![]() |
| সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস |
"দ্যা ম্যানিটু"
মূল - গ্রাহাম মাস্টারটন
রূপান্তর - অনীশ দাস অপু
(পর্ব ৬)
গােয়েন্দা চলে যাবার পরে বসে বসে আমি কিছুক্ষণের জন্য নিমগ্ন হয়ে গেলাম চিন্তায়। তারপর ফোন তুলে ডায়াল করলাম সিস্টারস অব জেরুজালেম হাসপাতালে।
‘হ্যালাে,' বললাম আমি, আমি আপনাদের এক রােগী, মিস ক্যারেন ট্যান্ডির
খবর জানতে ফোন করেছি। আজ সকালে অপারেশন করার জন্য সে
হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।'
‘হােন্ড অন, প্লিজ । আপনি কি তার আত্মীয়?'
‘জি,' মিথ্যা বললাম আমি। আমি ওর আঙ্কেল। শহরে মাত্র এসেছি। এসেই
শুনি ক্যারেন অসুস্থ।'
‘এক মিনিট, প্লিজ।
অপেক্ষা করতে করতে টেবিলে আঙুল দিয়ে ড্রাম বাজাতে লাগলাম। ফোনে
হাসপাতালের নানান শব্দ আবছা ভাবে ভেসে আসছে।
কে যেন হাঁক ছাড়ল, ‘ড, হিউজেস, প্লিজ, ড, হিউজেস। মিনিট খানেক পরে
আরেকটি কণ্ঠ বলল, হােল্ড অন, প্লিজ।
আমি ফোন ধরে রইলাম নানান আওয়াজ শুনতে শুনতে।
অবশেষে নাকি সুরে এক মহিলা বলল, ‘ক্যান আই হেল্প ইউ? মিস ক্যারেন
ট্যান্ডির খবর জানতে চাইছেন?'
অ, আমি ওর আঙ্কেল। শুনলাম আজ সকালে ওর অপারেশন হয়েছে। ও সুস্থ
আছে কিনা জানতে ফোন করেছি।'সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
ড. হিউজেস বলেছেন রোগিণীর কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে । মিস ট্যান্ডিকে
এখন ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। আরেকজন ডাক্তার আসছেন ওকে দেখতে।
জটিলতা?' জানতে চাইলাম আমি। কী ধরনের জটিলতা?'
আমি দুঃখিত, স্যার। ফোনে এতকিছু বলা যাবে না। আপনি বিস্তারিত
জানতে চাইলে ড. হিউজেসের সঙ্গে যােগাযোগ করুন। তার সঙ্গে আপনার
একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।'
হমম,' বললাম আমি। তার অবশ্য দরকার হবে না । আমি কি কাল একবার
আপনাকে ফোন করে মেয়েটির খবর জানতে পারি?'
পারেন, স্যার।'
ফোন নামিয়ে রাখলাম । আমার চিন্তা করা উচিত হচ্ছে না, তবু দুশ্চিন্তা
লাগছে। গত রাতে কার্ডে যেরকম উল্টো পাল্টা জিনিস দেখলাম
মিসেস হার্জের যেভাবে অপঘাতে মৃত্যু ঘটল, আর ক্যারেন ও তার
আজব ওই দুঃস্বপ্ন- সব মিলিয়ে বিষয়গুলাে যেমন অস্বস্তিকর।
রহস্যময়। সত্যি কি এর সঙ্গে শক্তিশালী, অশুভ কোনাে কিছু জড়িত,
আমার সবুজ টেবিলে ফিরে এলাম। ক্যারেন ট্যান্ডির লেখা চিঠি এবং আঁকা
ছবি বের করলাম। উপকূল, জাহাজ এবং পতাকার ছবি একটি সমস
সমাধানে তিনটা কাল্পনিক ক্লু। অথচ এ সমস্যার অস্তিত্বই হয়তাে নেই। আমি
কাগজগুলাে ভাঁজ করে পকেটে রাখলাম, গাড়ির চাবি নিয়ে রওনা হলাম
লাইব্রেরিতে । ছবির মালমশলাগুলাে একটু চেক করে দেখব।
গন্তব্যে পৌছে দেখি লাইব্রেরি বন্ধ হতে আর বেশি দেরি নেই। আমি
ঠেলেঠুলে কুগারটা খুদে একটি পার্কিং স্পেসে ঢােকালাম । আকাশের রং গাঢ়
তামাটে সবুজ। তার মানে আরাে তুষারপাত হবে। কনকনে শীতল হাওয়া
আমার নকশা করা ওভারকোটের মধ্যে হু হু করে ঢুকছে। গাড়ির দরজা বন্ধ
করলাম । গােড়ালি ডােবা নরম, থকথকে বরফ-কাদার মধ্যে কসরত করে
হেঁটে এগােলাম লাইব্রেরির কাঠের দরজার দিকে।
লাইব্রেরির ভেতরে, ডেস্কের পেছনে যে মহিলা বসে আছে তাকে লাইব্রেরিয়ান
নয় স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত ম্যাডামের মতাে লাগছে। সে টাইট, লাল একটি
কার্ডিগান পরেছে, চুড়াে করে বাঁধা কালাে চুল, দাঁতগুলাে ঘােড়ার মতাে।
“আমি জাহাজ খুঁজছি,' জুতাের বরফ ঝাড়তে ঝাড়তে বললাম আমি ।
‘তাহলে জাহাজ ঘাটায় যাচ্ছেন না কেন?' মুচকি হাসল সে। আমাদের এখানে
শুধু বই পাওয়া যায়।
হা হা, শীতল গলা আমার। জাহাজের ওপরে বই কোথায় পাওয়া যাবে বলুন তাে?
ওপরে, ছয় এবং সাত নম্বর তাকে।' জবাব দিল মহিলা।
আমি সিড়ি বেয়ে চলে এলাম দোতলায় । জাহাজ যে কত রকমের হতে পারে
সে সম্পর্কে আমার কোনাে ধারণাই ছিল না। আমি শুধু জানতাম জাহাজ
তিন রকমের- বড়, ছােট এবং এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার। কিন্তু মেরিন
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর গােটা পনেরাে বই ঘাটতে গিয়ে বুঝতে পারলাম
কঠিন একটা কাজ হাতে নিয়েছি। কত রকমের নৌযান যে
আছে দুনিয়ায়!
(আরব নাগরিকদের ব্যবহৃত এক মাস্তুলের জাহাজ), জেবেক, বাক, ব্রিগ,
ফ্রিগেট করভেট, ডেস্ট্রয়ার (রণতরী), জলি-বােট, ডিঙ্গি, কোরাকুল (ভেলা),
ও টাগসহ আরাে কত কী। এর মধ্যে অর্ধেকের চেহারা হুবুহু ক্যারেনের
হাস্যকর ভাবে আঁকা ছবির জাহাজটির মতাে।
করে দুর্ঘটনাক্রমে আসল জলযানটির সন্ধান আমি পেয়ে গেলাম । ছয় সাতটি
বই একসঙ্গে নিতে গিয়ে হাত ফস্কে দুম করে বইগুলাে পড়ে গেল মেঝেয় ।
চশমা পরা এক বুড়াে সীলের ওপর লেখা ধুমসী সাইজের একটি বই পড়ছিল,
আমার দিকে কটমট করে তাকাল।
‘দঃখিত,' ক্ষমাপ্রার্থনার সুরে বললাম আমি। মেঝেতে ছিটিয়ে পড়া বইগুলাে
জড়াে করছি, এমন সময় ওটাকে দেখতে পেলাম। একদম আমার নাকের
ডগায়। আমার কাছে সবরকম পালতােলা জাহাজই ‘গ্যালিঅন'। তবে এ
জাহাজটির কাঠামাে এবং মাস্তুলে ভিন্ন রকম একটি ব্যাপার রয়েছে। এটি
ক্যারেনের সেই স্বপ্নের জাহাজ।
ছবির নিচের ক্যাপশনে লেখা Dutch Man of war, circa 1650।
আমার ঘাড়ের পেছনটা শিরশির করে উঠল। মিসেস হার্জ আমার ফ্ল্যাটে বসে
বিড়বিড় করে কী যেন বলছিলেন? ডিবুট, মিজনহির ডিবুট।
![]() |
| সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস |
🏵সাত🏵
জাহাজের ছবি আঁকা বইটি বগলে চেপে রওনা হলাম নিচে, বিদেশি ভাষার
শাখায়। ইংলিশ-ডাচ অভিধান ঘাঁটতে লাগলাম। কয়েকটা পৃষ্ঠা ওল্টানাের
পরে পেয়ে গেলাম শব্দটা। ডি বুট মানে জাহাজ।
আমি সব কিছু যুক্তি দিয়ে বিচার করতে ভালােবাসি। কিন্তু তারপরও
কাকতালীয় কিছু ব্যাপার আছে যা এড়ানাে যায় না। ক্যারেন সপ্তদশ শতকের
ওলন্দাজ জাহাজ নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখেছে। আর মিসেস হার্জ হ্যালুসিনেশন
দেখতে শুরু করেন নাকি ঈশ্বরই জানেন তিনি কী দেখছিলেন। কীভাবে এবং
কেন এসব প্রশ্নের জবাব আমার কাছে এখন নেই। তবে আমার মনে হচ্ছে
জাহাজের ছবি দেখার কারণে যদি মিসেস হার্জের মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে
একই ঘটনা ক্যারেন ট্যান্ডির জীবনেও ঘটতে পারে।
আমি ফিরে এলাম ডেস্কে। জাহাজের বইটির দাম চুকিয়ে দিলাম ।
ঘােড়ামুখীটা আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। আমি ওর হাসি মােটেই
উপভােগ করতে পারছি না। এরকম বিশ্রী হাসি দেখলে রাতে দুঃস্বপ
হয়, অন্য কোনাে চিন্তা মাথায় থাকলে তা দুদ্দাড় পালিয়ে যায়।সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
‘বইটি আশা করি উপভােগ করবেন,' বলল বুড়ি মাগী ঠোটে মুচকি হাসি
রেখা ধরে রেখে। আমি মুখ ভেংচে চলে এলাম ।
বাইরে এসে একটা ফোন বুথ খুঁজে নিলাম। তবে হাড় জমানাে বাতাস
বরফের মধ্যে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলাে কারণ এক মুটকি মিনেসে
তার বােনের সঙ্গে কথা বলছে। এ ধরনের ফোনালাপের লেজ ক্রমে কত
হতেই থাকে জানেন আপনারা, যখন আশান্বিত হয়ে উঠবেন বকবকানির
অবসান ঘটতে যাচ্ছে, আপনার আশার আগুনে জল ঢেলে নতুন উদ্যমে আবার শুরু
হয়ে যাবে ম্যারাথন কথা। শেষে বিরক্ত হয়ে কাচের দরজায় আমাকে
টোকা দিতেই হলাে। মহিলা জ্বলন্ত চোখে আমাকে ভস্ম করে দেওয়ার বৃথা
চেষ্টা করে তার মহা কাব্যিক আলাপের সমাপ্তি টানল ।
ফোন বুথে ঢুকে একটা মুদ্রা ফেললাম । সিস্টারস অব জেরুজালেমের নাম্বারে
ডায়াল করে চাইলাম ড. হিউজেসকে । চার-পাঁচ মিনিট ফোন ধরে রাখতে
হলাে। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ে যাতে ঝিঝি ধরে না যায় সে জন্য
পা নাড়াচ্ছি । অবশেষে ডাক্তারের সাড়া মিলল।
‘ড. হিউজেস বলছি। আপনি কে বলছেন, প্লিজ?
‘আপনি আমাকে চিনবেন না, ড. হিউজেস,' জবাব দিলাম আমি, আমার নাম
হ্যারি আসকিন। আমি একজন অলােকদ্রষ্টা।'
‘অলােক কী?
‘জ্যোতিষী। লােকের হাত দেখে ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিই।'
‘ওয়েল, আয়াম সরি, মি. আর্সকিন, তবে-
“না, প্লিজ,' বাধা দিলাম আমি। এক মিনিট শুনুন । গতরাতে আপনার এক
পেশেন্ট আমার কাছে এসেছিল হাত দেখাতে। রােগিণীর নাম ক্যারেন
ট্যান্ডি।'
ড. হিউজেস, মিস ট্যান্ডি আমাকে বলেছে যেদিন সে টের পেল তার ঘাড়ে ওই
টিউমারটি গজিয়েছে সেদিন থেকে সে বিকট সব দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করে।
এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, অধৈর্য গলা ডাক্তারের। 'আমার অনেক পেশেন্ট
তাদের রােগের কারণে নানান স্বপ্ন দেখে।
“কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয় ড, হিউজেস। ক্যারেনের দুঃস্বপ্ন ছিল অত
পরিষ্কার এবং সুনির্দিষ্ট। সে একটি জাহাজের স্বপ্ন দেখত। যেমন -তেমন জাহাজ
নয়। সে তার স্বপ্নের জাহাজের ছবিও একে আমাকে দিয়েছে।১৬৫০
খ্রীস্টাব্দের একটি ওলন্দাজ যুদ্ধ-জাহাজ।
"মি আর্সকিন,' বললেন ড. হিউজেস। আমি অত্যন্ত ব্যস্ত একজন মানুষ।
আমি জানি না আমি...'
সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
"ড. হিউজেস, আমার কথা স্রেফ শুনে যান,' অনুনয় করলাম আমি ।
গরপর যা বলার বলবেন। আজ সকালে আমার এক ক্লায়েন্ট আমাকে হাত
দেখাতে এসেছিলেন। তিনি ডাচ ভাষায় একটি জাহাজের কথা বলতে থাকেন।
কোনাে ওলন্দাজ তার সামনে খড়ম পড়ে এসে একগুচ্ছ টিউলিপ দিলেও তিনি
তাকে ডাচম্যান বলে চিনতে পারবেন না । এই ভদ্রমহিলা হঠাৎ খুব উত্তেজিত
হয়ে ওঠেন। তারপর একটি অ্যাক্সিডেন্ট ঘটান।
কী ধরনের অ্যাক্সিডেন্ট?
তিনি সিঁড়ির ওপর থেকে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে যান। পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধা,
পতনের ধকল সামলাতে পারেননি।" ও প্রান্তে নীরবতা।
‘ড, হিউজেস,' বললাম আমি । আপনি লাইনে আছেন তাে?'
“জি, আছি । আচ্ছা, মি, আর্সকিন, আপনি এসব গল্প আমাকে শােনাচ্ছেন কেন?
কারণ আমার ধারণা এ মৃত্যুর সঙ্গে ক্যারেন ট্যান্ডির একটা সম্পর্ক রয়েছে।
সকালে শুনলাম তার নাকি কীরকম জটিলতা দেখা দিয়েছে। ক্যারেনের দুঃস্বপ্ন
ইতিমধ্যে আমার একজন ক্লায়েন্টকে হত্যা করেছে। আমার আশংকা, এরকম
ঘটনা আবার ঘটতে পারে।'
আবারও নীরবতা তবে এবারে দীর্ঘতর।
অবশেষে ড. হিউজেস বললেন, ‘মি, আর্সকিন, আমি একটি নিয়মবহির্ভূত
কাজ করতে যাচ্ছি। আমি বলছি না যে আপনি যে উপসংহারে পৌছুতে
চাইছেন তা আমি বুঝতে পেরেছি। তবে আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি
আমার পেশেন্টের রােগের ধরন সম্পর্কে জানেন। আপনি কি হাসপাতালে
এসে বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান? এটা ঠিক, ক্যারেন ট্যান্ডিকে
নিয়ে আমরা এ মুহূর্তে বেশ ঝামেলায় আছি। কী করব বুঝতে পারছি না।
কাজেই আপনার কথা শুনলে মেয়েটার যদি সামান্য উপকারাে হয়, শুনতে
আমার আপত্তি নেই।
এই তাে আপনি লাইনে এসেছেন।' বললাম আমি। আমাকে পনেরাে মিনিট
সময় দিন। চলে আসছি। রিসেপশনে শুধু আপনার নাম বললেই তাে হবে?
হ্যাঁ, ক্লান্ত গলায় বললেন ড. হিউজেস। শুধু নাম বললেই হবে।
![]() |
| সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস |
🏵আট🏵
আবার তুষারপাত শুরু হয়ে গেছে, রাস্তা বরফ-কাদায় মাখামাখি হয়ে পিচ্ছিল
এবং বিপজ্জনক। হাসপাতালের বেজমেন্টে গাড়ি ঢোকালাম। এলিভেটর চেপে
চলে এলাম রিসেপশন ডেস্কে।
কোলগেট হাসির মেয়েটি বলল, “হ্যালাে, মি. ইনক্রেডিবল হ্যারি আর্সকিন।
‘হ্যালাে,' হাসি ফিরিয়ে দিলাম আমি। “ড, হিউজেসের সঙ্গে দেখা করা যাবে,
ওঁর সঙ্গে আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।'
ডাক্তারের অফিসে ফোন করল মেয়েটি তারপর আমাকে আঠারাে তলায় যেতে
বলল। আমি এলিভেটরে উঠে পড়লাম। ভেতরটা বেশ গরম। এলিভেটর
থেকে নামতেই পুরু কার্পেটে মােড়া করিডাের। আমার সামনে, দরজার
তক্তিতে একটি নাম খােদাই করা, ‘ড. হিউজেস'।
আমি দরজায় নক্ করলাম।
ড. হিউজেস ছােটখাট গড়নের মানুষ। চেহারায় বেজায় ক্লান্তির ছাপ। দেখে
মনে হলাে এ মানুষটার ক'টা দিন কোথাও ছুটি কাটিয়ে আসা উচিত।
‘মি, আসকিন? আমার সঙ্গে হাত মেলালেন তিনি। বসুন। কফি চলবে?
নাকি অন্য কিছু খাবেন?
কফিই যথেষ্ট।
ডাক্তার তার সেক্রেটারিকে ইন্টারকমে নির্দেশ দিলেন দু'কাপ কফি পাঠিয়ে
দিতে। তারপর পিঠ এলিয়ে দিলেন কালাে, বড় সুইভেল আর্মচেয়ারে। মাথার
পেছনে হাত বাঁধলেন ।
‘বহু দিন ধরে টিউমার নিয়ে আমার কাজ-কারবার, মি, আর্সকিন। এমন
কোনাে টিউমার নেই যা আমি চিনি না বা দেখিনি। আমার রাজত্বে আমাকে
একজন এক্সপার্ট বলতে পারেন। কিন্তু সত্যি বলতে কী, ক্যারেন ট্যান্ডির ঘাড়ে
যে জিনিসটি গজিয়েছে ওরকম টিউমার আমি জন্মে দেখিনি। দেখে আমি
রীতিমতাে হতভম্ব।'
একটা সিগারেট ধরালাম। ওটার বিশেষত্ব কী?'
‘এটা মােটেই সাধারণ কোনাে টিউমার নয়। এর মধ্যে টিউমারের কোন
টিস্যুই নেই। যা আছে তা হলাে দ্রুত বর্ধমান চামড়া এবং হাড়ের একটা
টিউমারকে দেখে মনে হয় ভ্রণ।।
‘ভ্রূণ মানে-শিশু? ক্যারেনের ঘাড়ে একটা শিশু বেড়ে উঠছে? আপনার
মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না আপনার কথার।
কাঁধ ঝাঁকালেন ড. হিউজেস।
আমারও একই অবস্থা, মি, আর্সকিন। ভুল
জায়গায় ভ্রূণ জন্মানাের হাজারও ঘটনা আছে। কিন্তু ঘাড়ে কোনােদিন ভ্রণ
বের কথা শুনিনি, দেখা দূরে থাকি। আর ভ্রণটা অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়ে
চলেছে।'
"আপনি না আজ সকালে ওর অপারেশন করেছেন? আমি ভাবলাম অপারেশন
করে টিউমারটাকে ফেলে দিয়েছেন।'
মাথা নাড়লেন ড. হিউজেস। সেরকমই ইচ্ছে ছিল। আমরা একে অপারেশন
টেবিলে নিয়ে গিয়েছিলাম। অপারেশনের যাবতীয় প্রস্তুতি ছিল সম্পন্ন । কিন্তু
সার্জন ড, গিলবার্ট যে-ই টিউমারকে কাটতে গেছেন, ক্যারেনের পালসরেট
এবং শ্বাস-প্রশ্বাস এমন দুর্বল হয়ে গেল যে আমরা সঙ্গে সঙ্গে থেমে যেতেসেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
বাধ্য হলাম। আর দুই-তিন মিনিট অপারেশন চালালেই ও মারা যেত। আরাে
কয়েকটা এক্স-রে করে আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়।'
এর কোনাে কারণ ছিল কী?' জিজ্ঞেস করলাম আমি। মানে জানতে চাইছি
ক্যারেন এত অসুস্থ হয়ে পড়ল কেন?'
জানি না,' সরল জবাব ডাক্তারের। আমি এ মুহূর্তে ক্যারেনের কয়েকটি টেস্ট
করছি। তাতে হয়তাে জবাবটা পাব। কিন্তু এর আগে কখনাে এরকম
অভিজ্ঞতা হয়নি আমার। অন্য সকলের মতাে আমিও বিমূঢ় হয়ে পড়েছি।
ভ, হিউজেসের সেক্রেটারি দু'কাপ কফি এবং কিছু বিস্কিট নিয়ে ঢুকল ঘরে।
আমরা কিছুক্ষণ নিঃশব্দে পান করলাম কফি, তারপর ডাক্তারকে লাখ টাকার
প্রশ্ন করলাম।
ভ, হিউজেস,' বললাম আমি, আপনি কি ব্ল্যাক ম্যাজিকে বিশ্বাস করেন?
আমার দিকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন তিনি। তারপর বললেন,
না, বিশ্বাস করি না।'
আমিও করি না,' বললাম আমি। তবে যে বিষয়টি নিয়ে আমার কাজ-কারবার
তাতে এমন অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে যায় যা রীতিমতাে ধন্ধে ফেলে দেয়
আমাকে। ক্যারেন ট্যান্ডির আন্টিও আমার ক্লায়েন্ট, ক্যারেনের মতাে একই
স্বপ্ন দেখেছেন তিনিও। তবে তাঁর স্বপ্ন অতটা পরিষ্কার এবং ভীতিকর ছিল
না- কিন্তু স্বপ্নটা একই ধরনের।
তাে?' জিজ্ঞেস করলেন ড. হিউজেস। এ দিয়ে আপনি কী বােঝাতে চাইছেন,
অলােকদ্রষ্টা সাহেব?
মেঝেয় চোখ ফিরিয়ে নিলাম আমি। আমি কিন্তু বিরাট কোনাে অলােকদ্রষ্টা নই
ডাক্তার সাহেব । লােকের হাত দেখে আমি নিজের পেট চালাই। তবে
ভূত-প্রেত কিংবা আধিভৌতিক বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যদি
আমার মনে হচ্ছে ক্যারেনের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী বহির্জগতের কোন
প্রভাব। কোনাে কিছু ওকে এ স্বপ্নগুলো দেখাচ্ছে এবং এ স্বপ্নের কারণেই ওর ঘাড়ে
টিউমার হয়েছে, অসুস্থ হয়ে পড়েছে মেয়েটি।
সন্দেহ ডাক্তারের চোখে ‘আপনি কি বলতে চাইছেন ক্যারেনকে ভূতে ধরেছে,
দ্য এক্সরসিস্ট-এর মতাে কিছু?
‘না, আমি তা বলছি না। আমি ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি না। তবে আমি বিশ্বাস
করি একজন মানুষ আরেকজনকে মনের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে । পারে
কর্তত্ব খাটাতে । এবং আমার ধারণা কেউ বা কিছু ক্যারেনকে নিয়ে এখন সে
কাজটি করছে। কেউ ওর কাছে মেন্টাল সিগন্যাল পাঠাচ্ছে । আর সংকেতটা
এতই শক্তিশালী যে অসুস্থ হয়ে পড়েছে ক্যারেন ।
‘কিন্তু ওর আন্টি? কিংবা আপনার সেই বৃদ্ধা ক্লায়েন্ট যিনি আজ সকালে সিডি
দিয়ে পড়ে মারা গেছেন?
মাথা নাড়ালাম আমি। আমার মনে হয় না ওটা সত্যি ওদের ক্ষতি করতে
চেয়েছে। তবে এটা যে কোনাে শক্তিশালী সংকেতের মতােই । পাঠানাে হয়েছে
অল্প দূরত্ব থেকে-যাতে যে কোনাে রিসিভার সংকেতটা গ্রহণ করতে পারে।
মিসেস বারম্যান এবং মিসেস হার্জ দুজনেই ক্যারেনের ঘনিষ্ঠ কিংবা যে
জায়গায় সে ছিল সেখান থেকে ওদের জায়গাটার দূরত্ব বেশি নয়, ওঁরা মেইন
ট্রান্সমিশন থেকে সংকেত গ্রহণ করেছেন।'
সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
চোখ ঘষলেন ড. হিউজেস, তারপর আমার দিকে সরু দৃষ্টিতে তাকালেন।
“আচ্ছা ধরে নিলাম কেউ ক্যারেন ট্যান্ডির কাছে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে তাকে অসুস্থ
করে তােলার জন্য। কিন্তু কারা তারা এবং কেনই বা এ কাজ করছে?'
‘এ প্রশ্নের জবাব আপনার মতাে আমারও জানা নেই। ক্যারেনের সঙ্গে এ
বিষয়ে সরাসরি কথা বললে ভালাে হয় না?
দুহাত সামনে মেলে দিলেন ড. হিউজেস। ওর অবস্থা খুবই খারাপ। ওর বাপ
মা ওকে দেখতে আসছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলা গেলে মন্দ
হয় না।'
ফোন তুলে সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বললেন ডাক্তার। একটু পরে সেজে
ইন্টারকমে জানাল ক্যারেনের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা সে করে
ফেলেছে।
‘আপনাকে সার্জিকাল মাস্ক পরতে হবে, মি, আর্সকিন,' বললেন ড. হিউজেস"
ক্যারেন বড় দুর্বল । চাই না ওর শরীরে আর কোনাে রােগ জীবাণু ঢুকুক।
“আচ্ছা, ঠিক আছে।
নেমে এলাম দশ তলায় । ড. হিউজেস আমাকে নিয়ে ড্রেসিংরুমে চলে
এলেন। সবুজ সার্জিকাল রোব চড়লাম গায়ে, মুখে মুখােশ । ড. হিউজেস
বললেন ক্যারেনের অবস্থা যদি দেখা যায় বেশি খারাপ তাহলে আমি তার সঙ্গে
কোনাে কথা বলার সুযোগ পান না ।
সেরা রোমান্টিক গল্প উপন্যাস
মি আপনাকে ওর কাছে নিয়ে যাচ্ছি শুধু একটাই কারণে যে আপনার তত্ত্বে
যুক্তি আছে, মি, আসকিন। আর তত্ত্ব দিয়ে যদি কেউ আমাদের সাহায্য করতে
চায় তাহলে আমরা না করতে পারি না। তবে ব্যাপারটা কিন্তু একেবারেই আন
অফিশিয়াল । আপনাকে কেন এখানে নিয়ে এলাম সে বিষয়টি আমাকে যেন
কারাে কাছে ব্যাখ্যা করতে না হয়।'
আপনার কথা আমি বুঝতে পেরেছি,' বললাম আমি, ডাক্তারের পেছন পেছন
করিডাের ধরে চললাম ক্যারেনের ঘরে ।
চলবে.......



إرسال تعليق