গোয়েন্দা সিরিজঃ আত্নহত্যা অথবা খুন পর্ব ০২ ( গল্প শেয়ার)


 


হাসনাত করিম থানায় বসে আছেন।ওনার সামনে সকাল থেকে দেয়া দু'কাপ চা অবহেলায় টেবিলের কোণায় পড়ে আছে।ঠান্ডা হয়ে স্বাদ নোনতা হয়ে যাওয়াতে আবার দেয়া হয়েছিল।কিন্তু তিনি মুখে দেননি।পিরিচে পড়ে থাকা শক্ত টোস্ট বিস্কুটে মাছি ভনভন শব্দে উড়ছে।কিন্তু হাসনাত করিমের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন দেয়ালে থাকা ঘড়িটার দিকে।মাঝেমাঝে থানার কাঠের গেইটের শব্দে কেউ ভেতরে ঢুকলে পেছনে ফিরে তাকান।অপরিচিত পুলিশ কিংবা বাইরের কাউকে দেখলে আবার ভাবলেশহীন চোখের পলক ঘুরিয়ে ফেলেন।হাসনাত করিমের ডানপাশে বসে থাকা কনস্টেবল লোকটি অনেকবার খাওয়ার কথা বললেও তিনি একটু শব্দও করেননি।যেন কথা বলতে ভুলে গেছেন।মাথা নেড়ে বলেন,খাওয়ার ইচ্ছে নেই।লোকটি আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।এসআই আনিসুর রহমানের আত্মীয় শুনেই এত খবর নেয়া হচ্ছে।সারাদিনে থানায় কত কাজ থাকে।মানুষ আসে,আবার চলে যায়।সবাই অপরিচিত,কিন্তু বিপদে পড়ে আসে।এত কিছুর মাঝে আলাদা করে একজনকে খেয়াল রাখার সময় কই?তবুও মন রাখার জন্য এতটুকু করাই যায়।


-আনিসের আসতে আর কতক্ষণ লাগবে বলতে পারেন?দু'ঘন্টা তো প্রায় হয়ে যাচ্ছে,বললেন হাসনাত করিম।


হাসনাত করিমের বাকরুদ্ধ মুখে কথা শুনে কনস্টেবল লোকটির চোখ যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।খাতায় কি যেন লিখছিল সে।লেখা বন্ধ করে বলল,একটু আগে ফোন করেছিলাম স্যারকে।সকালে থানা থেকে দশ কিলোমিটার দূরে দুটো লাশ পাওয়া গেছে।এসপি স্যারের এলাকা হওয়াতে তিনিও সেখানে রয়েছেন।সেজন্যই দেরি হচ্ছে।জিজ্ঞাবাদ চলছে পুরোদমে।প্রায় শেষ পর্যায়ে।এখনই চলে আসবেন,স্যার।


-ও আচ্ছা।আমার ওর সঙ্গে জরুরি কিছু কথা ছিল।ঠিক আছে,তাহলে অপেক্ষা করি।


-সকাল থেকে তো কিছুই মুখে দেননি।বিস্কুটে মাছি উড়ছে।ছেলেটাকে বলে আরেক কাপ চা দিতে বলি?চা মনে হয় ঠান্ডা হয়ে গেছে।


হাসনাত করিম মাথা নেড়ে বললেন,না,খাওয়ার ইচ্ছে নেই।গতকালই আমার মেয়েটাকে দাফন করেছি।মনটা একদম ভালো নেই।


কনস্টেবল লোকটির মুখ হঠাৎ মলিন হয়ে গেল।মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ করে আবার খাতায় লেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে।


প্রায় মিনিট দশেক পর হাসনাত করিম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।বামহাত দিয়ে কোমড়ের পেছনের অংশ ধরে একটু চাপ দিলেন।মনে হচ্ছে,কোমড়ে টান পড়েছে।


কনস্টেবল লোকটি বলল,চলে যাচ্ছেন নাকি?স্যার,এখনই চলে আসবেন।


-না,বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি।আজকাল এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসতে পারি না।বয়স হয়েছো তো।কোমড় ধরে যায়,বললেন তিনি।


কাঠের দরজায় আটকানো ছোট্ট গেইট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল এসআই আনিসুর রহমান।হাসনাত করিমের দিকে তাকিয়ে বলল,খুবই দুঃখিত,দুলাভাই।আসলে সকাল থেকে কাজের এত চাপ।সঙ্গে আবার এসপি স্যারের এরিয়ায়।একটু যে দম ফেলবো সে উপায় নেই।আপনি বসুন না।এসআই আনিসুর রহমান মাথার টুপি খুলে চেয়ার টেনে বেশ বড় নিঃশ্বাস ফেলল।


কনস্টেবল লোকটি বলল,স্যার,সকাল থেকে দু'কাপ চা দিয়েছি।একটুও মুখে দেননি।চুপ করে বসে আছেন।আপনার সঙ্গে কি যেন বলবেন।


-তা লেখার কাজ কতদূর?আজকের মধ্যে শেষ না হলে কিন্তু কথা শুনতে হবে।কাজে মনোযোগ দিন বসে না থেকে।আনিসুর রহমান এবার হাসনাত করিমের দিকে তাকিয়ে বলল,দুলাভাই,আপা কেমন আছে?খেয়েছিল কিছু?


হাসনাত করিম একটু ঝুঁকে সামনে এসে বললেন,আনিস,তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে এসেছি।তারপর আশপাশে একবার তাকিয়ে বেশ আস্তে বললেন,তুলি আত্মহত্যা করেনি,খুন করা হয়েছে।


হাসনাত করিমের মুখ থেকে এমন কথা শুনে এসআই আনিসুর রহমান বিস্ফোরিত চোখ তাকিয়ে রইল।হাতের পাশে পিরিচে ঢেকে রাখা গ্লাস হাতে নিয়ে সবটুকু পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে বলল,কি!তুলি খুন হয়েছে?কিন্তু রির্পোটে তো সন্দেহজনক কিছুই আসেনি।


-আমিও দাফনের পর বাসায় এসে তুলির রুমে পা রাখার আগ পর্যন্ত এটাই ভেবেছিলাম,তুলি আত্মহত্যা করেছে।কিন্তু রুমে ঢুকে আমার সবকিছু অস্বাভাবিক লাগছে।আমার মনে হচ্ছে,তুলিকে খুন করা হয়েছে।


কনস্টেবল হামিদ খাতায় লেখা বন্ধ রেখে আড়চোখে দুজনের কথা আড়িপেতে শোনার চেষ্টা করছে।মনে হচ্ছে,এমন অদ্ভুদ কিছু সে আর কখনো শুনেনি।এসআই আনিসুর রহমান বলল,আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,দুলাভাই।একটু পরিষ্কার করে খুলে বলুন তো।


-গতকাল রাতে দাফন শেষে আমি ফিরোজার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর তুলির রুমে যাই।আমাদের সঙ্গে কক্সবাজারে তুলির ছবি তো তুই দেখেছিস।আমি সেই ছবিতে হাত বুলিয়ে আদর করছিলাম।হঠাৎ ছবিটা দেয়াল থেকে আলগা হতেই বেশ শক্ত করে ধরেছি,এমন সময়ে শরীর কিছুটা জানালার সঙ্গে চাপ খায়।তারপর চেয়ে দেখি,জানালার কিছু অংশ খানিকটা বেরিয়ে এসেছে।


হাসনাত করিমকে মাঝপথে থামিয়ে এসআই আনিসুর রহমান বললেন,কিন্তু এর সঙ্গে খুনের সম্পর্ক কি?


-তুই ভেবে দেখ,এই বাসা নতুন তৈরি হয়েছে।আমার শরীরে এতটাও শক্তি নেই যে,এক ছোট্ট ধাক্কায় জানালার একাংশ আলাদা হয়ে যাবে।আমার মনে হচ্ছে,রাতে তুলির রুমে কেউ এসেছিল।সে ইচ্ছে করে,তুলিকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে মেরে ফেলেছে।


-কিন্তু দুলাইভাই,এটা অসম্ভব।একটা যুবতী মেয়েকে এতগুলো ঘুমের ঔষধ খাওয়ানো হয়েছে,অথচ কোনো শব্দ হয়নি?মানে আমি বলছি,তুলি কিছু না বলে খেয়ে ফেলেছে?যদি শর্য্যাশায়ী বৃদ্ধা হতো,তাহলে না হয় ব্যাপারটা ঠিক ছিল।তাছাড়া তুলির শরীরে কারো হাতের ছাপও পাওয়া যায়নি।ঘুমের ঔষধ খাওয়ার অন্তত পাঁচ মিনিট পর প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা।তাহলে এই পাঁচ মিনিট তুলি কি চুপ করে শুয়ে ছিল?


পাশে থাকা কনস্টেবল হামিদ বলল,স্যার,এমনও হতে পারে,জানালা আগের থেকেই এমন ছিল।কিন্তু উনি সেটা খেয়াল করেনি এতদিন।


হাসনাত করিম বেশ জোর দিয়ে বললেন,অসম্ভব।কিছুদিন আগেও বারান্দায় কিছু কাজের জন্য জানালার উপর অনেক জিনিস স্তপ করে রাখা হয়েছিল।তখন তো এমন হয়নি।


এসআই আনিসুর রহমান গম্ভীর হয়ে বলল,কিছুতেই কিছু মিলছে না,দুলাভাই।


-আনিস,বারান্দার কথা আসতেই একটা কথা মনে পড়েছে।গতকাল রাত থেকে পুরো বারান্দা আমি তন্নতন্ন করে দেখেছি।এক ইঞ্চি জায়গাও বাদ রাখিনি।কিন্তু বারান্দার কোথাও কোনো অংশ ফাঁকা ছিল না।মানে বারান্দা একদমই আগের মতই ছিল।শুধু জানালার অংশ কিছুটা আলগা হয়ে আছে।


-অদ্ভুদ ব্যাপার তো!ধরে নিচ্ছি,তুলির রুমে কেউ এসেছিল।কিন্তু বারান্দা ছাড়া তো জানালা দিয়ে ঢুকতে পারবে না।অথচ বারান্দা একদমই ঠিক,কিন্তু জানালা ঠিক নেই।


কনস্টেবল হামিদ বলল,স্যার,অশরীরী কিছু হবে নাকি?মানে এটা ছাড়া আর কোনো সূত্র মিলছে না।


এসআই আনিসুর রহমান কিছুটা ধমকে বললেন,আহা!এটা মজা করার মতো সময় না।আর আপনি জানেন না,আদালত এসব বিশ্বাস করবে না।


-আনিস,এই বিষয়ে একটা তদন্তের জন্য ডায়েরী করলে ভালো হতো না?তাহলে ব্যাপারটা একটু এগিয়ে যেতো,বললেন হাসনাত করিম।


-না,দুলাভাই,এতটাও সহজ নয়।যখন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেখবে তদন্ত করার মতো তেমন কিছুই নেই,তখনই বাদ দিয়ে দিবে।আমরা যদি নিজেরা বের করতে পারি,এটা আত্মহত্যা নয় খুন।তবেই সবার নজরে আসবে।আমি বলি কি,দুলাভাই,এর রহস্য আপনি খুঁজে বের করুন।যতো রকম সাহায্য লাগবে আমি করবো।


হাসনাত করিম চমকে উঠলেন।বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ এর ঘরে।এই বয়সে কি এসবে পা ফেলা যায়।বললেন,আমি বের করবো?আমি কি পারবো এই বয়সে আমার মেয়ে হত্যার রহস্য খুঁজে বের করতে?


-দুলাভাই,এটা ছাড়া আর উপায় নেই।অফিসিয়ালি কিছুই করা যাবে না।আপনিই পারেন,কিছু করতে।


হাসনাত করিম চুপ করে রইলেন।তারপর বললেন,ঠিক আছে,এটাই এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য।আমার তুলি কি আত্মহত্যা করেছে নাকি খুন করা হয়েছে?অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নিচ্ছি।এবার বলো,প্রথমে কি করতে হবে?জিজ্ঞেস করলেন,হাসনাত করিম।


-আমরা বাবা-মায়ের সাথে যেসব কথা লুকিয়ে রাখি,সেটা কিন্তু বন্ধুদের সাথে বলি।হতে পারে,এমন কিছু তুলির কোনো ঘনিষ্ঠ বান্ধবী জানতে পারে যা আপনি বা আমরা জানি না।প্রথমে,তুলির কলেজ থেকেই শুরু করুন।আপনার সঙ্গে হামিদকে দিচ্ছি।পুলিশ দেখলে সবাই নির্ধিদায় মুখ খুলবে।হামিদ সাহেব,আপনি উনার সাথে চলে যান।


কনস্টেবল হামিদ বলল,স্যার,আমার লেখা তো শেষ হয়নি।


-হয়েছে,আর লিখতে হবে না।লেখা বাদ দিয়ে তো বসে কথা শুনছিলেন।আমি সামলে নিবো,আপনি উনার সঙ্গে চলে যান।


কনস্টেবল হামিদ এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন।হাত থেকে কলম রেখে চললেন হাসনাত করিমের সঙ্গে।


মাথার উপর ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরছে।সিটি কলেজের অধ্যক্ষ আলহাজ্ব আজিজুল হক সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন।ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।আজিজুল হকের পাশে পিয়ন রহমত মোটা খাতা হাতে সমানে বাতাস করে চলেছে।টেবিলে একগাদা সাদা খাতার স্তপ পড়ে আছে।ফ্যানের বাতাসে কয়েকটা পৃষ্টা টেবিল ছেড়ে উড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে।পিয়ন রহমতের চোখেমুখে বিরক্তের ছাপ।সে যেন বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।


অধ্যক্ষ আজিজুল হক চোখ বন্ধ রেখেই বললেন,রহমত,আমার মনে শান্তি নেই।কি করা যায়,বলতে পারো?


রহমত কিছুক্ষণ ভেবে বলল,স্যার,একটু পানি দেই।কলিজা শীতল করতে পানিই যথেষ্ট।


-মাথামোটা কাকে বলে।গাঁধা,আমার কলিজা শীতল আছে ঠিকই।কিন্তু চিন্তায় শরীরে অস্তিরতা বেড়ে চলেছে।গতকাল তুলি নামে একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।আমি নিজে জানাযা পড়ে আসলাম।কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।শেষ বয়সে চাকরি না গেলেই হয়েছে।আমি আমার শিক্ষার্থীদের কিনা এই শিক্ষা দিচ্ছি!রহমত,শুনছো?


পিয়ত রহমত মাথা নেড়ে বলল,জ্বি স্যার,বলেন।


-এখনই,ক্লাসে নোটিশ দিবে।কাগজে লিখে দিচ্ছি,তাড়াতাড়ি দিয়ে আসো।


-স্যার,টেবিলে এতোগুলা ফাইল পড়ে আছে।কখন দেখবেন?স্যার-ম্যাডামরা তো আমার উপর রেগে বসে আছে।কাছে গেলেই বকা দেয়।আমি নাকি আপনারে এসব দেইনা।


-আরে রাখো,তোমার ফাইল।এসব এখন জরুরি নয়।আমার চাকরি চলে গেলে ফাইল নিয়ে কি হবে শুনি?গত দুইমাস আগেও...


অধ্যক্ষ আজিজুল হক কথা শেষ করতে পারলেন না।বাইরে থেকে মোটা গলায় আওয়াজ আসলো,স্যার,ভেতরে আসতে পারি?


-জ্বি চলে আসুন।আবার কি বিপদ কে জানে,পরের কথাটা বেশ আস্তে বললেন তিনি।


হাসনাত করিম ভেতরে প্রবেশ করলেন।সঙ্গে কনস্টেবল হামিদ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে পেছনে।হাসনাত করিম বললেন,আমাকে চিনতে পেরেছেন,স্যার?আমি তুলির বাবা।


অাজিজুল হক সোফা দেখিয়ে বসতে বললেন।জ্বি,চিনতে পেরেছি।কিন্তু হঠাৎ পুলিশ নিয়ে এখানে?কোনো ঝামেলা হয়েছে?


হাসনাত করিম আসল ব্যাপারটা চেপে গেলেন।অফিসিয়ালি এই বিষয়ে কথা বলা যাবে না।সমস্যা হতে পারে।তিনি বললেন,আসলে মেয়েটা হুট করে এমন কান্ড করে বসলো।আমি একটু ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলতে এসেছি।যদি আপনি একটু অনুমতি দেন।


-আমার অনুমতির প্রয়োজন নেই।একটু পরেই বিরতি দিবে।আপনারা কথা বলতে পারেন।


-ঠিক আছে,অসংখ্য ধন্যবাদ,স্যার।আজ আসি তাহলে।


অধ্যক্ষ আজিজুল হকের রুম থেকে বেরিয়ে তুলির বাবা তিনতলায় উঠছেন।এই বয়সে এত দৌঁড়ঝাপ করা বেশ কঠিন।কিন্তু উনাকে দেখে মনে হচ্ছে,বয়স প্রায় দশ বছর কমে গেছে।হাঁটতে মোটেই কষ্ট হচ্ছে না।বিরতির ঘন্টা পড়ে গেছে।উপর থেকে আস্তে আস্তে ছেলে-মেয়েরা নেমে আসছে।অনেকেই পুলিশ দেখে নিজেদের মধ্যে কানে কানে কি যেন বলছে।হাসনাত করিম এসব এড়িয়ে যাচ্ছেন।এখন এতসব দেখার সময় নেই।শুধুই রহস্যের খোঁজে ছুটতে হবে।প্রথম ক্লাস পেরিয়ে দ্বিতীয় ক্লাসের সামনে আসতেই ভেতরে কয়েকজনকে বেঞ্চিতে বসে গল্প করতে দেখা গেল।ওনাকে দেখে সবাই চুপ করে থেমে গেল।কেউ কেউ নিজেদের বাসা থেকে আনা খাবার খাওয়াতে মনোযোগ দিল।


-এটা দ্বাদশ শ্রেণীর ক্লাস তো?আমি তুলির বাবা,বললেন হাসনাত করিম।তোমাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?


একটু স্বাস্থ্য করে একটা ছেলে এগিয়ে এসে বলল,হ্যাঁ আংকেল,বলুন না।


-তোমরা তো সবাই তুলির বন্ধু।আচ্ছা তোমাদের মধ্যে তুলির সাথে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল কার সঙ্গে?মানে আজকাল কি যেন বলে,হ্যাঁ,তুলির বেস্টফ্রেন্ড কে ছিল?


একটি মেয়ে বলল,আংকেল,তুলি তো সবার সঙ্গেই কমবেশি মিশুক ছিল।তবে আনিকার সাথে তুলি বেশি কথা বলতো।আমার মনে হয়,আনিকাই তুলির বেস্টফ্রেন্ড।


হাসনাত করিম উত্তেজিত হয়ে বললেন,আনিকা কোথায় গেছে?নিচতলায় তো?


মেয়েটি বলল,আনিকা তো আজ নিয়ে দুদিন ধরে কলেজে আসছে না।


-আচ্ছা আনিকার বাসার ঠিকানা কেউ দিতে পারবে?


মেয়েটি বলল,আংকেল আমি জানি।ওর জন্মদিনে আমাদের সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিল।একটু দাঁড়ান,আমি দিচ্ছি।মেয়েটি একটি কাগজে লিখে তা হাসনাত করিমের দিকে বাড়িয়ে দিল।


হাসনাত করিম ক্লাসরুম থেকে কিছুদূর যেতেই আত্মহত্যা নিয়ে কি যেন শুনতে পেলেন।সিড়ির কাছে আসতেই মিলিয়ে গেল সেই শব্দ।


-একটা বিষয় খেয়াল করেছেন,হামিদ সাহেব?


কনস্টেবল হামিল বলল,কোন বিষয়?


-তুলির মৃত্যু হয়েছে দু'দিন হয়েছে।আনিকাও কলেজে আসছে না দু'দিন।


কনস্টেবল হামিদ বলল,বান্ধবীর মৃত্যুর শোক হয়তো এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।


হাসনাত করিম বললেন,হতে পারে।আবার নাও হতে পারে।আনিকার সঙ্গে কথা বলার পর বুঝতে পারবো।


তিন.


রাস্তায় প্রচন্ড ভিড় জমে আছে।উৎসাহী লোকজন দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছে।সবাই ব্যাপারটায় বেশ মজা পাচ্ছে।হাসনাত করিম ভিড় ঠেলে কাছে আসতেই দেখতে পেলেন,চৌদ্দ-পনেরো বছরের একটি ছেলে গাড়ির দরজা ধরে বসে আছে।গাড়ির ভেতরে একটি ছোট্ট মেয়ে ছেলেটিকে দেখে ভয়ে কান্না করছে।মেয়েটি একা,পাশে কেউ নেই।সম্ভবত ছোট্ট মেয়েটিকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে পরিবারের লোকজন কোথাও গেছে।কান্না করার কারনটা বুঝতে পারছেন না হাসনাত করিম।তিনি গিয়ে ছেলেটির কাঁধে হাত রাখতেই ছেলেটি পেছনে ফিরে তাকালো।তিনি বুঝতে পারলেন,ছোট্ট মেয়েটির ভয় পাওয়ার কারন।ছেলেটির মুখের ডানপাশ পুঁড়ে গেছে।রোদের তাপে জায়গাটা তৈলাক্ত হয়ে ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে।হয়তো গাড়ির গ্লাসে নিজের মুখের অবস্থা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি।


তিনি বললেন,এই এখানে কি করিস?চলে যা এখান থেকে।নাহলে ওরা খুব মারবে।কিছু খাবি তুই?


ছেলেটি মাথা নেড়ে হাসলো,যে হাসির মাঝে মায়া নেই।হঠাৎ দেখলেই ভয় পেয়ে যাবে যে কেউ।হাসনাত করিম পকেট থেকে বিশ টাকার নোট বের করে ছেলেটির হাতে দিতেই সে টাকা নিয়ে দৌঁড় দিয়ে মিশে গেল রাস্তার জনস্রোতে।হাসনাত করিম ছোট্ট মেয়েটিকে হাত নেড়ে কি যে ইশারা দিতেই মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল।ওনার চোখে পানি এসে ভিড় করছে।উপস্থিতি অনেকেই জানে না,এই চোখের পানির ভাষা।হাসনাত করিম  আর দাঁড়িয়ে না থেকে একটি গলিতে ঢুকে পড়লেন।


একটি পাঁচতলা বিল্ডিং এর সামনে আসতেই দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি।পকেট থেকে কাগজ বের করে পড়লেন,১০/৪,বাসা নং:২৩।কনস্টেবল হামিদকে বললেন,এটাই আনিকাদের।সম্ভবত দ্বিতীয় তলার প্রথম বাসার কথাই বলেছিল মেয়েটি।সঙ্গে পুলিশ দেখে গেইটের দারোয়ান ঝামেলা করলো না।সালাম দিয়ে ভেতরে যেতে বলল।দ্বিতীয় তলায় উঠে প্রথম বাসায় কলিং বেল বাজালেন হাসনাত করিম।দরজা খুলল একটি মাঝবয়সী লোক।বললেন,আপনারা কারা?


-আমি তুলির বাবা,হাসনাত করিম।একটু আনিকার সাথে কথা বলতে এসেছি।


লোকটি বলল,ওওও আচ্ছা।ভেতরে আসুন।


সোফায় বসতেই হাসনাত করিম বললেন,আনিকা কি বাসায় আছে?


আনিকার বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,আসলে কি বলবো,ভাই?মেয়েটার গত দুইদিন ধরে কি যে হয়েছে।সারাদিন ঘরের কোণে বসে থাকে।কথা বলে না,ঠিকমতো খায় না।শুনলাম,তুলি আর নেই।হয়তো সেই শোকে এমনটা হয়েছে।


হাসনাত করিম কনস্টেবল হামিদের দিকে একবার তাকালেন।বললেন,আমরা একটু কথা বলতে পারি?


আনিকার বাবা রুমের দরজা দেখিয়ে দিলেন।


দিনের বেলায়ও পুরো রুম অন্ধকার।ঠিকমতো দেখা যায় না।পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে জানালাগুলো।যেন অনেকদিন এই রুমে কারো পা পড়েনি।হাসনাত করিম কনস্টেবল হামিদকে সোফায় বসিয়ে একা ঢুকলেন।আস্তে ডাকলেন,আনিকা,মা?আমি তুলির বাবা।কেমন আছো?


আনিকা বিছানায় মাথা নিচু করে বসেছিল।হাসনাত করিমের কন্ঠ শুনে মাথা তুলে তাকালো।চোখদুটো লাল হয়ে আছে।মুখটা কেমন যেন মলিন।বলল,আংকেল,আপনি এখানে?


তিনি আনিকার পাশে এসে বসলেন।মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,তোমার সাথে একটু কথা বলতে এসেছি।আমার তো একটি মেয়ে ছিল।সে এখন নেই।তুমি আমার মেয়ে হয়ে থাকতে পারবে না,মা?


আনিকা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল।


-আচ্ছা একটা কথা বলবে?তুলির কি কোনো ছেলে বন্ধু ছিল?


আনিকা চোখ মুছে বলল,না তো,আংকেল।এমন তো কেউ ছিল না।থাকলে তো আমাকে বলতো।


-তাহলে এমন কোনো বিষয় নিয়ে ডিপ্রেশনে ছিল যা আগে কখনো দেখোনি?


-তুলিকে কখনো কিছু নিয়ে মন খারাপ হতে দেখিনি।এমনকি,কেউ বকা দিলেও নয়।


-ঠিক আছে,আমি আজ তাহলে আসি।শুনলাম,তুমি বের হও না?এমনটা তো ঠিক নয়,মা।বের হবে,সবার সাথে কথা বলবে।তবেই তো মনটা হালকা লাগবে।


আনিকার বাসা থেকে বের হতেই কনস্টেবল হামিদ জিজ্ঞেস করল,কিছু জানতে পেরেছেন?


-তেমন কিছু তো বলেনি।তবে মেয়েটির চোখ এবং মুখের ভাষা ভিন্ন কথা বলছে।আরও কিছুদিন সময় দিতে হবে।


কনস্টেবল হামিদ বলল,এখন কোথায় যাবো আমরা?


-আপনি চলে যান আজ।আমার একটু অফিসে যেতে হবে।কিছু কাজ বাকি আছে।


বাসায় ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল হাসনাত করিমের।দেখতে পেলেন,ওনার স্ত্রী ফিরোজা টেবিলে খাবার নিয়ে বসে আছে।বলল,মাহবুব ভাইকে ফোন করেছিলাম।তুমি নাকি অফিস থেকে মাসখানেকের ছুটি নিয়েছো আজ।কোথাও যাবে নাকি?কখনো তো এতদিনের ছুটি নিতে দেখিনি।


ছুটি নেওয়ার কারনটা চেপে গেলেন তিনি।খুনের ব্যাপারটা সন্দেহের।আগের শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি,ফিরোজা।বললেন,না,ভালো লাগছে না।ভাবছি,বাসায় থেকে কিছুদিন বিশ্রাম নিব।তুমি চাইলে গ্রামে থাকতে পারি কিছুদিন।


-না,আমি যাবো না,বলল ফিরোজা।


-ঠিক আছে।খাবার খেয়ে নাও।দোকান থেকে ঔষধ এনেছি,মনে করে খেয়ে নিও।


হাসনাত করিমের ঘুম আসছে না।বিছানার এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘড়িতে প্রায় তিনটা বেজে গেছে।চোখ বন্ধ করলে এই বুঝি মনে হয়,বাসায় কেউ হাঁটছে।হাত ধারালো ছুরি।যেকোনো সময় গলায় বসিয়ে দিবে।হাসনাত করিমের বুকে ব্যাথা উঠেছে।বিছানার পাশ থেকে ঔষধ নিয়ে বুকে লাগালেন তিনি।চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলেন।কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন খবর ছিল না।প্রায় ঘন্টাখানেক পর ভোর রাতে মোবাইলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল হাসনাত করিমের।হঠাৎ কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়াতে প্রথমে কিছু বুঝতে পারলেন না।কিছুক্ষণ পর উঠে বসলেন।চোখ কচলে মোবাইল হাতে নিয়ে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কান্নার কন্ঠ শুনতে পেলেন তিনি।


-জামাল সাহেব আপনি এত রাতে?আর কান্না করছেন কেন?কি হয়েছে আপনার?জিজ্ঞেস করলেন হাসনাত করিম।


ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত কন্ঠে শুনতে পেয়ে হাসনাত করিম উত্তেজিত হয়ে বললেন,কি!আনিকা আর নেই।একটু আগে আত্মহত্যা করেছে!


.............চলবে............


written by Habib Khan Hridoy

Post a Comment

أحدث أقدم