লেখা: ShoheL Rana শামী
পর্ব:-০৩
চার
-----
কয়েকটা জলের ধাক্কায় জ্ঞান ফেরে জারার। শরীরের অর্ধেকটা তার জলে আর মাথাটা একটা দ্বীপে ঠেকে আছে। জল থেকে উঠে আসে সে দ্বীপে। চারপাশে তাকিয়ে দেখে শুধু জল আর জল। শুধু মাঝখানে ছোট্ট একটা দ্বীপ। দেহের প্রাণটা এখনও আছে দেখে হতাশ দেখালো তাকে। নির্জন পরিবেশে কী করবে বুঝে উঠতে পারলো না। হঠাৎ আত্মচিৎকার করে উঠলো,
-কেউ আছেন?'
উত্তর এলো না কোথা থেকেও। কিছুক্ষণ একা একা কাঁদলো সে। তারপর হেঁটে যেতে লাগলো সামনে। বেশকিছু গাছ মাথা উঁচিয়ে আছে ওখানে। মরতে তো পারছে না। অন্তত খিদে মেটানোর জন্য তো কিছু খেতে হবে। খাবারের খোঁজ করতে লাগলো সে। অজানা কিছু ফল দেখতে পেল সে গাছে। কীভাবে ফলগুলো পেড়ে খাবে ভাবতেই সে দেখলো গাছের ডালটা ঝুঁকে গেছে। ভয়ে ভয়ে সে গাছের ফল ছিড়ে খেতে লাগলো।
ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গেছে। একটা গাছে হেলান দিয়ে বসলো জারা। ধীরে ধীরে অন্ধকার বাড়তে লাগলো, আর তার ভয়টাও বাড়তে লাগলো। কে যেন হাঁটছে ওর সামনে। অন্ধকারে দেখা গেল না কে সে। জারার চিৎকার শোনা গেল,
-প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করো। আমাকে বাঁচতে দাও। আর নয়তো মরতে দাও।'
অদ্ভুত ভয়ংকর এক কণ্ঠ শোনা গেল তখন,
-তোমার মৃত্যু এখন হবে না। তোমার পেটে আছে আমাদের শয়তানদের বাদশা। ও পৃথিবীতে আসুক, তার পরপরই তোমার মৃত্যু হবে।'
-তোমাদের তো অনেক শক্তি। অন্য কোনোভাবে কি তোমাদের বাদশাকে আনা যেতো না? আমাকেই কেন বেছে নিলে তোমরা?'সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
-এটা তার ইচ্ছে। কোনো মানুষের গর্ভ থেকে জন্ম নিলে তার শক্তি অনেক বেড়ে যাবে। এটা তার দ্বিতীয় জন্ম হবে। আর আমরাও অপেক্ষা করছি কবে আমাদের বাদশা আমাদের মাঝে ফিরে আসবে।
-কিন্তু ও এসে কী করবে?
-ও শক্তিশালী হয়ে আসবে, আর আমরা ওর নেতৃত্বে পুরো বিশ্বে রাজত্ব করবো। ধ্বংস হয়ে যাবে মানবকূল।
-নাহ্, এমনটা করো না। আমি কিছুতেই এ শয়তানটাকে জন্মাতে দিবো না।
-যতো চেষ্টা করো, পারবে না। তোমার চারপাশে আছে অদৃশ্য শক্তি। হা হা হা।' ভয়ানকভাবে হেসে ওঠলো অদৃশ্য কণ্ঠটা। অন্ধকারে কণ্ঠটা লক্ষ করে ঢিল ছুড়লো জারা। আরো ভয়ানকভাবে হেসে উঠে ক্রমশ দূরে সরতে লাগলো কণ্ঠটা। জারা উঠে উত্তেজিত হয়ে এদিক ওদিক ছুটতে লাগলো অন্ধকারে। একটা গাছে জোরে জোরে মাথা ঠুকতে লাগলো। মাথা ফেটে শরীরের সব রক্ত বের হয়ে যাক, তারপর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে যেন মারা যায় সে। তার একটা ভুলের জন্য পুরো মানবকূলকে বিপদে ফেলা যাবে না কিছুতেই। কিছুতেই শয়তানটাকে আসতে দেয়া যাবে না। কিন্তু প্রাণপণে চেষ্টা করেও সে মাথা ফাটাতে পারলো। তবে জোরে মাথা ঠুকার কারণে কপালের অংশটা প্রচুর ব্যথা করছে। ধীরে ধীরে ব্যথাটা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। বুঝতে পারলো সে জ্বর আসছে। তারপর ওখানেই সে গুটিয়ে শুয়ে পড়লো। জ্বরের ঘোরে কতক্ষণ সে এভাবে থাকলো খেয়াল নেই। তবে অনুভব করলো কারা যেন তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর একটা জায়গায় নিয়ে গিয়ে ওরা তার হাত পা বেঁধে চিৎ করে শুয়ালো। চিৎকার করতে পারছে না সে। মুখটাও আটকে দিছে ওরা। শুধু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে সে ওদের কীর্তি দেখছে। নিজেকে ছাড়ানোর অনেক চেষ্টা করেও সে পারলো না। ওকে নিয়ে ওরা কী করতে চাইছে বোঝার চেষ্টা করলো। তখন ওরা ছুরি দিয়ে তার পেট চিরতে লাগলো। পেট চিরেই ওরা তাদের অধিপতিকে বের করে আনতে চাইছে। জারার বাধা দেয়ার শক্তি নেই। আর্তনাদ করতে গিয়েও মুখ দিয়ে শব্দ বের করতে পারলো না। তার অবস্থা দেখে শয়তানগুলো দাঁত বের করে হাসছে। পেটের কাটা অংশ থেকে অঝোরে রক্ত পড়ে চারপাশটা রক্তাক্ত হয়ে ওঠেছে। বিশ্রী ভয়ানক একটা অবস্থা। কাটা পেটের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো এবার ভয়ানক একটা চেহারা। জারা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। আর্তচিৎকার করে উঠে বসলো। ভয়ে ভয়ে আশেপাশে তাকালো সে। কেউ নেই। স্বপ্ন দেখেছে সে। পেটের উপর হাত বুলালো, কোনো কাটা অংশও নেই। স্বপ্নটা ভুলতে পারছে না সে। তবে কি শয়তানটা এভাবেই জন্ম নেবে তার পেট থেকে? নাকি আরও ভয়ানকভাবে হবে তার জন্ম?
সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
সকাল হয়ে গেছে। জারা উঠে হাঁটতে লাগলো। কী করছে সে নিজেও জানে না। পাগলের মতো হয়ে গেছে সে। গায়ের ভেজা জামাটা গায়েই শুকিয়ে গেছে। জামাটা থেকে ভেজা বিশ্রী একটা গন্ধ আসছে। দ্বীপের এক ধারে কিছু বড় বড় পাথর দেখতে পেল। একটা পাথরের সাথে আরেকটা পাথর আঘাত করে টুকরো টুকরো করলো সে। তারপর ধারালো একটা পাথরের টুকরো তুলে নিয়ে একের পর এক আঘাত করতে লাগলো পেটে। শয়তানটাকে পেটেই শেষ করতে চাইছে সে এবং নিজেও মরবে। কিন্তু এই চেষ্টাও তার ব্যর্থ হলো। পাথরের টুকরোটা পেট থেকে বের হয়ে আসলে ক্ষতটাও মুছে যায়। রাগে নিজের মাথার চুল ছিড়তে থাকে সে। একসময় দৌড় দেয় জলের দিকে। ঝাপ দেয় জলে। ডুবতে থাকে সে। তখনই সে জলের ভেতর দেখতে পায় ওদেরকে, যারা স্বপ্নে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে পেট চিরে শয়তানটাকে বের করতে চেয়েছিল। জলের ভেতর ওরা ভয়ানকভাবে হেসে ওঠে এগিয়ে আসতে থাকে জারার দিকে। জারা জলের ভেতর হাতপা ছুড়তে থাকে। ওরা এসে তাকে চারপাশ থেকে ধরলো। ভয় পেয়ে গেল জারা। স্বপ্নটা সত্যি হচ্ছে না তো? চিৎকার করতে গিয়েও কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ থেকে। ওরা তাকে জল থেকে তুলে এনে দ্বীপে রাখলো। ওদের মধ্য থেকে একজন দাঁত বের করে হাসলো,
-মরা এতো সহজ হবে না তোমার জন্য। আর বেশিদিন নেই আমাদের অধিপতি আসতে। তারপর তোমার মুক্তি মিলবে, চিরমুক্তি।' হাসতে হাসতে বললো ও। কী ভয়ানক বিশ্রী হাসি! ওর দিকে তাকাতে পারলো না জারা। চোখ সরিয়ে ফেললো।
পাঁচ
---সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করেছে ড্যানিয়েল হুগো আর ইলিশা হান্নান। সাথে আরেকটা চব্বিশ পঁচিশ বছরের ছেলে। ছেলেটার পরনে অদ্ভুত পোশাক। মাথায় একটা পাগড়ি বাঁধা। এই বয়সেই তন্ত্রশাস্ত্রের সাধনা করে সে। তিনজনে একসাথে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে হাঁপাচ্ছে হুগো আর ইলিশা।
-আর কতদূর?' প্রশ্ন করেন ড্যানিয়েল হুগো।
-প্রায় পৌঁছে গেছি।' জবাব দেয় ছেলেটা। ওদের মতো তেমন হাঁপাচ্ছে না সে। বোঝা যায় এখানে প্রায় আসা যাওয়ার অভ্যাস আছে তার। একটা বোতলের ছিপি খুলে জল পান করেন হুগো, তারপর বোতলটা এগিয়ে দেয় ইলিশার দিকে। বাকি জলটা সাবাড় করে কিছুক্ষণ জিরোয় সে। তারপর আবার হাঁটতে থাকে ওদের সাথে সাথে। একজন তন্ত্রসাধকের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে ওরা। তন্ত্র সাধনায় যার ভালো ডাকনাম আছে। সাধনা করেই বলে দিতে পারেন অনেক অজানা কিছু। মিস্টার হুগো অবশ্য এসবে বিশ্বাস করেন না। শুধু ইলিশার জোরাজোরিতে আসা। দুইমাস হচ্ছে দুজন বিয়ে করেছে। তারপর একসাথে থাকা। কিন্তু মন থেকে এখনও জারাকে মুছতে পারেনি ইলিশা। জারা কোথায় যেন হারিয়ে যাওয়ার পর অনেক খুঁজেছে ইলিশা তাকে। পুলিশের কাছে ডায়েরি করেছিল জারার ব্যাপারে। কিন্তু পুলিশ কোনো হদিস দিতে পারলো না জারার। জারা কোথায় আছে, কীভাবে আছে জানে না সে। তবে সে বেঁচে আছে এটা তার বিশ্বাস। তাই আজও তার সন্ধানের আশায় ছুটে চলেছে সভ্য জগত থেকে বন জঙ্গলে। হাঁটতে হাঁটতে ইলিশা বুঝতে পারে স্বামীর কষ্ট হচ্ছে। ইলিশা তাঁর উদ্দেশ্যে মন্তব্য করে,
-আমার কারণে তোমাকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে না?'
-না, এতে আর কষ্ট কী?' কপালের ঘাম মুছেন মিস্টার হুগো। "তবে এটা বুঝি না, সব তান্ত্রিকদের বন-জঙ্গলে এসে কেন সাধনা করতে হবে? শুধু শুধু আমাদের এত যন্ত্রনা..."
এই পরিস্থিতেও হাসলো ইলিশা স্বামীর কথা শুনে। তবে কিছু বললো না। ভারী শরীরটা অনেক কষ্টে চালিয়ে যাচ্ছেন মিস্টার হুগো। তার মানসিক শক্তি বাড়ানোর জন্য ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে স্বামীর ডান বাহুটা জড়িয়ে ধরে ইলিশা।
যখন তারা গন্তব্যে এসে পৌঁছায়, দেখতে পায় সেই সাধককে, যার জন্য এতদূর আসা। একটা পাথরের উপর বসে চোখ বন্ধ করে গভীর সাধনা করছেন তিনি। তাঁর সামনে বসলো ইলিশা আর মিস্টার হুগো। আর ঐ ছেলেটা তান্ত্রিকের কানের পাশে গিয়ে উচ্চারণ করলো,
-গুরু...'
তান্ত্রিক ছেলেটাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন। তবে তার ভাবমূর্তির কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা গেল না। এভাবে কেটে যেতে লাগলো সময়। ড্যানিয়েল হুগো এবার বিরক্ত হয়ে বললেন,
-আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকতে হবে?'
তাঁর কথা শুনে চোখ খুলে তাকালেন সাধক। মিস্টার হুগো চুপ হয়ে গেলেন সাধকের তাকানো দেখে। দ্বিতীয়বার মুখ খোলার সাহস হলো না তাঁর। সাধক আবারও চোখ বন্ধ করে সাধনায় মনোযোগ দিলেন। ইলিশা ঐ ছেলেটার উদ্দেশ্যে ইশারায় জানতে চাইলো এসব কী, এভাবে বসিয়ে রাখার মানে কী? ছেলেটা ইশারায় ওদেরকে ধৈর্য ধরতে বললো।
বেশ কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুললেন তন্ত্র সাধক। ড্যানিয়েল হুগো আর ইলিশাকে এক নজরে একবার দেখে নিলেন। তারপর বললেন,
-দেরি হয়ে গেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে।
-কীসের দেরি? আমরা কেন এসেছি তাও তো বলিনি এখনও।' অবাক হলেন ড্যানিয়েল হুগো।
-চুপ থাক মূর্খ মানব। একজন সাধককে তুই কী ভেবেছিস? আমরা সাধনা করে আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করি। তোদের এখানে আসার কারণও জানি।
-আমরা কি জারাকে ফিরে পাবো?' প্রশ্ন করে ইলিশা।
-নাহ্, তাকে ফিরে পাওয়ার চান্স নেই আর। তবে সে এখনও জীবিত। খুব শীঘ্রই মরবে সে। খুব শীঘ্রই আগমন ঘটবে ভয়ংকর এক শয়তানি শক্তির। তার বিপক্ষে রুখে দাঁড়ানো অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
[[চলবে...]]


إرسال تعليق