গোয়েন্দা সিরিজঃ আত্নহত্যা অথবা খুন পর্ব ০১ ( গল্প শেয়ার)



 গল্পঃ- আত্মহত্যা অথবা খুন


এক.


মিশরের হাজার বছরের পুরানো মমির মতো সোজা হয়ে কেউ আত্মহত্যা করতে পারে ব্যাপারটা সত্যিই তাজ্জব!মানে মৃত্যুর যন্ত্রনা যেন স্পর্শই করতে পারেনি তাকে।কলেজ পড়ুয়া তুলির নিথর দেহ বিছানায় পড়ে আছে।দেখে মনে হবে,যেন বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেছে তুলি।অথচ তুলির মৃত্যু হয়েছে দিনের আলোর মতো এটাই সত্যি।মেয়েটির মুখের বামপাশে ঠোঁটের কোণায় সাদা ফেঁনার মতো কিছু বেরিয়ে আছে।বালিশের পাশেই পড়ে আছে রিলাক্সিন-৫ নামক ঔষধ। তুলির বাবা হাসনাত করিম সাহেব মাথায় হাত দিয়ে মেঝেতে বসে আছেন।সকাল থেকে কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে এখন দিকশূন্য।মেয়ের শোকে পাগল প্রায় তিনি।নির্বিকার হয়ে মাথায় হাত দিয়ে তাকিয়ে আছে তুলির মৃতদেহের দিকে।মৃতদেহের পাশে দুজন পুলিশ বেশ বিচক্ষণতার সাথে আলামত খুঁজে দেখছে।কোনো কিছুই যেন বাদ না পড়ে যায়।তবে দুজনের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে,তারা অযথা সময় নষ্ট করছে।মৃত্যুর কারন একদমই স্পষ্ট দুজনের কাছে।লাশের আশপাশে কিছু না পেয়ে পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসার এসআই আনিসুর রহমানকে মাথা নেড়ে ইশারা দিল দুজনেই।এসআই আনিসুর রহমান সম্পর্কে হাসনাত করিমের পরিচিতই বটে।দূর সম্পর্কের তুলির মামা হন তিনি।রক্তের সম্পর্কের না হলেও তুলিকে আপন ভাগ্নির মতোই স্নেহ করেন।তুলির এমন অবস্থায় হতবাক তিনি।সকালে ফোনে মৃত্যুর খবর শুনে বিশ্বাসই করতে কষ্ট হচ্ছিল তুলির মতো চঞ্চল মেয়ে কিনা আত্মহত্যা করেছে।পুলিশ হিসেবে উপরে শক্ত মনে হলেও ভেতরটা হাহাকার করছে তুলির জন্য।


একটা সাদা ব্যাগে তুলির মৃতদেহ নিয়ে চলে গেছে সেই দুজন পুলিশের সদস্য।সন্দেহজনক তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি ওষধের প্যাকেট ছাড়া।রুমে এখন এসআই আনিসুর রহমান আর হাসনাত করিম ছাড়া কেউ নেই।এসআই আনিসুর রহমান ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে হাসনাত করিমের কাঁধে হাত রেখে নিচে বসে পড়লো।


হাসনাত করিম হঠাৎ আনিসুর রহমানকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন।আমার আর কেউ রইল না রে,আনিস।মেয়েটা চিরকালের মতো চলে গেল আমাদের ছেড়ে।আর কখনো আব্বু বলে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে না।


এসআই আনিসুর রহমানের চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে।হাসনাত করিমের পিঠে হাত রেখে বলল,আমি ঠিক বুঝতে পারছি না,দুলাভাই,তুলি হঠাৎ আত্মহত্যা করতে গেল কেন?মেয়েটার মাঝে তো এমন কিছু দেখিনি যে মানসিক চাপে পড়ে আত্মহত্যার মতো কাজ করতে গেল।


-গত দুইদিন আগেও "আত্মহত্যা বিরোধী" বিতর্ক অনুষ্ঠান শেষ করে রাতে আমাকে বলল,বাবা,যারা আত্মহত্যা করে তারা সবচেয়ে বড় ভুল করে।পৃথিবীটা এত সুন্দর।মানুষ কতদিনই বাঁচবে?তার আগেই আত্মহত্যা করে নিজেকে শেষ করে দেয়।আর এই মেয়েটাই কিনা আত্মহত্যা করে বসলো!


-আর দুলাইভাই,সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টা কি জানেন,আমার চাকরি জীবনে কাউকে এভাবে আত্মহত্যা করতে দেখিনি।মানে এমন সোজাভাবে বিছানায় পড়ে ছিল যে দেখে মনে হবে,ঘুমিয়ে আছে।কিন্তু সত্যি হলো এই যে,এতগুলো ঘুমের ঔষধ খেয়ে তুলি আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই।


হাসনাত করিম আবার কেঁদে উঠলেন জোরে।


-দুলাইভাই নিজেকে শক্ত করেন।আচ্ছা,সকালে তো দরজা-জানালা এভাবেই বন্ধ ছিল তাই না?নাকি আপনি বন্ধ করেছেন?জিজ্ঞেস করলো এসআই আনিসুর রহমান।


-না,আমি করিনি।তুলির দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘুমানোর অভ্যাস।রাতে নাকি ভয় লাগে মেয়েটার।ঘুমানোর আগে বারান্দার দরজা-জানালা নিজের হাতে বন্ধ করতো।হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন,আনিস?


এসআই আনিসুর রহমান পুরো রুমের দিকে একবার তাকালেন।দেয়ালে কাগজের তৈরি বিভিন্ন কারুকাজ শোভা পাচ্ছে।সবগুলোই তুলির নিজের হাতে তৈরি করা।টেবিলে গতরাতে গোছানো বইয়ের স্তপ পড়ে আছে।কিছুক্ষণ পর কি যেন ভেবে বলল,না,এমনি।দুলাইভাই,আমি দেখি,আজ সন্ধ্যার ভিতরে তুলির পোস্টমর্টেম শেষ করে লাশ হস্তান্তর করতে পারি কিনা।আপনারা বাকি ব্যবস্থাটুকু করুন।আর আপার দিকে একটু খেয়াল রাখবেন।


মেডিকেলে নতুন লাশ এসেছে।মর্গের দরজার তালা খোলা দেখে রোগীর সঙ্গে আসা অনেকেই কৌতহূলী হয়ে আশপাশে ঘুরঘুর করছে।খাকি পোশাক পরিহিত খোঁচা দাঁড়িতে একজন ঢুলুঢুলু শরীরে দরজার তালা খুলছে।লোকটার চোখদুটো ঘুমে কাবু হয়ে আছে।তালাতে চাবি ঢুকাতে কষ্ট হচ্ছে তার।বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় শেষে তালা খুলেছে।দরজার পাটাতন দু'পাশে সরিয়ে সাদা ব্যাগে মোড়ানো লাশটাকে ঠেলে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।একটু পরেই সাদা শার্ট পরিহিত ভদ্রলোক কৌতহূলী লোকদের ধমক দিয়ে বলল,এখানে দাঁড়িয়ে কি দেখছেন?যার যার কাজে যান।লোকটির গলায় ভ্যাকটর আইকন ঝুলছে।সম্ভবত সিনিয়র ডাক্তার হবেন।ওনার পেছনে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।ধমক খেয়ে সবাই চলে যেতেই তিনিও আর দাঁড়িয়ে রইলেন না।ছেলেটিকে ইশারায় পেছন পেছন আসতে বললেন।


-কি ব্যাপার,আজগর,ঘুম এখনও কাটেনি তাই না?বিরক্ত করে ফেললাম মনে হয়,বললেন তিনি।


খাকি পোশাকে থাকা লোকটি বলল,স্যার,মুর্দা কাটি ফজরের একটু আগে ঘুমাইছি।এখনও ঘুম যায় নাই।


-আচ্ছা তুমি এখন যাও।তোমার আর এখানে কাজ নেই।যাওয়ার আগে দরজা টেনে যেও।আরও একজন আসবে।


লোকটি আর একটি কথাও বললো না।ঘুম কাতর শরীরে আস্তে করে বেরিয়ে দরজা বাইরে থেকে টেনে চলে গেল।ডাক্তার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল,হাসপাতালে দিনে কখনো লাশ কাটা হয়না।এসব কাজ হয় রাত বারোটার পর।দিনের বেলায় এসব করলে অনেকেই বাইরে থেকে দেখার চেষ্টা করে।আর এসব দেখলে কেউ স্বাভাবিক থাকতে পারেনা।আমরা যখন মেডিকেলে ভর্তি হই,তখন প্রথম প্রথম অনেকেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।থাকুক সে কথা,সেগুলো অন্য একদিন বলবো।আর লোকটাকে যে দেখেছো,এরা রাতে নেশা করে তারপর এসব কাজে নামে।নেশার ঘোরে ঘুম ভাঙবে একেবারে সন্ধ্যায়।তখন দেখে মনেই হবে না,এরা রাতে নেশা করে ঘুমিয়েছিল।একদম সতেজ,জোরে হেসে উঠলেন ডাক্তার।


-আরে ডাক্তার সাহেব,এত খুশি যে?আমি তো ভাবলাম,আপনাকে অসময়ে বিরক্ত করে ডেকে আনলাম।সে কারনে রেগে থাকবেন,ভেতরে প্রবেশ করল এসআই আনিসুর রহমান।


-শুধু তোমার কারনে অফ ডিউটিতেও বাসা ছেড়ে বের হলাম।নাহলে এখন আমি বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিতাম,বন্ধু।


এসআই আনিসুর রহমান দরজা বন্ধ করে এসে বললেন,রফিক,আসলে এই মেয়েটি আমার দূর সম্পর্কের ভাগ্নি।হুট করে এমন কাজ করবে ভাবতেও পারিনি।আমি চাই যে,লাশ দাফনে যেন দেরি না হয়।


ডাক্তার রফিক কিছুটা ব্যথিত হয়ে বললেন,ওহ,দুঃখজনক ব্যাপার।আজকালকার বাচ্চাগুলোর ভেতরে ধৈর্য বলতে কিছু নেই।হুট করে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেনা।


এসআই আনিসুর রহমান বললেন,নিয়তি হয়তো তাই ছিল।আচ্ছা আপনার সাথে এই ছেলেটিকে তো ঠিক চিনলাম না।এই ছেলেটি কে?


ডাক্তার রফিক বললেন,ওর নাম ফারহান।সিটি কলেজেই পড়াশোনা করে।আমার সাথে পরিচয় হয়েছিল মাসখানেক আগে।তো ছেলেটা সাইন্স নিয়ে পড়ছে।সে কারনে লাশ নিয়ে ওর কৌতহূল।দেখলেই বলতো,একদিন মর্গে সরাসরি লাশ দেখবে।আজকে আমরা একা,সে কারণেই নিয়ে আসলাম।বেশ ভালো ছেলে।আর প্রচন্ড মেধাবী।


এসআই আনিসুর রহমান বললেন,আচ্ছা রফিক,লাশ বেশি কাটাছেঁড়া করতে হবে?মানে একটু ফ্রেশ রাখা সম্ভব হবে না?আমরা তো জানি,পোস্টমর্টেম করার পর লাশের আর কিছুই থাকে না।


ডাক্তার রফিক বললেন,বন্ধু,যেহুতু তোমার ভাগ্নি,আমি যত্নসহকারে কাজ করবো।চেষ্টা করবো,লাশের শরীরে দাগ কম পড়তে।


-ঠিক আছে কাজ শুরু করো।সন্ধ্যার মধ্যেই রিপোর্ট পেলে সবচেয়ে ভালো হয়।তাহলে রাতের মধ্যেই দাফন করা যাবে,বললেন এসআই আনিসুর রহমান।


সকাল পেরিয়ে দুপুর হতেই হাসনাত করিম উঠে দাঁড়ালেন।তুলির বিছানার পাশে সকাল থেকেই বসে ছিলেন একা একা।একটু আগে এসআই আনিসুর রহমান ফোন করে জানিয়েছে,মাগরিবের মধ্যে লাশ হস্তান্তর করার ব্যবস্থা হয়ে গেছে।এদিকে যেন লাশ মাটি দেয়ার জন্য আর দেরি না করে।হাসনাত করিম রুম থেকে বেরিয়ে দেখতে পেলেন,ওনার স্ত্রী সোফায় শুয়ে আছে।মাথা পানি ঢালছে পাশের ফ্ল্যাটের তনিমা ভাবি।সঙ্গে আশপাশের আরও অনেকেই আছে।হাসনাত করিম স্ত্রীর কপালে হাত রেখে বললেন,এই ফিরোজা,আনিস ফোন করেছিল।তুলিকে আজ মাগরিবের মধ্যে নিয়ে আসা হবে।মেয়েটাকে শেষবারের মতো দেখে নাও।আত্মীয়দের খবর দিতে হবে।নিজেকে শক্ত করো।আমাদের কপালে হয়তো উপরওয়ালা এমন কিছুই লিখে রেখেছিলেন।


পাশের ফ্ল্যাটের তনিমা ভাবি বলল,ভাই সাহেব,আপার তো জ্ঞান ফিরে নাই।সকাল থেকে পানি ঢালতেছি।কিছুক্ষণ চোখ মেলে চারদিকে দেখে।তুলির কথা মনে পড়লে আবার অজ্ঞান হয়ে যায়।


হাসনাত করিম একবার ওনার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দরজা ঠেলে বেরিয়ে পড়লেন বাইরে।এই দৃশ্য তিনি সহ্য করতে পারছেন না।পৃথিবীতে নিজ সন্তানের মৃত্যু মা-বাবার জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক।


বাদ এশার নামাজের পর তুলির দাফন সম্পন্ন হয়ে গেল।স্থানীয় কবরস্থানেই দাফন করা হয়েছে তুলিকে।জানাযার নামাজ শেষে মসজিদের মুয়াজ্জিন সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,"তুলিকে আমরা সবাই খুব পছন্দ করতাম।মেয়ে হিসেবে খুবই ভালো ছিল।কিন্তু এমন কান্ডে আমরা সত্যিই মর্মাহত।ছেলে-মেয়েরাগুলো বড্ড অধৈর্য।বাবা-মায়ের কথা একটুও চিন্তা করেনা।তবুও উপস্থিত সবাইকে বলছি,আত্মহত্যাকারী জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে যাবে।আমাদের কর্তব্য আমরা পালন করলাম মুসলিম হিসেবে।আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।"মুয়াজ্জিনের কথায় অনেকের চোখ পানিতে ভিজে উঠল।


লাশ দাফন শেষে সবাই এক এক করে চলে যেতেই হাসনাত করিম তুলির কবরের উপর শুয়ে পড়লেন।কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।বাবা হিসেবে সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।এলাকার কিছু মুরব্বি হাসনাত করিমকে ধরে বাড়ির গেইটের সামনে আনতেই পুলিশের গাড়ি এসে থামল।গাড়ি থেকে নেমে আসলো এসআই আনিসুর রহমান।রঙিন কাগজের মতো কিছু রয়েছে তার হাতে।এসে দাঁড়িয়ে বেশ আস্তে বলল,দুলাইভাই,আমি কিছুটা আশা রেখেছিলাম।কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছে,ঘুমের ঔষধ ছাড়া অন্য কোনো আঘাত বা কিছুর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।একটা কিংবা দুটো নয়,পুরো এগারোটা ঔষধ খেয়েছে তুলি।দুলাভাই,তুলি আত্মহত্যাই করেছে।


তুলির বাবা হাসনাত করিম চুপ করে রইলেন।এসআই আনিসুর রহমানের হাত থেকে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন গেইটের সামনে।


-দুলাইভাই আমাকে যেতে হবে।স্যারের থেকে ঘন্টাখানেকের ছুটি নিয়ে নামাজ পড়ে আবার রিপোর্ট আনতে চলে গিয়েছিলাম হাসপাতালে।হাতে সময় প্রায় শেষ।আমি সকালে একবার দেখে যাবো।আর যেকোনো প্রয়োজন হলে আমাকে বলবেন কিন্তু।আপাকে দেখবেন,সকাল থেকে কিছু মুখে দেয়নি।ওইযে,স্যারের ফোন চলে এসেছে।আমি আসছি তাহলে,এসআই আনিসুর রহমান গাড়িতে গিয়ে বসতেই সাইরেন বাজিয়ে একসময় অদৃশ্য হয়ে গেল পুলিশের গাড়িটি।


ঘড়িতে এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট।রিপোর্ট হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চোখ বুলিয়ে হাসনাত করিম ওনার স্ত্রী ফিরাজার পাশে গিয়ে বসলেন।ওনার স্ত্রী ফিরোজা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছেন।শুয়ে আছেন সোফায়।সন্ধ্যা থেকে একজন একজন করে যেতে যেতে বাসা এখন পুরো ফাঁকা।তনিমা ভাবি কিছুক্ষণ আগে চলে গেলেন।যাওয়ার আগে অনেক চেষ্টা করেও কিছুই মুখে দিতে পারলেন না ফিরোজার।হাসনাত করিম বললেন,তুলির সাথে কি তোমার সাথে ঝগড়া হয়েছিল,ফিরোজা?


ওনার স্ত্রী শুকনো মুখে তাকিয়ে বললেন,গতকাল সকালে খাওয়া নিয়ে মেয়েটাকে বকা দিয়েছিলাম।কিছুই না খেয়ে চলে যাচ্ছিল।জোর করে খাইয়ে দিয়েছিলাম আমি।কিন্তু বিকালে কলেজ থেকে এসে তো ভালোই ছিল।আমার সঙ্গে হেসেই কথা বললো।


-তাহলে হঠাৎ মাথায় এই ভূত চাপল কিভাবে?আচ্ছা ফিরোজা,মেয়েরা তো মায়েদের সাথে খুব খোলামেলা হয়।তুলির কি কোনো ছেলে বন্ধু ছিল?কিংবা এই নিয়ে কখনো কিছু বলেছিল,যে আমার ওই ছেলেটাকে ভালো লাগে?


ওনার স্ত্রী ফিরোজা বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,না তো,কখনো তো এমন কিছু বলেনি।ওর বান্ধবীরা ক্লাসে কেমন এসব নিয়েই বেশি কথা হতো আমাদের।


-সবকিছু কেমন যেন রহস্যময়।কোনো কারন নেই।অথচ এতগুলো ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা!আচ্ছা,তুমি সকাল থেকে তো কিছুই খাওনি।একটু ভাত এনে দেই,ফিরোজা?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।


ফিরোজা বেগম আবার কাঁদছেন।কাঁপা গলায় বললেন,আমার গলা দিয়ে কিছু নামবে না।মেয়েটাকে রাতে নিজের হাতে ভাত খাইয়ে দিয়েছিলাম।বলল,সকালে পরোটা খাবে।কিন্তু সকালে উঠে মেয়ের মরা মুখ দেখে কি মায়ের গলা দিয়ে খাবার নামবে,হাসনাত?


তিনি আর কিছু বললেন না।খুব বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরোজার পাশ থেকে উঠে ধীর পায়ে তুলির রুমে ঢুকতেই একটা শূন্যতা অনুভব করলেন।মুখ দিয়ে অস্ফুটভাবে বের হলো,তুলি মা,ঘুমিয়েছিস?ভেতরে আসবো?কিন্তু কোনো উত্তর আসল না।

বিছানায় চোখ পড়তেই হুঁ হুঁ করে উঠলো হাসনাত করিমের বুকের ভেতরটা।তুলির বইগুলো এখনও আগের মতই পড়ে আছে টেবিলে।কলেমের মুখ খুলে রাখা।হাসনাত করিম রুমে হাঁটছেন।তুলির রুমে বিছানা বরাবর বারান্দা।বারান্দার দরজার পাশেই জানালা।জানালার উপরে দেয়ালে ঝুঁলছে তুলির হাস্যউজ্জল ছবিখানা।ছবিতে তুলি দাঁড়িয়ে আছে দুজনের পাশে।কক্সবাজারে গিয়ে গতবছর তোলা হয়েছিল।তুলির খুব পছন্দের ছিল ছবিটি।হাসনাত করিম ছবির দিকে হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলেন পরম যত্নে।ছবিতে হাত বুলিয়ে যেন তুলিকে আদর করছেন তিনি।হঠাৎ ছবিটা হাতের চাপ লেগে দেয়ালে ঝুলানো বাঁধন আলগা হতেই জোরে ধরে ফেললেন।একটু হলেই নিচে পড়ে ভেঙে যেতো ছবির বাঁধানো ফ্রেম।।এবার চোখ পড়ল জানালার দিকে।ছবিখানা দেয়ালে টাঙিয়ে জানালার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন,উনার শরীরের সঙ্গে লেগে জানার একপাশ কিছুটা আলগা হয়ে গেছে।কিন্তু এমনটা তো হওয়ার কথা নয়।এই বয়সে শরীরে এত জোরও নেই।তাছাড়া পুরানো বাসা হলে নাহয় একটা কথা ছিল।কিন্তু নতুন বাসায় শরীরের সঙ্গে লেগে জানালা আলগা হয়ে যাবে?তার মানে কি?ঘুমের ঔষধ ছাড়া তুলির শরীরে কিছুই পাওয়া যায়নি।এদিকে জানালাও কিছুটা ফাঁকা।আর কোনো আওয়াজ ছাড়া এত মজবুত জানালা খোলা অসম্ভব।ওপাশে বারান্দা তো আছেই।মনে হচ্ছে কোনো অদৃশ্য দানব এসেছিল এই রুমে।সবকিছুই রহস্যজনক মনে হচ্ছে।উত্তেজনায় শরীর কাঁপছে হাসনাত করিমের।তবে কি এটা আত্মহত্যা নয়,খুন?


...........চলবে..........


written by Habib Khan Hridoy

Post a Comment

أحدث أقدم