পাশে হাসনাত করিম এবং এসআই  আনিসুর রহমান দাঁড়িয়ে আছে।দুজনে ডাঃ রফিকের মুখে কিছু শোনার জন্য অপেক্ষা করছে।ডাঃ রফিক বেশ মনোযোগ সহকারে লাশের দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করছেন।উনার ঠোঁটের কোণে কিছুটা হাসির আভা ফুটেছে।মনে হচ্ছে যেন,হারানো জিনিস খুঁজে পেয়েছেন তিনি।


-আনিস এবং মিঃ হাসনাত করিম সাহেব,আপনারা এতদিন যে রহস্যের পেছনে ছুটছিলেন তার কিছুটা মনে হয় এবার বের হয়েছে,বললেন ডাঃ রফিক।


দুজনের চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠল আনন্দে।হাসনাত করিম বললেন,কোনো আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে নাকি ডাক্তার সাহেব?


ডাঃ রফিক বললেন,না,ছাপ পাওয়া যায়নি।কিন্তু যদি খুন হয়ে থাকে তবে খুনী খুব চালাক এবং সচেতন একজন মানুষ।আর আমি যতদূর ধারনা করছি,খুনীর চেহারা অসম্ভব ভয়ঙ্কর।মানে চেহারার দিকে তাকালে আত্মা কেঁপে উঠার মতো অবস্থা হবে।


এসআই আনিসুর রহমান বললেন,তুমি এতটা শিউর কিভাবে?মানে তেমন কিছু তো পাওয়া যায়নি।


-আন্দাজ করছি,বন্ধু।ডাঃ রফিক হাত দিয়ে ইরার ডান চোখ ধরে বললেন,মেয়েটির চোখের দিকে তাকাও ভালো করে।ফোনে কথা বলার সময় এমন কিছু দেখেছিল যাতে ওর চোখদুটো ভয়ে জমে যায়।যাকে মেডিকেলের ভাষায় শকড বলে।তারপরই সে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।তবে এখানে একটা জিনিসে বিস্ময় প্রকাশ না করে পারছি না,ওর শরীরের ভেতরের মাংসগুলো একদম গুঁড়ো হয়ে গেছে।এমনটা কখনো আগে দেখিনি।কোনো আঘাতের চিহ্ন না রাখে এমনটা কিভাবে পারে আমার জানা নেই।


-তা আপনি বললেন না,রহস্যের কিছুটা বের হয়েছে সেটা কি?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।


-ইরার পোশাকে পিঠের পেছনের অংশে একধরনের পাউডার জাতীয় ঔষধ পাওয়া গেছে যা শরীরের কোনো অংশ ঝলসে গেলে লাগানো হয়ে থাকে।এখন এটা ধারনা করা যায়,খুনী ভয়ঙ্কর এই কারনে তার মুখের অংশ ঝলসানো।আর হঠাৎ যদি রাতের অন্ধকারে কেউ এসে আপনার সামনে দাঁড়ায় বুঝতে পারছেন তো,ব্যাপারটা কি?ইরার চোখদুটো হয়তো তা দেখে ভয় পেয়েছিল,বললেন ডাঃ রফিক।


হাসনাত করিম বললেন,তার মানে আপনি বলছেন,খুনী এমন কেউ যার মুখ ঝলসানো?


-একদমই তাই।সে নিয়মিত এই ঔষধ ব্যবহার করে তার মুখে।হয়তো এইদিকে সে ভুল করে ফেলেছে।কোনোভাবে তা ইরার পোশাকে লেগে যায়।


এসআই আনিসুর রহমান বললেন,দুলাভাই, তাহলে কি ইরা কথার বলার সময়ে ঝলসানো কোনো ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল?কিন্তু প্রশ্ন হলো,ইরার শরীরের গঠন অনুযায়ী তাকে ফ্যানে ঝুলানো এবং ধরাশায়ী করা তো ছোট্ট একটা ছেলের পক্ষে অনেকটা কঠিন হবে।তাহলে এখানে নতুন ঝট পাকিয়ে গেল না?


-তার থেকেও বড় কথা,প্রথম আত্মহত্যা ফ্যানে ঝুলে গলায় ফাঁস।তার দুইমাস পর তুলি আর আনিকা ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা।শেষে ইরার আবার গলায় ফাঁস।এখানে সব কিন্তু একই কায়দায়।সবগুলো মেয়ে কলেজ পড়ুয়া।এখন প্রশ্ন,পরবর্তী আত্মহত্যা কি ফাঁস লাগিয়ে নাকি ঘুমের ঔষধ?


-দুলাভাই,হতে পারে খুনী দুইজন।কিন্তু দুজনে সম্পর্কে পরিচিত।


-এমনটা হলে,তখন মুশকিল হবে।ঘুমের ঔষধ নাকি গলায় ফাঁস এই নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হবে।

হাসনাত করিম কি যেন ভেবে বললেন,খুনী কে এটা বের করার আগে আমাদেরকে পরবর্তী খুনির শিকার কে হতে যাচ্ছে তা বের করতে হবে।আর বের করতে পারলেই খুনীর উদ্দেশ্য কি তা জানতে পারবো।আনিস,তুই একটা কাজ করতে পারবি?


এসআই আনিসুর রহমান বলল,কি কাজ,দুলাভাই?


-তুই আজ রাতের মধ্যে আমাকে আত্মহতা করা চারটি মেয়ে কোথায় পড়েছে,সম্পর্ক কি,একে-অপরের সাথে আগে দেখা হয়েছিল কিনা সবকিছু ফোনে জানাতে পারবি?


-হ্যাঁ,পারবো।কঠিন কোনো কাজ বলে মনে হচ্ছে না।


-আর শোন,মুনিরা নামে মেয়েটির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা কর।হতে পারে মৃত্যুর আগে ইরা কিছু দেখেছিল যা মুনিরা জানে।


এসআই আনিসুর রহমান বললেন,তুমি এখন বাসায় গিয়ে আপাকে সময় দাও।আমি সবকিছু তোমাকে ফোন করে রাতে জানিয়ে দিবো।


হাসনাত করিম চোখদুটো স্থির করে বললেন,শিকারী শিকার করার আগে এবার আমাদের শিকারকে বাঁচাতে হবে।তবেই হয়তো সেই খুনিকে ধরাশায়ী করা সম্ভব হবে এবং আমি সেটা করেই ছাড়বো।


ফারহান বারান্দায় বসে আছে।মিলি ওর পাশে বসে কাপড় দিয়ে পুতুল বানাচ্ছে।ফারহানকে দিয়ে রাস্তার মোড়ের টেইলার্স চাচার দোকান থেকে অনেক কাপড় এনে জড়ো করেছে।কয়েকটা পুতুল বানানো শেষ।কিন্তু সেগুলো একটাও সুন্দর মনে হচ্ছে না মিলির কাছে।আজকে পুতুলের বিয়ে দিবে।যেই পুতুলটা সবচেয়ে সুন্দর হবে,বর পুতুলের সাথে তার বিয়ে হবে।ফারহান বসে বসে ছোট বোনের পাগলামি দেখছে।


-তোর পুতুল বানানো শেষ হবে কখন?ছয়টা তো বানানো হয়েছে।এদের থেকে একটা পুতুল নিয়ে বউ সাজানো হলেই তো হয়,বলল ফারহান।


মিলি মুখ ভেংচি কেটে বলল,উফফ,তুমি কিছুই জানো না।সবার নাক বোঁচা,চেহারা সুন্দর হয়নি।আর জানো,চেহারা সুন্দর না হলে তো ভালোবাসবে না কেউ।


-ওরে বাবা,কি পাঁকা মেয়ে।তা এতকিছু কে বলেছে তোকে,সুন্দর না হলে ভালোবাসবে না কেউ?


-তুমি দেখি,কিছুই জানো না ভাইয়া।কিছুদিন আগে রুমা আপুকে ওর বর মেরে বাসায় দিয়ে গেছে।রুমা আপু বলে,উনি কালো।তাই বেশি মারে।সুন্দর হলে নাকি খুব আদর করতো।


ফারহান বলল,এত কিছু তোর জানতে হবে না।পুতুল বানানো শেষ করে বিয়ে দে।বিয়ের দাওয়াতের জন্য তখন থেকে বসে আছি।পেট একদম খালি।ফারহান দেখতে পেল,রাকিব আসছে।


-আরে ফারহান ভাই,বারান্দায় পাগলির সাথে কি করেন?


ফারহান বলল,কই পাগলি?আমি তো মিলির সাথে বসে আছি।


রাকিব হেসে বলল,ওই তো পাগলি।আমাকে দেখলেই লাঠি নিয়ে তাড়া করে।


মিলি তেড়ে এসে বলল,তোকে তো আজকে আমি।আমাকে পাগলি বলা?


ফারহান দুজনকে থামিয়ে বলল,এই আবার শুরু হয়ে গেছে।তোদের দুজনকে নিয়ে আর পারি না।রাকিব এখন ঝগড়া থামিয়ে বল তো,তোর মুখের এই অবস্থা কেন?ঔষধ কিনে দিলাম না তোকে?ঠিকমতো দেস না তাই তো?


রাকিব মাথা চুলকে হাসি দিয়ে বলল,গতরাতে জামার সাথে লাগছে।চামড়া উঠে গেছে।


ফারহান মাথা নেড়ে বলল,হুম বুঝলাম।এখন এখানে আয়।মিলির পুতুলের বিয়ের দাওয়াত।একটু পরে বিয়ে হবে।তারপর তিনজনে বসে পেট ভরে খাবো।


রাকিব বারান্দায় বসে বলল,হাতের রান্না মজা হবে তো?


মিলি এসে দুম করে কিল বসিয়ে দেয় রাকিবের পিঠে।ফারহান দুজনের এমন অবস্থা দেখে না হেসে পারে না।


এসআই আনিসুর রহমান দরজার তালা খুলে বাসার ভেতরে প্রবেশ করল।লাইট অন করে পায়ের জুতা খুলে হাত থেকে বাজারের ব্যাগ রেখে চলে গেল ফ্রেশ হতে।হোটেল থেকে আগেই খেয়ে এসেছে।খাওয়ার কোনো তাড়াহুড়া নেই।দুই রুম নিয়ে ব্যাচেলর হিসেবে বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছে।সোফায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইল।বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মনে পড়ল,সকালে তার দুলাভাই কিছু জানার জন্য বলেছিল।ঘড়িতে তাকিয়ে দেখতে পেল,বারোটা বেজে গেছে।এখনও তিনি ঘুমায়নি হয়তো।ঘুমাতে দেরি হবে।আনিসুর রহমান সোফা থেকে উঠে ভেতরের রুমে বিছানায় গিয়ে বসল।ফোন করল হাসনাত করিমকে।ওপাশ থেকে রিসিভ করতেই বলল,দুলাভাই,ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি?আমি মাত্রই বাসায় আসলাম।


-না রে,আমরা বসে আছি।এই ঘুমাবো ঘুমাবো করছি।তা তোর এত দেরি হলো যে বাসায় ফিরতে?


-অফিসে একটু কাজ ছিল।আপার শরীর এখন কেমন আছে?আমি কাজের চাপে বাসায় গিয়ে দেখে আসার সুযোগ পাইনি।


-হ্যাঁ,ডাক্তার ঔষধ দিয়েছে।এখন কিছুটা সুস্থ মনে হচ্ছে।তোকে যে একটা কাজ দিয়েছিলাম সেটা হয়েছে তো?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।


-হ্যাঁ,সে জন্যই কল দিয়েছি।শুনুন,তুলি আর আনিকা একে অন্যকে কলেজ থেকেই জানে।কিন্তু ইরা আর সাবিহার সাথে দুজনের পরিচয় নেই।এমনকি কখনো দেখা হয়নি।তবে ইরা আর সাবিহা মাঝে স্কুলে একই সাথে পড়তো।কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সাবিহা অন্য কলেজে চলে গেছে।আর ইরা অন্য কলেজে।মাঝে দুজনের কেউ কারো সাথে কথা বলেনি।মানে বলতে পারি,একদমই যোগাযোগ ছিল না।আর চারজন কখনোই একসঙ্গে হয়নি।


-দুজন একদিকে,বাকি দুজন অন্যদিকে।আমরা কি কোনো সিরিয়াল কিলারের পাল্লায় পড়লাম নাকি?


-আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম।কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করুন,সাবিহাকে মারার পর হঠাৎ খুনি আনিকা আর তুলির পিছনে কেন পড়লো?আবার সাবিহা তো অন্য কলেজে চলে গিয়েছিল।সাবিহা আর ইরা,দুজনের মাঝে কোনো যোগাযোগ ছিল না।তাহলে খুনীর হঠাৎ অতদূরে চোখ পড়ল কেন?ব্যাপারটা কাকতালীয় মনে হলেও তা কিন্তু নয়।কিছু তো অবশ্যই রয়েছে।


-তা তো ভেবে দেখিনি।আচ্ছা মুনিরা মেয়েটার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল তোর?কি বলল মেয়েটা?


-মুনিরা,সকালের ফ্ল্যাটে বাংলাদেশে আসছে।মুনিরা হয়তো ইরার ব্যাপারে কিছু জানে না।আমি বলিনি মুনিরাকে।


-তাহলে তো ভালোই হয়েছে।ওর সাথে সরাসরি কথা বলতে হবে।মেসেজে একটা ঠিকানা দেখতে পেলাম।এটাই কি মুনিরার বাসার ঠিকানা?


-হ্যাঁ,দুলাভাই,মুনিরার বাসার ঠিকানা।সকাল থেকে সবকিছু খবর নিয়ে তারপর আপনাকে বলছি।


-অনেক ধন্যবাদ তোকে।অবশ্য,ধন্যবাদে কাজ হবে না।একদিন বাসায় আয়,জমিয়ে খাওয়াবো তোকে।আচ্ছা,সাবিহা আর ইরা...


হাসনাত করিমকে মাঝপথে থামিয়ে এসআই আনিসুর রহমান বলল,দুলাভাই একটু দাঁড়াও।আমি তোমাকে পরে ফোন করছি।আনিসুর রহমান হাত থেকে মোবাইল রেখে উঠে দাঁড়ালেন।বাসায় যেন কেউ হাঁটছে।অনেকটা পায়ের সাথে পা লাগিয়ে হাঁটার শব্দ।কে হাঁটছে ওখানে?আমি বলছি,আমার সামনে আসো।


পায়ে হাঁটার শব্দ হঠাৎ থেমে গেল।এবার দেয়ালে কেউ যেন আস্তে আস্তে আঘাত করছে,"টুক টুক"।আনিসুর রহমান এবার কিছুটা ঘাবড়ে গেল।কাঁপা গলায় বলল,কে ওখানে?সামনে আসো বলছি।নাহলে কিন্তু গুলি করবো।


হঠাৎ পুরো বাসা অন্ধকার হয়ে গেল।এবার রান্নাঘর থেকে পানি পড়ার শব্দ শুনতে পেল আনিসুর রহমান।কেউ যেন পানি ছেড়ে মৃদু হাসছে।সঙ্গে কাঁচের প্লেট নিচে পড়ার আওয়াজ।একটু পরেই বাথরুম থেকে পানি গড়িয়ে পড়ার শব্দ।মোবাইলের আলোতে তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না রুম থেকে।আনিসুর রহমান সাহস নিয়ে আস্তে আস্তে দরজা সরিয়ে সামনের রুমে পা ফেলল।তেমন কেউ নেই।পানি এখনও উপচে পড়ছে।হঠাৎ কাঁধে কারো হাতের স্পর্শে চমকে উঠল আনিসুর রহমান।এত ভয় আগে কখনই লাগেনি।এমনকি বড় বড় ডাকাত ধরার সময়েও নয়।মনে হচ্ছে,ভেতর থেকে ভয়ে যেন কলিজা বের হয়ে আসবে।ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরে তাকাতেই চিৎকার দিয়ে হাত থেকে মোবাইল ফেলে দিল আনিসুর রহমান।অন্ধকারে রুমের কোণায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।এক ঝলকে ভয়ানক চেহারা যেন দেখা হয়ে গেল।কি সেই ভয়ঙ্কর চাহনি!


আনিসুর রহমান কাঁপা গলায় বলল,আমাকে খুন করো না।তুমি যা বলবে সব শুনবো।আমি মরতে চাই না।


আনিসুর রহমান অন্ধকারে দেখতে পেলেন,অবয়বটি এগিয়ে আসছে তার দিকে।তারপরই শোনা গেল ভয়ানক আর্তনাদ।তবে কি শিকার খোঁজার আগেই তাকেই শিকারে পরিণত হতে হলো?


...........চলবে..............


written by Habib Khan Hridoy

Post a Comment

أحدث أقدم