লেখা: ShoheL Rana শামী
পর্ব:-০২
এবার ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিলো ইলিশা। জারার চিৎকার বেড়েই চললো এদিকে। ইলিশা তাকে দুহাতে শক্ত করে ধরে বললো,
-চল, হাসপাতালে যায়।' সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
ইলিশার কথা যেন জারার কান পর্যন্ত গেল না। নিজের পেটটা একহাতে চেপে ধরে অন্য হাতে সে সজোরে ধাক্কা দিলো ইলিশাকে। ইলিশা গিয়ে পড়লো মেঝেতে। জারা উঠে দরজা খুলে বাইরে চলে যেতে লাগলো। ইলিশা মেঝে থেকে উঠে উত্তেজিত হয়ে ছুটলো পিছুপিছু। ততক্ষণে অন্ধকারে মিশে গেছে জারা। চিৎকার করে ডাক দিলো ইলিশা,
-জারা.. জারা..আ..আ...'
দ্রুত ভেতরে এসে টর্চটা হাতে নিলো ইলিশা। তারপর আলো জ্বেলে বাইরে খুঁজতে লাগলো জারাকে। কিছুদূর এসেই সে দেখতে পেল তাকে। জারা রাস্তায় শুয়ে কেমন যেন ছটফট করছে হাত পা ছুড়ে। ওর আকৃতিটাও বড় হয়ে গেছে আরও। দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো দানব শুয়ে ছটফট করছে। ইলিশার নিজেরও ভয় হচ্ছে। কী করবে বুঝতে পারছে না সে। পাশে গিয়ে জারাকে ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-জারা, তুই ঠিক আছিস তো?'
জারা কোনো উত্তর দিলো না। ধীরে ধীরে তার ছটফটানি কমতে লাগলো। আকৃতিটাও ছোট হয়ে আসতে লাগলো। ইলিশা আরও কয়েকবার ডাকলো,
-জারা... জারা...'
জারার আর হুশ নেই। নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকলো। ইলিশা দুহাতে ওকে তুলতে চেয়েও পারলো না। তারপর ওর দুইবাহু শক্ত করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে এলো ভেতরে। অনেকক্ষণ মাথায় পানি ঢেলে জারার হুশ ফেরালো ইলিশা। ওর অবস্থা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। ইলিশাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো সে। ইলিশা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগলো।সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
তিন
------
হাসপাতালে ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছে ইলিশা আর জারা। জারার আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট চেক করছেন ডাক্তার। ডাক্তারকে কেমন যেন হতাশ দেখাচ্ছে। ইলিশা ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলো,
-ডাক্তার, কোনো সমস্যা?'
-হুমম, উনার পেটে তো কোনো সন্তানের অস্তিত্ব নেই, তবে বেশকিছু প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ছোট ছোট ইঁদুরের মতো অনেকগুলো প্রাণী।
-হোয়াট!
-আমরাও অবাক হচ্ছি। মেডিকেল সাইন্সে এরকম আসলে কখনও হয়নি।
-এখন উপায়?
-আমরা উনার দ্রুত অপারেশন করে প্রাণীগুলো বের করার চেষ্টা করবো।
-তাই করুন ডাক্তার, ওর যেন কোনো ক্ষতি না হয়...'
-আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করবো।' ভরসা দিলেন ডাক্তার।সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
জারাকে অপারেশন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তার অপারেশন শুরু করতে চেয়েও পারলেন না। পুরো হাসপাতালটা হঠাৎ যেন কেঁপে ওঠলো। থমথমে এক পরিবেশ সৃষ্টি হলো ভেতরে। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেন ভর করেছে কক্ষে। ভয়ে ভয়ে ডাক্তার একটা ইনজেকশন হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলেন জারার দিকে। অজ্ঞান করার ইনজেকশন। ইনজেকশনটা দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন ডাক্তার। অদৃশ্য শক্তিটা যেন হাত চেপে ধরে আছে তাঁর। কানের মধ্যে কেমন যেন ভোঁ ভোঁ শব্দ হতে লাগলো। ওদিকে জারার পেটটা আবারও অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠছে। হাতপা ছুড়ে চিৎকার করছে সে। দুজন নার্স এগিয়ে এলো তার দিকে। দুজন দুপাশ থেকে জারাকে ধরতে চাইলে, ওদেরকে দুহাতে ধাক্কা দেয় জারা। দুজন দেয়ালে গিয়ে পড়ে। দ্বিতীয়বার কাছে আসার সাহস হয়নি আর। জারার হঠাৎ দানব আকৃতি দেখে ভয়ে দ্রুত বের হয়ে যায় ডাক্তার। পিছুপিছু দৌড়ে পালায় নার্সরা। অপারেশন কক্ষে পড়ে থাকে জারা। শরীরের আকৃতির জন্য পরনের কাপড় ছিঁড়তে থাকে তার। তার চিৎকারে যেন পুরো হাসপাতাল কেঁপে ওঠলো। দূর থেকে তার দিকে চেয়ে কাঁদতে লাগলো ইলিশা। কেউ তাকে কাছে আসতে দিলো না জারার।
বেশ কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো। জারার আকৃতিটাও কমে এলো। ইলিশা তার পাশে এসে ছেঁড়া কাপড়গুলো ঠিক করতে লাগলো। ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলো সে,
-জারা, তুই ঠিক আছিস তো...'
-হুমম...' অস্ফুটে জবাব দিলো জারা। বাম হাত দিয়ে চোখের জল মুছলো সে। তখন ডাক্তার এসে নম্রকণ্ঠে বললো,
-আমরা দুঃখিত, আসলে আমরা এই অপারেশনটা করতে পারবো না। এতে সবারই বিপদের আশঙ্কা আছে।
-ডাক্তার, প্লিজ কিছু করুন।' দুহাত জোড় করে মিনতি করলো ইলিশা।
-স্যরি, আমাদের কিছুই করার নেই আর। এর পেছনে অদৃশ্য কোনো শক্তি কাজ করছে। ভয়ংকর কোনো শক্তি।'
ডাক্তারের কথা শুনে হাফ ছেড়ে দিয়ে অসহায়ভাবে তাকালো ইলিশা জারার দিকে। তারপর জারাকে দু'হাতে ধরে দাঁড় করিয়ে বললো,
-চল জারা, ফিরে যায়।
-তুই চলে যা ইলিশা, আমার কারণে তুই নিজেকে এই বিপদে জড়াস না...
-তোর এই বিপদটা তো আমারই জন্য হয়েছে। ঐদিন লোকটাকে তোর কাছে না পাঠালে হয়তো তোর এই বিপদটা হতো না।' জারাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো ইলিশা। জারা ইলিশাকে শান্ত হতে বলে কৃত্রিম হাসার চেষ্টা করলো,
-সব ঠিক হয়ে যাবে রে, চল... আমার কিছুই হবে না।'
ইলিশা জারাকে দু'হাতে ধরে হাসপাতাল থেকে বের করে আনলো।
সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
রাত! পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে ইলিশা আর জারা। চারপাশটা নির্জন। হঠাৎ নির্জনতা ভেদ করে খটখট শব্দ হলো। দরজা ঠেলে কে যেন প্রবেশ করলো ভেতরে। পুরো রুমে কয়েকবার পায়চারি করলো আগন্তুক। তারপর জারার শিয়রে এসে থামলো। আত্মচিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে উঠলো জারা। সুইচ টিপে আলো জ্বালালো সে। ইলিশাও উঠে বসলো চিৎকার শুনে। জারা কাঁপছে।
-কী হয়েছে জারা?' আলতো কণ্ঠে ইলিশা জিজ্ঞেস করলো।
-ভয়ংকর এক স্বপ্ন দেখেছি। আমার পেট চিরে ভয়ংকর এক শয়তান বের হয়ে এসেছে। আর সে আমার মৃত্যু দেখার জন্য আমার মাথার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কী অদ্ভুত দাঁত বের করে হাসছিল আমার দিকে তাকিয়ে!'
গ্লাসে করে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো ইলিশা জারার দিকে। জারা পানিটুকু পান করে কাঁপতে কাঁপতে বললো,
-ভয়ংকর কিছু ঘটতে চলেছে ইলিশা। আমি এক শয়তানকে পেটে ধরেছি, ও জন্ম নিলে সবকিছু ধ্বংস করে দিবে। আমার খুব ভয় হচ্ছে রে।
-ভয় পাস না জারা। ওটা কেবল স্বপ্ন। স্বাভাবিক হ তুই। ভুলে যা স্বপ্নটাকে।
-ভুলে যাওয়ার মতো স্বপ্ন না এটা। শয়তানটা ঠিক এইখানে এসে দাঁড়িয়েছিল। ওকে কিছুতেই জন্মাতে দেয়া যাবে না। আর এ জন্য প্রয়োজন আমার নিজেকে শেষ করে দেয়া। আমি মারা গেলে হয়তো ও আর জন্ম নিতে পারবে না।' বলেই বিছানা থেকে নেমে বের হয়ে যেতে চাইলো জারা।
-কী পাগলামি করছিস তুই?' চিৎকার করে জারার হাত ধরে ফেললো ইলিশা।
-আমাকে তুই বাধা দিস না। আমাকে মরতেই হবে।' জোরে ধাক্কা দিলো জারা ইলিশাকে। বিছানায় চিত হয়ে পড়লো ইলিশা। সে উঠার আগেই জারা বের হয়ে গেল রুম থেকে। আর ইলিশা যাতে বের হতে না পারে, তাই বাহির থেকে লক করে দিলো। ভেতর থেকে জারার নাম ধরে চিৎকার করতে লাগলো ইলিশা। তার ডাকে সাড়া দিলো না জারা।
.
.
মোটা একটা রশি খুঁজে নিয়ে দৌড়ে চললো জারা অন্ধকারে। কিছুক্ষণ দৌড়াতেই ল্যাম্পপোস্টের আলো দেখতে পেল। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে এবার গতি কমিয়ে হাঁটতে লাগলো সে। আশেপাশে কোনো জনমানব নেই। রাস্তার ধারে শুয়ে থাকা কয়েকটা কুকুর উঠে পালিয়ে গেল তাকে দেখে। হাঁটতে হাঁটতে একটা বড় গাছের নিচে এসে দাঁড়ালো সে। হাঁটুগেড়ে বসে কিছুক্ষণ রশিটা বুকে চেপে ধরে কাঁদলো। তারপর চোখ মুছে রশিটা গাছের সাথে বেঁধে ফাঁস তৈরি করলো। যখনই গলায় সে ফাঁসটা পরতে যাবে তখন চারপাশে জোরে বাতাস বইতে শুরু করলো। আশেপাশে হতভম্ব হয়ে তাকালো জারা। প্রচণ্ড বাতাসে গাছটা দুলতে লাগলো এপাশ ওপাশ। একসময় মাটির ভেতর থেকে শিকড় উপড়ে জোরে শব্দ করে পড়লো গাছটা। হাত দিয়ে কান চেপে ধরলো জারা। বুঝতে পেরেছে সে, অদৃশ্য শক্তিটা তাকে সহজে মরতে দেবে না। পেটের শয়তানটাকে পৃথিবীতে এনেই ছাড়বে। হু হু করে কাঁদতে লাগলো জারা। কী করবে বুঝতে পারলো না। কিন্তু শয়তানটাকে এইখানে জন্মাতে দেয়া যাবে না। তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো দূরে কোথাও চলে যাবে, মানবশূন্য কোনো জায়গায়।
আবারও দৌড়াতে থাকে জারা। রাতের অন্ধকার কেটে ভোরের আলো ফুটতে থাকে চারপাশে। জারা এসে হাজির হয় একটা সাগরের তীরে। সাগরে তখন উত্তাল ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে নাম না জানা কতগুলো পাখি। হা করে চেয়ে থাকলো জারা পাখিগুলোর দিকে। খাবারের খোঁজে বের হয়েছে ওরা। বাঁচার জন্য তারা সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কিন্তু জারা মরার জন্য সংগ্রাম করেও পারছে না। হঠাৎ আকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে ঝাপ দেয় সে উত্তাল সাগরে। সাঁতার জানে না সে। হারিয়ে যেতে থাকে সাগরের অতল জলে। বাঁচার চেষ্টা করলো না সে মোটেও। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। এবার হয়তো সে মরবেই। মরে গিয়ে শয়তানের তাণ্ডবলীলা থেকে বাঁচিয়ে দেবে মানব সমাজকে। জলের ভেতর চোখ বুঝলো সে, তখনই অনুভব করলো দ্বিতীয় কারও অস্তিত্ব। একটা অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেন। জ্ঞান হারালো জারা।
[[চলবে...]]



إرسال تعليق