গল্পঃ ভুতুড়ে কামড়া
গতকাল রাত থেকে কারা যেন আমার গলা চেপে ধরছে।একজন নয়,দু দু'জনের হাতের চাপে একেবারে দম বের হওয়ার অবস্থা।অদ্ভুদ ব্যাপার হলো,প্রথম হাতের অস্তিত্ব বেশ নরম হলেও,দ্বিতীয় হাতের ছোঁয়া বেশ শক্ত।মাঝ রাত্রে এমন ভূতুড়ে কান্ডে আমার আরামের ঘুম উড়ে গেছে।বুঝতে পারছি না,এটা কি আমার স্বপ্নে ঘটছে নাকি বাস্তবে?তাহলে ব্যাপারটা প্রথম থেকেই খুলে বলি।
সহকারী অধ্যাপক হিসেবে গতকালই ঢাকা থেকে বদলী হয়ে বরিশাল শহর থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে স্থানীয় সরকারি কলেজে এসে দেখি,পুরো কলেজ ফাঁকা।অবশ্য ছুটির দিন হওয়াতে এমন হওয়ারই কথা।কিন্তু সরকারি বাসভবনের ভেতরে ঢুকে আমার মেজাজ হয়ে গেল গরম।আমার জন্য বরাদ্দ রাখা আবাসিক বাসা এখনও পরিপাটি করা হয়নি।বাসাটির দরজায় তালা ছিল না।ঢুকে দেখি,ধুলোবালিতে একদম নাজেহাল ভেতরের অবস্থা।সঙ্গে আনা ব্যাগ নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর গেটের দারোয়ান ছেলেটা এসে বলল,স্যার,জলিল ভাই তো বাড়িতে গেছে।কালকে রাতের আগে মনে হয়না আসবো।ওনি মনে হয়,ভুলে এই ঘর ঝাড়ু দেয় নাই।
প্রথম ঢুকে পরিচিত না হয়ে কথা বলা ঠিক নয়।ভুঁরু কুঁচকে বললাম,তোমার নাম কি?
-আমার নাম রফিক মিয়া।আমি এই কলেজের দারোয়ান।তা স্যার,সঙ্গে মেডাম আসে নাই?ওনারে তো চোখে পড়ে না।
ক্লান্ত শরীরে এই অবস্থা দেখে খুব জোরে হেসে উঠলাম।রফিক আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।বললাম,ভাগ্য ভালো সঙ্গে আনিনি।এসে যদি এখানে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো,তাহলে বিরাট কান্ড বেঁধে যেতো।পনেরো দিন পরে আসবে তোমার ম্যাডাম।আমি আগে এদিকটা গুছিয়ে উঠলেই আসতে বলবো।কিন্তু এসে তো দেখি,আমারই রাতে থাকার জায়গা নেই।ছুটির দিন হওয়াতে সব স্যার-ম্যাডাম সকাল ছাড়া মনে হয়না আসবে।নাহলে কারো সঙ্গে থেকে রাতটা কাটিয়ে দেয়া যেতো।কি করা যায় বলো তো,রফিক?
-স্যার,একটু দাঁড়ান আমি দেখি কি করা যায়,ডানদিকে দৌড় দিল রফিক।
অগত্যা হাত থেকে ব্যাগটা রেখে বাইরে রাখা চেয়ারে বসে পড়লাম।মফস্বল শহর হওয়াতে এখানে এখনও বাসা-বাড়ি তেমন হয়ে উঠেনি।সরকার থেকেই আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।তবে কলেজের পরিবেশ বেশ সুন্দর।গেইট দিয়ে ঢুকতেই ডানদিকে কলেজ ভবন।তারপর বামে মোড় নিয়ে একটু সামনে প্রশাসনিক ভবন।ভবন পাড় হলে আবার গেইটের শুরু।তারপরই বাসভবন।চারদিকে ঘন গাছপালায় বেশ লাগছে।সন্ধ্যা হতে খুব একটা সময় নেই।আকাশে পাখিরা নীড়ে ফিরছে।কিন্তু রফিক হঠাৎ কোথায় হাওয়া হয়ে গেল?
-স্যার,একটা রুম পাওয়া গেছে।ভেতরে সবকিছু পরিষ্কার মোটামুটি।বিছানা-বালিশ ব্যবস্থা করা যাবে।ঝং ধরা তালা ঝুলছিল দরজায়।মনে হয়,অনেকদিন ব্যবহার হয়না।কিন্তু ভেতরটা পরিষ্কার।হবে তো স্যার?
-হবে মানে,একেবারে দৌড়াবে।একটু চোখ বুঝে ঘুমাতে পারলেই হলো।তা ব্যাগটা নিয়ে আমার সঙ্গে চলো।দীর্ঘ ভ্রমণে খুব ক্লান্ত লাগছে।ব্যাগ নিয়ে হাঁটা সম্ভব হবে না।
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়লাম।আমার বই পড়ার অভ্যাস।কিছুক্ষণ বই পড়ার পর আর ভালো লাগছিল না।বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলে বারান্দায় এসে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম।রুমটা বেশ ভালোই পছন্দ হয়েছে।গেইট পেরিয়ে প্রশাসনিক ভবনের একদম পেছনে।দোতলা ভবন।নিচতলায় সম্ভবত রফিক থাকে।আর দোতলায় সবগুলো রুমই তালা।বেশ নিরিবিলি।কপাল গুণে পেয়ে গেলাম।ভাবছি,এখানেই থেকে যাবো।কাল অধ্যাপক স্যারকে বলে দেখি তিনি কি বলেন।রুমে একটি বিছানা পাতা ছিল।বিছানার সঙ্গে ছোট্ট টেবিল।তবে টেবিলের উপরে কলমের কালি দিয়ে ছবি আঁকা।এক ললনার ছবি।ললনার চুল বেণি করা।কোন প্রেমিক পুরুষ এই রুমে ছিল কে জানে!অতকিছু না ভেবে আবার শুয়ে পড়লাম।সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন চোখ বুজে এলো টেরই পেলাম না।
মাঝরাতে হঠাৎ মনে হলো,কেউ আমার গলা চেপে ধরেছে।বেশ নরম হাত।তেমন একটা চাপ লাগেনি।ঘুমের ঘোরে অদ্ভুদ কারনে চোখও খুলতে পারছিলাম না।কিন্তু দ্বিতীয় চাপ যখন গলায় পড়ল,বুঝতে পারছিলাম এবার হাতের বেশ জোর আছে।ইচ্ছে করছিল,চোখ খুলে ফেলি।কিন্তু পারছিলাম না।কেউ যেন শক্ত করে চোখ ধরে রেখেছিল।হঠাৎ কানের পাশে ফিসফিস কন্ঠে শুনতে পেলাম,"চলে যা এখান থেকে।তোকে সহ্য হচ্ছে না।"
আর কিছু শুনতে পেলাম না।ধড়াম করে উঠে বসলাম বিছানায়।শরীর তখন ভিজে একেবারে চুবচুবে হয়ে আছে।বুঝতে পারছিলাম না,স্বপ্ন কিনা?কারন মাঝেমাঝেই ঘুমে মানুষকে বোবায় ধরে।একবার বুকের উপর চেপে বসলে নিস্তার নেই।ঘোঁ ঘোঁ আওয়াজ শুনে কেউ এসে লাইট জ্বালিয়ে দিলে তবেই চলে যায়।আমি ছোটবেলায় গ্রামে বড় হয়েছি।এসব ব্যাপারে কখনো ভয় পাইনি।তবে বড় ভাইকে মাঝেমাঝে ধরতো।শুনেছি,একদম সোজা হয়ে ঘুমালে নাকি এমন হয়।ভাইয়া,প্রায়ই সোজা হয়ে ঘুমাতো।কিন্তু আমি ভাবছিলাম,বোবা তো কখনো এমন ফিসফিস করে কথা বলে না।মন থেকে সমস্ত চিন্তা ঝেড়ে ফেললাম।হয়তো নতুন জায়গায় এসেছি,সেজন্য স্বপ্নে এমন হতেই পারে।ভাবলাম,একবার নিচে গিয়ে রফিককে ডেকে গল্প করি।অবশ্য পরে নিজেই হেসে ফেললাম।এত রাতে পাগলও তো ঘুমাবে।আর আমি কিনা এই মাঝরাতে গল্প করতে নিচে গিয়ে একজন মানুষের ঘুম নষ্ট করবো?মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলাম,প্রায় সাড়ে চারটা বাজে।একটু পরেই ফজরের আযান পড়বে।অজু করে নামাজ পড়ে যখন উঠলাম,তখন চারপাশে সূর্য উঠতে শুরু করেছে।এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঠান্ডা বাতাসে নিঃশ্বাস ফেললাম।কফি খাওয়ার পর যেন চোখে নেমে এলো রাজ্যের ঘুম।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি বলতে পারবো না।আবার কেউ যেন গলা চেপে ধরেছে।এবার শক্ত হাত দুটি চেপে ধরলো আমার গলা।আর নরম হাত সোজা আমার পায়ে।নড়াচড়ার একদমই শক্তি নেই।ঘুমের মধ্যে শুধু একটাই কথা ঝপছিলাম,কেউ যেন এসে আমাকে বাঁচায়।মনে হচ্ছিল,এই বুঝি আমার দম ফেটে যাবে।কিন্তু না,হঠাৎ সাকিবের গলা শুনতে পেলাম।দুলাভাই,এই দুলাভাই,ঘুমাচ্ছো নাকি?বাবা,একদিন একা রুম পেয়ে এই অবস্থা?
চোখ খুলে দেখি সব স্বাভাবিক।আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে।বিছানার চাদর অনেকটা অগোছালো।যেন একটু আগে এখানে অনেকগুলো মানুষ বসে আমায় তাকিয়ে দেখছিল।মোবাইলে দেখতে পেলাম,বিকেল তিনটা বাজে।সাকিব তখনও দরজা ধাক্কা দিয়েই যাচ্ছিল।
দরজা খুলে বললাম,তুমি এখানে?তোমার আপু সঙ্গে আসেনি?
সাকিব ভেতরে ঢুকে ধপাস করে বিছানায় বসে ঢগঢগ করে পানি খেয়ে বলল,আপু,ঢাকা থেকে ফোন করে বলল,আমি যখন আপনার কাছাকাছি রয়েছি,আপনার সাথে এসে হাত লাগাতে।সবকিছু গুছিয়ে তারপর আপুকে কল দিতে বলেছে।কিন্তু আপনি তো ঘুমে ডুবে আছেন।
বললাম,এসেছো ভালোই হয়েছে।একা একা ভালো লাগছিল না।অবশ্য,আজই আমার ছুটি শেষ।কাল থেকে ক্লাসে যেতে হবে।এত বেলা হয়ে গেল।ভেবেছিলাম,অধ্যাপক স্যারের সঙ্গে দেখা করবো।কিন্তু এখন তো সম্ভব না।আমি এসেছি হয়তো তিনি জানেন না।
-তা রাতে ঘুম হয়নি,দুলাভাই?এখন তো সকাল পেরিয়ে বিকাল হতে চললো।
রাতের কথাটা চেপে গেলাম।অবশ্য মনের ভুলও হতে পারে।এই নিয়ে আমার শালার কাছে হাসির পাত্র হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।বললাম,আসলে শরীর ক্লান্ত ছিল।ফজরের নামাজ পড়ার পর চোখ লেগেছিল।আর উঠতে পারিনি।তা কিছু খেয়েছো?নাকি ব্যবস্থা করবো?
-আমি হলাম,বুদ্ধিমান ছেলে।আপনার কষ্ট হবে ভেবে এখানে আসার আগে হোটেলেই খেয়ে নিয়েছি।তা আপনার রান্নার কি খবর?মনে হয়না,বাসায় কিছু আছে?
-না,আমি এইতো এখন বের হবো।তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও।কিছু কেনাকাটা বাকি আছে,তা শেষ করে সন্ধ্যায় ফিরবো।এসে দুজনে জমিয়ে আড্ডা দিবো।সঙ্গে রাতের খাবারও নিয়ে আসবো।গরম গরম বিরিয়ানি।
সাকিব খুশি হয়ে বলল,তাহলে তো পুরো জমে যাবে।আমি তাহলে একটু ঘুমিয়ে নি।খুব ঘুম আসছে।
সাকিবকে রেখে বেরিয়ে পড়লাম কেনাকাটা করতে।কিন্তু মনটা তখনও পড়েছিল অন্য জায়গায়।স্বপ্ন নাকি সত্যি এমন চিন্তার মধ্যেই কেনাকাটা শেষ করে কলেজে ফিরতেই আবার দারোয়ান রফিকের সঙ্গে দেখা।বলল,স্যার,আপনার রুমে কেউ আসছিল?একটু আগে চলে গেছে।মনে হয়,কিছু দেখে খুব ভয় পাইছে।
ঘড়িতে তখন বেজে আটটা।সাকিব এত তাড়াতাড়ি যাওয়ার কথা নয়।বললাম,আচ্ছা আমি কল দিব।তা তুমি স্যারকে বলোনি,আমি এসেছিলাম যে?
রফিক মাথা চুলকে বলল,স্যার,আমার ডিউটি তো সন্ধ্যা থেকে।ওনার সাথে কমই দেখা হয়।
আমি আর কিছু না বলে চলে আসলাম।সাকিবের নাম্বারে ফোন করতেই বলল,দুলাভাই,এই রুমে থেকো না।পালিয়ে যাও।
বললাম,কি হয়েছে বলবি তো?আর তুই কিছু না বলে চলে গেলি কেন?
-আপনি চলে যাওয়ার পর কেউ যেন আমার গলা চেপে ধরেছিল।একটু হলেই দম বন্ধ হয়ে মারা যেতাম।আর সাহস হয়নি।আপনি অন্য বাসায় চলে যান।আমি আর কথা বলতে পারছি না।
এই হলো ঘটনা।বুঝতে পারছি না,আজ রাতে থাকা ঠিক হবে কিনা।অবশ্য,আমার নাহয় স্বপ্ন হতে পারে।তাই বলে,সাকিবের সাথেও একই ঘটনা ঘটবে!এখন প্রায় বারোটা বাজে।হোটেল থেকে নিয়ে আসা বিরিয়ানি খেয়ে হালকা কিছু হাতের কাজ শেষ করলাম।এর মাঝে অস্বাভাবিক কিছুই হয়নি।মনে বেশ জোরও আছে।মনেই হচ্ছে না,এই রুমে কেউ আমাকে গলা চেপে ধরেছিল।বাসায় ফোন করে শারমিনের সাথে ঘন্টাখানেক কথা বলে ফোনটা রেখে দিলাম।যা হবার হবে ভেবে মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়লাম।লাইট অফ করে চোখ বুজতেই হঠাৎ মনে হচ্ছে,খাট মৃদু নড়ছে।ভূমিকম্প ভেবে উঠে বসলাম।এই কি,লাইট অন হচ্ছে না কেন?লোডশেডিং হওয়ার তো কথা নয়।চব্বিশ ঘন্টা আইপিএস থাকে।হঠাৎ করে রুমের পরিবেশ যেন পাল্টে গেছে।বেশ ঠান্ডা লাগছে।বাইরে থেকে আসা কিঞ্চিত আলোতে অন্ধকারে আন্দাজ করে মোবাইল হাতে নিতেই এবার অবাক হওয়ার পালা।চার্জ নেই।ফোন খুলছে না।অথচ হাত থেকে ফোন রাখায় সময়ে নিজে দেখেছি,৫৪% চার্জ ছিল।বেশ ভয় লাগছে।তাহলে কি খারাপ কিছু আজ কপালে আছে।খাটের নিচ থেকে নখের আঁচড়ের আওয়াজ শুনতেই চমকে উঠলাম।কেউ যেন রাগে ফুঁসছে।নখ দিয়ে ছিঁড়ে ফেলবে আমাকে।অন্ধকারে কি করবো বুঝতে পারছি না।ঠাঁয় বসে আছি মাঝখানে।এখনও আঁচড় কাটছে।মশারি সরিয়ে আস্তে আস্তে খাটের পাশে যাচ্ছি।সবই আমার মনের ভুল ভেবে নিজেকে অভয় দিয়ে মাথা নিচু করে খাটের নিচে তাকাতেই আঁতকে উঠলাম।একটি মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসছে।মুখটা সাদা ফ্যাঁকাসে।চোখের পাশ থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে।বলছে,কিরে,তোর বড্ড সাহস তাই না?আজ সাহসের পরিণাম ভোগ করতে হবে তোকে।
চিৎকার দিয়ে মাথা তুলে তাকাতেই এবার অজ্ঞান হওয়ার যোগাড়।আমার ঠিক এক হাত দূরে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।মুখে কুৎসিত হাসি।ছেলেটির মুখও ফ্যাঁকাসে।বামহাতে একটি রক্তাক্ত ওড়না।রাগে ফুঁসছে।বলছে,গলা চেপে শুধু ভয় দেখিয়েছিলাম।তবুও যাসনি।তোর মৃত্যু বোধহয় আমাদের মতো এই রুমেই লেখা আছে।তবে একটু অন্যভাবে।চারপাশ কাঁপিয়ে বিকট শব্দ হাসছে ছেলেটি।আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না।ইচ্ছে করছে,প্রচন্ড চিৎকারে দারোয়ান রফিককে ডাকতে।আমার শারমিনের কি হবে?আমার এভাবে মৃত্যু মেনে নিতে পারবে তো?ছেলেটি এগিয়ে আসছে।সঙ্গে মেয়েটিও।ঠিক দুপুরের মতো মেয়েটি আমার পা চেপে ধরেছে।ছেলেটি ওড়না দিয়ে আমার হাত বেঁধে দিয়েছে।নড়ার এতটুকু বাকি রাখেনি।ছেলেটির হাতে কাটা কম্পাস।কুৎসিত হাসি দিয়ে বলছে,এটা দিয়ে তোর শরীর এবড়োখেবড়ো করে তারপর গলা টিপে মারবো।ঠিক পাঁচ বছর পর আবারও একটি হত্যা হতে চলেছে এই কলেজের রুমে।মেয়েটি পা ছেড়ে এবার আমার গলা চেপে ধরেছে।যন্ত্রনায় চোখে পানি এসে গেছে।আমার আয়ু ফুরিয়ে আসছে।শারমিনের চেহারাখানা ভাসছে।মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে।মৃত্যু!
-মোজাম্মেল স্যার,মোজাম্মেল স্যার,আপনি ঠিক আছেন তো?আমি জলিল,এই কলেজের কর্মচারী।স্যার,আপনি বেঁচে আছেন তো?
দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলো একজন লোক।মুখে সাদা লম্বা দাঁড়ি।লোকটির পেছনে আছে রফিক।আমার নিঃশ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।কোনোমতে উঠে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম।এ যেন বেঁচে ফেরার আনন্দ।বেশ সময় নিয়ে বললাম,আপনারা না আসলে এতক্ষণে আমার লাশ পড়ে থাকতো বিছানায়।
-স্যার,মাফ করবেন,সবই আমার ভুল।আসলে নাতনীর অসুখের কথা শুনে কাজ ফেলে রেখে বাড়িতে চলে গেলাম।আপনার রুমটা পরিষ্কার করতেও মনে নেই।সন্ধ্যায় নাতনী সুস্থ হলে হঠাৎ মনে পড়লো।আর দেরি না করে এসেই শুনতে পাই,আপনাকে দ্বিতীয়তলার রুমটা খুলে দেয়া হয়েছে।রফিক,এখানে এসেছে বেশিদিন হয়নি।তাই এতকিছু জানে না,বললেন জলিল।
-এতকিছু মানে?অামাকে গলা চেপে ধরেছিল দুজনে।একটি ছেলে,আর একটি মেয়ে।দুজনের বয়স কাছাকাছি।মুখখানা কেমন ফ্যাঁকাশে হয়ে আছে।
-স্যার,আজ থেকে ঠিক ছয়বছর আগে এখানে দুটি ছেলে-মেয়ে আত্মহত্যা করে।ছেলেটি এখানেই থাকতো।সিট সংকটের কারনে এই বিল্ডিং-এ কিছু ছাত্রের জায়গা হয়।দুজন দুজনকে প্রচন্ড ভালোবাসতো।কিন্তু পরিবার থেকে মেনে নেয়নি।আর তাই একদিন দুজনে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুঁলে পড়ে ফ্যানে।তারপর নতুন করে রুম রঙ করার পর ঠিক একবছরের মাথায় এখানে একজনের লাশ পাওয়া যায়।গলায় ছিল নখের আঁচড়।হাতে-পায়ে রক্তজমাটের কালো দাগ।তারপর থেকেই এই রুমে বিভিন্ন আওয়াজ শোনা যেতো।মাঝরাতে হাসির শব্দ,চিৎকারের শব্দ।এরপরই বন্ধ করে দেয়া হয় পুরো বিল্ডিং।তখন নতুন বিল্ডিও তৈরি হয়ে গেছে।কিন্তু রফিক আসার পর এখানে নিচতলায় থাকে।অবশ্য নিচতলায় তেমন কিছু ঘটেনি।
-জলিল ভাই,এগুলা তো আমারে আগে বলেন নাই,বলল রফিক।
-বললে ভয় পাইবি তাই।স্যাররে,রুমটা দেয়ার আগে একটু কল দিলেও পারতি।আজকে যদি না আসতাম কি হতো বুঝছস?
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।ভয়ে এখনও শরীর কাঁপছে।টেবিলের দিকে তাকাতেই সেই আঁকা ছবিটির দিকে চোখে পড়লো।মেয়েটি যেন হাসছে।
-স্যার,এক্ষনি চলেন।আর এখানে থাকার দরকার নাই।ওই রফিক,স্যারের ব্যাগ নিয়ে আয়।কি ভয়ানক অবস্থা।
সকালের সূর্য উঠে গেছে।পুরো শরীরে ব্যাথা।গলার দিকে মনে হয় কেটে গেছে নখের আঁচড়ে।রফিক ব্যাগ নিয়ে চলে গেছে।দরজার দিকে আসতেই পেছনে ফিরে তাকালাম।ছেলে-মেয়ে দুটি বিছানায় বসে আছে।ছেলেটি মেয়েটির চুলে বিলি কাটছে।মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে আবার সেই কুৎসিত হাসি দিচ্ছে।আমার আগমন তাদের পছন্দ হয়নি।আগেই ব্যাপারটা বোঝা উচিত ছিল।
...........সমাপ্ত..........
written by Habib Khan Hridoy

إرسال تعليق